সি  আর অ্যাভেনিউ-গণেশচন্দ্র অ্যাভেনিউয়ের মোড়ের দীর্ঘ সিগন্যালে ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে ছিল। পাশের গাড়ির দিক চোখ পড়তেই দেখি স্কুল ইউনিফর্মে বছর পাঁচেকের এক ফুটফুটে চিনা মেয়ে। মায়ের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরছে। আমি হাসতেই একটু গম্ভীর হয়ে চোখ সরিয়ে নিল। বুঝতে পারছি, আড়ে আড়ে দেখছে। আমি তাকিয়েই আছি। সিগন্যাল সবুজ হতেই গড়াতে শুরু করল গাড়ির সারি। আর তখনই সেই মেয়ে হাসল। মুহূর্তে মনে হল, ওই মেয়ের নাম ‘ইন-চিন’ না হয়েই যায় না!

মনটা ভারী হয়ে গেল ইন-চিনের কথা ভেবে।

সালটা ১৯৬২। পণ্ডিত নেহরুর ‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’ স্লোগান পাল্টে গিয়ে নতুন ব্যঙ্গাত্মক ছড়া ‘চিন চং, চায়নাম্যান/চিন চং চায়নাম্যান’। দুই দেশে যুদ্ধ বেধেছে। তাই নিয়ে দেশ জুড়ে রাজনৈতিক উন্মত্ততা। 

স্থান: দার্জিলিং। বাবা চু পেই সুয়ে দার্জিলিং ম্যালের উপরে অভিজাত চিনা রেস্তোরাঁ-কাম-হোটেল, পার্ক-এর প্রতিষ্ঠাতা। ম্যালের অদূরে অজিত ম্যানসনে তাঁর অভিজাত ফ্ল্যাট। কতই বা বয়স হবে তখন ইন-চিন বা ওর ভাই ববির! ইন-চিন দার্জিলিং লোরেটোর ছাত্রী। ববি বছর আটেক। মা রয়েছেন কাঠমান্ডুতে। সেখানে খুলেছেন নেপালের প্রথম চিনা রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার।

বাবা কট্টর কমিউনিস্ট বিরোধী। কমিউনিস্টরা শাসন ক্ষমতা দখলের আগেই তিনি চিন ছেড়ে ভারতে এসেছেন। তাঁর পড়াশোনা নানকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। কুয়োমিনতাং আর্মির যোদ্ধা হিসেবে চিনে জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছেন। পরে এক সিনো-ব্রিটিশ বেসরকারি সংস্থার ম্যানেজার হয়ে ভারতের স্বাধীনতার আট বছর আগে এলেন কলকাতায়। মা-ও মধ্য চিনের ইয়াং চাউয়ের মেয়ে। পেশায় নার্স। সুয়ে দম্পতি এ বার বাসা বাঁধলেন কলকাতায়। কোনও চিনা পল্লিতে নয়, মধ্য কলকাতার মিশন রোয়ে ফ্ল্যাট। সালটা ১৯৪৪।

আরও পড়ুন:পরীক্ষায় ভীত ঈশ্বরচন্দ্রকে রচনা লিখিয়েছেন শিক্ষক

ব্রিটিশ ভারত থেকে স্বাধীন ভারতের উত্তরণের সাক্ষী ছিলেন তাঁরা। এমন কী সাক্ষী থাকলেন ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এরও।  নিজেদের ফ্ল্যাটে লুকিয়ে রেখে বাঁচিয়েছিলেন উন্মত্ত দাঙ্গাবাজদের তাড়া খাওয়া এক মানুষকে। স্বাধীন ভারতে সিনো-ব্রিটিশ কোম্পানিটি তার পরই কলকাতার ব্যবসা গুটিয়ে নিল। চাকরি গেল সুয়ের।

কী করবেন চিনা পরিবারটি? বাবা জানিয়ে দিলেন, কোনও মতেই কমিউনিস্ট শাসিত চিনে ফিরবেন না। থেকে যাবেন কলকাতায়। চু পেই সুয়ে পত্তন করলেন লাইটহাউস বার অ্যান্ড রেস্তোরাঁর। বছর দুয়েক চালাবার পর তা বিক্রি করে দিয়ে সপরিবারে পাড়ি দিলেন দার্জিলিঙে। সেখানেই শুরু পার্ক হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁর। ১৯৪৯-এ দার্জিলিঙের প্রথম চিনা রেস্তোরাঁ। এখন সেটিই ম্যালের অদূরে শাংগ্রিলা হোটেল।

ইতিমধ্যে কলকাতায় জন্ম হয়েছে ইন-চিনের। জন্মেছে তাঁর ভাই ববি। তবু দার্জিলিঙে তাঁদের শান্ত জীবনে এক দিন নেমে এল ঝড়।

১৯৬২ সালের অক্টোবর। অজিত ম্যানসনের ফ্ল্যাটে বিকেলের চায়ের আসরে বসেছেন বাবা, দুই ভাই-বোন ও দিদা। দিদাকে ওরা দুই ভাই-বোন ডাকে ‘পোপো’ বলে। বিবিসি রেডিও সূত্রে বাবা যুদ্ধের খবর শুনছেন প্রায় সারাদিন ধরেই। এই যুদ্ধে ভারতের কট্টর সমর্থক তিনি। একই সঙ্গে কড়া সমালোচকও। চিনের রেড আর্মির বিরুদ্ধে উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ভারত যে তেমন কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে তা নিয়ে ভারত সরকারের উপরে রীতিমতো ক্ষুব্ধ তিনি। তবে ভাই-বোন যুদ্ধ কী জানে না। চিন দেশকেও চেনে না। ইন্ডিয়াই তাদের দেশ। যদিও ইন্ডিয়া বলতে তাদের কাছে দার্জিলিং। আর চেনে কলকাতা।

চায়ের আসরের মাঝপথেই বেজে উঠল কলিংবেলটা। উঠে গিয়ে দরজা খুলল ইন-চিন। ভাবলেশহীন মুখে এক তিব্বতি দাঁড়িয়ে। জানতে চায়, ‘‘বাবা আছে? খুব জরুরি দরকার।’’ বাবাকে বলতেই তিনি উঠে গেলেন। দু’জনে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তার পর বাবা ফিরে এলেন টেবিলে। কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা চিন্তিত। বললেন, ‘‘থানায় যেতে হবে। জানি না কী জন্য ডেকেছে।’’ বলে গেলেন, সন্ধের মধ্যেই ফিরবেন।

সন্ধে গেল, রাত গেল! পরের দিন গেল, তার পরের দিনও। তখনও বাবা ফেরেননি। বাড়িতে পোপো থাকলেও তিনি চিনা ভাষা ছাড়া আর কিছুই জানেন না। অতএব তেরো বছরের ইন-চিনকেই দায়িত্ব নিতে হল। আট বছরের ভাই তার সঙ্গী।

কোথায় খুঁজবে বাবাকে? ভেবে কোনও কূল কিনারা পায় না ইন-চিন। এ ভাবেই কয়েকদিন পার হওয়ার পর একদিন আবার বেল বাজল। উৎকণ্ঠা নিয়ে দরজা খুলে ইন-চিন দেখে এক চিনা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন, মিঃ লি বলেই। চক বাজারে তাঁর জুতোর দোকান। তিনি দার্জিলিঙের চিনা সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আসছেন। ইন-চিনের বাবা-মা চিনা সম্প্রদায়ের জন্য নানা হিতকর কাজে নানা সময় সাহায্য করেছেন। এই বিপদের দিনে চিনা সম্প্রদায় তাদের পাশেই রয়েছে। লি খবর দিলেন, ইন-চিনের বাবাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

‘গ্রেফতার’ শব্দটা শুনে হতবাক ইন-চিন। নানা প্রশ্নে আগন্তুককে জর্জরিত করে তোলে সে—কেন? বাবা কোথায়? তাঁর অপরাধ কী? উত্তরে লি যা বললেন তার অর্থ, চিনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তার বাবাকে চিনের গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেফতার করেছে ভারত সরকার। ইন-চিন বোঝার চেষ্টা করে, বাবা তো চিনের কমিউনিস্ট সরকারের ঘোর বিরোধী। তিনি কী করে চিনের গুপ্তচর হবেন! কিন্তু বাবা কোথায়, তা তখনও লি জানেন না। আশ্বাস দিয়ে গেলেন, পরের দিন সেই খবর জোগাড় করে আনবেন। প্রয়োজনে জামিনের জন্যও চিনা সম্প্রদায় চাঁদা তুলবে। তবে এর মধ্যে ইন-চিন যদি তাঁর বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তো ভাল হয়।

পরের দিন আট বছরের ছোট ভাইটিকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামল তেরো বছরের দিদি ইন-চিন। দার্জিলিঙের রাস্তায়। প্রথমে গেল বাবার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর বাড়ি। দরজা খুলে ইন-চিনকে দেখেই মুখের উপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন তিব্বতি ভদ্রলোক। সেন্ট জোসেফের ছাত্র ভাইটিকে নিয়ে ইন-চিনের এ বার সাহায্যের আশায় এগোল লোরেটো কনভেন্টের দিকে। এই লোরেটো কনভেন্টে পড়াশোনা শেষ করে তাঁর দিদি এখন আমেরিকায় পড়াশোনা করছে। এখানে এই সেদিন পর্যন্ত আবাসিক ছাত্রী ছিল ইন-চিন। সদ্য সদ্য ডে-স্কলার হিসেবে বাড়ি থেকে স্কুল যাতায়াত শুরু করেছে সে। স্কুলে গিয়ে ইন-চিন দেখা করল মাদার সুপিরিয়রের সঙ্গে। সস্নেহে ছাত্রীটির কাছে জানতে চান তিনি, কী হয়েছে? সমস্ত ঘটনা বলে যায় কিশোরী। সব শুনে গম্ভীর মাদার সুপিরিয়র। জানালেন, রাজনীতির মধ্যে ঢুকবেন না তিনি। তবে আশ্বস্ত করলেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবেন তিনি।

হতাশ ইন-চিন, আরও হতাশ ছোট্ট ববি। দিদিকে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘‘এ বার কী হবে?’’ এই প্রশ্নটাই ইন-চিনের সামনেও। সেই রাতেই ইন-চিন দার্জিলিঙের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে কাঠমাণ্ডুতে তার মাকে একটি চিঠি লিখল।

এর মধ্যেই আবার আসেন লি। খবর আনেন বাবা, চু পেই সুয়ে এখন দার্জিলিং জেলে বন্দি। কেন? ফের প্রশ্ন কিশোরীর। লি বলেন, তার মা নেপালে রয়েছে। তারা এখানে। নেপালের সঙ্গে চিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে। সে কারণেই পুলিশের সন্দেহ, তার বাবা-মা চিনের হয়ে গুপ্তচর বৃত্তি করছেন। এর কোনও ভিত্তি না থাকলেও এটাই ভারত সরকারের প্রতিনিধি-রাজপুরুষদের বিশ্বাস। ইন-চিনকে লি পরামর্শ দেন, জেলের খাবার খুব খারাপ। তারা বাড়ি থেকে বাবার জন্য খাবার নিয়ে যেতে পারে।

এর পরের এক মাস প্রতিদিন জেলে বাবার জন্য খাবার নিয়ে যাওয়াটা দুই ভাইবোনের দৈনন্দিন রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। চক বাজার থেকে নেমে গিয়ে কসাইখানার পাশ দিয়ে কয়েকশো ফুট নীচে দার্জিলিং জেল। ভাইবোনের নিত্যসঙ্গী তাদের আয়া এবং টিবেটান ম্যাস্টিফ কুকুর ল্যাসি। প্রথম দিন থেকেই একটি জিনিস ইন-চিনের খুব খারাপ লাগে, জেলরক্ষীদের হাতে খাবার তুলে দেওয়ার সময় তারা প্রতিদিনই বলে, আগে নিজে একটু খেয়ে দেখাও। এমনিতেই মানসিক চাপে জর্জরিত ইন-চিন। এক দিন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারে না, চিৎকার করে ওঠে। জেলরক্ষীকে বলে, ‘‘বাবার জন্য খাবার আনছি। সেই খাবারে আমরা নিশ্চয় বিষ দেব না।’’

এর মধ্যেই একদিন লি এসে জানায়, জামিনের সম্ভাবনাই নেই। বরং সে খবর পেয়েছে তাদের বাড়িতে সিআইডি তল্লাশি চালাতে পারে। আবার কিশোরীর প্রশ্ন, কেন? কী অপরাধ তাদের? লি জানায়, চিনা হওয়ার অপরাধ। গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে রেখে বাকি কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দেয় লি। বিশেষ করে চিঠিপত্র। কিন্তু কোনটা গুরুত্বপূর্ণ নথি, তেরো বছরের মেয়ের সেই বোধই তো নেই। তবু পোপো ও ববির সাহায্যে সব কাগজপত্র বাছাই করে যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হল তা বাছাই করল ইন-চিন। বাকি কাগজপত্র পুড়িয়ে লি’র পরামর্শ মতো সেই ছাই কমোডে ফেলে ফ্ল্যাশও করে দিল। এ বার কোথায় লুকোবে বাবার ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কাগজপত্র?

কোনও এক হলিউড মুভিতে ভাইবোন দেখেছিল ফায়ারপ্লেসের চিমনির মধ্যে কাগজপত্র লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। কাজের মতো একটা কাজ পেয়ে আট বছরের ববি দিদিকে বলে, ওই ভাবে কাগজপত্র লুকিয়ে রাখি? ভাইয়ের আইডিয়া ভালই লাগে ইন-চিনের। কিন্তু পরেই তার মনে হয়, আচ্ছা সিআইডির লোকেরাও তো ওই সিনেমাটা দেখে থাকতে পারে! শেষ পর্যন্ত দুই ভাইবোন ড্রইংরুমের কার্পেটের তলায় ঢোকালো কিছু নথি। বাকি রাখল ল্যাসির বিছানার তলায়। কারণ ল্যাসি বিছানায় ধারে কাছে কাউকে যেতে দেয় না। বড়দের মতো একটা কাজ সেরে দু’জনেই বেশ পরিতৃপ্ত।

এর কয়েকদিনের মধ্যেই আবার তাদের কলিং বেল বাজল। লি এসেছেন ভেবে দরজা খুলে ইন-চিন দেখেন তিন-চার জন লোক দাঁড়িয়ে। তাঁদের মধ্যে একজনকে সে চেনে। তাদের পার্ক রেস্তোরাঁয় বহুবারই দেখেছে ভদ্রলোককে। বাবার ‘বন্ধু’। তিনিই বললেন, তাঁরা সিআইডি থেকে আসছেন। চলল তল্লাশি। অফিসাররা সমস্ত ফ্ল্যাট তছনছ করে ফেলল। ফায়ারপ্লেসের চিমনিও খুঁজল। ববি তখন দিদির দিকে তাকিয়ে, ভাগ্যিস...! ল্যাসির বিছানার কাছাকাছি যেতেই তার গরগরানি। শেষ পর্যন্ত বাবার সেই বন্ধুর হস্তক্ষেপেই ক্ষান্ত দিল তারা।

কয়েকদিন পরে ফের লি এলেন। তুলনামূলক ভাবে একটা ‘সুখবর’, বাবার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎকারের অনুমতি পাওয়া গিয়েছে। তবে সাক্ষাৎকারের আগেই মায়ের চিঠির উত্তর এল। মা লিখেছে, নেপাল রাজপরিবারের ‘থার্ড প্রিন্স’-এর সঙ্গে কথা বলে তিনি আপাতত ইন-চিন ও ববিকে নেপালে নিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করেছেন। উল্লেখ্য, নেপাল রাজপরিবারের ছেলেমেয়েরা দার্জিলিঙের লোরেটো ও নর্থ পয়েন্ট স্কুলেই পড়াশোনা করে। তারাও আটকে পড়েছে। তাদের আনতে নেপালরাজের একটি বিমান যাচ্ছে। সেখানে বলেকয়ে তিনি দু’টি আসন তাঁর ছেলেমেয়ের জন্য ব্যবস্থা করেছেন। কবে, কী ভাবে সেই বিমানে আসতে হবে তার বিশদ তিনি জানিয়েছেন।

জেলে বাবার সঙ্গে একজনকেই দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কথা বলতে ইন-চিনই গেল। ববি আয়ার সঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। ইন-চিনের মায়ের পরিকল্পনার কথা বাবাকে জানাল। বাবাও এক বাক্যে বললেন, এই সুযোগ তাঁদের ছাড়লে চলবে না। কিন্তু জেলবন্দি বাবাকে দেখে মায়ের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিশোরী ইন-চিনের মধ্যে শুরু হল দোলাচল। বাবাকে ছেড়ে, পোপোকে একা রেখে তারা চলে যাবে! পোপো তো চিনা ছাড়া ইংরাজি, হিন্দি কিছুই জানে না! যদিও ছোট্ট ববি মা’র কাছে যেতে চায়। ভাইকে বোঝায় কিশোরী দিদি।

সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল বালিকা ইন-চিন। আপাতত বাবাকে জেলে রেখে, পোপোকে বাড়িতে একা ফেলে কিছুতেই তারা নেপালে যাবে না। ভারতেই থাকবে। নির্দিষ্ট দিন পার হয়ে গেল। নেপালরাজের প্লেন এল, চলেও গেল রাজকুমার-রাজকুমারীদের নিয়ে।

ইতিমধ্যে খবর আসতে থাকে কাল রাতে মিঃ চ্যানকে তুলে নিয়ে গিয়েছে, পরশু মিঃ ওয়াঙকে মধ্যরাতে পুলিশ নিয়ে গিয়েছে ইত্যাদি। চিনা পরিবারগুলি থেকে গ্রেফতারের একের পর এক খবর। এর মধ্যে একদিন লি এসে জানালেন, ইন-চিনদের তিন জনের নামও পুলিশের তালিকায় রয়েছে। যে কোনও দিন তাদেরও পুলিশ তুলে নিয়ে যাবে।

তার কয়েকদিন পর। গভীর রাতে নয়, একেবারে দিনের বেলা। অজিত ম্যানসনের সামনে এসে দাঁড়াল একটা মিলিটারি জিপ। তাতে তিন অফিসার। তার কিছু ক্ষণের মধ্যেই কলিং বেলের আওয়াজ। দরজা খুলতেই অফিসাররা জানালেন, তাদের সঙ্গে তিন জনকেই যেতে হবে। জামাকাপড়, বেডিং, কিছু বাসনপত্র গুছিয়ে নিতে হবে। কোথায় যেতে হবে? তা তাঁরা জানেন না।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই প্রিয় ল্যাসিকে এবং সারা বাড়ির দায়িত্ব আয়াকে বুঝিয়ে দিয়ে ইন-চিনদের বাক্স-বিছানা নিয়ে চড়ে বসতে হল জিপে। চৌরাস্তা থেকে বেরিয়ে  চক বাজার হয়ে জিপ নেমে চলল দার্জিলিং জেলের দিকে। বদলে গেল শৈলশহরের সম্ভ্রান্ত চিনা পরিবারটির ঠিকানা। জেলে এবার পারিবারিক মিলন। বাবার সঙ্গে পরিবারের বাকি তিনজনের। গত এক-দেড় মাসে ইন-চিনের ঘাড়ে যে দায়-দায়িত্বের বোঝা চেপে বসেছিল, জেলে বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই সেই বোঝা উধাও। টিনএজার ইন-চিন তখন আবার ফিরল তার বয়সে। জেলবন্দি চিনা পরিবারগুলির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলে, গল্প করেই জেলের দিন কাটে।

কিন্তু সে আর ক’দিন! হঠাৎই এক অন্ধকার রাতে কয়েকটি মিলিটারি ট্রাক এসে দাঁড়াল দার্জিলিং জেলের গেটে। বন্দি চিনা পরিবারগুলিকে নিজেদের বাক্স-পেঁটরা নিয়ে ট্রাকে ওঠার আদেশ দেওয়া হল। কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে তাঁদের? কোনও উত্তর নেই।

গভীর রাতেই শুরু হল অনির্দেশের উদ্দেশে যাত্রা। পথে কার্সিয়াং থেকেও তোলা হল বেশ কয়েকটি পরিবারকে। সবাই চিনা। কয়েক ঘণ্টা পরে তাঁদের নিয়ে সশস্ত্র বাহিনী পৌঁছল শিলিগুড়ি স্টেশনে। সেখানে দাঁড়িয়ে একটি ট্রেন। বিভিন্ন কামরায় অজস্র মানুষ। সবাই চিনা। সুয়ে পরিবারের চার জনও উঠলেন এমনই একটি কামরায়। ভোর রাতে ট্রেনটি নড়ে উঠল।                       

গোটা ট্রেনের সব যাত্রীই চিনা। খোঁজ খবর করে ইন-চিনের বাবা কিছু খবর জোগাড় করলেন। অধিকাংশ যাত্রীই সীমান্তবর্তী অসমের বাসিন্দা। সকলের বিরুদ্ধেই অলিখিত অভিযোগ, তাঁরা চিনা গুপ্তচর ‘হতে পারেন’!

তবে ট্রেনের গন্তব্য কোথায়, কোথায় এই মানুষগুলিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেউই কিছু জানেন না। প্রাথমিক ভাবে অনেকেরই ধারণা ছিল তাঁদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু ট্রেনেই দু’দিন কেটে যাওয়ার পর সকলে বুঝতে পারলেন কলকাতা নয়, তাঁদের অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত চতুর্থ দিন, নভেম্বরের এক বিকেলে ট্রেন পৌঁছল দেওলি স্টেশনে। চারপাশে রাজস্থানের রুক্ষ প্রকৃতি। তাঁদের ট্রেন থেকে নামিয়ে ফের চাপানো হল মিলিটারি ট্রাকে। শহরের বাইরে কিছুটা যাওয়ার পর কাঁটাতার ঘেরা এক বিশাল চত্বরে ট্রাক থেকে নামার নির্দেশ এল। আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ। মিলিটারি অফিসার স্বাগত জানালেন, ‘ওয়েলকাম টু দ্য স্টেট অব রাজস্থান।’ এই প্রথম কেউ একজন সরকারি ভাবে জানালেন, ভারত-চিন যুদ্ধের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী চিনাদের আপাতত ‘সরকারি আতিথেয়তায়’ এই ক্যাম্পে অন্তরীণ রাখা হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তাঁদের ফেরত পাঠানো হবে। 

এর পর থাকার জায়গা বরাদ্দের পালা। ইন-চিনদের চার জনের পরিবারের ঠাঁই মিলল ক্যাম্প-৪-এর এক কামরার এক বাংলোয়। যদিও বাংলো না বলে কোয়ার্টার বলাই ভাল। দার্জিলিং ক্যাম্পের মানুষদের জন্যই ক্যাম্প-৪। ১৩-১৪টি ছোট ছোট বাংলো নিয়ে এই ক্যাম্প। তবে অধিকাংশ মানুষের ঠাঁই হল অন্য তিনটি ক্যাম্পের টিনের ছাউনি দেওয়া ব্যারাকে। পরের দিন সকালে দুই ভাই-বোন মিলে ঘুরে ঘুরে দেখল বিশাল ক্যাম্প দেওলি। জানতে পারল, যে বাংলোয় তাঁরা রয়েছেন, সেখানেই পরাধীন ভারতে এক সময় অন্তরীণ ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। ইন-চিনের কথায়, এই সংবাদে তাঁরা একটু যেন গর্বিতও হলেন। এ যেন নেহরুর সঙ্গেই অন্তরীণ থাকা। তবে ভাগ্যের পরিহাস, এ ক্ষেত্রে চিনা পরিবারগুলিকে অন্তরীণ করার সিদ্ধান্ত স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরই!  

দেওলি শিবিরে সবুজ বলতে কিছু লতা গুল্ম, কয়েকটি মাত্র গাছ। সকালে, দুপুরে, রাতে ক্যাম্পের জেনারেল কিচেন থেকে সরবরাহ করা হয় অতি নিম্ন মানের খাবার। তাই নিয়ে অন্তরীণ মানুষগুলির তীব্র অসন্তোষ। ইতিমধ্যে খাদ্য তালিকায় উটের মাংস নিয়ে দেওলি ক্যাম্প জুড়ে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠল। অনশনে বসার হুমকি দিল চিনা বন্দিরা। শেষ পর্যন্ত ইংরাজি জানা সুয়ে ক্যাম্প কম্যান্ডান্টের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেন। দু’জনের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্কও তৈরি হল। সেই সূত্রেই শেষ পর্যন্ত ঠিক হল রান্না খাবার নয়, ক্যাম্প-৪ রেশন পাবে। নিজেদের রান্না তাঁরা করে নেবেন। ইতিমধ্যে ওই ক্যাম্পেই সুয়ের দেখা তাঁর এক পুরনো কর্মচারীর সঙ্গে। লাইটহাউস রেস্তোরাঁর চিফ সেফ লিউ। লিউকে দার্জিলিং ক্যাম্পে নিয়ে এসে তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হল হেঁশেলের ভার।

এ ভাবেই কেটে গেল মাস দেড়েক। এসে গেল বড়দিন। কোনও একজন প্রিয়জনকে বড়দিনের শুভেচ্ছা পাঠানোর অনুমতি দিলেন শিবির কর্তৃপক্ষ। ইন-চিন বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে মা’কে নয়, কার্ড পাঠালেন পূর্ব-পরিচিত কাঠমান্ডুর মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্ত্রী মিসেস ডটিকে। বড়দিনের শুভেচ্ছার সঙ্গে সেখানেই সংক্ষেপে নিজেদের দেওলি ক্যাম্পে অন্তরীণ থাকার খবর দিলেন। যথাসময়ে সেই কার্ড নিয়ে ডটি পৌঁছে দিলেন তাঁর মা’কে।

ইন-চিন ও ববির ভাগ্যের চাকা ঘুরল দ্রুত। ১৯৬৩-র ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নয়াদিল্লির মার্কিন কূটনীতিক মিঃ টেলর সস্ত্রীক হাজির হলেন দেওলিতে। সঙ্গে ববি ও ইন-চিনের মুক্তির ফরমান। যথারীতি বাবা ও পোপোকে ছেড়ে যেতে রাজি নয় ছোট্ট ইন-চিন ও ববি। অনেক বুঝিয়ে বাবা রাজি করালেন তাদের। মার্কিন কূটনীতিকের সঙ্গে সড়ক পথেই তারা পৌঁছল দিল্লিতে। সেখান থেকে পরের দিন কাঠমান্ডুর উড়ানে ‘জন্মভূমি’ ছেড়ে গেল দুই বালক-বালিকা। মিলন হল মায়ের সঙ্গে।

শুরু হল স্বাভাবিক জীবন। এর পর বছর ঘুরে গেল। একদিন ছেলেমেয়ে জানল, বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে। মা ছেলেমেয়েকে নিয়েই নতুন করে ঘর বাঁধছেন এক মার্কিন কূটনীতিকের সঙ্গে। এ বার তাঁরা পাড়ি দেবেন আমেরিকায়। কাঠমান্ডু থেকে কলকাতা হয়ে মার্কিন দেশের উড়ান।

কলকাতায় এক রাত্রি থাকবে ইন-চিনরা। মা’ই উদ্যোগী হয়ে বাবাকে খবর দিলেন। ১৯৬৪-র এপ্রিলেই বাবা অন্তরী‌ণ শিবির থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে এসেছেন কলকাতায়। চিনে তিনি ফিরে যাবেন না। বাবা এলেন। শীর্ণ চেহারা। বললেন, ছ’মাসের মাথায় পোপো মুক্তি পেয়ে চলে গিয়েছেন তাইওয়ানে। সে রাতে ডিনারও করলেন প্রাক্তন স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে। পরের দিনের বিমানে চিরতরে ভারত ছেড়ে চলে গেল ইন-চিন। ইতিমধ্যে বছর তিনেক কলকাতায় থেকে আমেরিকাতেই চলে গিয়েছেন বাবা। তিনিও নতুন করে সংসার পেতেছেন।

অন্তরীণ শিবিরের সেই ‘ক্ষত’ নিয়েই কিশোরী ক্রমশ তরুণী হয়েছেন। এক মার্কিন কূটনীতিককে বিয়ে করেছেন। কিন্তু ভুলতে পারেননি দার্জিলিঙের দিনগুলি। প্রতিজ্ঞা করেছেন আর কখনও ইন্ডিয়াতে আসবেন না।  অভিমান থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত। প্রায় চার দশক পরে ২০০১ সালে সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙে এক আত্মীয়ার বিয়ে উপলক্ষে কলকাতায় এলেন ইন-চিন। তখন তাঁর বয়স ৬১। সঙ্গে তাঁর অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা, ছেলে, দিদি। সাবেক মিশন রো, এখনকার গণেশচন্দ্র অ্যাভেনিউয়ের সেই ফ্ল্যাট ঘুরে এলেন একদিন। এ বার গন্তব্য দার্জিলিং। সেই পার্ক রেস্তোরাঁ, সেই অজিত ম্যানসন, সেই চক বাজার। এবং সেই দার্জিলিং জেল।

জেলের সামনে আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারেননি ইন-চিন। বিনা দোষে সব হারানোর ব্যাথায় ফুলে ফুলে উঠেছেন কান্নায়। মা’কে শক্ত করে ধরে নীরবে সান্তনা দিয়েছেন নিকোল মার্শ। এক চিনা-ভারতীয় মায়ের আমেরিকান সন্তান! ‘‘সে দিনই বুঝেছিলাম, আমার মায়ের জীবন একটা আইডেন্টিটিতে বন্দি নয়। উনি যতটা চিনা, ততটা মার্কিন, এবং ততটাই ভারতীয়,’’ লিখেছেন নিকোল।