জাভেরি বাজার-সহ মুম্বইয়ের নানা জায়গায় পরপর ব্লাস্ট... বছর কয়েক আগের সেই ভয়ংকর বাস্তবই ‘কবীর’-এর প্রেক্ষাপট। একই সঙ্গে এ ছবি একটা জার্নি। সন্ত্রাসবাদের শিকড় কোথায়, তা খুঁজে দেখার চেষ্টাও বটে। সেখান থেকেই একটা-একটা সূত্র জুড়ে ছবির গল্প গেঁথেছেন পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। ‘কবীর’-এর সিংহভাগ শ্যুটিং হয়েছে দুরন্ত এক্সপ্রেসে। পরিচালক ও প্রযোজক দেব চেয়েছিলেন রিয়্যাল লোকেশনে শ্যুট করতে। নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমে শ্যুট শেষ করার তাড়াও ছিল। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?

 

অনিকেতের কথায়    

এই ছবিতে একজন মানুষ কিছু খুঁজতে বেরিয়েছে। গোটা ভারত জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় সে যাচ্ছে। সেই চরিত্র টেররিস্ট, কখনও অ্যান্টি-টেররিস্ট। আবার কখনও সে শিকড়ের সন্ধানে। কিন্তু কেন এই সন্ত্রাসবাদ? এই ছবি তা নিয়েই একটা ডিসকোর্স। এ সবের মাঝে ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ। ছবিতে ট্রেনের দৃশ্য থাকলে স্টুডিয়োয় কম্পার্টমেন্ট তৈরি করে শ্যুট করা হয়। কিন্তু এতে রিয়্যাল ফিল কি আসে? তাই ঠিক করলাম, ট্রেনের কম্পার্টমেন্টেই শ্যুট করব। সাউথ সেন্ট্রাল রেলের দেওয়া দুটো বগিতেই শ্যুট করলাম। রবিবার সকাল থেকে শ্যুট শুরু। স্টেশনের সামনের রাস্তা, লবি, প্ল্যাটফর্মে শট নিয়ে রাতে ট্রেনে চাপলাম। তার পর গোটা একটা দিন ও আরও অর্ধেক দিন কাটিয়ে, দুটো-আড়াইটের সময় প্যাকআপ করেছি। সকালবেলা আধঘণ্টা কেউ হয়তো একটু ঝিমিয়ে নিয়েছে। ফের শুরু। একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে নেমেছিলাম, বিরাট এক্সপিরিয়েন্স হল। দু’-আড়াই দিনে ছবির প্রায় অর্ধেক শ্যুিটং আগে কেউ করেছে কি না, জানা নেই!

আরও পড়ুন: হৃতিকের জন্মদিনে আবেগঘন পোস্ট সুজানের

আমাদের বগিটা ছিল টু টিয়ার। টয়লেটে রুক্মিণীর একটা অ্যাকশন সিকোয়েন্স আছে। ব্যাপারটা ওর কাছে খুব শকিং। বারবার বলছিল, ‘আর একটু অপেক্ষা করলে হয় না! স্টেশন এলে ক্লিন করা হবে। তার পর শট দেব’। গোটা টিম যে চাপের মধ্যে কাজ করেছে, তা বলার নয়। আমরা কাজ করতে করতে সব সময় চা খাই। কিন্তু এখানে স্টেশন আসা অবধি অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। বগিও ভেস্টিবিউল ছিল না। কলকাতা থেকে ট্রেন ধরার দিন দেবের বাবা টিফিন ক্যারিয়ারে চিকেন আর অনেক পরোটা নিয়ে এসেছিলেন। রুক্মিণী মাঝেমধ্যে কাঠ হয়ে যাওয়া সেই পরোটা আর একটু চিকেন খেত। ট্রেন লেট ছিল, ফলে সময়টা একটু বেশি পেয়েছি। তবে দেব ও রুক্মিণী-সহ পুরো টিম অতক্ষণ জেগে অসম্ভব পরিশ্রম করায় এমন একটা শ্যুটিং সম্ভব হল।

দেবের কথায়

আমি এই শ্যুটটা নিয়ে সত্যিই খুব ভয়ে ছিলাম। কলকাতা থেকে মুম্বইও গিয়েছিলাম ওই ট্রেনে, ওয়র্কশপ করার জন্য। সেই টাইমটা পুরো ইউটিলাইজ করেছি আমাদের মুভমেন্ট কেমন হবে, ক্যামেরা কোথায় থাকবে, কী ভাবে সংলাপ বলব, সে সব ঠিক করায়। মুম্বইয়ে পৌঁছেই পরদিন সকাল আটটা থেকে শ্যুটিং। সিএসটি স্টেশন থেকে যখন শ্যুটিং শুরু করলাম, সেখানে ভর্তি বাঙালি। এক সময় ভাবছিলাম, শ্যুটিং করতে পারব কি না। ট্রেন ছাড়ার আগে স্টেশনে পাঁচটা সিন ছিল। তার পর ছাড়ার আধঘণ্টা আগে ট্রেন দিল। আবার ট্রেনে উঠেই শ্যুটিং শুরু। আমি বোধহয় জীবনে এত ওয়র্কশপ করিনি, যা এই ছবিতে করেছি। ওইটুকু সময়ের মধ্যে সংলাপ ভুলে গেলে আমি শেষ! আমার আর রুক্মিণীর সব ডায়লগ মুখস্থ। লাইট ম্যাচ করার ব্যাপার ছিল। সকাল দশটার সিন তো বিকেল চারটেয় শ্যুট করতে পারব না। তবে আজ আমি খুশি যে, কাজটা ভাল ভাবে শেষ করতে পেরেছি। মুম্বই থেকে কলকাতা আসতে দুরন্তর সময় লাগে মোটামুটি ২৬ ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে ছবির ৬০ থেকে ৭০ ভাগ শ্যুটিং শেষ করতে হবে। তার জন্য টানা শ্যুট করতে করতে একটা সময়ে পুরো ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যেতাম। ডায়লগ মনে করতে পারতাম না। বলতাম, ‘আমাকে একটু ব্রেক দাও, আমি দৃশ্যটায় রিঅ্যাক্ট করতে পারছি না’। অনিকেতদা হয়তো বলল, ঠিক আছে, ব্রেক নাও। কিন্তু তার পরই বলল, লাইট চলে যাচ্ছে, শট নিতে হবে। অনেক ফ্যাক্টর কাজ করেছিল। মহারাষ্ট্রের প্রকৃতির আলাদা একটা টেক্সচার আছে। পাহাড়, দূরে বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে গেলে তো সিনারি বদলে যাবে। দৃশ্যটা যেহেতু জানালার ধার থেকে টেক করা হয়েছিল, তাই আমাদের এই ছোট ছোট জিনিসগুলো মাথায় রাখতে হয়েছে। কত দিন পর ট্রেনে চড়লাম! যখন স্ট্রাগল করতাম, মুম্বই থেকে কলকাতায় ট্রেনে আসতাম। তার পর থেকে প্রায় দশ-বারো বছর পর আবার মুম্বই-কলকাতা ট্রেনে ট্র্যাভেল করলাম। 

প্ল্যাটফর্মে রুক্মিণী

রুক্মিণীর কথায়

মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় আমি বাড়ি পৌঁছেছি। তার পর থেকে শুধু ঘুমিয়েছি। ঘুম থেকে ওঠার পর সব কিছু ঝাপসা। আসলে এত দ্রুত হয়েছে সব, টেনশনেও কেটেছে। রবিবার আটটায় কলটাইম ছিল। সকাল ছ’টায় উঠে রেডি হতে হয়েছে। রবি আর সোমবার রাতে মাত্র তিন ঘণ্টা করে রেস্ট নিয়েছি। কলকাতা থেকে ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে, অ্যাট এ স্ট্রেচ ষাট ঘণ্টা শ্যুট... মাই গড! কিছু দিন আগে আমার পা ভাঙায় শ্যুটিং পিছিয়ে যায়। তখনও রোজ ডায়লগ রিহার্স করেছি। এখন আমি সেভেন্টি পারসেন্ট সুস্থ। ডাক্তারও পরামর্শ দিয়েছিলেন, নি-ক্যাপ পরে থাকার। কিন্তু টানা অতক্ষণ পরেছিলাম, যেটা পরা উচিত নয়। ফলে গোড়ালি ফুলে খুব খারাপ অবস্থা হয়েছিল। মেকআপও সামান্য ছিল, লেন্স পরেছি আর মাসকারা। ওই তিন দিন মুখ মোছারও সময় পাইনি। অনিকেতদা’র জন্মদিনও ছিল তার মধ্যে। মুভির শট দিচ্ছি, তখন অনিকেতদার বার্থডে! অনিকেতদা বলল, ‘দাঁড়া দাঁড়া আগে শট নিয়ে নিই।’ ইট ওয়াজ ক্রেজি।