কমা কি তবে কম পড়িয়াছে? প্রশ্নটা মগজে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল জজসাহেবের। সারা জীবনে মামলা-মোকদ্দমা তো মেলাই দেখলেন। কিন্তু এজলাসে এমন অদ্ভুত লড়াই বড় একটা দেখেননি তিনি। এক পিস কমা। এলেবেলে ভেবে যার কথা মনে আসেনি কারও। সে-ই কি না কোর্টে একেবারে ঘোল খাইয়ে ছাড়ছে! বাদী ও বিবাদী— আস্তিন গুটিয়ে রে রে বলে যাঁরা পরস্পরের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন, এখন থমথমে, চিন্তিত মুখে জজসাহেবের সামনে অপেক্ষায় তাঁরা সকলেই। হার-জিত বা হাসি-কান্না— সবই ওই ‘কমাশ্রী’র করকমলে বন্দি। কী গেরো!

মামলাটি করেছিলেন আমেরিকার মেইন প্রদেশের একটি দুগ্ধজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারী সংস্থার ডেলিভারি ভ্যানের চালকেরা। তাঁরা কোম্পানির কাছ থেকে ওভারটাইম চান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ দিতে নারাজ। কারণ, মেইন প্রদেশের আইন অনুযায়ী, ওই কাজে ওভারটাইম প্রাপ্য হয় না। কিন্তু তা বললে চলবে কেন?

নাছোড় চালকেরা তখন আইনের বই খুলে দেখালেন একটি ছোট্ট অংশ। যেখানে লেখা: The state's law says the following activities do not count for overtime pay: The canning, processing, preserving, freezing, drying, marketing, storing, packing for shipment or distribution of: (1) Agricultural produce; (2) Meat and fish products; and (3) Perishable foods.

লক্ষ করুন, যে যে কাজের জন্য ওভারটাইম প্রাপ্য নয় লেখা হয়েছে, তার শেষে রয়েছে ‘প্যাকিং ফর শিপমেন্ট অর ডিস্ট্রিবিউশন অব’ অংশটি। চালকদের বক্তব্য, ‘প্যাকিং ফর শিপমেন্ট’ আর ‘ডিস্ট্রিবিউশন’ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। কিন্তু এখানে একটি কমার অভাবে দুটো একই কাজ বলে মনে হচ্ছে। আসলে ওই অংশে ‘প্যাকিং ফর শিপমেন্ট’-এর পরে একটি কমা দেওয়া উচিত ছিল। তবেই দুটো কাজকে আলাদা বোঝানো যেত। চালকদের বক্তব্য: তাঁরা ‘প্যাকিং’ ও ‘ডিস্ট্রিবিউশন’ একসঙ্গে করেন না। শুধু ডিস্ট্রিবিউশনই তাঁদের কাজ। অতএব, আইনের বইয়ে যখন তা নেই, তখন দাও আমাদের ওভারটাইম। একশো-দুশো নয়, গুনে গুনে এক্কেবারে এক কোটি ডলারের মামলা! কমার এই প্যাঁচে পড়ে গিয়ে কোম্পানির কর্তাদের মাথায় হাত!

জজসাহেবের তো আক্কেল গুড়ুম! আইনের অনেক ভারী ভারী কেতাব ঘাঁটাঘাঁটি করলেন তিনি। তার পরে গালে হাত দিয়ে বিস্তর ভাবনা-চিন্তার পরে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। একটি কমার জন্য কয়েকশো পাতার  রায় প্রস্তুত হল। সেই রায়দান পর্বে ভরা আদালতে জজসাহেব বললেন, কখনও কখনও একটি কমা দেওয়া বা না দেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। অতএব, এ ক্ষেত্রে ওই চালকদের দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া আইনত কোনও উপায় নেই। আইনের বইয়ে যা লেখা আছে, তার ‘স্পিরিট’ যা-ই হোক, এ ক্ষেত্রে ‘লেটার’-এর অর্থটাই শিরোধার্য।

বিদ্বজ্জন-মহলে এই কমার একটি গালভরা নাম আছে— ‘অক্সফোর্ড কমা’। একে নিয়ে বিতর্কও কম নেই। অনেকের মতে, এটি অপ্রয়োজনীয়। আবার অনেকে মনে করেন, ক্ষেত্রবিশেষে ‘অক্সফোর্ড কমা’ না বসলে নানাবিধি কেলেঙ্কারি হতে পারে। ধরা যাক, দুই পোষা বাঁদর নিয়ে হরিবাবু দিঘায় বেড়াতে যাচ্ছেন। তিনি আবার লেডি গাগা আর জাস্টিন বিবারের ভক্ত। গাড়িতে বাজছে তাঁদেরই গান। কোলাঘাটে নেমে দুই বাঁদরকে নিয়ে সেলফি তুললেন হরিবাবু। তার পরে ফেসবুকে পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখলেন, ‘গাড়ি নিয়ে দিঘা চললুম। সঙ্গে আমার দুই পোষা বাঁদর, জাস্টিন বিবার ও লেডি গাগা’। যা বলতে চেয়েছেন আর যা বলতে চাননি, একটি কমা কম দেওয়ায় সে ফারাক ঘুচে গেল। জাস্টিন বিবার আর লেডি গাগা হয়ে গেল হরিবাবুর পোষা দুই বাঁদরের নাম। কী কেলেঙ্কারি! এ ক্ষেত্রে জাস্টিন বিবারের পরে একটি কমা দিলেই কিন্তু ল্যাঠা চুকে যায়। হরিবাবু যদি লিখতেন ‘সঙ্গে আমার দুই পোষা বাঁদর, জাস্টিন বিবার, ও লেডি গাগা’— তা হলে ভুল বোঝার কোনও অবকাশ থাকত না।

ইতিহাসের পাতায় এমন নজির ভূরি ভূরি, যেখানে একটি কমা কম পড়ায় বা ভুল জায়গায় বসায় বক্তব্যের মানেটাই পুরো বদলে গিয়েছে। এখন অবশ্য সংক্ষিপ্তায়নের যুগ। BTW মানে যে ‘বাই দ্য ওয়ে’, LOL মানে যে ‘লাফিং আউট লাউড’ বা ASAP যে ‘অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল’— এ সব না বুঝলে বিশ্বের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।

সবার হাতেই এখন সময় বড় কম। যতিচিহ্নের কমবেশি নিয়ে ভাবার অবকাশই বা ক’জনের আছে? তাই চটজলদি লিখতে গিয়ে অর্থ বদলে গিয়ে অনর্থও ঘটতে থাকে মাঝেমধ্যে। আর ব্যাকরণ বইয়ের পাতা থেকে মুচকি হাসে অপরিহার্য এক ‘অক্সফোর্ড কমা’।