মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ঘোষণা করলেন, ‘‘ছবি বিশ্বাসের পোস্টমর্টেম হবে না।’’

১১ জুন, ১৯৬২। লোকে লোকারণ্য আর জি কর হাসপাতাল। এত ভিড়, ঢোকা-বেরোনোর পথ সব বন্ধ। থিয়েটার, সিনে-দুনিয়ার সবাই আসছেন, ঢুকতে পারছেন না। উদ্বিগ্ন, থমথমে মুখের সারি। প্রশ্নের গুঞ্জন। কী হয়েছিল? কী ভাবে হল অ্যাক্সিডেন্ট? সাদা অ্যাম্বাসাডরটা নাকি তুবড়ে গিয়েছে? ড্রাইভার ছিল না? নিজে চালাচ্ছিলেন? মদ খেয়ে?

ডাক্তার না করলেও, মানুষ কি আর ছাড়ে কাটাছেঁড়া? বাতাসে ভাসে আশ্চর্য, বহুবর্ণ এক অভিনেতার ব্যবচ্ছিন্ন শব। কথা-বলা চোখ। দুই ভুরুর একটা তুলে, অন্যটা নামিয়ে আশ্চর্য কৌশলে ডায়ালগ বলতেন, সেই ভুরু। সংলাপের মাঝে ‘পজ’-কে অতুল শিল্পবস্তু বানিয়ে ফেলার সেই কণ্ঠ। বিশু, হারান, মাস্টারমশাই, রহমত, দাদাঠাকুর, বিশ্বম্ভর রায়, কালীকিঙ্কর, ইন্দ্রনাথরা বুঝি আজ ঢুকতে চেয়েও ঢুকতে পারছে না ওই ছ’ফুট, ঋজু শরীরটায়। বাংলা ছবির উত্তম-সুচিত্রা-সুপ্রিয়া-সাবিত্রী-সন্ধ্যার অজস্র কাহিনির আজ পিতৃবিয়োগ! 

মাত্র বাষট্টি বছরের জীবন। ১৯০০ সালে জন্ম নেওয়া মানুষটি বাংলা ছবিকে হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছেন আধুনিকতার আঙিনায়, বললে ভুল হবে কি? আর মঞ্চের ছবি বিশ্বাসও তো শুধু পটে নয়, ইতিহাসেও লেখা। বাঙালিরা শিল্প নিয়ে কথা কইতে গেলে ‘যুগ’ শব্দটি বলতে বড় ভালবাসেন। রবীন্দ্র যুগ, অহীন্দ্র যুগ। সে কালের থিয়েটার-ভক্তরা বলেন, অহীন্দ্র চৌধুরী-শিশিরকুমার ভাদুড়ীর পর বাংলার মঞ্চে ছিল ছবি বিশ্বাস যুগ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’, মনোজ বসুর কাহিনি-আধারিত ‘ডাকবাংলো’, দেবনারায়ণ গুপ্ত-র ‘শ্রেয়সী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, কত ঐতিহাসিক নাটক! শিশির ভাদুড়ীর ভাই ছিলেন ছবি বিশ্বাসের সহপাঠী, তাই শিশিরবাবুকে ‘বড়দা’ বলতেন। কাছ থেকে অভিনয় দেখেছেন, শিখেছেন, তার পর পালটেছেন সেই অভিনয়কে। ম্যানারিজম-হীন সেই অভিনয়ের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ত চরিত্রের আভিজাত্য, দাপট, কারুণ্য, ভাঙচুর। ফিল্ম-কেরিয়ারের তুঙ্গ পর্যায়ে ন’বছর বাদ পড়েছিল মঞ্চাভিনয়, শরীরও ভাল যাচ্ছিল না। ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে যে দিন স্টার থিয়েটারে ফিরলেন, বুকিং অফিস খুলতেই লম্বা লাইন, প্রতিটা শো হাউসফুল। বক্স অফিস টানেন নায়ক-নায়িকারা আর ছবি বিশ্বাস— এ ছিল অমোঘ সত্য।

 ‘জলসাঘর’ ছবির বিশ্বম্ভর রায়

বারাসতের জাগুলিয়ায় জমিদারি ছিল দে বিশ্বাস পরিবারের। ‘দে’ পদবি, ‘বিশ্বাস’টা নাকি তাঁর পূর্বপুরুষ পেয়েছিলেন আকবর বাদশাহর কাছ থেকে। বাবা ভূপতিনাথ দে বিশ্বাসের চার ছেলের মধ্যে ছোট শচীন্দ্রনাথ। বয়স এক না পেরোতেই মায়ের মৃত্যু। প্রিয়দর্শন শিশুটিকে মা আদর করে ‘ছবি’ নামে ডাকতেন। সেই নামটাই  রয়ে গেল আজীবন, ইতিহাসেও!

শুরুটা সতু সেনের রঙমহল-এ, নাটক দিয়ে। ১৯৩৬ সালে অভিনেতা-পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তী ছবি বিশ্বাসকে মুখ্য ভূমিকায় নিলেন ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ (পরে উত্তমকুমার যে ছবি করবেন আবারও) ছবিতে। লম্বা, সুদর্শন নায়কটিকে কিন্তু দর্শক নিলেন না। ছবি বিশ্বাস এখানে-ওখানে ঘোরেন নতুন কাজের আশায়। এক দিন শুনলেন, কমেডিয়ান-চরিত্রে অভিনয় করা এক অভিনেতা নাম নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, নাকি বদনাম করে বেড়াচ্ছেন তাঁর নামে। এক দিন পাকড়াও করলেন তাঁকে। গম্ভীর হয়ে নৃপতি বললেন, ‘‘বদনাম করার মতো কাজ করেছেন, তাই বদনাম করে বেড়াচ্ছি।’’ সে আবার কী!  ওখানে দাঁড়িয়েই বোঝানো শুরু করলেন তাঁর অভিনয়ের ভুলচুক, খামতিগুলো। কেমন হবে হাঁটা, তাকানো, ডায়ালগ থ্রো, টাইমিং— সব। সে দিন থেকেই নৃপতি চট্টোপাধ্যায় ছবি বিশ্বাসের ফ্রেন্ড, ফিলজফার অ্যান্ড গাইড। ভালবাসা, বন্ধুতা অটুট ছিল আজীবন।

১৮ জানুয়ারি ১৯৪১। চিত্রা-য় মুক্তি পেল দেবকী বসুর ‘নর্তকী’। ৪১ বছরের ছবি বিশ্বাস সে ছবিতে অশীতিপর এক সন্ন্যাসী! কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি, ইনি আসলে বৃদ্ধ নন! অনেক পরে তপন সিংহের ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ একই বিপ্লব ঘটাবেন বছর চল্লিশের মনোজ মিত্র। ‘নর্তকী’-র মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র পেয়ে গেল তাঁর শ্রেষ্ঠ চরিত্রাভিনেতাকে। একটু বেশি বয়সেই ছবির জগতে এসে, ২৬২ খানা মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিকে হাতে ধরে পার করে দিয়েছেন চরিত্রাভিনয়ের বৈতরণী। খানদানি জমিদার, অভিজাত বাঙালি বা ইঙ্গবঙ্গ চরিত্রে ভাবতেই দেননি আর কাউকে।

ছ’ফুট চার লম্বা, মর্তমান কলার মতো গায়ের রং, বলেছেন জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়। মেজাজটিও ছিল রাজার মতো। গটগট করে হাঁটা, পাইপ-মুখে আয়েশি ধোঁয়া-ছাড়া ছবি বিশ্বাস অভিনয়ের বাইরেও জমিদার, রাজা। আভিজাত্যের সঙ্গে রসবোধের বিক্রিয়ায় কী ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয়, তার প্রমাণ। খুব শৌখিন ছিলেন। টালিগঞ্জের কাছে বাঁশদ্রোণীতে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, সেখানে অনেকটা জায়গায় একটা পুকুরও ছিল। যত্ন করে বাগান করেছিলেন। দুষ্প্রাপ্য জবাগাছের চারা ইন্দোনেশিয়া থেকে প্লেনে উড়িয়ে এনেছিলেন এক বার। কলা, বেগুন, কড়াইশুঁটি, আলু, পেঁয়াজ— সব ফলত। খুরপি হাতে সকালে কাজ করতেন। কেউ গেলে লুচির সঙ্গে ‘স্বরচিত’ বেগুনভাজা খাওয়াতেন। অনেক বেগুন ফলত, কিন্তু তিনি তো ছবি বিশ্বাস, বেগুন বেচতে পারেন না! এক ফড়েকে রোজ তিন পয়সা সের দরে কয়েক বস্তা করে বেগুন দিতেন বিক্রির জন্য। এক বার বাড়িতে দুটো গরু, একটা মোষ কিনে ডেয়ারি বানালেন। রোজ প্রচুর দুধ হয়। খেয়ে, ছানা-মিষ্টি বানিয়েও পড়ে থাকে। ভাবলেন, দুধ বিক্রির ব্যবসা করলে কেমন হয়? লিফলেট ছাপিয়ে-টাপিয়ে সে এক কাণ্ড! নিজে ক’দিন দেখে, দু’-তিন জন লোকের হাতে ছেড়ে দিলেন। তার পর যা হয়, মাস কয় বাদে বাড়ির দুধে জল-যোগ দেখে টনক নড়া, এবং আবিষ্কার, দুধ-বিক্রির টাকার হিসেব নেই, গোয়ালে গরু-মোষের স্বাস্থ্য-যত্নও ঝিমোচ্ছে। তখন সেই লোকেদের কাছেই জলের দরে গরুমোষ বেচে, ব্যবসার দি এন্ড। 

         

বার্লিনে মঞ্জু দে ও সুনন্দা দেবীর সঙ্গে

তেলরঙে মাটির ফুলদানি বা প্লাস্টিকের পাত্রের উপর আঁকতেন আশ্চর্য সুন্দর নকশা, ছবি। বাটিক, এমব্রয়ডারির কাজ করতেন। দেবনারায়ণ গুপ্ত দেখেছেন, বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে ছবি বিশ্বাস মাছের আঁশ দিয়ে মোটা কালো কাপড়ের উপর ফুলের সাজি বানাচ্ছেন। মিনার্ভায় ‘ঝিন্দের বন্দী’ নাটকের রাতভর রিহার্সাল হত। কোনও কোনও দিন মহড়া এগারোটার মধ্যে শেষ, এ দিকে ছবি বিশ্বাসের অনিদ্রা রোগ, ঘুম আসে সেই ভোরের দিকে। নিজের মেকআপ রুমে বসে বড় বড় পোড়ামাটির ঘটে রং-তুলি দিয়ে ছবি আঁকতেন— স্মৃতিকথায় লিখেছেন কমল মিত্র।

‘সূর্যমুখী’ ছবির শ্যুটিং, পরিচালক বিকাশ রায়। ছবি বিশ্বাসের কল টাইম তিনটেয়, সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছে, তাঁর দেখা নেই। বিকাশ রায় প্রথমে প্রোডাকশন ম্যানেজার, তারও পরে এক সহকারীকে পাঠালেন ছবি বিশ্বাসকে খুঁজতে। তাঁরাও বেপাত্তা। পাঁচটার পর ছবি বিশ্বাস এলেন, মেকআপ কস্টিউম সেরে যথারীতি দুর্দান্ত শট দিলেন। ভাল শট পেয়ে পরিচালকের রাগ পড়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করলেন, এত দেরি হল? ছবি বিশ্বাস বললেন, ‘চুমকি বসাচ্ছিলাম!’ বিকাশ রায় হতভম্ব! ছবি বিশ্বাস সোৎসাহ বললেন, তাঁর স্ত্রী মেয়ের বাড়িতে পাঠাবেন বলে দোলের তত্ত্ব সাজাচ্ছিলেন, আবিরের চুড়োটা কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছিল। তাই তাঁর খোঁজে আসা প্রোডাকশন ম্যানেজারকে পাঠিয়েছিলেন বড়বাজারে। অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা রঙিন পাত কিনতে। সে ফিরতে ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্টকে নিয়ে বসে ছোট ছোট চুমকি-তারা বানাচ্ছিলেন। তাই দেরি! বলেই পরিচালককে বললেন, ‘‘তুই যেন ছেলেদুটোকে বকাবকি করিস নে।’’

রসবোধ ছিল দেখার মতো। পাহাড়ী সান্যাল আর ছবি বিশ্বাসের একটা গল্প খুব বিখ্যাত। বহু মানুষের বয়ানে এ গল্প স্থান-কাল পালটেছে। নির্যাসটুকু এ রকম: পাহাড়ী সান্যাল রেগেমেগে গজগজ করছেন, এটা নেই, ওটা নেই, সেটা নেই, এ ভাবে কাজ হয়! কোথাও একটুও শান্তি নেই! ছবি বিশ্বাস শুধু বললেন, ‘‘শান্তি এখানেই ছিল, এতক্ষণ!’’

দার্জিলিংয়ে বাজে আবহাওয়ায় শ্যুটিং বন্ধ, সবাই মিলে তাসের জুয়ো খেলা হচ্ছে। সব টাকা ছবি বিশ্বাস জিতে নিলেন, বিকাশ রায়ের কাছে সিগারেটটুকু কেনার পয়সাও নেই। রাতে মনের দুঃখে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। ‘ছবিদা’ মান ভাঙাতে ডেকে তুলে সিগারেট খাওয়ালেন। নিজে বিনিদ্র, বিকাশ রায়কেও ঘুমোতে দেবেন না। ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলে গা থেকে কম্বল কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘‘আমার সিগারেট ফুঁকলি ফুসফুস করে, আর আমার সঙ্গে জেগে থাকবি না, এত বড় বেইমানি তোকে আমি করতে দেব! আমি তোর দাদা না?’’

মজা করতে গিয়ে কখনও বিপত্তিও বাধত। ‘ঝিন্দের বন্দী’ নাটকে কমল মিত্রের সঙ্গে তরবারি-যুদ্ধের দৃশ্য, এ দিকে ব্যবহৃত হচ্ছে আসল স্প্যানিশ সোর্ড। দু’জনের মধ্যে ১২ নম্বর মার অবধি চলবে, প্রতিটা মার রিহার্সড। ছবি বিশ্বাস সে দিন কী মনে করে ৩-এর পর ৬ নম্বর মার চালিয়ে দিলেন, কমল মিত্রের খাকি কোটের হাতা ভেদ করে তরোয়ালের ডগা ঢুকে গেল বাঁ হাতের কনুইয়ে। রক্তে ভেজা জায়গাটা ডান হাতে চেপে ধরেই পরের দৃশ্যে অভিনয় করলেন কমল মিত্র। সিনের পর ছবিদাকে চেপে ধরতে বেমালুম অস্বীকার, ‘‘তুমিই তো মারের ভুল করলে!’’

 সব বড় শিল্পীই বুঝি অনন্ত ছেলেমানুষ। ছবি বিশ্বাসও ব্যতিক্রম নন। বিকাশ রায়ের অনবদ্য লেখা থেকে তুলে ধরা যাক:

‘‘লাঞ্চের ছুটির আগেই ছবিদা এলেন, আমাকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করে পাহাড়ীদার কাছে গিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘পাহাড়ীবাবু, ‘সাজঘর’-এ আমার পার্ট আপনাকে দিয়েছিলাম, এখন আপনি সেই পার্ট আমাকে ফেরত দিন।’

পাহাড়ীদার জবাব, ‘এ ছবি ‘সাজঘর’ নয়, এর নাম ‘অর্ধাঙ্গিনী’। এ ছবিতে আমার পার্ট আমি আপনাকে দেব না মশাই। আর সেট-এ আমাকে ডিসটার্ব করবেন না, ডিরেকটরকে বলুন।’

ছবিদা আমার দিকে ফিরতেই আমি বললাম, ‘লাঞ্চ ব্রেকের আগে আমাকে দুটো শট নিতেই হবে। জ্বালাতন করবেন না, চুপ করে বসুন।

ছবিদা কোনও কথা না বলে একটি চেয়ার টেনে ক্যামেরার সামনে বসলেন। বললেন, ‘আমার পার্ট দে।’

আমি বললাম, ‘পার্ট নেই।’

ছবিদা বললেন, ‘ঠিক আছে... তুই অন্তত আমাকে একটা এক্সট্রার পার্ট দে।’

‘মানে?’

‘মানে, ছবি বিশ্বাসকে এক্সট্রা সাজাবি, একটা ক্লোজ আপ দিবি তো। ওই এক শটেই তোদের সব্বাইকে মেরে দেব।’

আমি বললাম, ‘ছবিদা প্লিজ সরে বসুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

ছবিদা বললেন, ‘আমি সত্যাগ্রহ করছি। হয় পার্ট দে, না হলে আমার মাথা সুদ্ধু ছবি তোল।’

অনেক বলেকয়ে, ফ্রি লাঞ্চ খেতে দেব বলে, তবে ভদ্রলোককে সরানো গেল।’’

‘এক্সট্রা’ প্রসঙ্গে মনে পড়ল, সত্যজিৎ রায় বলতেন, ছবি বিশ্বাসকে নিয়ে তাঁর কাজ সাড়ে তিনখানা। ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’— তিনটে। আর ‘সাড়ে’খানি হল ‘পরশপাথর’-এ ককটেল পার্টির দৃশ্য। সেখানেও ছবি বিশ্বাস আছেন, ডায়ালগহীন। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ করতে গিয়েও এক কাণ্ড। মনোজ মিত্র সে গল্প শুনেছেন থিয়েটারের বর্ষীয়ান শিল্পী-কর্মীদের মুখে। আউটডোরে দীর্ঘদিন বাইরে থাকতে হবে শুনে ছবি বিশ্বাস নাকি বলেছিলেন, সোম থেকে বুধ ঠিক আছে, কিন্তু বৃহস্পতিবার তো আমাকে কলকাতা ফিরতেই হবে! (তখন বৃহস্পতি-শনি-রবি নাটক হত)। সত্যজিৎবাবু বললেন, তা তো হবে না। ছবি বিশ্বাস তখন ‘না’ বলে চলে এলেন। পরে থিয়েটারের সবাই সে কথা জানতে পেরে ওঁকে বললেন, সে কী, আপনি কাকে ‘না’ করলেন, সত্যজিৎ রায়কে! থিয়েটার কাল না-ও থাকতে পারে, সত্যজিৎ রায়ের কাজটা যে ইতিহাসে থেকে যাবে! ওঁরাই আবার ওঁকে সত্যজিৎবাবুর কাছে পাঠান।

স্বয়ং সত্যজিৎ রায় লিখে গিয়েছেন ওঁর অসম্ভব স্মরণশক্তির কথা। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র শ্যুটিংয়ের আগে ছবি বিশ্বাসকে বলেছিলেন, ওঁর সিন আর সংলাপগুলো নিয়ে একটু কথা বলে নিতে চান। শুনে ছবি বিশ্বাস জিজ্ঞেস করেন, কেন, কিছু অদলবদল করেছেন না কি? সত্যজিৎ রায় ‘না’ বলাতে উনি বলেন, তা হলে আর কথা বলে নেওয়ার কী দরকার! শ্যুটিংয়ের সময় সত্যজিৎ রায় দেখেছিলেন, পাতার পর পাতা সংলাপ, সব ছবি বিশ্বাসের ঠোঁটস্থ। লিখেছেন মেকআপে ‘ছবিবাবু’-র বিতৃষ্ণার কথাও। দাড়িগোঁফ লাগাতে গেলে স্পিরিট গাম লাগাতে হত, তাতে ওঁর ‘ডেলিকেট’ স্কিনে সমস্যা হয়। ‘দেবী’-র কালীকিঙ্কর তাই গোঁফ লাগাবে না। সত্যজিৎবাবুর কথায়, একটা ‘যাত্রা–মার্কা গোঁফ’ দেওয়া হল, ‘প্রতি শট্‌-এর আগে পিছনে এক পোঁচ আঠা লাগিয়ে থাবড়া দিয়ে সেটিকে নাক ও ঠোঁটের মধ্যিখানে আটকে নিতেন।’ ওই একই কারণে তপন সিংহের ‘কাবুলিওয়ালা’-র দাড়িখানাও বিকট বেখাপ্পা! কিন্তু কিছু করার নেই, ওই দাড়িই ছবি বিশ্বাস লাগাবেন, ভেসলিন দিয়ে। তবে দাড়িটাড়ি সব ভেসে গিয়েছিল অভিনয়গুণে। ‘কাবুলিওয়ালা’ বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গেল, এক বিদেশি সাংবাদিক লিখলেন, হি ইজ সো গুড দ্যাট হি মেক্‌স ইউ ফরগেট অ্যাবাউট হিজ বিয়ার্ড। স্টার থিয়েটারে ‘ডাকবাংলো’ নাটকে ছবিবাবু ন’বছর পর মঞ্চে। বিশ্বেশ্বর নামের চরিত্রটির কাঁচাপাকা পরচুল, দাড়ি-গোঁফ, সব আছে। ফুল রিহার্সালের দিন নির্দেশক দেবনারায়ণ গুপ্তকে জানালেন, দাড়ি নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। সেটি বাদ গেল। কয়েকটা অভিনয় হল, একদিন জানালেন, পরচুলা পরে মাথা বড্ড দপদপ করছে। তাই সেও দূর হল। রইল বাকি গোঁফ। সেটি সিন-এ পরতেন, সিন শেষ হলেই গোঁফ খুলে হাতে আটকে রাখতেন। শততম অভিনয়ের পর এক রাতে দেখা গেল, নাটক চলছে, ছবি বিশ্বাস মঞ্চে আর গোঁফটি সাঁটা হাতে! অতঃপর পরদিন থেকে গোঁফটিও বাদ গেল। ছবি বিশ্বাস কাগজে মুড়ে সেই গোঁফ নির্দেশককে ফেরত পাঠালেন, সঙ্গে লেখা, ‘ঝামেলা ফেরত দিলাম। প্রাপ্তিসংবাদ দিস।’

‘কাবুলিওয়ালা’ ছবির রহমত

‘স্টার’ হয়ে গেলে লোকব্যবহারে রুক্ষ, দুর্বিনীত হতে হয়— এই ধারণার গালে ছবি বিশ্বাস ছিলেন এক সপাট চড়। অগ্রদূতের ‘ত্রিযামা’-র শ্যুটিং, উত্তমকুমারের বাবার চরিত্রে ছবি বিশ্বাস। তরুণ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর সলিল দত্তের ভার পড়েছে মেকআপ চলাকালীন সে দিনের সিনটা ছবিবাবুকে শোনানোর। সলিল বুঝিয়ে দিচ্ছেন, সন্ধেবেলা আপনি স্ত্রীর সামনে গীতা পড়ছেন, ছেলে মত্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরল। আপনি বুঝলেন, আপনার ছেলে অধঃপতনের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে... এটুকু শুনেই ছবিবাবু বললেন, ‘‘অধঃপতন কাকে বলে, জানো?’’ শুরু করলেন নিজের জীবনের গল্প। তরুণ বয়সে এক রাতে মত্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরলে বাবা দরজা খুলে দিতে, তাঁরই বুকের মধ্যে টলে পড়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলেছিলেন। বাবা সে দিন তাঁকে শোওয়ার ঘরের বিছানায় এনে শুইয়ে দিয়ে, মুখ মুছিয়ে, জুতো খুলে দিয়েছিলেন। সলিল দত্ত নির্বাক হয়ে সে দিন শুনেছিলেন বাংলা ছবির এক নম্বর চরিত্রাভিনেতার অকপট কনফেশন। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ও ক’জন বন্ধু মিলে শিল্পী সংঘ-র ব্যানারে ‘কালো বউ’ করবেন। নায়িকা সন্ধ্যারানি, বাবার চরিত্রে ছবি বিশ্বাসকে নিতে খুব ইচ্ছে। এ দিকে ছবিবাবু কত পারিশ্রমিক নেন, তাঁদের জানা নেই। ছবিবাবু বললেন, ‘‘পাঁচশো টাকা পার ডে দিবি।’’ অত পারব না, আড়াইশো পারব, বলায় বললেন, ‘‘একেবারে নিলডাউন হয়ে হাফ টিকিটের প্যাসেঞ্জার হয়ে গেলি যে, ডেটগুলো দিয়ে যা।’’

অনেকেই জানেন না, ঋত্বিক ঘটক ‘কত অজানারে’ ছবি শুরু করেছিলেন ছবি বিশ্বাসকে নিয়ে। ছবিবাবু ব্যারিস্টারের রোলে, যে পার্ট তাঁর তুড়ি-মারা কাজ। শ্যুটিংয়ে ঋত্বিক বারবার কাট করছেন, ‘‘হচ্ছে না ছবিদা। উকিল হয়ে যাচ্ছে, ব্যারিস্টার হচ্ছে না।’’ হতভম্ব ছবি বিশ্বাস ঋত্বিককেই বললেন, ব্যারিস্টারের অভিনয় দেখিয়ে দিতে। ঋত্বিকও তা-ই করলেন। ফ্লোরে সবাই তখন তটস্থ! ছবি বিশ্বাস কিন্তু ঋত্বিকের ফরমায়েশ মতোই শট দিলেন। পরে বলেছিলেন, ‘‘এ ঢ্যাঙাও (অন্য ‘ঢ্যাঙা’টি হলেন সত্যজিৎ রায়) অনেক দূর যাবে।’’ 

সহশিল্পীদের যে কত ভাবে সাহায্য করতেন, তার ইয়ত্তা নেই। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ছবিতে ভারতী দেবী কিছুতেই লম্বা ডায়ালগ মনে রাখতে পারছেন না, খুব নার্ভাস। ছবি বিশ্বাস মূর্তিমান আশ্বাস, ‘‘ভয় নেই ভারতী। আমি তোমাকে প্রম্পট করে যাব, আমার ঠোঁট নড়বে না। তুমি কাছ থেকে আমাকে ফলো করে যাবে।’’ ভারতী দেবী লিখছেন, ‘এখনও ভাবতে অবাক লাগে যে তখনকার দিনে জুম লেন্সের চল আমাদের এখানে হয়নি, ক্যামেরা ক্লোজে চলে আসছে, ছবিদা কিন্তু ওই অবস্থায় আমার ডায়ালগ আমাকে প্রম্পট করে দিচ্ছেন ঠোঁট না নেড়ে।’ ‘আম্রপালী’-র শ্যুটে সুপ্রিয়া দেবী লম্বা ডায়ালগ নিয়ে সমস্যায়, ছবি বিশ্বাস বুঝতে পেরে পরিচালককে টি-ব্রেক দিতে বলে সুপ্রিয়াকে বললেন, ‘‘চল তোর মেকআপ রুমে, তোর সঙ্গে বসে চা খাব।’’ চা তো ছুতো, প্রতিটি সংলাপ ধরে ধরে, কোথায় পজ দিতে হবে, কোথায় দম ফেলতে হবে, বুঝিয়ে দিলেন। ১০-১২ বার রিহার্সাল করিয়ে দিলেন। এক শটেই টেক ওকে! ‘কাবুলিওয়ালা’ করার সময় চার বছরের শিশু টিঙ্কু ঠাকুর খামখেয়ালে যদি অন্য কিছু ডায়ালগ বলত, ছবি বিশ্বাসও তৎক্ষণাৎ পালটাতেন নিজের সংলাপ। তপন সিংহ বলতেন, ‘‘আমার তো মনে হয়, ‘কাবুলিওয়ালা’ আমার ছবি নয়, ছবি বিশ্বাসের ছবি।’’

সম্ভ্রান্ত অভিজাত পার্টের বাইরেও অন্য রকম চরিত্র করেছেন বিস্তর। শরৎচন্দ্র পণ্ডিত বেঁচে থাকতেই ‘দাদাঠাকুর’ হয়েছিল, ছবি বিশ্বাস সেই প্রবাদপ্রতিম চরিত্রে। বর্ষার জলকাদা-ভরা মাঠে শ্যুটিং, সবাই দূর থেকে দেখছে, অত লম্বা মানুষটা গলা অবধি জলে ডুবে। সে অবস্থাতেই হাত তুলে শট নিতে বললেন। পরে বোঝা গেল, একটা বড় গর্তে পা পড়ে গিয়েছিল। পরিচালক সুধীর মুখোপাধ্যায়কে বললেন, ‘‘আমি কিন্তু সাঁতার জানি না। আপনাকে আগে থেকে জানালে আপনি আতঙ্কিত হয়ে এত সুন্দর শটটার সুযোগ হারাতেন।’’

স্টুডিয়ো-কর্মীরা ভাল মাইনে পান না, মালিকের ব্যবহার খারাপ, নানা অভিযোগ। কর্মীরা ধর্মঘট করলে এই মানুষটাই এসে গেটের সামনে বসে পড়েন তাঁদের সমর্থনে। বলামাত্র রাজি হন ‘অভিনেতৃ সংঘ’-র নেতৃত্ব দিতে। বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘কাবুলিওয়ালা’ দেখানোর পর ‘পশ্চিমের কোন অভিনেতার সঙ্গে নিজের তুলনা করবেন’ শুধোলে এই মানুষটাই মাথা উঁচু করে বলেন, ‘‘হু এলস দ্যান ব্যারিমোরস!’’ হিন্দি ছবিতে অভিনয় করাবেন বলে রাজ কপূর কথা বলতে এলে এই মানুষটাই বলে দেন, তাঁর অপঘাতে বিপদের আশঙ্কা, তাই প্লেনে চড়বেন না, ট্রেনে যাবেন। ট্রেনেই গিয়েছিলেন।

অপঘাত? এক বার তাঁর মৃত্যুর ভুয়ো গুজব ছড়িয়েছিল কলকাতায়। উদ্বিগ্ন বন্ধু-পরিজনেরা টেলিফোনে যোগাযোগ করলে হো হো করে হেসে বলেছিলেন, ‘‘আমি চোরের মতো চুপিচুপি মরব কেন রে? তোদের সকলকে জানিয়েই মরব।’’ ১৯৬২-র ১১ জুন অ্যাম্বাসাডরে চেপে যাচ্ছিলেন জাগুলিয়ার বাড়ি। সকালে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি এসে বললেন, যাবি সঙ্গে? রেডিয়োতে রিহার্সাল আছে বলে ভানুবাবু গেলেন না। ভবানীপুরে অসিত সেনের সঙ্গে দেখা। ছবি বিশ্বাস নয়, স্টিয়ারিংয়ে তাঁর ড্রাইভার। শ্যামবাজারে নিজে চালকের আসনে বসেছিলেন। মধ্যমগ্রামের কাছে গঙ্গানগরে ওল্ড যশোর রোডে উলটো দিক থেকে আসা ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি...

আর জি কর হাসপাতালের বাইরে ভিড়, দূরে একটা ট্যাক্সি। তার চালক বলেছিলেন, ‘‘আজ ছবি বিশ্বাস মারা গেছেন, আজ আর গাড়ি চালাব না, গ্যারেজে যাচ্ছি।’’

স্টার থিয়েটারে মরদেহ নিয়ে আসা হচ্ছে বিরাট মিছিল করে। উত্তমকুমার ফোন করলেন, স্টারের পিছনের দরজাটা খুলে রাখো, আমি এসে মালা দেব। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তমকুমারকে বললেন, ‘‘উত্তম, তুমি মালা দিতে যেও না। ছবির প্রতি যারা শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে, তোমার দিকে চোখ পড়বে তাদের।’’ মেনে নিয়েছিলেন উত্তমকুমার। নিজে সামনে আসেননি সে দিন।

শেষ দৃশ্যেও এক শটে মেরে বেরিয়ে গেলেন ছবি বিশ্বাস!

 

কৃতজ্ঞতা: মনোজ মিত্র, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া (পূর্বাঞ্চল)