অসম হোক বা উত্তর-পূর্বের যে কোনও রাজ্য, ঘুরতে গেলে সবচেয়ে জরুরি দিন আর ভ্রমণস্থলের বোঝাপড়া। এখনকার ছুটির যা আকাল, তাতে একবারে হয়তো গোটা রাজ্য ঘোরা শেষ নাও হতে পারে।

যাঁরা ধার্মিক তাঁদের কাছে যেমন অসমের টান কামাখ্যায়, যাঁরা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তাঁদের কাছে অসমের টান মানেই কাজিরাঙা। কিন্তু হাতে সময় থাকলে সিলেবাসের বাইরে ঘুরতে বাধা কোথায়?

ট্রেনে গুয়াহাটি আসতে হলে সবচেয়ে ভাল সরাইঘাট এক্সপ্রেস। তার পরেই সবচেয়ে কম সময় নেয় কলকাতা স্টেশন থেকে আসা গরিব রথ। বিমানে এলে তো একটা দিন বাঁচলই। প্রথমেই বিমানবন্দর বা স্টেশন থেকে হোটেলে ব্যাগপত্তর রেখে কামাখ্যায় পুজো দেওয়া সেরে নিতে পারেন। পান্ডা অনেক মিলবে গেলেই। গর্ভগৃহের লম্বা লাইনে দাঁড়াতে না চাইলে দুই নম্বর দ্বারে পুজো সেরে ফিরতে পারেন। নীলাচল পাহাড়ের একেবারে মাথায় ভুবনেশ্বরী মন্দির দেখতে ভুলবেন না। কামাখ্যার আশপাশে কোথাও উপরে, কোথাও নীচে মিলিয়ে দশ মহাবিদ্যার মন্দির আছে। কামাখ্যার পিছনে সংগ্রহশালা ও আশপাশে থাকা সুপ্রাচীন মূর্তিগুলি দেখতে ভুলবেন না।

আরও পড়ুন, আগরতলা-চতুর্দশ দেবতার মন্দির-সিপাহিজলা-কমলাসাগর কালীমন্দির

কামাখ্যা থেকে ফেরার পরে নৌকা ভাড়া করে বা জল পরিবহণ নিগমের ফেরিতে মাত্র কুড়ি টাকা পারাপারে ঘুরে নিন উমানন্দ দ্বীপ মন্দির। ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে উমানন্দ দ্বীপে মহাদেবের মন্দির ছাড়াও আছে সোনালি হনুমান। এ ছাড়াও গুয়াহাটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধর্মস্থান বলতে রয়েছে বাইপাসে বালাজি মন্দির, পাহাড়-জলপ্রপাতকে কেন্দ্র করে তৈরি সুপ্রাচীন বশিষ্ঠ মন্দির, পামহিতে ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ। ভীমাশঙ্করে জংলা পথে হেঁটে ঝর্না পর্যন্ত যেতে দারুণ লাগবে। সেখান থেকে কাছেই দীপর বিল পাখিরালয় ও অভয়ারণ্য। যেতে পারেন গাঁধী মণ্ডপ। শুক্রেশ্বর ঘাট। নর্থব্রুক গেটের সামনে বসে ব্রহ্মপুত্রের বুকে সূর্যাস্তও সুন্দর। গুয়াহাটি মেট্রো শহর হলেও পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এই মহানগরে হাতি, চিতাবাঘ, অজগর, বিভিন্ন ধরনের হরিণ, উল্লুক (হুলক গিবন), বিভিন্ন প্রজাতির পাখি-সহ বহু প্রথম তফশিলভুক্ত প্রাণীর বিচরণভূমি। গুয়াহাটির আমসাং অভয়ারণ্যে ট্রেকিং করলে দেখতে পারেন হাতি, উলুক, ধনেশ, চিতাবাঘ, সাপ। আমসাং সবচেয়ে খ্যাত প্রজাপতির জন্য। সময় থাকলে অবশ্যই গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে আসুন ব্রহ্মপুত্রের অপর পারে দোলগোবিন্দ মন্দির, প্রাচীন অশ্বক্লান্ত মন্দির, কানাই-বারসি শিলালিপি, হাজোয় হয়গ্রীব মাধব মন্দির ও পাশেই পোয়া মক্কা। আছে পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা আমিনগাঁও বৌদ্ধ মন্দির। গুয়াহাটির বুকে, সংগ্রহশালার উল্টো দিকেই দীঘলিপুখুরিতে বোটিং করতে পারেন। আবার নৌকায় ঘুরে দেখতে পারেন দীপর বিল। দীপর বিল থেকে শুরু করে রানি অরণ্যে ট্রেকিং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

রাজ্য সংগ্রহশালা আর কলাক্ষেত্র ঘুরলে অসমের সুপ্রাচীন ইতিহাস, সভ্যতার বিভিন্ন দিক জানা যায়। বাংলায় চৈতন্যদেবেরও আগে অসমে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব বৈষ্ণবধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে অসমের সমাজ আরও সেই শঙ্করী বৈষ্ণবধর্মের বাঁধনে বাঁধা। সব গ্রাম, সমাজ আবর্তিত হয় নামঘরকে কেন্দ্র করে। শঙ্করদেবের কথা, ভূপেন হাজরিকার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রাদি সবই দেখবেন, জানবেন শঙ্করদেব কলাক্ষেত্রে। গুয়াহাটির অন্যতম আকর্ষণ প্রাকৃতিক পাহাড়-জঙ্গলের পরিবেশে থাকা চিড়িয়াখানা। মনে রাখতে হবে, চিড়িয়াখানা শুক্রবার বন্ধ থাকে।

মায়ের সঙ্গে শাবক গন্ডার।

যাঁরা সময়াভাবে কাজিরাঙা যেতে পারেন না, তাঁদের নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ, গুয়াহাটি থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেক দূরত্বেই আছে পবিতরা অভয়ারণ্য। সেখানে হাতি ও জিপ, দুই ধরনেরই সাফারি আছে। আছে শ’খানেক গন্ডার, বুনো মোষ, হরেক পাখি, বুনো শুয়োর। পবিতরায় ভোরে বেরিয়ে ঘুরে চলে এসে অন্যান্য জায়গা ঘুরতে পারেন।

যাঁরা জঙ্গলের রহস্যময়তা ভালবাসেন, যাঁদের কাছে অরণ্য মানেই গন্ডায় গন্ডায় পশুদর্শন নয়, অরণ্যকে অনুভব করা, তাঁদের জন্য আদর্শ মানস জাতীয় উদ্যান। গুয়াহাটি থেকে গাড়ি ভাড়া করে মানস ঘুরে রাতে ফিরেও আসতে পারেন। কিন্তু মাথানগুড়িতে উদ্দাম মানস নদীর সামনে আর জঙ্গলের বুকে বনবাংলোতে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতাই আলাদা। কাজিরাঙার মতোই মানসও বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র। এখানে মোট ৫৫ প্রজাতির শ্বাপদ আছে। আছে চারশোর বেশি প্রজাতির পাখি। ৫০ রকমের সরীসৃপ। তার মধ্যে ২১টি শ্বাপদ প্রজাতি প্রথম তফশিলভুক্ত। ৩১টি বিপন্ন পর্যায়ের। শুধুমাত্র মানসেই হিসপিড খরগোশ, পিগমি হগদের স্বাভাবিক বাসস্থান। বিপন্ন বেঙ্গল ফ্লোরিকানও মানসেই সবচেয়ে বেশি মেলে। মানসের অর্ধেক পড়ছে ভুটানে।

আরও পড়ুন, নীল আকাশের নীচে এই স্বর্গের নাম দিউ

মাথানগুড়ি থেকে পায়ে হেঁটে ভুটানের জঙ্গলেও ঢোকা যায়। নিজের সঙ্গে সুমো, স্করপিও, বোলেরো ধাঁচের গাড়ি না থাকলে স্থানীয় এনজিও-দের কাছ থেকে জঙ্গলে ঘোরার জিপ ভাড়া পাওয়া যায়। খরচ হাজার তিনেক। ভোরবেলা হাতি সাফারিও করতে পারেন। ঘোরানো হয় মূলত বাঁশবাড়ি রেঞ্জ। মানসের জঙ্গলে প্রতিপদে অনুভব করবেন বন্যদের। কিন্তু বাঘ, কালো চিতাবাঘদের দেখা কপালের ব্যাপার। জিপ থেকে জঙ্গলের মধ্যে না নামাই ভাল। আর মোবাইল টাওয়ার মাথানগুড়িতে অধরা। মানস যেতে হলে গুয়াহাটি থেকে এসইউভি ভাড়া করে যাওয়া ভাল। না হলে গাড়ির জন্য আবার টাকা গুনতে হবে। না হলে ট্রেনে বরপেটা রোড নেমেও মানস যাওয়া যায়। আবার মাওঝিগেন্দ্রি সোসাইটি ভুঁইয়াপাড়ার রিসর্টে রেখেও মানস ঘোরায়।

মাথানগুড়ি যেমন নদীর পারের বনবাংলো, নগাঁও-তেজপুরের সীমান্তে থাকা বুড়াচাপোড়ির বাংলো আবার যেন বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাস থেকে উঠে আসা। চারদিকে জঙ্গল। মধ্যিখানে দ্বীপের মতো সবুজ দোতলা বাংলো। তার বৈঠকখানায় আড্ডা মারার মজাই আলাদা। বুড়াচাপোড়িতে বাঘ আছে, আছে বুনো মোষ, বুনো শুয়োর, অজগর, বিস্তর পাখি আর স্থল ম্যানগ্রোভের বন। কিন্তু প্রধান আকর্ষণ বনকর্মীদের সঙ্গে বিরাট ব্রহ্মপুত্রের বুকে জলবিহার। দিগন্ত বিস্তৃত ব্রহ্মপুত্রের এক দিক চলে গিয়েছে তেজপুরে কলিয়াভোমরা সেতুর পানে। অন্য পারে কাজিরাঙা। লাউখোয়া ও বুড়াচাপোড়ি মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই অভয়ারণ্যে আগে গন্ডার থাকলেও এখন নেই। বুড়াচাপোড়িকে দেশে-বিদেশে বিখ্যাত করেছে ব্লু-টেইলড বি ইটার পাখির বিরাট বসতি।

কামাখ্যা মন্দির।

বুড়াচাপোড়ি যেতে হলে গুয়াহাটি থেকে গাড়ি নিতেই হবে। আর সেই গাড়িতেই পরের দিন চলে আসুন মঙ্গলদৈ জেলায় ওরাং রাজীব গাঁধী জাতীয় উদ্যানে। বাঘের সংখ্যা কাজিরাঙায় বেশি হলেও ছোট্ট অভয়ারণ্য ওরাংয়ে বাঘের ঘনত্ব কিন্তু সবচেয়ে বেশি। ওরাং ঘোরার জন্য গাড়ির নিতান্ত অভাব। জঙ্গলের দরজার পাশেই সরকারি লজ আছে। নিজের গাড়িতে বাঘ সন্ধানে জঙ্গল ঘোরার পরে দুপুরে লজেই খাওয়াদাওয়া সারতে পারেন।

যাতায়াত, থাকা-খাওয়া

গুয়াহাটি ঘোরার জন্য গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই ভাল। কতগুলি জায়গা ঘুরছেন তার উপরে ভিত্তি করে মোটামুটি ২৫০০-৩০০০ টাকা লাগবে। গাড়ি ভাড়ার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন ফাস্টট্র্যাক- ৯৯৫৭৭৮৭৭৯২, ৭৮৯৬০০১৪৭৭। একই সঙ্গে গুয়াহাটি-শিলং-চেরাপুঞ্জি-মাওলিনং-দাউকির প্যাকেজ ট্যুরের জন্য গাড়ি নিতে পারেন স্বপন দেবের কাছ থেকে। ফোন- ৯৮৬২০০৫১৮৮। সব মিলিয়ে মোটামুটি ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা পড়বে চার দিনে। না হলে গুয়াহাটির ভিতরে ঘুরতে ওলা বা উবার বুক করতে পারেন।

গুয়াহাটি এলে মেখলা, অসম সিল্ক, হস্তশিল্প কিনতেই হবে। তার জন্য ভরসার দোকান সরকারি প্রাগজ্যোতিকা, আর্টফেড জাগরণ ও পূর্বাশা। তিনটিই আমবাড়ি এলাকায় রাস্তায় এ পার-ও পারে। বাঙালি দোকানে দরদাম করে মেখলা বা শাড়ি কিনতে হলে পল্টনবাজার এএসটিসি বাস স্ট্যান্ডে দিদার মার্কেটে দীপিকা।

পবিতরা গিয়ে থাকতে চাইলে বাইরে সরকারি প্রশান্তি লজ ও আর্য ইকো রিসর্ট রয়েছে। প্রশান্তি- ৯৮৫৯৫৮৩০৪৩। আর্য- ৯৫৭৭৮৮৫৪৪৬।

আরও পড়ুন, নীল নির্জন আন্দামান

গুয়াহাটি ও কামাখ্যাতেও প্রশান্তি লজে থাকতে পারেন। না হলে পল্টনবাজার, বি বরুয়া রোড, উলুবাড়িতে বিস্তর বাজেট, ইকনমি ও ভাল মানের হোটেল রয়েছে। ডবল বেড মান বুঝে ১০০০ থেকে ৪০০০। ফ্যান্সি বাজারের আশপাশের হোটেলে না থাকাই ভাল। তুমুল যানজট হয়। মনে রাখবেন, অধিকাংশ হোটেলে বছর বারোর উপরে বাচ্চা থাকলে অতিরিক্ত বেডের ভাড়া নেওয়া হয়।

গুয়াহাটিতে অসমীয়া তো বটেই মিসিং, নাগা, মণিপুরি খাবারও চেখে দেখতে পারেন। অসমীয়া খাবারের সেরা ঠিকানা গণেশগুড়ির ডেলিকেসি, বোরা সার্ভিসে মাইহাং, লাচিত নগরে খরিকা। নাগা খাবারের জন্য শিলপুখুরিতে নাগামিস, জু রোডে নাগা কিচেন্স, মিসিং কিচেন রয়েছে হেঙেরাবাড়িতে। মণিপুরি হোটেলগুলি আছে পল্টনবাজারে। থালি প্রতি খরচ ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। সঙ্গে ইচ্ছেমতো পদ অতিরিক্ত। আর বাঙালি খাবার চাইলে পল্টনবাজারে মা কালী হোটেল, সুরুচি, মাদার্স কিচেন, মালিগাঁওতে মা মনসা। আরও ভাল চাইলে লাচিত নগরে আছে ৬ বালিগঞ্জ প্লেস, কস্তুরি। একই এলাকায় কন্টিনেন্টাল পাবেন বার বি কিউ-তে।

আমিনগাঁও বুদ্ধ মন্দির।

মানস যেতে হলে এসইউভি গুয়াহাটি থেকেই ভাড়া করে যাওয়া ভাল। বাঁশবাড়ি রেঞ্জ অফিসে দেখা করে অনুমতিপত্র নিন। জিপ ও রিসর্ট রয়েছে মিউস সংস্থার। যোগাযোগ- ৯৬১৩৯৭৩৩৪৩, ৯৪৩৫৭৫৯৪৮৮। ভুঁইয়াপাড়ার দিকে থাকা ও ঘোরার জন্য মাওঝিগেন্দ্রি সোসাইটি। ফোন- ৯৫৩৬৬২৬০৮৫। মাথানগুড়ি বাংলোয় থাকতে গেলে বরপেটা রোডের বিট অফিসে বুকিং করতে হবে। ফোন- ০৩৬৬৬-২৬১৪১৩/ ২৬০২৮৮/ ২৬০২৮৯। জঙ্গল সাফারির খরচ সাড়ে তিন হাজার। হাতি সাফারি, এন্ট্রি ফি মিলিয়ে প্রায় ৮৫০।

বুড়াচাপোড়ি যেতে গেলেও ভরসা ভাড়া করা গাড়ি। বাংলোর ভাড়া মাথাপিছু ৫০০-৬০০ টাকা হিসেবে নেওয়া হয়। নৌকাবিহারের খরচ সময় ও দূরত্বের উপরে নির্ভর করে মোটামুটি হাজার টাকা পড়বে। যোগাযোগ- ডিএফও, নগাঁও-০৩৬৭২ ২২৫৬৩২। রেঞ্জ অফিসার লাওখোয়া- ০৩৬৭২ ২৪৭৫৯২। ওরাংয়ে প্রশান্তি টুরিস্ট লজ- ৯০৮৫৮৮৯১৭৮।

ছবি: লেখক।