যাচ্ছেতাই কিছু একটা ঘটেই যেতে পারত সে দিন!

‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’র শ্যুট। হাওড়া ব্রিজের উপর। বিন্দুমাত্র ড্রাইভিং না-জানা রজতাভ দত্ত পাইলট-সিটে। পাশে ছবির নায়ক আয়ুষ্মান খুরানা। টোয়িং ভ্যানে হুকিং করে বাঁধা গাড়ি।

স্টার্ট ক্যামেরা। ভ্যান এগোল। গাড়িও গড়াল। একটু বাদে স্পিড বাড়ল ভ্যানের। গতি চড়ল গাড়িরও। খেলা জমল তখনই। আনাড়ি হাত। স্টিয়ারিং মানবে কেন! পাগলা হাতির মতো এলোমেলো দৌড়তে লাগল। এ ধার ও ধার দিয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রাক, বাস, বাইক। কাটাতে গিয়ে একবার ফুটপাথে গাড়ি তুলে দিলেন। হুকিং খুলে গা়ড়ি পালটে যায়-যায়! আয়ুষ্মান ভয়ে ফ্যাকাশে। শুকিয়ে কাঠ রজতাভ। বড় কোনও দুর্ঘটনা কান ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল সে দিন।  কিন্তু ওইটুকুই। শ্যুটিং শেষে একে-তাকে দোষ চাপানো নেই। ‘‘আর অদ্ভুত! সেলেব-সুলভ অ্যরা ব্যাপারটাও ওদের কারও নেই, ’’ বলছিলেন রজতাভ।

একটা বার্থ ডে পার্টির দৃশ্য টেক-এর গল্প শোনাচ্ছিলেন। রাতভর শ্যুট। প্রচুর লোকজন। রেন-মেশিন লাগিয়ে বৃষ্টির দৃশ্য। শীতকাল। হি হি ঠান্ডা। তার মধ্যে সব্বাই ভিজে শপশপে। মাঝে মাঝে ক্যামেরা বন্ধ হচ্ছে। তখন ওই ভেজা ফ্রাই হয়েই সকলে আড্ডা দিচ্ছে। মশকরা করছে। পরিণীতি-আয়ুষ্মানও সেই দলে ভিড়ে। চাইলেই ভ্যানে গিয়ে শুকনো হয়ে আসতে পারতেন ওঁরা। যাননি। বদলে গান চালিয়ে নেচে-নাচিয়ে শরীর গরম করতেন!

রাতের অন্য একটা দৃশ্য। ঢালাও বিছানা করে সবাই শুয়ে। ঘুম ভাঙতে সকলে দেখবে আয়ুষ্মান-পরিণীতিকে। শট এটাই। হল। ‘‘হঠাৎ দেখি, অপা (অপরাজিতা আঢ্য, ছবিতে আয়ুষ্মানের মা) পরিণীতিকে বলছে, আয় আয়, এখানে শুয়ে পড়। ও দেখি দিব্যি গিয়ে শুয়ে পড়ল সবার মাঝেই,’’ বলছিলেন রজতাভ। অনুরাগ বসুর ‘জগ্গা জাসুস’ করতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা। সেখানে রণবীর কপূর। স্টারডমের ‘স’-ও নেই। ফুটপাথেও বসে পড়েছেন।

‘‘প্রথমে একটু কিন্তু-কিন্তু লাগে। মুম্বই, ওরে বাবা! কিন্তু ওদের ব্যবহারটাই এমন, কমফর্ট জোন তৈরি হয়েই যায়,’’ বলে যান রজতাভ। ‘কমিনে’র সময়কার গল্প শোনালেন এর পর। ভাল হিন্দি বলতে পারেন না বলে, অন্যদের একটু এড়িয়ে চলতেন। বুফে-ডিনারে খাবার নিয়ে আলাদা বসে খেতেন। ব্যাপারটা লক্ষ করে বিশাল নাকি নিজের প্লেট নিয়ে চলে আসতেন রজতাভর টেবিলে।

আরবপারে কাজ হয়ে গেল বেশ ক’বছর। কিন্তু যত না ছবি করেছেন, ছেড়েছেন তার চেয়ে বেশি। বাংলা ছবিতে কথা দেওয়া, তাই। উল্টো দিকে মুম্বইয়ের অফার? কখনও ‘সাত খুন মাফ’, কখনও ‘ম্যাড্রাস ক্যাফে’ কখনও ‘ভিকি ডোনর’, ‘বরফি’! আফসোস হয়নি? হেসে বললেন, ‘‘নীললোহিতের কথা ভাবি। কেউ চাকরি পেয়ে আনন্দ পায়, কেউ ছেড়ে।’’ আফসোস অবশ্য একটা আছে। তবে সেটা ছেড়ে নয়, ছবি করে। ‘এক থি ডাইন’। অসম্ভব জটিল চরিত্র। মনোবিদ। হিপনোটিজম জানে। একতা কপূর-বিশালের যৌথ প্রযোজনা। লিড রোলে ইমরান হাশমি-হুমা কুরেশি। স্ক্রিপ্ট পড়ে মনে হয়েছিল, ‘দ্য ওমেন’-এর মতো ক্লাসিকাল হরর! এ দিকে একতার হঠাৎ মনে হল, একটু বেশি সেরিব্রাল ছবি হয়ে যাচ্ছে। ‘‘এমনকী ইমরানকে বুঝিয়ে ফেলল ও, দর্শক তোমার কাছে ‘চুমু’র দৃশ্য চায়। ইমরানও ঘেঁটে গেল। ব্যস, ফার্স্ট হাফের পর ছবির লাইনআপটাই গেল পাল্টে,’’ রজতাভর গলায় আজও খেদ। এটা ছাড়া ওঁর মুম্বই-চ্যাপ্টার ভীষণই মিঠে-মিঠে। সেটা প্রথম অফার থেকেই। একটা ক্যাফেতে বসেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। হঠাৎই উঠল বিশাল ভরদ্বাজের ‘ওমকারা’ প্রসঙ্গ। ‘ও সাথী রে দিন ডুবে না’ গানের সিকোয়েন্স। তার পরই বিশালের ছবি নিয়ে টেলিস্কোপিক আড্ডা। বাড়ি ফিরতে ল্যান্ডফোন, ‘‘বিশাল ভরদ্বাজের ইউনিট থেকে বলছি, আপনাকে একটা ছবির স্ক্রিন টেস্টের জন্য ডাকা হচ্ছে।’’ বন্ধুদের দুষ্টুমি ভেবে ফোন রেখে দিয়েছিলেন। মিনিট পনেরো বাদে আবার ফোন। এ বার ভুল ভাঙল।

মিঠে স্মৃতি বাংলাতেই বা কম কী! তপন সিংহ বাড়িতে ডেকে স্ক্রিপ্ট বোঝাচ্ছেন। এমনিতে শর্ট-টেম্পার্ড, কিন্তু শ্যুটে যেন বরফের মতো ঠান্ডা মাথা গৌতম ঘোষের। সন্দীপ রায়ের সঙ্গে কাজ মানেই যেন জয়েন্ট ফ্যামিলির ফিলিং। অপর্ণা সেন এতটাই প্যাশানেট যে, বেচাল দেখলে ফ্লোরেই কেঁদে ফেলছেন। আউটডোরে শর্মিলা ঠাকুর চুল বেঁধে দিচ্ছেন বিদীপ্তার (চক্রবর্তী)। গল্প করতে করতে বলছেন, ‘‘সেফটা যে কী ছেলে! রাতবিরেতে চিৎকার করে গিটার বাজিয়ে গান গায়, এমন করলে ঘুম হয়!’’ মিঠুন চক্রবর্তী নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। প্রথমবার অভিনয়ের সময় শট বোঝাচ্ছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়!

করতেন তো গান! দক্ষিণী, সুরঙ্গমা-য় শিখেছেন। বাড়িতে চণ্ডীদাস মালের ছাত্র তিমিরদার (পদবি মনে নেই) কাছেও। গানই প্রাণের মতো। হাজরার মোড়ে দাঁড়িয়ে লাস্ট বাস ছাড়া অবধি কত বার একের পর এক গান শুনিয়েছেন বন্ধুদের! সেখান থেকে প্রথমে থিয়েটার। পরে পরদা। ফার্স্ট লাভ যদিও থিয়েটার। এখন চারটে নাটকে নিয়মিত অভিনয় করেন।

এত কিছুর পরেও মাথা থেকে পা পর্যন্ত ফ্যামিলি-ম্যান। ‘‘ডিসেম্বরের ২১-৩১, স্পিলবার্গ ডাকলেও যাব না। ওই সময় লম্বা ট্যুর। মেয়ে-বৌকে নিয়ে। নো অভিনয়। পুরো জীবন,’’ বিজ্ঞাপনের নিজের সংলাপ ‘পুরো মাখন’ স্টাইল টালিগঞ্জের রনির গলায়! হাসিটা চওড়া হতেই থাকল। পাহাড়ের গায়ে সূর্য উঠল যেন!