আমরা এখন ইংল্যান্ড স্কটল্যান্ড-এর বর্ডার ক্যাম্বরিয়ার (যে জায়গাটি লেক ডিস্ট্রিক্ট নামে সুপরিচিত) ন্যাশনাল পার্কের গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক টুকরো নুড়ি বিছানো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। এখানেই চার দিনের জন্য আমাদের কটেজ বুক করা রয়েছে। মেয়ে রিসেপসন থেকে চাবি নিয়ে এলে কটেজে ঢুকে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৮টা ৩৫ বাজে। তবে এখনও দিনের আলো রয়েছে। যদিও আকাশ মেঘলা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও পড়ছে। আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও কয়েকটা কটেজ রয়েছে। আসার পথে কাছাকাছি কোনও লোকালয় চোখে পড়েনি। মেয়ে বলল, রিসেপশনে কোনও মানুষ নেই। বোর্ডে লেখা নির্দেশিকা দেখে চাবি নিয়ে এসেছে। নির্দেশিকায় কয়েকটা ফোন নম্বরও রয়েছে। বলা হয়েছে, যে কোনও নম্বরে ফোন করলে দূরের গ্রাম থেকে ডিম, দুধ, মুরগি পৌঁছে দেবে। আমাদের অবশ্য কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই, সবই নিয়ে আসা হয়েছে।

আরও পড়ুন: আন্দামান-নিকোবর ছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন ভারতের এই অসাধারণ দ্বীপগুলোতে

ফ্রেশ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে ফেসবুকে বন্ধুদের আমার অবস্থান জানাতেই ছবি পাঠানোর অনুরোধ আসতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ ওয়াইফাই কানেকশন সমস্যা শুরু করায় আইপ্যাড রেখে টেবিলে রাখা গাইডবুক খুলে বসলাম। এই সমগ্র অঞ্চলটিকে লেক ডিস্ট্রিক্ট বলা হলেও সরকারি নথিতে এই নামটির উল্লেখ নেই। এই জায়গাটির নাম হার্টসপ গ্রাম। আমাদের কটেজের ডান দিকের পাহাড়টির নাম হার্টসপ ডোড (Hartsop Dood)। উচ্চতা ৬১৮ ফুট। আসার পথে যে লেকটি দেখেছি তার নাম উলস ওয়াটার।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পাহাড় আর জঙ্গলের নীরব সৌন্দর্য দেখে বাকরহিত হয়ে গেলাম। পাখির মৃদু কলতান ছাড়া কোনও আওয়াজ নেই। কর্মব্যস্ত জীবনকে ভুলে থাকার উপযুক্ত জায়গা। একটু আগেই দেখলাম পাহাড়ের মাথায় রোদ আটকে আছে, কখন যে লাফ মেরে নীচে নেমে এসেছে টের পাইনি।

১০টার সময় রওনা হলাম উলস ওয়াটার লেকের উদ্দেশে। গাড়ি কটেজ ছাড়িয়ে সামান্য এগোতেই মন ভোলানো দৃশ্যে আবিষ্ট হয়ে পড়লাম। পাহাড়ের কোলে পাহাড়। সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্নার জল নেমে এসে দু’দিকের পাহাড়ের পা ছুঁয়ে বয়ে চলেছে। মেয়ে বলল, জায়গাটা অনেকটা সুইজারল্যান্ডের মত। ‘গ্লেন রাইডিং’-এ পৌঁছে উলস ওয়াটার লেকে ভ্রমণের জন্য স্টিমারের টিকিট কেটে জেটিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। চার দিকটা ছবির মতো সুন্দর। নীল আকাশের নীচে সবুজ পাহাড়, তারই কোলে লেকের স্বচ্ছ জল এক মায়াময় দৃশ্যের অবতারণা করেছে। এই লেক দৈর্ঘ্যে সাড়ে সাত মাইল, প্রস্থে অর্ধেক মাইল, গভীরতায় ২০৫ ফুট এবং সমুদ্র থেকে ৪৭৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই ধরনের অপ্রশস্ত লেকগুলিকে ‘রিবন লেক’ বলা হয়।

আরও পড়ুন: গ্রিস দেশের দ্বীপসুন্দরী সান্তোরিনি

‘লেডি অফ দ্য লেক’ স্টিমার জেটি ছুঁয়ে দাঁড়াল, এই স্টিমারটি ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে এই লেকের বুকে প্রথম ভেসেছিল। স্টিমারে চড়ে বসলাম, ঘুরে ঘুরে চারপাশের অপরূপ দৃশ্য এবং পাহাড় ও লেকের সখ্য ক্যামেরাবন্দি করতে লাগলাম। পাহাড়ের রং কোথাও সোনালি, কোথাও সবুজ। সুদৃশ্য হোটেল, পাহাড়ের সবুজ ঢালে সাদা কালো ভেড়ার পাল দেখা যাচ্ছে। আমাদের হাতে সময় কম। তাই লেকের শেষ প্রান্ত ‘পলিব্রিজ’ না গিয়ে কিছুটা আগে ‘হাও টাউন’-এ নেমে পড়লাম। জায়গাটা এতটাই সবুজ যে অন্য রং চোখে পড়ছে না। লেকের পাড়ে বেশ গুছিয়ে ছিপ ফেলে বসে আছেন অনেকে। জলে পা ডোবালাম, ভীষণ ঠাণ্ডা! এখানেও ভেড়ার মতো যে প্রাণীগুলি ঘাস খাচ্ছে, জানলাম এদের নাম ‘আলপাকা’। এদের গা থেকে অনেক বেশি পশম পাওয়া যায়। কিছুটা বেড়িয়ে জেটিতে ফিরলাম। এক সাহেব পরপর তিনটে স্যামন মাছ ছিপে গেঁথে তুললেন। ইতিমধ্যে স্টিমার আসে গেছে। এর নাম ‘রেভন’। এখানকার এক প্রজাতির পাখির নাম ‘রেভন’। একই দৃশ্য দেখতে দেখতে ‘গ্লেন রাইডিং’-এ ফিরলাম।

আমরা এ বার চলেছি লেক থেকে তিন মাইল দূরে ‘আইরা ফোরস’ দেখতে। গাড়ি থেকে নেমেই অনেক দূর থেকে আছড়ে পড়া জলের আওয়াজ পেলাম। ফোরস দেখে যাঁরা ফিরছিলেন তাঁদের কাছে জানলাম হাফ মাইল ওপরে উঠতে হবে। কিছুটা হেঁটে একটা জলের স্রোতের ওপর ছোট্ট কাঠের পুল পার হয়ে খুব সাবধানে ওপরে উঠতে লাগলাম। পথ খুবই বিপদজনক। অন্যমনস্ক হলেই নীচে পাথরের ওপর বয়ে যাওয়া আইরা ফোরসের স্রোতে গিয়ে পড়ব। ১০০ মিটার উঁচুতে আইরা ফোরস। আমরা এখন যে পথ দিয়ে চলেছি, ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও তাঁর বোন ডরোথি ওয়ার্ডসওয়ার্থ এই পথ দিয়ে যেতে যেতে এই স্রোতের ধারে সোনালি ড্যাফোডিল ফুটে থাকতে দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তার পরেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘ড্যাফোডিল’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। উইলিয়ামের জন্ম (১৭৭০-১৮৫০) এখানেই। ঢেউখেলানো পথ ধরে যেতে যেতে একটা লম্বা কাঠের গুঁড়িতে পিন কুশনের মতো অজস্র কয়েন গাঁথা দেখে মনে হল যেন টাকার গাছ! এই জঙ্গলে নাকি লাল হরিণ ও কাঠবেড়ালি রয়েছে।

আমরা এখন আইরা ফোরসের একেবারে সামনে পাথরের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে ফোরসের উৎস খোঁজার চেষ্টা করছি। এর উচ্চতা ৬৫ ফুট। ফোরসের মাথায় একটা ব্রিজে অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা এখানে দাঁড়িয়েই আইরা ফোরসের সঙ্গে নিজেদের ক্যামেরাবন্দি করে নীচে নামতে শুরু করলাম। কবি উইলিয়ামের কথা ভাবতে ভাবতে নস্ট্যালজিক হয়ে পড়েছিলাম। দূর থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার ধ্বনিতে সম্বিত ফেরে। আমাদের গাড়ি হার্টসপ গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়।