আকাশের নীল আর মনের আশমানি রং মিলেমিশে একাকার আন্দামানের চরাচরে। যে দিকে তাকাবেন ক্যালেন্ডারের ছবি ধরা দেবে মন ক্যামেরায়। কাচ গলানো জলের রাশি সোহাগে আছড়ে পড়ে সোনালি বালুতটে। মাথার উপর নারকেল গাছের মুকুট নীল ফ্রেমে বাঁধানো। হালফিলে ভারতের এই সবুজ দ্বীপপুঞ্জ পর্যটনে সম্ভাবনার নতুন দিশা খুলে দিয়েছে। শুধু বিদেশি নয়, ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। পর্যটন দৃঢ় হচ্ছে। স্থানীয় মানুষদের রুটি-রুজির এক স্থায়ী সমাধান রেখা ফুটে উঠছে আন্দামান ভ্রমণের হাত ধরে। দিনের হেরফেরে ট্যুর প্রোগ্রামগুলি গোছানো হয়। সময় আর পকেট যেটায় ফিট করবে, সেটাই আপনার পক্ষে ফিটেস্ট!

প্রথম দিন: প্লেনে আন্দামানের রাজধানী পোর্টব্লেয়ার যাওয়া। বিকালে ঐতিহাসিক জাতীয় স্মারক সেলুলার জেল দেখে নিয়ে, সন্ধেবেলায় লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শো দেখা।

ঐতিহাসিক সেলুলার জেল

(ব্রিটিশদের দ্বারা ১৯০৬ সালে নির্মিত এই বিশাল কারাগার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নির্বাসনে পাঠানোর জন্য নির্মিত হয়েছিল। পূর্বে সাতটি শাখা থাকলেও বর্তমানে তিনটি শাখা অবশিষ্ট আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমার আঘাতে চারটি শাখা নষ্ট হয়ে যায়। ফটো গ্যালারি, মিউজিয়াম নিয়ে যা টিকে আছে, তাই বা কম কী! সেলুলার জেল সপ্তাহে প্রতি দিন খোলা (সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত)। সময় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২.৩০ এবং দুপুর ১.৩০ থেকে বিকেল ৫.০০। জনপ্রতি প্রবেশকর ৩০ টাকা। ভিডিও ক্যামেরা ২০০ টাকা। সন্ধে ৬.০০ ও ৭.১৫-তে লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ডের দু’টি শো অনুষ্ঠিত হয়। সোম, বুধ, শুক্রবারের দ্বিতীয় শো’টি ইংরেজি ছাড়া বাকি সব শো হিন্দিতে। এই শো’তে জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শো-এর ছবি তোলা মানা।

দ্বিতীয় দিন: সারা দিনের জল সফরে লঞ্চে দেখে নিন রস, ভাইপার, নর্থ-বে আইল্যান্ড।

সারা দিন লঞ্চ সফরে দেখে নিন নর্থ-বে আইল্যান্ড

(অগ্রিম টিকিট কেটে রাখতে হবে। সিজনে ভিড় হয় খুব। বোট ছাড়ে সকাল ৯টায় রাজীব গাঁধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স-এর জেটি থেকে। বোট প্রথমে নিয়ে যাবে রস আইল্যান্ড। আবছা হয়ে আসা ব্রিটিশ উপনিবেশ ধরা দেয় চোখে। কিছু বাড়ির কাঠামো, গির্জার ভগ্নাবশেষ আজও ঝড়জল সয়ে টিকে আছে। অতীতে রসদ্বীপ কেমন ছিল তার কিছু ছবি সেলুলার জেলের আর্ট গ্যালারিতে দেখতে পাবেন। কয়েকটি হরিণ চরে বেড়ায় রসদ্বীপের পর্যটক মহলে। বেশ কিছুটা দূরে ভাইপার আইল্যান্ড। অবশিষ্ট আর বিশেষ কিছু নেই, ঢিপির মাথায় কক্ষের ভাঙা কাঠামো। ফেরার পথে নর্থ-বে আইল্যান্ড। ট্রেডমার্ক লাইট হাউস বহু দূর থেকে দেখা যায়। ঠাসা নারকেল গাছ। ঝুপড়ি দোকানে সস্তার বিকিকিনি। পায়ে পায়ে লাইট হাউসের দোরগোড়া থেকে ঘুরে আসুন, ভাল লাগবে।)

আরও পড়ুনবর্ষায় আপনার অপেক্ষায় রয়েছে ভারতের এই সব মনসুন ডেস্টিনেশন

তৃতীয় দিন: জারোয়া রিজার্ভের মধ্য দিয়ে যাত্রা। লাইমস্টোন কেভ ও মাড ভলক্যানো দেখে পোর্ট ব্লেয়ার ফেরা।

(আজকে খুব ভোরে রাত থাকতে বেরনো। জিরকাটাং গিয়ে পারমিটের জন্য লাইন দিতে হবে। ফর্ম ফিলআপ করে পারমিটের ব্যবস্থা গাড়ির ড্রাইভারই করে দেয়। সকাল ৭টায় প্রথম কনভয় ছাড়ে। আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ধরে প্রায় ৫০ কিমি পথ জারোয়া রিজার্ভের ভিতর দিয়ে। ফটো তোলা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। ওপারে বারাটাং। ফেরিতে নদী পেরিয়ে বারাটাং-এর নীলাম্বুর জেটি। স্পিড বোটে আধ ঘণ্টার সফরে নয়া ডেরা জেটিতে নেমে দেড় কিলোমিটার পদব্রজে লাইমস্টোন কেভ। ছোট পরিসর, তাই ভিড় হলে ছোট ছোট দলে ঢুকতে হয়। গুহা দেখে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের গা ছুঁয়ে বারাটাং ফিরে গাড়িতে করে খানিক গেলে মাড ভলক্যানো। প্রাকৃতিক গ্যাস বেরোচ্ছে কাদার মধ্য দিয়ে। আবার একই পথে পোর্ট ব্লেয়ার ফিরে আসা।

ভগ্নপ্রায় কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাইপার আইল্যান্ড

চতুর্থ দিন: পোর্ট ব্লেয়ার থেকে সকালের হ্যাভলক যাত্রা। কালাপাথর, বিজয়নগর বিচ দেখে বিকালে রাধানগর বিচে সূর্যাস্ত। চাইলে সমুদ্রস্নান।

(পোর্ট ব্লেয়ারের ফেনিক্স-বে জেটি থেকে দিনে তিনটি জাহাজ ছাড়ে হ্যাভলকের উদ্দেশে। জাহাজ ছাড়ে সকাল ৬.০০, ১১.০০ (ভায়া নীল), দুপুর ২.০০, ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে। দ্রুতগামী বিলাসবহুল এম ভি ম্যাক্রুজ ছাড়ছে সকাল ৮.৪৫। প্রয়োজনে অনুসন্ধান: ০৩১৯২-২৩১৭৯৪ নম্বরে। জলপথে দূরত্ব ২৫ কিমি। ভাড়া কেবিন ৬৫ টাকা, আপার ডেক/বাঙ্ক ৩৫ টাকা সাধারণ জাহাজে।)

পঞ্চম দিন: হ্যাভলক থেকে বোটে করে এলিফ্যান্টা বিচে গিয়ে সমুদ্রস্নানের মজা নিন। দুপুরে ফিরে হ্যাভলক থেকে নীল দ্বীপ যাত্রা। নীলের লক্ষ্মণপুর-১ বিচে সূর্যাস্ত দেখে হোটেলে ঢোকা।

(দুপুর ৩.০০ হ্যাভলক ছেড়ে সরাসরি জাহাজ বিকেল ৪।৩০ নীলে পৌঁছয়। দূরত্ব মাত্র ১৫ কিমি। ভাড়া কেবিন ৮০ টাকা, বাঙ্ক ৫০ টাকা, ডেক ৩৫ টাকা।)

ষষ্ঠ দিন: নীলে লক্ষ্মণপুর-২ বিচে ন্যাচারাল কোরাল ব্রিজ, সীতাপুর বিচ, ভরতপুর বিচে সমুদ্রস্নান। বিকেলে নীল থেকে জাহাজে পোর্ট ব্লেয়ার ফেরা।

(সীতাপুর বিচে সূর্যোদয় দেখুন। লক্ষ্মণপুর-২ বিচ ভাটার সময় যাবেন। জ্যান্ত কোরাল, রঙিন মাছ দেখে তাক লেগে যাবে। ফেরার জাহাজ বিকেল ৪.৩০। ২০ কিলোমিটার জলপথের ভাড়া-কেবিন ৬০, বাঙ্কে ৪৫, ডেক ৩৫ টাকা। সময় লাগে দু’ঘণ্টা।)

নীলের হাতছানি রসদ্বীপে

সপ্তম দিন: পোর্ট ব্লেয়ারের আশপাশে সারা দিনের সাইড-সিয়িং। চাথাম স’মিল, মাউন্ট হেরিয়েট, মিনি জু, সামুদ্রিকা, অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মিউজিয়াম, ফিশারিজ মিউজিয়াম।

(শতাব্দী প্রাচীন চাথাম স’মিলের মিউজিয়ামটি অবশ্য দ্রষ্টব্য। মাউন্ট-হেরিয়েট যাওয়ার পথে গাড়ি থামিয়ে দেখে নিন ভারতীয় ২০ টাকার পিছনের ছবি। নর্থ-বে আইল্যান্ডের লাইট হাউসের ছবি কোথা থেকে তোলা হয়েছে তা চালক দেখিয়ে দেবেন। সামুদ্রিকাতে বিশাল তিমি মাছের কঙ্কাল দিয়ে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশের মাছ, প্রাণী, কোরাল ও পোকামাকড়ের বিশাল সম্ভার। রোজ সকাল ৯.০০-১.০০ এবং ২.০০-৪.৪৫ পর্যন্ত খোলা। প্রতি সোমবার সরকারি ছুটির দিন ও দ্বিতীয় শনিবার বন্ধ। অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মিউজিয়ামে আদিম উপজাতির জীবন ও জীবিকার ছবি ও ব্যবহার্য জিনিস দিয়ে সাজানো। আর ফিশারিজ মিউজিয়ামে সমুদ্রের তলার রঙিন জীবন অ্যাকোয়ারিয়ামে বন্দি। ঝিনুকের সংগ্রহও দেখার মতো। উভয় সংগ্রহশালা রোজ ৯.০০-১.০০ এবং ১.৩০-৫.০০ পর্যন্ত খোলা। প্রতি সোমবার ও সরকারি ছুটির দিন বন্ধ।

অষ্টম দিন: রাবার প্ল্যানটেশন, স্পাইস গার্ডেন, ওন্ডুর বিচ, জলি বয়, কারবাইনস কোপ বিচ, চিড়িয়াটাপুরে (মুন্ডা পাহাড় বিচ) সূর্যাস্ত।

(ওন্ডুরের কাছ থেকে জলি বয় যাওয়ার বোট ছাড়ে। জনপ্রতি পারমিট ৫০ টাকা ও বোটে যাতায়াত ৭৫০ টাকা। মহাত্মা গাঁধী ন্যাশনাল পার্কের মধ্য দিয়ে জলপথ। অফিসের ফোন নম্বর ০৯৪৭৪২০৯৪৩৩/০৩১৯২-২৩৬৯৪)

লাইমস্টোন কেভের পথে

নবম দিন: প্লেনে করে ফেরা।

(কেনাকাটা করতে সরকারি দোকান সাগরিকা এম্পোরিয়ামে যেতে পারেন।)

জেনে রাখুন: আন্দামান ট্যুরে জলক্রীড়া বিশেষ আকর্ষণীয়। গ্লাসকোটে সমুদ্রের তলায় বিচিত্র জগৎ দেখুন জলি বয়, নীলের ভরতপুর বিচে। স্নরকেলিং করুন জলি বয়, হ্যাভলকের এলিফ্যান্টা বিচে। স্কুবা ডাইভিং-এর পীঠস্থান হ্যাভলক। সি-ওয়াক এলিফ্যান্টায়।

খেয়াল রাখুন: আবহাওয়ার উপর জাহাজ, বোট ছাড়া নির্ভর করে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে আগাম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই যে কোনও সময় জাহাজ/বোট বাতিল হতে পারে। জাহাজের আগাম দেয় টিকিটের জন্য এজেন্সির লোকই ভরসা। জাহাজে উঠতে পরিচয়পত্র আবশ্যিক। জারোয়াদের ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আন্দামানে পানীয় জল কিনে খান। কিং কোকোনাট অবশ্যই খাবেন। ভাল লাগে চিংড়ি, কাঁকড়ার নানা রকম লোভনীয় পদ। আন্দামান ও পশ্চিমবঙ্গ মোবাইলে লোকাল কল সার্ভিস হিসাবে গণ্য। বিএসএনএল নেটওয়ার্ক ভাল কাজ করে। পোর্ট ব্লেয়ার ছাড়া হ্যাভলক ও নীলে এটিএম আছে। হ্যাভলক, নীলে বাইক, স্কুটি ভাড়ায় মেলে। তেল ছাড়া সারাদিনে ভাড়া ৫০০ টাকা। সাইকেলও আছে। আন্দামানের স্মারক কিনে বিল সঙ্গে রাখবেন। প্রাকৃতিক কোনও কিছু সঙ্গে করে আনবেন না। বিমানবন্দরে চেকিং হয়।

যাওয়া: ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আন্দামান যেতে জলপথ ও আকাশপথ খোলা আছে। কলকাতা ও চেন্নাই থেকে নিয়মিত জাহাজ ছাড়ে। সময় লাগে চার দিন। এক মাস আগে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে টিকিট দেয় দ্য শিপিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, ১৩ স্ট্যান্ড রোড, কলকাতা-৭০০০০১। দূরভাষ: ০৩৩-২২৪৮ ২৩৫৪/২০৩৫/০৩৭৭/৮০১৩। প্রতি দিন গোটা দশেক উড়ান যাতায়াত করে কলকাতা-পোর্ট ব্লেয়ার রুটে।

থাকা: গোটা আন্দামান জুড়ে থাকার জায়গার অভাব নেই। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যবস্থা পাকা। কলকাতায় সরকারি অফিসের ঠিকানা: আন্দামান-নিকোবর পর্যটন, ৭ ডি পি ব্লক, সেক্টর-৫, সল্টলেক, কলকাতা-৭০০০৯১, ফোন:২৩৫৭-৭৬২৮/৭৬২৯, বিশদ জানতে ওয়েবসাইট: www.andamans.gov.in

সি-ওয়াক করতে চলে যান এলিফ্যান্টায়

পোর্ট ব্লেয়ারে সরকারি থাকার জায়গা:

মেগাপোড রিসর্ট, দিলানীপুর, পোর্ট ব্লেয়ার-৭৪৪১০২, ফোন: ০৩১৯২-২৩১৬৬৪/২৩২২০৭/২৩২৩৮০,

আন্দামান টিল হাউস, দিলানীপুর, পোর্ট ব্লেয়ার-৭৪৪১০২, ফোন: ০১১-২৫৬১৫৬৫৫

সিপিডব্লিউডি গেস্ট হাউস: লম্বা লাইন, পোর্ট ব্লেয়ার-৭৪৪১০৩, ফোন: ০৩১৯২-২৩৩৫৮৩

হর্ন বিল নেস্ট, ফোন: ০৩১৯২-২২৭১০৭/২২৭০৪০

হ্যাভলকে সরকারি ডলফিন রিসর্ট, ফোন: ০৩১৯২-২৮২০৬৬/২৩১৬৬৮/২৩২৩৮০

নীলে হাওয়াবিল নেস্ট, ফোন: ০৩১৯২-২৮২৬৩০

(সাধারণ পর্যটকদের নিকোবর ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ আছে। তাই নিকোবর ভ্রমণ বন্ধ। ভাইপার আইল্যান্ড ও রাবার প্ল্যান্টেশন এখন অস্থায়ী ভাবে বন্ধ রয়েছে।)

ছবি: লেখক

(লেখক পরিচিতি: পেশা শিক্ষকতা। বিষয়: অঙ্ক। অথচ নেশা বেড়ানো। বছরে
ছোট-বড় বেড়ানো মিলিয়ে অন্তত বার চারেক। ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখালেখি বছর
বিশেকের। ঘুরেছেন গোটা ভারতবর্ষই। তবে পয়লা পছন্দের তালিকায় রয়েছে
জঙ্গল। কলম চালানোর পাশাপাশি ক্যামেরার শাটার টিপতেও ভুল হয় না তাঁর।)