মঞ্চে নয়তো শটে যাওয়ার আগে ওঁর নমস্কারের ধুম দেখলে ভিরমি খেতে হয়! দরজা, জান‌ালা, আলমারি, মায় গেঞ্জিতেও কপাল ছোঁয়ান! পারলে কড়ি-বরগায় হাত ছুঁইয়ে কপালে ঠেকান!

কিন্তু গোটা টলিপাড়া জানে, শুভাশিস মুখুজ্জের মতো ‘ইউটিলিটি’ অভিনেতা পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এই শো-তে নটরাজ, তো পরের শো-তেই মমতাজ! পুরো ময়দানের ‘সুদীপ চাটুজ্জে’! কখনও মাঝমাঠ, তো কখনও স্টপার!

‘বিবাহ অভিযান’-এর রাজেন হয়েও তিনি হিলারিয়াস হিট, আবার ‘হারবার্ট’-এর হারবার্ট সরকার কি ‘মেঘে ঢাকা তারা’র বিজন ভট্টাচার্য বা ‘শি‌ল্পান্তর’এর নিবারণ পটুয়া সেজেও একশোয় দুশো! অথচ এই মুহূর্তে কী কী করছেন, জানতে চাইলে মুখুজ্জেমশাই মহাশূন্যে ভাসেন, ‘‘দাঁড়ান, দাঁড়ান একটু ইয়ে, মানে ভেবে নিই-ই!’’  অ-নে-ক ভেবেটেবে শুভাশিস জানলেন, নাটক করছেন একটা, ‘মেঘে ঢাকা তারা’। সিনেমায় স্বপন সাহার ‘সেরা বাঙালি’ সবে শুরু, রাজা ঘোষের ‘চাবিওয়ালা’র কাজ গড়িয়েছে কিছুটা। সিরিয়াল দুটো, ‘জড়োয়ার ঝুমকো’ আর ‘রাখিবন্ধন’। স্নেহাশিস চক্রবর্তীর। ‘‘দুটোই মারাত্মক সিরিয়াস রোল, নো কমেডি! কী যে ভাল্লাগছে করতে,’’ চওড়া হাসিতে যেন খুশি আর তৃপ্তির ককটেল শুভাশিত শুভাশিসের।

হঠাৎ কী করে যে রটে গিয়েছিল অভিনতা মনু মুখোপাধ্যায় ওঁর বাবা! ধোঁকাটা খেয়েছিলেন ‘ইডেন উদ্যান থেকে বলছি’র অজয় বসুও।

বন্ধু কাম বউ কাম ঝগড়া আর খুনসুটির পার্টনার ‘উষ্ণিক’ নাট্যদলের ঈশিতাকে নিয়ে এখন শুভাশিসের সংসার ওল্ড বালিগঞ্জ সেকেন্ড লেনে। যদিও হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্ট বেলার শুরুটা কেটেছে ৩/১ডি ছিদাম মুদি লেনের বাড়িতে।

বাবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। মা পিওর ঘরণি। ছেলে স্কটিশ ইস্কুল। নাটকের ‘ভূত’ ধরে তখনই। ক্লাস সেভেনে বন্ধু কাঞ্চনের হাত ধরে বাংলা টিচার গৌরচন্দ্র সাহার দল ‘সপ্তর্ষি’। সেই শুরু। স্কুলের দেড়শো বছরে বড় জাম্প। গর্ন্ধব নাট্যদলের দেবকুমার ভট্টাচার্য এলেন ‌নাটকের ডিরেকশন দিতে। শুভাশিসকে দেখেটেখে তাঁর অভিনয়ের কারিকুরিতে পেশাদারি ছাপ পান। তিনিই নিয়ে যান অভিনেতা উজ্জ্বল সেনগুপ্তর কাছে।

ইস্কুলের সেই নাটক দেখতে এসে বেতারের শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ওঁর কাজে হাঁ! এক ধমক স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, তখন আকাশবাণীর বেতার-নাট্যকর্তা জগন্নাথ বসুকে, ‘‘তুমি থাকতে এ ছেলে রেডিয়োয় যায় না!’’ এর পরই ‘ওভার টু বিবিধ ভারতী’। শ্রাবন্তী মজুমদার। ব্যস, শুষ্কতার রুক্ষতার অবসান!

রবারের বলে পাড়ায় পাড়ায় খেপ খেলাটা তদ্দিনে গিয়েছে, ইস্কুল পেরিয়ে বাস্কেটবলটাও হাওয়া, ছিল পড়ে ফার্স্ট ডিভিশনে ভলিবল। সেও ‘গ‌ন গনা গন নট টু রিটার্ন’। পরের পর সেলসের চাকরি, বাবার অডিট ফার্ম, কিছুই পোষাচ্ছিল না। ভরসা দিলেন ঈশিতা, ‘‘ধ্যাত্তেরি, ছাড়ো তো।’’ ফলে ’৭৮-এ বিনোদন-এর আশিস সরকারের হাত ধরে স্টুডিয়ো পাড়ায় যাওয়া শুরু। ৮১-তে বড় পরদা। ’৮৬-তে সিরিয়ালে পা। এমনকী ওয়ানওয়াল যাত্রাও। সেই থেকে চাক্কি পিসিং অ্যান্ড পিসিং!

পুর্ণেন্দু পত্রী টু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, রাজা সেন, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী হয়ে অপর্ণা সেন, সন্দীপ রায়, অঞ্জন দত্ত, অরিন্দম শীল, কমলেশ্বর আর সুমন মুখোপাধ্যায়। কেরিয়ার গ্রাফে পেল্লায় সব ডিরেক্টর! কিন্তু সিনেমার ‘সি’ বললেও যার কথা ভোলেন না, তিনি স্বপন সাহা। সাড়ে চুয়ান্নটা ছবি করে ফেলেছেন ওঁর সঙ্গে। আর ভোলেন না প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে, ‘‘আমি আর বুম্বা কত যে জুটি বেঁধেছি!’’ আনমনা শুভাশিস।

আর ভো‌লেন না কিছু দৃশ্য! জিভ খোলা রেখে কী করে কথা বলতে হয়, শিখিয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। বিকাশ রায় ভুল পার্ট বলায় তাঁর গলা টিপে ধরেছিলেন শ্রাবন্তী মজুমদার। ‘শ্যামলী’ করতে যাওয়ার আগে টিপস দিয়েছিলেন অনুপকুমার। অগ্রদূত-এর বিভূতি লাহার ঘরে উত্তমকুমারকে অনুমতি চেয়ে ঢুকতে দেখাও কি কম পাওয়া...!

এ তো সবই সুখের স্মৃতি। দগদগে ঘা কি নেই? আছে তা-ও। অনেক চাপাচাপিতে একটা মাত্র বললেন। ‘‘নামী বাঙালি ডিরেক্টর। বলিউডের। ডেকেছিলেন। এয়ারপোর্টে নেমে দেখি, যেতে হবে অটোতে। তাও কিনা আনতে এসেছে এলেবেলে একজন। বিরক্তি প্রকাশ করায় আনতে আসা লোকটি ফোন করল ওঁকে। তখন ভাড়ার ট্যাক্সি! পৌঁছেও অপেক্ষা ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষে ডিরেক্টেরের তিন ধাপ নীচের একজন ইন্টারভিউ নিল। পরিচালক এলেন আরও পরে। টাকাপয়সা কী চাই, জানতে চাওয়ায় বললাম। তাতে পরে যা কথা শোনালেন!’’

বাংলা সিনেমার ‘মার্কামারা’ কমেডিয়ানের চোখ ছলছল করে উঠল। হঠাৎ মনে হল, চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমায় কোনও ট্র্যাজিক ক্লাইম্যাক্স দেখছি যেন!