গুয়াহাটি থেকে কাজিরাঙা যেতে হলে নগাঁও দিয়ে যাওয়া যায়। আবার তেজপুর হয়েও কাজিরাঙা ও নামেরি দু’টি জাতীয় উদ্যানই ঘুরে নেওয়া যায়। আবার তেজপুর থেকেই যেতে হয় ভালুকপং হয়ে তাওয়াং। তেজপুর শহরেও বেড়ানোর জায়গা অনেক। অটো ভাড়া করেই জায়গাগুলি ঘুরে নেওয়া যায়। তেজপুর খুবই পুরনো শহর। এই শহরের সঙ্গে অনেক ইতিহাস আর গল্পকথা জড়িয়ে। দ-পর্বতীয়ার মন্দির সেই গুপ্তযুগের। বামুনিহিলে গেলে দেখতে পাবেন নবম শতকের সুপ্রাচীন সভ্যতা-মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। তেজপুরের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র অগ্নিগড়। পাহাড় পেঁচানো সুন্দর রাস্তা দিয়ে উঠতে উঠতে চোখে পড়বে বানরাজার কন্যা ঊষা ও কৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধের প্রেমের কাহিনির প্রতিমূর্তি। একেবারে উপরে আছে ভিউ পয়েন্ট, ওয়াচ টাওয়ার। সামনে বিশাল ব্রহ্মপুত্র। পিছন দিকে রয়েছে হর-হরির মহাযুদ্ধের মূর্তি। অগ্নিগড়ের কাছেই গণেশ ঘাট। দেখে আসুন মহাভৈরব মন্দির। সেখান থেকে বিষ্ণু রাভা উদ্যান। প্রশান্তি লজের উল্টো দিকেই আছে চিত্রলেখা উদ্যান। তেজপুর থেকে গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন জিয়া ভরালি নদীর পারে নামেরি অরণ্য। সেখানে ইকো রিসর্টও আছে। জিয়া ভরালির স্বচ্ছ পাহাড়ি জলধারার অপর পারে অরুণাচলের পাক্কে। দুই পারই টাইগার রিজার্ভ। নামেরিতে মাছ ধরা ও র‌্যাফটিং খুবই জনপ্রিয়।

তেজপুরে থাকার অনেক হোটেল রয়েছে। তবে অনেক হোটেলে স্বামী-স্ত্রী থাকতে গেলে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেখতে চায়। তেজপুর থেকে ঘণ্টা দু’য়েক গাড়িতে গেলেই কাজিরাঙা পৌঁছনো যাবে। কাজিরাঙায় যাওয়ার জন্য গুয়াহাটি থেকে উজান অসমগামী বাস, ট্রাভেলার ছাড়ে খানাপাড়া থেকে। গুয়াহাটি থেকে কাজিরাঙার দূরত্ব ঘণ্টা চারেক। 

তেজপুর বামুনি পাহাড়

কাজিরাঙায় তিনটি রেঞ্জে মূলত সাফারি হয়। বাগরি, কোহরা ও অগরাতলি। তিনটির মধ্যে দূরত্ব অনেক। তাই সঙ্গে গাড়ি থাকলে ভাল। না হলে যে জিপ ভাড়া নেবেন, তারাই হোটেল থেকে তুলে নিয়ে যাবে। দুপুর ২টো থেকে জিপ সাফারি হয়। তখনই পর দিন ভোরের হাতি সাফারির বুকিং সেরে নিন।

কাজিরাঙায় হাতি আর জিপের রাস্তা পৃথক। ঘোরার রোমাঞ্চও ভিন্ন। বাঘ দর্শন অবশ্য ভাগ্যের কথা। কিন্তু গন্ডার, হাতি, ধনেশ, বুনো শুয়োর, বিভিন্ন পাখি, এশীয় ওয়াটার বাফেলো, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ দেখতে পাবেনই। জিপে গেলে ডাফলাং টাওয়ারে ধৈর্য্য ধরে বসে থাকলে বাঘের দেখা মিলতে পারে। কালো সারস, পেলিক্যান, কচ্ছপদের দেখতে পাবেন ডিফলু নদীর আশপাশে, অগরাতলির সোহলা বিল বা বাগরির মোনাবিলে।

কাজিরাঙার জঙ্গল

কাজিরাঙা থেকে ঘণ্টাখানেকের রাস্তা যোরহাট শহর। যোরহাট শহরে বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে হোটেল আছে। সেখান থেকে অটোয় নিমাতিঘাট আধ ঘণ্টার দূরত্ব। নিমাতি থেকেই বিশ্বখ্যাত নদীদ্বীপ মাজুলির ফেরি ছাড়ে। তবে ফেরির সংখ্যা সীমিত। তাই সকাল-সকাল যাওয়া ভাল। ফেরিতে মানুষ ছাড়াও একাধিক গাড়ি, মোটরসাইকেল, গবাদি পশুও তোলা হয়। ফেরি পার হয়ে সময় লাগে মোটামুটি সওয়া ঘণ্টা। ওপারে কমলাবাড়ি ঘাটে মাজুলি ঘুরে দেখার সুমো পাওয়া যায়। অসমের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুখোশ শিল্প, দ্বীপবাসীদের জীবনযাত্রা দেখতে-বুঝতে মাজুলির বিকল্প নেই। গড়মূড়, আউনি আটি, কমলাবাড়ি, দক্ষিণ কমলাবাড়ি, দক্ষিণপাট, বেঙেনা আটি সত্রগুলিতে দেখতে পাবেন বৈষ্ণব জীবনযাত্রা, গুরুকুল প্রথা, শঙ্করীধর্মের সাধনা পদ্ধতি। সব জায়গায় পাবেন প্রসাদ। সামাগুড়ি সত্র বিখ্যাত তার মুখোশ শিল্পের জন্য।

মাজুলি যাওয়ার পথে

মাজুলি ঘুরে বিকেলের ফেরিতে যোরহাট ফিরে আসুন। পরের দিন যোরহাট থেকে ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন শিবসাগরের উদ্দেশে। শিবসাগরের আগের নাম রংপুর। ছিল আহোমদের রাজধানী। শিবসাগরের পরতে পরতে প্রাচীন ইতিহাসের ছোঁয়া। শহরে ঢোকার মুখেই আহোম রাজাদের অ্যাম্ফিথিয়েটার রংঘর, যার উপর তলায় বসে খেলা দেখতেন রাজা। রয়েছে মানুষের খোঁড়া ভারতের সবচেয়ে বড় সরোবর জয়সাগর। তার থেকে একটু দূরেই তলাতল ঘর। সামনে শস্যাগার ও পিছনে সেনাশিবির। এই তলাতল ঘরের উপরের ঘরগুলি ও একতলা দেখা গেলেও মাটির নীচের তিনটি তলা বন্ধ। শোনা যায়, এখান থেকেই সোজা সুড়ঙ্গপথে যোগাযোগ ছিল রাজভবন কারেংঘরের। একটু দূরে কারেংঘরের চারটি তলা ঘুরে দেখা যায়। আহোম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এই তিনটি ভবন। আর আছে শিবসাগর সরোবরের তীরে ১৭৩৪ সালে তৈরি শিবদোল, বিষ্ণুদোল ও দেবীদোল বা মন্দির। ৮ ফুট স্বর্ণশিখর বিশিষ্ট এই শিবমন্দিরের উচ্চতা ১০৪ ফুট।

শিব সাগর

ক’জন জানেন, কেবল আফ্রিকার মিশর নয়, একই ধাঁচের পিরামিড মিলবে এই দেশেই। সেই ১৩ শতকে চিনের তাই রাজ্য মং মাও (বর্তমানে চিনের ইউনান প্রদেশের রুইলি এলাকা) থেকে প্রায় ৯ হাজার অনুগামী নিয়ে ভারত পাড়ি দেন চাওলুং (মহান প্রভু) স্যুকাফা। ১২২৮-’২৯ সালে বর্তমান শিবসাগরে তৈরি হয় আহোমদের রাজপাট। তাঁদের বংশধরেরা এখনও তাই-আহোম নামে পরিচিত। স্যুকাফার রাজনাধী ছিল চড়াইদেও। অসমে এসে এখানকার স্থানীয় উপজাতিদের সঙ্গে সন্ধি করে, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে রাজ্য বাড়াতে থাকেন তিনি। তাঁর বংশধর রুদ্র সিংহের আমলে রাজধানীর নাম হয় রংপুর। এই আহোম রাজা-রানি-রাজপুত্রদের মৃত্যুর পরে, একেবারে মিশরের মতোই কায়দায় শবদেহ পোরা হত কফিনে। এরপর, ইটের গম্বুজ ধাঁচের মৈদাম গড়ে তাঁর পেটের ভিতরে ধনরত্ন, জাগতিক পছন্দের সামগ্রী, এমনকী, মিশরের মতোই পোষ্য-সহ সেই কফিন রেখে আসা হত. উপরে পড়ত মাটির প্রলেপ. চারিদিক ঘেরা থাকতে ইটের খাটো দেওয়ালে। বর্তমান চড়াইদেওয়ের চত্বরে ছোট-বড় এমন অন্তত ৪০টি মৈদাম এখনও দেখতে পাওয়া যায়। বাকিগুলি কোনওটি চাপা পড়েছে, কোনওটি ভেঙেছে, কোনওটি জঙ্গলে ঢাকা। ৩০টি মৈদামকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ এবং রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংরক্ষণ করছে। বাকি মৈদাম এখনও অরক্ষিত। ইংরাজ আমলেই মৈদামের ভিতরের সম্পদ লুঠ হয়ে গিয়েছে। সংরক্ষিত সবচেয়ে বড় মৈদামের ভিতরে গেলেও দেখা যায় কী ভাবে উপর থেকে ছাদ ফুটো করে মৈদামে ঢোকা হয়েছিল। শিবসাগর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সাঙ্ঘাতিক এবড়ো খেবড়ো পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হয় মৈদামে। সামনে রাখা আছে পুরনো কামান আর গোলার পসরা এবং ইংরেজ আমলে ব্যবহৃত লোহার নৌকা।

যাতায়াত: কাজিরাঙা যাওয়ার বাস ভাড়া ২০০ টাকা গুয়াহাটি থেকে। হাতির জন্য মাথাপিছু ৮২৫ টাকা পড়বে। জিপ সাফারির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন বাবুর সঙ্গে। ফোন- ৯৯৫৪৯৫৩০৩৩। খরচ পড়বে জিপ প্রতি কোহরা রেঞ্জে ২৫৫০ টাকা, অগরাতলিতে ৩০৫০ টাকা ও বাগরিতে ২৭৫০ টাকা। সেই সঙ্গে ক্যামেরা বাবদ টাকা অতিরিক্ত। এ সবই দেশীয় পর্যটকদের জন্য।

মাজুলি ঘোরাতে সুমো আড়াই হাজার টাকা মতো নেবে। যোরহাট থেকে গাড়ি ভাড়া করে শিবসাগর ঘুরে এলে হাজার পাঁচেক।

কাজিরাঙার জঙ্গলে হাতির দল

থাকার জায়গা: কাজিরাঙায় হোটেল ও হোম স্টে অনেক। ভাল মানের রিসর্ট চাইলে রয়েছে আয়োরা, বরগস, গ্রাসল্যান্ডস। ভাড়া ৩০০০-৫০০০। মাঝারি মানের হোটেলের মধ্যে ধনশ্রী রিসর্ট, ডিফসু, বন দফতর ও অসম পর্যটনের বন দফতরের বনানী, বনশ্রীতে থাকা যায়। কাজিরাঙা বনানী, বনশ্রীর বুকিংয়ের জন্য ফোন ০৩৭৭৬ ২৬২ ৪২৩, অরণ্য– ০৩৭৭৬ ২৬২ ৪২৯, অগরাতলি রিসর্ট ৯৭০৬০১০৮৩৮, ৯৪৩৫১১০৮৩৮। আয়োরা– ৯৯৫৭১৯৩৫৫০, বরগস– ৭৩৯৯০৪১১৯২, ডিফলু রিভার লজ– ৯৪৩৫১৪৬২১৪, কাজিরাঙা ফ্লোরিকান লজ– ৯৪৩৫১২৪৩৩৩, বনহাবি– ৯৯৫৪২৪৬৮১৬, ব্রহ্মপুত্র জঙ্গল ক্যাম্প– ০৩৭৭৬ ২৬২ ৬৭৫

নামেরিতে থাকার জন্য জিয়া ভরালি ওয়াইল্ড রিসর্ট– ৭০৮৬৭৩২৩৫৬, ৮৮২২০২২০৮৮। অল্প এগিয়ে অরুণাচল সীমানায় নদী-পাহাড়ের কোলে ভালুকপং প্রশান্তি লজ ০৩৭৮২ ২৩৪০৩৭, ৯৪০২৮০২২৩৪, ৯৯৫৪১৯১২০২।

যোরহাটে চা বাগানে হেরিটেজ কটেজে থাকতে গেলে কাজিরাঙা গলফ রিসর্ট। ফোন- পল্লব বরুয়া ৯৯৫৪৪০৪০৯২। আরও দাম বেশি ঠেঙাল ম্যানরের। এ ছাড়া ম্যানর, জিরনি, যোরা প্যালেস, হেরিটেজ, স্কাই স্টার, নিকিতা, আর্ল গ্রে হোটেল রয়েছে।

শিবসাগরে থাকতে গেলে শিবা প্যালেস, পিকোলো, ভিলা, অমরাবতীর মতো অনেক হোটেল পাবেন। ভাড়া ১১০০-২৭০০। শিবসাগর থেকে সোজা গুয়াহাটি ফেরার নাইট সুপার এসি বাস রয়েছে। ভাড়া ৪৫০ টাকা।