ভুজ

দ্বিতীয় পর্বের গুজরাত পরিক্রমা আমরা শুরু করব ভুজ শহরকে কেন্দ্র করে। জামনগর থেকে সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিমি। এ পথে মাঝেমধ্যেই নজরে পড়বে লবণ তৈরির কর্মকাণ্ড। কোথাও বা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বায়ু বিদ্যুতের বিশালাকার সব স্তম্ভ। পথের রুক্ষতা বলে দেবে, আমরা ঢুকে পড়েছি মরুভূমির ভিতরে।

ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক আয়তন বিশিষ্ট কচ্ছ জেলার সদর শহর ভুজ। ষোলো শতকের মাঝামাঝি জাদেজা রাজপুত রাজা প্রথম খেঙ্গার্জির হাতে এ শহরের পত্তন এবং লখপত, কোটেশ্বর, জাখাউ, খান্ডভি প্রভৃতি সমুদ্র-বন্দরের মাধ্যমে বাণিজ্যে ভুজ তথা কচ্ছের সমৃদ্ধি। তবে খরা এবং ভূমিকম্পে বার বার বিধ্বস্ত হয়েছে সমগ্র অঞ্চল। তবু পর্যটনের কচ্ছ আজও উজ্জ্বল তার প্রকৃতি, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির দৌলতে।


রুদ্রমাতা গ্রাম: প্রকৃতির উন্মুক্ত ক্যানভাস।

হামিরসর সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভুজ। কচ্ছ জাদুঘর, আয়না মহল, প্রাগমহল প্রাসাদ প্রভৃতি দ্রষ্টব্যও এর আশপাশেই। কিছুটা দূরে ভারতীয় সংস্কৃতি দর্শন সংগ্রহালয়টি। এই জাদুঘরগুলিই ভুজ শহরের প্রধান আকর্ষণ, কচ্ছের বৈচিত্রপূর্ণ শিল্পকর্মের দুর্লভ সংগ্রহে সমৃদ্ধ। এগুলির মধ্যে কচ্ছ জাদুঘরটি আবার গুজরাতের প্রাচীনতম। তেমনই সোনা, রূপা, হাতির দাঁত ও মূল্যবান রত্নাদিতে অলঙ্কৃত আয়না মহল। তবে কচ্ছের আসল রূপ ধরা আছে প্রকৃতির উন্মুক্ত ক্যানভাসে। এক বিরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সন্ধানে আমরা প্রথমেই পাড়ি দেব ধর্দোর উদ্দেশ্যে। চাক্ষুষ করব বৃহত্তর রণ-এ লবণের চাদরে ঢাকা শুভ্র মরুভূমির এক অপার্থিব রূপ। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে এক বর্ণময় উৎসবের আয়োজন হয়। ট্যুরিজম কর্পোরেশন অব গুজরাত লিমিটেড (TCGL)-এর ব্যবস্থাপনায়।


বর্ণময় উৎসবে গুজরাতের লোকনৃত্য।

অস্থায়ী তাঁবুর নগরীতে আসর বসে কচ্ছি লোকসংস্কৃতির। ধর্দো গ্রামটিতে মুটওয়া সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাস। তাদের আয়না বসানো সূচিশিল্প এবং ঘরবাড়ির দেওয়ালচিত্রও আকর্ষণীয়। পাশাপাশি ভুজ থেকে যাওয়া আসার পথে দেখে নেব বন্নি তৃণভূমির অন্তর্গত হোডকা ঝিল (গ্রাম)-এর মেঘোয়াল সম্প্রদায়ের সূচিশিল্প ও চর্মশিল্পের নমুনা, লুডিয়া গ্রামের কাঠখোদাই, খাভদার খুম্বরদের মৃৎশিল্প, জুরার লোহার সম্প্রদায়ের তামার ঘণ্টা তৈরির কারিকুরি, নিরোলার ক্ষত্রি শিল্পীদের রোগান শিল্পকর্মগুলিও। খাভদা থেকে কুড়ি কিমি দূরের কালো দুঙ্গার পাহাড় এবং মননসিংহ সোধার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা ফসিল পার্কটিও দেখে নেওয়া যায় এই যাত্রায়।

অন্য দিকে, কচ্ছের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে কোরি খাড়ি সংলগ্ন পরিত্যক্ত বন্দর-নগরী লখপত, প্রাচীন হিন্দুতীর্থ নারায়ণ সরোবর কোটেশ্বর মন্দির। পথ গিয়েছে নারায়ণ সরোবর অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে। চলার পথে তাই নজরে পড়ে কিঙ্কারা, নীলগাই, শিয়াল প্রভৃতির। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে এই অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া, সিন্ধু নদীর ধারাটি পথ হারানোয় শুকিয়ে যায় এক সময়ের সমৃদ্ধ জনপদগুলি। আজ তাই সমগ্র অঞ্চলটি মরুভূমির জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যাওয়া এক খন্ডহরের মতোই মনে হয়।


প্রাচীন হিন্দুতীর্থ নারায়ণ সরোবর কোটেশ্বর মন্দির।

ফিরতি পথে আমরা ঘুরে নেব মান্ডভি। এটিও গুজরাতের একটি প্রাচীন সমৃদ্ধ সমুদ্রবন্দর। তবে আজ এর মুখ্য আকর্ষণ রূপালি বালির সৈকত। রুক্ষ, শুকনো মরুভূমির প্রান্তটি কিন্তু আশ্চর্য এক স্নিগ্ধতার পরশমাখা। ঝিনুক ছড়ানো শান্ত, নিরিবিলি সৈকতটি দিনভর মেতে থাকে সিগাল-এর আনাগোনায়। তেমনই দর্শনীয় এখানকার জাহাজ তৈরির কারখানা এবং কচ্ছের রাজাদের গ্রীষ্মাবকাশ বিজয় বিলাস প্রাসাদটিও।

আরও পড়ুন: আমদাবাদ-জুনাগড়-গির-সোমনাথ-দ্বারকা-জামনগর

লিটল রণ

পরিশেষে ভুজকে বিদায় জানিয়ে আমরা পাড়ি দেব লিটল রণের পথে। তবে আগ্রহীরা তার আগে ভুজ থেকে প্রায় আড়াইশো কিমি দূরের হরপ্পা সভ্যতার পঞ্চম বৃহত্তম নগরী ধোলাভিরার ধ্বংসাবশেষটিও ঘুরে নিতে পারেন। পোড়া ইটের বদলে সেখানে আবার বাড়িঘর তৈরি হয়েছিল পাথর দিয়ে। যাই হোক, এই পথেই ভুজের উপকণ্ঠে ভুজোড়ি, আজরখপুর গ্রামগুলিও দেখে নেওয়া যায়। তার মধ্যে ভুজোড়ি গ্রামের হাতেবোনা তাঁতের কাপড় ও রাবারি সম্প্রদায়ের আয়না বসানো সূচিশিল্প এবং আজরখপুরের মুসলিম ক্ষত্রিদের প্রাকৃতিক রঙে অলঙ্কৃত আজরখ শৈলীর হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টিং বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।


লিটল রণ: বিরল প্রজাতির বুনো গাধার অভয়ারণ্য।

কচ্ছের পূর্বতম অংশে লিটল রণ-এর পরিচিতি এক বিরল প্রজাতির বুনো গাধার অভয়ারণ্য হিসেবে। এই জঙ্গল মরুভূমির বাস্তুতন্ত্রের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। মূলত বাবলা জাতীয় উদ্ভিদ এবং ঘাস-গুল্মের আশ্রয়ে বুনো গাধা ছাড়াও চিঙ্কারা, কৃষ্ণসার, নীলগাই প্রভৃতি তৃণভোজী এবং শিয়াল, মরু শিয়াল, মরু বিড়ালের মতো মাংসাশী প্রাণীদের বাস। আর আছে কানঠুটি, গগনভেড়, ক্রৌঞ্চ, সারস, ঈগলের ওড়াউড়ি। পশ্চিমে আদেসর বা পূর্বে বাজানা রেঞ্জ অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে ঘুরে নেওয়া যায় এই অভয়ারণ্য। ধোলাভিরা থেকে আদেসর খুব দূরে নয়, তবে আদেসর বা বাজানা— কোথাও রাত্রিবাসের সুব্যবস্থা নেই। সে ক্ষেত্রে উচিত হবে বাজানা রেঞ্জের কাছাকাছি দাসাদাতে ভাভনা রিসর্ট বা রণ রাইডার্সের ব্যবস্থাপনায় জঙ্গলটি ঘুরে দেখার।

 

পাটন

পরের গন্তব্য পাটন দাসাদা থেকে আরও প্রায় একশো কিলোমিটার। ইতিহাস বলে, সোলাঙ্কি রাজাদের আমলে পাটন, অতীতের অনহিলভরা সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। পরে মুসলিম শাসকদের হাতে শহরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও অক্ষত থেকে যায় রানিকী ভাও-এর স্থাপত্যটি। বর্তমানে সেটি বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। তেমনই পাটনের আর এক গর্ব পাটোলা শাড়ি। যদিও লাখ টাকা দামের শাড়িটি বর্তমানে টিকে আছে মাত্র দু’-চার জন শিল্পীর সৌজন্যে। তাই পাটোলাওয়ালা ফার্ম হাউস বা পাটন পাটোলা হেরিটেজ কেন্দ্রটি ঘুরে নেওয়া যায় বিরল এই শিল্পকর্মটির পরিচয় পেতে।

অন্য দিকে, মাধেরার সূর্যমন্দিরটিও সোলাঙ্কিদের এক অনন্য কীর্তি। পাটন থেকে ৩৫ কিমি দূরে পুষ্পবতী নদীর ধারে গড়ে ওঠা মন্দিরটি কারও কারও মতে, সোলাঙ্কিদের শ্রেষ্ঠ কীর্তিও বটে। মন্দিরটি আজ বিগ্রহশূন্য। তবে মন্দিরগাত্র বারোটি সূর্যমূর্তির সঙ্গে নানান দেবদেবী, দিকপাল, অপ্সরা প্রভৃতির অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তিতে সাজানো। এমনকী, এটির গর্ভগৃহ, সভামণ্ডপ এবং সামনের কুণ্ডটিও পাথরের অসাধারণ খোদাই কাজে অলঙ্কৃত।


তৎকালীন বরোদায় বিত্ত-বৈভবের নিদর্শন লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদ।

বদোদরা

যতই চলতে থাকি, পথও এগিয়ে চলে। এক সময় আমদাবাদকে পিছনে ফেলে পৌঁছে যাই গুজরাতের সাংস্কৃতিক রাজধানী বদোদরায়। তৃতীয় সয়াজিরাও গায়কোয়াড়ের সময় থেকে এ শহর শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। দেশ-বিদেশের নানান গুণীজনের সঙ্গে অরবিন্দ, নন্দলাল, মুজতবা আলি প্রমুখের অবদানও ছিল তাতে। দ্রষ্টব্যের তালিকায় প্রথমেই বলতে হয় কীর্তি মন্দিরের কথা। নন্দলাল বসুর চারটি কালজয়ী দেওয়াল চিত্র— গঙ্গাবতরণ, মহাভারতের যুদ্ধ, মীরার জীবন ও নটির পূজায় অলঙ্কৃত গায়কোয়াড়দের এই স্মৃতিমন্দিরটি। পাশাপাশি, শ্রীঅরবিন্দ নিবাস, বিবেকানন্দ স্মৃতিমন্দির প্রভৃতিও উল্লেখযোগ্য। অন্য দিকে, তৎকালীন বরোদায় বিত্ত-বৈভবের নিদর্শন লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদটি। একই সঙ্গে স্থাপত্যটি অসাধারণ শিল্পসুষমা মণ্ডিত। এ ছাড়াও দ্রষ্টব্যের তালিকায় রয়েছে জাদুঘর, চিত্রশালা, তারামণ্ডল প্রভৃতি। তেমনই নবরাত্রির আলোর রোশনাইয়ে সেজে ওঠে গোটা শহর। তাই পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এলে বদোদরা দিয়েও শুরু করা যায় গুজরাত পরিক্রমা, পুজোর মেজাজেই। তবে শুরু বা শেষ যা-ই হোক না কেন, বদোদরা থেকে ৪৫ কিমি দূরের বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকভুক্ত গুজরাতের প্রথম নিদর্শন চম্পানের পাওয়াগড় ঘুরে নিতে ভুলবেন না। গুজরাতের ইসলামি জমানার শেষ রাজধানী শহর চম্পানের নানান মসজিদ, ভাও, বিনোদনকেন্দ্র, দুর্গতোরণ, প্রাচীর, বুরুজ প্রভৃতির মধ্যে বিশেষ ভাবে বলতে হয় পনেরো শতকের শেষভাগে নির্মাণ শুরু হওয়া জামি মসজিদটির কথা।


পনেরো শতকের শেষভাগে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তৈরি হয় জামি মসজিদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তৈরি হওয়া স্থাপত্যটির গঠনশৈলী পরবর্তীকালে সারা দেশজুড়ে অনুসৃত হয়। অন্য দিকে, পাওয়াগড় পাহাড়ের ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা রাজপুত রাজাদের দুর্গ, প্রাসাদ, শষ্যাগার, পার্বত্য নগরীর জলধারণ ব্যবস্থা, মন্দির প্রভৃতির স্থাপত্য-ভাস্কর্যগুলিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই, হিন্দু এবং মুসলিম সংস্কৃতির এমন যুগ্ম স্বীকৃতি (বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হওয়া) খুব অস্বাভাবিক নয়। বস্তুত, বৈচিত্র্যের এমন মিলন এবং সহাবস্থানই আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য।

কয়েকটি দরকারি কথা:

যাতায়াত

রেল: ১২৮৩৩ এক্সপ্রেস (প্রতিদিন) ছাড়াও ১২৯০৫ (বুধ, বৃহ, রবি), ১২৯৩৭ এক্সপ্রেস (শনি), ২২৮২৯ এক্সপ্রেস (মঙ্গল) এবং ১২৯৪৯ এক্সপ্রেসে (শুক্র) আমদাবাদ বা বদোদরা থেকে ফেরা যায় হাওড়ায়।

থাকাখাওয়া: TCGL-এর পর্যটক আবাস রয়েছে নারায়ণ সরোবরে।

লিটল রণে থাকা এবং ঘোরা

ক) ভাবনা রিসর্ট (০৯৪২৭২১৬০৫৯)

খ) রণ রাইডার্স (০৯৯২৫২৩৬০১৪)

হোটেল/গাড়ি/কচ্ছের রণ উৎসবের বুকিং কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য: যোগাযোগ করুন TCGL-এর কলকাতা অফিসে। ঠিকানা: ২৩০-৭, চিত্রকূট বিল্ডিং (৮ম তল), এজেসি বসু রোড, কলকাতা-২০।

দূরভাষ: (০৩৩) ২২৮৭৪৩১৭/৯৮৩০৯৪৪৩২৭/৯৮৩৬৩২৬২৯০

ওয়েবসাইট: www.gujarattourism.com

লেখক পরিচিতি: দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে পায়ের তলায় সর্ষে গীতা পালিতের। ২০০২-এ হিমালয়ে ট্রেকিংয়ের উপর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ। পরে স্বামী সুপ্রিয় করের সঙ্গে যৌথ ভাবে লেখেন ‘বাংলার মেলা’, ‘পর্যটনের গুজরাত’ এবং ‘জঙ্গলকথা’। দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশ পাচ্ছে। এখনও সুযোগ পেলেই হিমালয় ডাকে ষাটোর্ধ্ব গীতাকে।


 

ছবি: সুপ্রিয় কর