সড়ক হোক বা বায়ুপথ, রেলপথ হোক বা জলপথ— সব পথেরই পাঁচালি আলাদা। পথ-ভেদে চলাচলের নিয়মও পৃথক। দুর্ঘটনা, বাধাবিপত্তি এড়িয়ে মসৃণ সফরের জন্য দরকার সেই সব নিয়মের পূর্ণাঙ্গ পাঠ। তাই অর্থসাহায্যের সঙ্গে সঙ্গে এ বার রাজ্যে জল পরিবহণের মান উন্নয়নে পাঠ-প্রশিক্ষণ দেবে বিশ্বব্যাঙ্ক। সেই প্রশিক্ষণ চালু হয়ে যাচ্ছে নতুন বছরের শুরু থেকেই।

জলযাত্রায় একদা বিশেষ খ্যাতি ছিল বাংলার। এ বার বিশ্বব্যাঙ্কের সহায়তায় হলদিয়া থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার দু’পাড়ের মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজ্যের পরিবহণ দফতর। পুরো প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ে হলদিয়া থেকে ত্রিবেণী পর্যন্ত গঙ্গার দু’পাড়ের উন্নয়নের কাজ করবে পরিবহণ দফতর। ওই পর্যায়ের কাজে খরচ হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে সাতশো কোটি টাকা দেবে বিশ্বব্যাঙ্ক। বাকিটা জোগাবে রাজ্য সরকারই। পরিবহণ দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন, আগামী বছরের মাঝামাঝি থেকেই ওই উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে যাবে।

জলপথ পরিবহণ ও উন্নয়নের এই ধরনের প্রকল্পে সাফল্যের চাবিকাঠি বিশ্ব-মানের পরিকাঠামো। সেই মানের পরিকাঠামো তৈরির আগে পরিবহণ দফতরের অফিসার ও কর্মীদের আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেবে বিশ্বব্যাঙ্ক। পরিবহণ দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘বিশ্বব্যাঙ্ক সারা পৃথিবীতে কাজ করে। অ্যামাজন, টেমসের মতো বড় বড় নদীতে কী ধরনের ভেসেল চলে, কেমন হয় জেটির কাঠামো, রো-রো পরিষেবা এবং পণ্য পরিবহণের কাঠামোই বা কেমন হওয়া দরকার— সেই সব ব্যাপারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে তাদের। তাই এই সমস্ত বিষয়েই প্রয়োজনীয় পাঠ দেবে বিশ্বব্যাঙ্ক।’’

পুরো প্রকল্পে কী কী কাজ হবে?

পরিবহণ দফতরের খবর, হলদিয়া থেকে ত্রিবেণী পর্যন্ত ৫৬টি যাত্রী ও পণ্য পরিবহণযোগ্য জেটি গড়া হবে। রো-রো ভেসেল চলাচলের উপযোগী এলসিটি জেটিও তৈরি হবে আটটি। কেনা হবে ৩৭৪টি আধুনিক ভেসেল। চলবে পুরনো ভেসেলকে আধুনিক মানের ভেসেলে রূপান্তরের কাজও। এ ছাড়া গঙ্গাপাড় বরাবর বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রকে এক সুতোয় গেঁথে পর্যটকদের জন্য প্রমোদসফরের ব্যবস্থাও হবে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে।

গঙ্গার দু’পাড়ে বেশ কয়েকটি জেটিকে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে রাজ্য সরকার। তৈরি হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি)। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে বিশ্বব্যাঙ্ক। তাই জেটিতে কী ভাবে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা যায়, তা-ও খতিয়ে দেখবে তারা। পরিবহণ দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘বিশ্বব্যাঙ্কের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পরে তাদের তৈরি করে দেওয়া মাপকাঠির ভিত্তিতেই ভেসেল এবং রো-রো কেনার জন্য দরপত্র ডাকা হবে।’’

গঙ্গার দু’পাড়ে পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক ভেসেল চালানোর মতো উন্নত মানের সারেং এবং চালকও তৈরি করতে চাইছে রাজ্য সরকার। তার জন্য বিশ্বব্যাঙ্কের সহায়তায় একটি প্রশিক্ষণ স্কুল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে জলযানের দক্ষ চালক তৈরি করা হবে।