কিছু দিন আগে এক বাঙালি কূটনীতিকের বাসভবনে রবিবারের মধ্যাহ্নভোজনে ভারতের বিদেশসচিব জয়শঙ্কর যে ভাবে কাঁটা বেছে ইলিশ খাচ্ছিলেন, তা দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। তামিল ব্রাক্ষণটির সঙ্গে ছিলেন তাঁর জাপানি স্ত্রী।

পরে শুনলাম ঢাকায় যেতে যেতেই তাঁর ইলিশ প্রেম। জয়শঙ্করের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখন এক গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। যখনই জয়শঙ্কর ঢাকায় যান, দুজনেই তাঁদের প্রতিনিধি দলকে ছুটি দিয়ে দেন। তারপর শুরু হয় দু’জনের আড্ডা। এ বারেও শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের প্রাক্কালে জয়শঙ্কর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান। তবে এ বারে খামতি ছিল একটাই। বিদেশ সচিবকে হাসিনা ইউরোপীয় খানা পরিবেশন করেন। পাতে ইলিশ ছিল না।

জয়শঙ্করের এ হেন দৌত্যের পরেও কিন্তু হাসিনার ভারত সফর শেষ হওয়ার পর ‘মোদী ডকট্রিন’-এর মূল্যায়ন করতে বসে মনে হচ্ছে, হাতে শুধু সেই আদি অকৃত্রিম পেন্সিলই। মোদীর ঘোষিত নীতি ছিল, প্রতিবেশী প্রথম। সত্য, মনমোহন সিংহ এত প্রতিবেশী রাষ্ট্র সফর করেননি। কিন্তু তিন বছর পর দেখছি, মরিশাস ছাড়া প্রতিবেশী সব দেশেই এক ভয়ঙ্কর ‘ডেলিভারি ডেফিসিট’।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্থায়ী সরকার আছে বলে ভারতের সুবিধে। যদি হাসিনার সরকার টলোমলো হত, তবে আমাদের বিপদ বাড়ত। যেমন হচ্ছে নেপালে। বাংলাদেশেও চিন-পাকিস্তান চুপ করে বসে রয়েছে, এমনটা ভাববেন না।

রাজা জ্ঞানেন্দ্র ও রাজতন্ত্রকে দীর্ঘ দিন আমরা চোখ বুজে সমথর্ন করেছি। নেপাল পৃথিবীর একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। অতএব সেখানে চিন বা পাকিস্তান ট্যাঁ-ফুঁ করতে পারবে না এমনটাই ভেবেছিলাম। পরে জ্ঞানেন্দ্রর বিদায় দৃশ্যপটটাই বদলে দিল। এখন প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল, যাঁকে আমরা প্রচন্ড নামে চিনি, তিনি ভারতের বন্ধু, নেপাল সেনাবাহিনীকে এখনও ভারতীয় সেনাবাহিনী নানা ভাবে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, তবু সে দেশে সংবিধান রচনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে নেপালের সংঘাত মেটেনি। নেপালের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। এই কাজ শুরু হতে না হতেই প্রধানমন্ত্রী জয়শঙ্করকে পাঠান ভারতের আপত্তি জানাতে। মদেশীয় সম্প্রদায়ের পৃথক সংবিধান দাবি করছে, নেপালের মানুষের প্রশ্ন তাতে আমরা নাক গলাব কেন? এই সুযোগে নেপালে ঢুকছে চিন। ওখানে বসবাসকারী তিব্বতিদের জন্য নাকি তাদের ঘুম চলে গেছে। নেপালকে প্রচুর টাকার জোগান দিচ্ছে চিন। আমরা এখন কী করব?

নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই ২৬ মে-র শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানান। ব্যক্তিগত ভাবে নওয়াজকে কিন্তু মোদী বেশ পছন্দই করেন। অনেক বার অনেকেই বলেছেন, ‘লোকটা তো বেশ ভালই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করতেও চান। কিন্তু পাক সেনা যদি ওর কথাই না শোনে তবে উনিই বা কী করবেন? আমরাই বা কী করি?’

আসলে ট্রাম্প আসার পর আমেরিকা যে ভাবে প্রকাশ্যে পাকিস্তান, এমনকী মুসলিম বিরোধী বক্তব্য পেশ করতে শুরু করে তাতে পাক মোল্লাতন্ত্র শুধু নয়, চিনও পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে। অনেকে অবশ্য বলছেন, ট্রাম্প মুখে এ সব বললেও সৌদি ও মুসলিম দুনিয়া সম্পর্কে ও রকম কট্টর নীতি নিতে পারে না আমেরিকা। তবে আপাতত চিন-পাকিস্তান মৈত্রী আরও বেড়েছে। পাকিস্তানে যে আর্থিক করিডর তৈরি করছে চিন, যে ভাবে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে, তা ভারতের পছন্দ নয়। আমার তো মনে হচ্ছে মোদী পাকিস্তান নিয়েও কখনও প্রেম, আর কখনও ঘৃণা— দুটোই মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি রকমের করছেন। চিন যে ভাবে বাণিজ্য আর সীমান্ত বিতর্ককে আলাদা রাখতে জানে, আমরা তা পারি না। পাকিস্তানের সন্ত্রাস যতই হোক, সবর্দাই নরসিংহ রাও থেকে মনমোহন সিংহের নীতি ছিল, যে কোনও পরিস্থিতিতেই এই দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আলোচনায় বসা দরকার। মোদী সরকারও রাও-মনমোহন নীতি থেকে সরে এসেছে। জয়শঙ্কর নয়, পাকিস্তান আর আফগানিস্তান দেখেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। তাঁর কৌশল হল, আফগানিস্তানকে অর্থ সাহায্য দাও। প্রতিরক্ষা সহায়তা দাও। আফগানিস্তানে কারজাই ঘোরতর পাক বিরোধী ছিলেন। কিন্তু কারজাইয়ের পর আফগানিস্তানও পাকিস্তান সম্পর্কে নরম হচ্ছিল। কিন্তু আসরফ ঘনিও বুঝছেন, পাকিস্তানের মোকাবিলা না করলে কাবুলে আবার তালিবান-রাজ এসে যাবে। ভারত চাইছে, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, যাতে কাশ্মীর সীমান্তে তাদের সক্রিয়তা কমে। আমার নিজের অবশ্য মনে হয়, আফ-পাক নীতি যাই হোক, আলোচনার প্রক্রিয়া কখনওই বন্ধ হওয়া উচিত নয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য।

মালদ্বীপ একমাত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র যেখানে মোদী যাব বলেও শেষ মুহূর্তে সফর বাতিল করেছেন। কারণ ওখানকার মুসলমান সম্প্রদায় ঘোরতর মোদী বিরোধী। মরিশাসের উপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ অবশ্য প্রবল। ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সখ্য রচনায় সক্রিয় ভবিষ্যতের চিন আগ্রাসনের দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কায়।


দিল্লি সফরে শেখ হাসিনা সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। —ফাইল চিত্র।

এ বার আসুন মায়ানমারে। শরৎচন্দ্রের গল্পের সেই বর্মা। চিন সে দেশে পরিকাঠামোর জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। আমাদের দেশে তো অত টাকাই নেই অন্য রাষ্ট্রে খরচ করার জন্য। শিবশঙ্কর মেনন এক বার আমাকে বলেছিলেন, ‘আরে বাবা, মায়ানমার সীমান্তে চিন রাস্তা বানাচ্ছে বলে কেঁদে লাভ কী? আমরা কেন পারছি না?’

কলম্বোয় প্রথম গিয়েছিলাম অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে সার্ক সম্মেলনে। সেটা ছিল বাজপেয়ীর প্রথম বিদেশ সফর। তখন থেকে দেখছি, শ্রীলঙ্কায় তামিল জাতীয়তাবাদ আর সিংহলি জাতীয়তাবাদের সংঘাত-তীব্র। চিনের ভূমিকা সে দেশেও ক্রমবধর্মান। তামিল স্বায়ত্তশাসন চালু করার জন্য ভারত শ্রীলঙ্কার সরকারকে সম্প্রতি চাপ দেয়। তখন তো খোলাখুলি শ্রীলঙ্কার কতার্ব্যক্তিরা বলে দেন, চিনের কাছে ৯০০ কোটি ডলার ঋণ। এই টাকা না মেটানো পর্যন্ত তামিল স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ভারতের সঙ্গে তারা কোনও বোঝাপড়ায় যেতে পারবে না।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে মোদী চিনকে আমন্ত্রণ না জানালেও বিজেপির আমন্ত্রণে তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের প্রধান লোবসাং সাংগে আর দলাই লামাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তারপর অবশ্য চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংকে প্রথম অতিথি হয়ে এসে সবরমতীর তীরে দোল খেলেন একই ঝুলায় বসে। আর এখন দেখছি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলিতে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রতিপত্তি।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদী শিবশঙ্কর মেনন, শ্যাম শরণ ও জয়শঙ্কর, তিন কূটনীতিককে ডেকে চিন ও মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করেন। মেনন বলেছিলেন, আমেরিকার সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে চিনের সঙ্গে বেশি বন্ধুত্বে লাভ। অন্য দু’জন উল্টো কথা বলেন, আমেরিকার সঙ্গে ভাব বাড়লে চিন ভারতকে বেশি গুরুত্ব দেয়। মোদী দ্বিতীয় মতটাই মেনে নেন। সম্প্রতি তিনি জয়শঙ্করকে বলেছেন, তিন বছর হয়ে গেল, প্রতিবেশী রাষ্ট্র নিয়ে অনেক কথা আমরা বলেছি। এ বার সেগুলো বাস্তবায়িত করতে হবে। মোদীর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন করছি না। সমস্যা হচ্ছে, তা কী ভাবে? তবে কি সমাধান আমেরিকা শরণং গচ্ছামি!