সে বার সান্দাকফু থেকে নামার সময় ‘শে’ আমাদের সঙ্গ নিল। প্রথম এসেছি। সবাই বলল বিকেভঞ্জন অবধি গিয়ে তার পর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শর্ট কাট করতে, তা হলে সোজা রিম্বিক। রাতটা ওখানে কাটিয়ে পরদিন জিপ ধরে দার্জিলিং...বড় জোর ঘণ্টা চারেক লাগে। ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা পায়ে চলা পথ অনেক, গুলিয়ে যাবার আশঙ্কাই বেশি এবং সেটাই হল। আমরা ক্রমশ হাঁপিয়ে উঠছি কিন্তু ‘শে’র এনার্জি প্রচুর, অনেকটা এগিয়ে গিয়ে দেখে আসছে আশপাশে কোনও গ্রাম আছে কি না, তার পর অন্য পথ ধরছে। শেষকালে অনেক কষ্টে সন্ধের মুখে রিম্বিক পৌঁছনো গেল। ওখানে শিব প্রধান লজের হদিস দেওয়া ছিল। ট্রেকারদের খুব পছন্দের জায়গা।

আসল মালিক অবশ্য মারা গিয়েছে, গঙ্গা বলে একজন দেখাশোনা করে। ভয়ানক ক্লান্ত শরীরে কোনওক্রমে লজে ঢুকে তিন জনেই আমরা খাটের ওপর চিৎপাত। এক কোণায় গাঁক-গাঁক করে টিভি চলছে, বললাম বন্ধ করে দিতে। গঙ্গা ব্যস্ত হয়ে উঠল আমাদের আপ্যায়ন করতে। বলল, ‘‘পোর্ক-পোর্ক-পোর্ক খাইয়েগা?’’ কেন খাব না? একে তো পেট চোঁ চোঁ, তার পর এ ক’দিন শুধু নুডলস খেয়ে জিভের বারোটা বেজে গেছে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই বড় বাটিতে কবে সবার জন্য ধোঁয়া ওঠা পর্কের ঝোল এল, মাংসের সঙ্গে এতটা করে চর্বি ভাসছে...আমরা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম...গঙ্গা তখন হাসি হাসি মুখে এক পাশে দাঁড়িয়ে বলে চলেছে, ‘‘ইয়ে হমারি তরফ সে, পয়সা নহি লগেগা।’’ পরের বার গিয়ে এই দেবদূততুল্য লোকটির কোনও পাত্তা পাইনি। খিদের মুখে পর্কের ঝোল আর এনে দেয়নি কেউ।

কেভেন্টার্সের ছাদ থেকে—২০১১

এখনকার কেয়ারটেকারটি আস্ত ন্যালাখ্যাপা। এ দিকে রাজা তো তুড়ি লাফ খেতে শুরু করেছে, ডিনারে মুর্গি চাই, আন্ডা চাই। শেষকালে নিজেই বাজার থেকে কিনে টিনে নিয়ে এসে বাবা-বাছা করে রাঁধিয়ে, ওর ভাষায় ‘দারু’ সমেত সে রাতে মহাভোজের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল।

ফিরে আসি ‘শে’-র কথায়। ওকে নিয়ে কি মুশকিল! পর্ক দেখেই ও একেবারে আঁতকে উঠল, ‘‘নো পর্ক ফর মি, নো পর্ক ফর মি। মুসলিমস অ্যান্ড জিউস ডোন্ট ইট পর্ক।’’ এটা নাকি ওদের কাছে আত্মহত্যার সামিল! আমরা তাজ্জব। দু’দলে এত গোলমাল আবার খাবারের বেলায় এত মিল। অথচ ছেলের জ্ঞান অন্য দিকে কিন্তু টনটনে...এখনই যদি খবর আসে, ওদের দেশকে আক্রমণ করেছে, সব ফেলে দৌড়বে যুদ্ধ করতে। সে সব ট্রেনিং নেওয়া আছে। ‘শে’র কাছে শুনলাম ইজরায়েলে নাকি সমস্ত স্কুল থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে ‘হলোকস্ট মিউজিয়াম’দেখাতে নিয়ে যায়। ইহুদিরা চায় ওদের অতীতকে সবাই মনে রাখুক। পর দিন দুপুরে দার্জিলিং পৌঁছে ‘শে’র সঙ্গে আমাদের ছাড়াছড়ি হয়ে গেল। অদ্ভুত প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছেলে। ওর রাশিয়া ভ্রমণের গল্প আর শোনা হয়নি।

আরও পড়ুন: নিরিবিলি সন্ধ্যায় সান্দাকফুর ট্রেকার্স হাটে বসেছিল জমাটি আড্ডার আসর

প্রতি বছর নিয়ম কর সান্দাকফু ট্রেক করতে আসার মতো লোক বহু আছে, যেমন আমার চেনা সঞ্জীব আর রাহুল। শেষ বার আমার সঙ্গী ছিল সঞ্জীব। কিন্তু সমস্যা হয়েছিল অন্য বার রাহুলকে নিয়ে, ওকে তুমলিংয়ে রেখে আমাদের বেরিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ পায়ের ব্যথায় ও তখন নড়তে পারছিল না। যদিও জানতাম সর্বত্র ওর চেনাশোনা প্রচুর। নীলাদিই ওকে গাড়ি করে শিলিগুড়ি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে। এবং রাহুলও হাসি মুখে ব্যাপারটা সামলেছিল, তবু এটা নিয়ে আমার নিজের একটা অপরাধবোধ ছিল। যদিও রাহুল যে সব কিছু স্পোর্টিংলি নেবে এটা জানতাম, না হলে তিন বছর পরে সেই আমাকে নিয়েই ‘জোংরি’ ট্রেক করতে যেত না। ওর সঙ্গে বেড়ানো সত্যিই এক অন্য অভিজ্ঞতা, তবে সে গল্প পরে হবে।

ফেরার পথে অভিজিৎ আর শে—বিকেভঞ্জন-১৯৯৯

শেষ বার সান্দাকফু যাওয়ার আসল উদ্দেশ্য ছিল গোটা রাস্তাটার ভিডিও তুলে রাখার। বিকেভজ্ঞন পেরিয়ে কিছুটা উঠে গিয়ে অ্যালপাইন রেঞ্জটা যেখানে শেষ হচ্ছে...হঠাৎ চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকতে শুরু করবে...কিংবা পথে স্থানীয় বুড়ো মাতাল রাস্তা আটকে নেচেকুঁদে নেপালি ভাষায় গান শোনাবে...টিনের চাল থেকে বরফের তালগুলো ধপধপ আওয়াজ করে মাটির ওপর পড়বে— এই সব দৃশ্য স্টিল ক্যামেরায় ঠিকমতো আসবে কী করে?

শেষ বার সান্দাকফু ফেরত গুরুদুং হয়ে নেমেছিলাম। অনেকটা ঢালু রাস্তা। উত্তরে গোটা অঞ্চলটাই সিকিম, নীচে সীমানা বরাবর ছোট্ট গ্রাম ‘গোরকে’। শুনেছি নাকি ছবির মতো সুন্দর। এক বার আসতেই হবে। গুরুদুং-ও অবশ্য কিছু কম যায় না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে অল্প কয়েকটা ঘরবাড়ি, দু’পাশে প্রায় ঘাড়ের ওপর জঙ্গলে ঢাকা খাড়াই পাহাড় উঠে গিয়েছে। অনেক নীচে সরু হয়ে বয়ে চলেছে শ্রীখোলা নদী। রামুর ছোট্ট লজটা ভারী সুন্দর। জ্যোৎস্নার আলোয় খোলা উঠোনে বসে গরম কফি খেতে খেতে মনটা যেন কোথায় উধাও হয়ে যায়। ভোরবেলা ঘর থেকে সূর্য ওঠা দেখেছি লেপের তলায় শুয়ে। আজকাল রিম্বিক অবধি আর হাঁটতে হয় না শ্রীখোলার ব্রিজটা পেরিয়ে কিছুটা গেলেই জিপ পাওয়া যায়। শ্রীখোলায় দারুন সুন্দর একটা টেকার্স হাট ছিল, যেটা আপাতত তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, কেউ থাকে-টাকে না। দেখভাল করার দায়িত্বে যিনি ছিলেন সেই মহিলা পাশেই ‘গোপার্মা’ হোটেল খুলে দিব্যি ব্যবসা চালাচ্ছেন। খুব সকালে গুরুদুং ছেড়ে বেরিয়েছি, ব্রেকফাস্ট করতে হবে। সঞ্জীব বলল, গোপার্মায় ভাল প্যানকেক বানায়। ওই মহিলাই বানালেন, খেতে বেশ বাজে তবে জানলার ধারের টেবিলে বসে বাইরে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর আওয়াজ আর ঘন সবুজ জঙ্গলের দৃশ্য, দু’টোই ভারী মনোরম, উঠে আসতে ইচ্ছে করে না।

মা ও মেয়ে/ ২০০৩

ফেরার পথে ‘ধোতরে’তে কিছু ক্ষণ জিপ থামল। পাইনের জঙ্গলে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটাও আজকাল টুরিস্ট স্পট। তবে রিম্বিক দেখলাম ভীষণ ঘিঞ্জি হয়ে গিয়েছে। এ বার কোনও রকমে দার্জিলিং পৌঁছতে পারলে নিশ্চিন্ত। হোটেলে মালপত্তর রেখে সোজা কেভেন্টার্স, তার পর শুধু প্লেটভর্তি সসেজ, হ্যাম আর বেকন নিয়ে বসব। এত দিন তো কেবল প্রকৃতির শোভা দেখেই কেটেছে, ভালমন্দ খাবার জোটেনি, সেটা তো এ বার ষোলো আনা পুষিয়ে নেওয়া চাই!

লেখক পরিচিতি: লেখক প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট। কিন্তু তুলি-কলমের বাইরেও আদ্যন্ত ভ্রমণপিপাসু। সুযোগ পেলেই স্যাক কাঁধে উধাও। সঙ্গে অবশ্য আঁকার ডায়েরি থাকবেই।

অলঙ্করণ:লেখকের ডায়েরি থেকে।