দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের মামলা ঘুরপাক খেয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে। তাতেও সুরাহা না-হওয়ায় ফের মামলা হয় উচ্চ আদালতের সিঙ্গল বেঞ্চে। সেখান থেকে ডিভিশন বেঞ্চ। অবশেষে শুক্রবার হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে সেই নিয়োগ মামলায় জয় হল রাজ্য সরকারের।

এবং সরকারের জয়ে প্রাথমিক শিক্ষকের পদে নিযুক্ত কয়েক হাজার প্রার্থীর মাথার উপর থেকে সরে গেল বিপদের খাঁড়া। হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ মেধা-তালিকা ঢেলে সাজার যে-নির্দেশ দিয়েছিল, সেই অনুযায়ী কাজ হলে অনেকেরই চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত বলে শিক্ষা শিবির এবং আইনজীবীদের অভিমত। ডিভিশন বেঞ্চ মেধা-তালিকা পুনর্বিন্যাসের সেই নির্দেশ খারিজ করে দেওয়ায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্কুলে নিযুক্ত বহু প্রার্থীর বিপদ কাটল।

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক গত ১২ এপ্রিল নির্দেশ দিয়েছিলেন, ২০০৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় পিটিটিআই প্রশিক্ষিত প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে বাড়তি ২২ নম্বর যোগ করতে হবে। সেই অনুযায়ী নিয়োগের প্যানেল পুনর্বিন্যাসও করতে বলেন তিনি। রাজ্য সরকার সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মাস দেড়েক আগে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে মামলা দায়ের করে। বিচারপতি সৌমিত্র পাল ও বিচারপতি মির দারা সিকোর ডিভিশন বেঞ্চ এ দিন বিচারপতি বসাকের সেই নির্দেশ খারিজ করে দেওয়ায় একই সঙ্গে সরকারের জয় হয়েছে এবং বিপন্মুক্ত হয়েছেন নিয়োগপত্র পাওয়া অনেক প্রার্থী।

রাজ্য জুড়ে শিক্ষকের আকাল। পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা না-থাকায় প্রাথমিক থেকে স্কুলশিক্ষার সর্বস্তরেই পঠনপাঠন মার খাচ্ছে। এই অবস্থায় শিক্ষা শিবিরের প্রশ্ন, প্রাথমিকে নিয়োগ নিয়ে মামলা-মকদ্দমা এত জটিল এবং দীর্ঘায়িত হয়ে উঠল কেন?

রাজ্য প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ সূত্রের খবর, ২০০৬ সালে কর্মসংস্থান কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকপদ পূরণের জন্য আবেদনপত্র চাওয়া হয়েছিল। সেই সময় রাজ্যে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ’ ছিল না। প্রতিটি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের মাধ্যমে ওই সব পদে নিয়োগের পরীক্ষা হয়। প্যানেল তৈরি হয় ২০০৯-’১০ সালে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০১ সালের নিয়ম মেনে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বা পিটিটিআই থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীদের অতিরিক্ত ২২ নম্বর দেওয়া হবে। কিন্তু মেধা-তালিকা তৈরির পরে জানা যায়, ওই ২২ নম্বর অনেককেই দেওয়া হয়নি। হাইকোর্ট জানিয়ে দেয়, ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা ২২ নম্বর পাওয়ার যোগ্য। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য। হাইকোর্টের নির্দেশই বহাল রাখে শীর্ষ আদালত।

কিন্তু তার পরেও প্রাপকদের ওই ২২ নম্বর না-দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা ফের হাইকোর্টে মামলা করেন। গত এপ্রিলে বিচারপতি দেবাংশু বসাক জানিয়ে দেন, প্রশিক্ষিত প্রার্থীদের ওই ২২ নম্বর দিতেই হবে। সেই সঙ্গেই তাঁর নির্দেশ ছিল, ওই বাড়তি নম্বর সংযোজনের পরে মেধা-তালিকায় যে-হেরফের হবে, সেই অনুযায়ী প্যানেল পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

বর্তমানে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অশোক রুদ্র সেই সময় আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। এ দিন তিনি জানান, পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল, প্রাথমিক শিক্ষকপদে আবেদন করার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হতে হবে। থাকতে হবে এক বছরের পিটিটিআই ট্রেনিং। কিন্তু ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন বা এনসিটিই-র নিয়ম অনুযায়ী এটা অবৈধ। তাদের নিয়ম অনুসারে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে প্রার্থীকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করতে হবে। এবং সেই সঙ্গে থাকতে হবে দু’বছরের পিটিটিআই প্রশিক্ষণ। অশোকবাবুর অভিযোগ, আগেকার সরকার এনসিটিই-র নিয়ম উপেক্ষা করে নিয়োগ করতে থাকায় জটিলতা শুরু হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে এনসিটিই-র নিয়ম মানতে গিয়ে বঞ্চিত হন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীদের একাংশ। ওই ২২ নম্বরের দাবি জানিয়ে ২০১২ সালে তাঁরাই উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেন।

স্কুলশিক্ষা দফতরের এক কর্তা জানান, বিচারপতি বসাকের নির্দেশে অনেক প্রাথমিক শিক্ষকেরই চাকরি হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ, ওই ২২ নম্বর দেওয়া হলে এবং প্যানেল পুনর্বিন্যস্ত হলে অনেক প্রার্থীর নাম তালিকার উপরের দিকে চলে আসত। স্বাভাবিক ভাবেই সেই সব প্রার্থী হয়ে উঠতেন এমন কিছু পদের দাবিদার, যেখানে নিয়োগ হয়ে গিয়েছে। পথে বসতেন ইতিমধ্যে নিযুক্ত বহু প্রার্থী। সেই জন্যই সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার।

‘‘ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের ফলে বহু শিক্ষক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচলেন,’’ বলছেন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি মানিক ভট্টাচার্য।