ইচ্ছে হলেই আমরা ছুটি রাজস্থান কিংবা ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোনও জায়গায়। কিন্তু, আমাদের সোনার বাংলার আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঐতিহ্যমণ্ডিত নানা ডেস্টিনেশন। বাংলার রাজা, জমিদারদের জমানা চলে গিয়েছে অনেক দিন আগেই। রয়ে গিয়েছে ফেলে আসা অতীত। তাঁদের সেই রাজবাড়ি। কেমন ছিল সেই রাজপাট? কেমন ছিলেন সেই রাজপরিবারের মানুষজন? কেমন ছিল সেই পরিবারের দুর্গাপুজোর উৎসব? হাজারো প্রশ্ন মাথায় ঘোরাফেরা করছে? যাঁরা বাংলার অল্পচেনা লুকিয়ে থাকা ঐতিহ্যকে জানতে চান, তাঁরাই বেরিয়ে পড়তে পারেন।  অতীতের সেই ঐতিহ্যকে জানতে হলে, কংক্রিটের জঙ্গলকে পেছনে ফেলে চলে আসতে হবে তাঁদের রাজপাটে।

পর্যটনে হেরিটেজ শব্দটা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে। আর হেরিটেজ ট্যুর ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যে ভাবে প্রচলন আছে আমাদের রাজ্য তেমন ভাবে নেই। কথা হচ্ছিল সম্রাট চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁর লেগাসি অব বেঙ্গল দীর্ঘ দিন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে কী ভাবে, বাংলার এই ঐতিহ্যকে পর্যটকদের কাছে উৎসাহিত করা যায়।

সেই ঐতিহ্যময় হেরিটেজ সফরে প্রথমেই বেছে নেওয়া যাক বর্ধমান ও হুগলি জেলার বেশ কিছু জায়গাকে। শুধু ডে ভিজিটে নয়, সেখানে অন্তত দুটো দিন থেকে দেখে নিন, বাংলার ফেলে আসা ঐতিহ্যর অলঙ্কারকে।

দেবীপুর

হাওড়া–বর্ধমান মেনলাইনে দেবীপুর। অল্পচেনা, অখ্যাত আখ্যান যেন আপনার অপেক্ষায়। ছড়িয়ে আছে নানান মন্দির। এখানকার টেরাকোটার তৈরি, লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির সবচেয়ে বিখ্যাত। ১৮৩৬ সালে এটি নির্মাণ করেন নরোত্তম সিংহ। পরবর্তীকালে বর্ধমানের দেওয়ান বনবিহারী কপূর এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করেন। মন্দিরের গায়ে চিত্রিত টেরাকোটার কারুকাজ মন ভুলিয়ে দেবে। বাংলার আটচালা ও ওড়িশার রেখদেউলের অনবদ্য শিল্পশৈলী ফুটে উঠেছে। মন্দির গাত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছেলেবেলা থেকে গোপিনীদের সঙ্গে খুনসুটি অনবদ্য টেরাকোটার কাজ। মন্দিরের গায়ে সেই সময়কালের যুদ্বের ছবি স্থান পেয়েছে। লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের কাছেই দুটি শিবমন্দির ও দোল মঞ্চ দেখে নিতে পারেন। দেখে নিন বাংলার অল্পচেনা ঐতিহ্যের অপরূপ নিদর্শন।

আরও পড়ুন, গড়চুমুক... বনের সুবাস নদীর স্নিগ্ধতায়

কী ভাবে যাবেন: হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইনে দেবীপুর স্টেশনে নেমে বাসে অথবা ট্রেকারে চলে আসুন শিবতলা।

আমাদপুর

এক নাম না জানা অচিনপুর। সুন্দর গ্রাম। যে গ্রাম মননে আর মেজাজে তাদের জমিদারি বজায় রেখেছে। কলকাতা থেকে মাত্র ৮৯ কিমি দূরে আরও এক অসাধারণ হেরিটেজ ডেস্টিনেশন। বর্ধমানের মেমারি থেকে মাত্র ৩ কিমি। আবার কলকাতা থেকে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের ড্রাইভে পৌঁছে যান এক জমিদারি ঘরানায়। এখানেই চৌধুরীদের জমিদার বাড়ি। আর এখান থেকেই দেখা আমোদি আমাদপুর গ্রামকে। আর পাঁচটা আটপৌরে গ্রামের থেকে আমাদপুর অনেকটাই আলাদা। হলদে পাকা ধানি জমি, দিঘির পাড়, মন্দির এই নিয়ে আমাদপুর। প্রায় ৩৫০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস ফিসফিস করে সফেদরঙা রাজবাড়ির আনাচে কানাচে। আর এই রাজবাড়িতে রাত্রিবাস। হাজার বছর পুরনো নিশংক আশ্রম, বটতলা, বাঘবাড়ি, এখানকার আদিবাসী পাড়া না দেখলে অনেক কিছুই অদেখা থেকে যাবে। আমাদপুরে বিখ্যাত দেবী কালীর থান। বছরভর পূজার্চনা চলে। এখানকার ছোটকালী-মেজোকালী-বড়কালী মন্দিরের পুজো আর তাদের বিসর্জনের আতিশয্য মন ভুলিয়ে দেবে।

আরও পড়ুন, অষ্টবিনায়কের টানে মুম্বই

কালনা ও অম্বিকা কালনা

ভাগীরথী নদীপারের এক প্রাচীন জনপদ। নদীর অন্য পারে নদিয়ার শান্তিপুর। মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য, নিত্যানন্দ, কমলাকান্ত আর ভবা পাগলার স্মৃতি বিজড়িত অম্বিকা কালনাকে মন্দিরনগরী বললেও ভুল হবে না। একদা অম্বুয়ানগরী থেকেই অম্বিকা কালনা নামে পরিচিত হয়। ১৫০০ সালে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য শান্তিপুর থেকে এখানে আসেন, গৌরীদাস পণ্ডিতের বাড়িতে। আজকের মহাপ্রভু পাড়ায় সেই বাড়িতে তাঁর পদচিহ্ন আজও সংরক্ষিত। এখানকার জগন্নাথ মন্দির, সিদ্বেশ্বরী দেবীমন্দির দেখে নিন।

১৭৩৯ সালে মহারানি বিষণ কুমারী লালজি মন্দির নির্মাণ করেন। গিরিগোবর্ধন মন্দিরের গায়ে অসাধারণ টেরাকোটার কাজ মুগ্ধ করবে।

পঞ্চরত্নশৈলির কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। চারপাশে সাজানো বাগান। টেরাকোটার অসাধারণ কাজ মনে করিয়ে দেবে বাংলার অনবদ্য এই শিল্পকলাকে।

শ্যামরাইপাড়ার কাছে অনন্তবাসুদেব মন্দির। ১৭৫৪ সালে বর্ধমান মহারাজ প্রায় ৫০ ফুটের ৪ চালা রীতির অসাধারণ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

বিদ্যাবাগীশপাড়ায় সাধক কমলাকান্তের বসতবাড়ি ও মন্দির। জাবরিপাড়ার মসজিদ, ২০০ বছরের জামি মসজিদ, দাঁতনকাঠিতলার উলুঘ মুসুয়াদি খানের ১৫৩৩ সালের মসজিদ, কুশিনগরপাড়ার বৌদ্ধমন্দির এবং কালনার ১০৮ শিবমন্দির।

আরও পড়ুন, এই উইক-এন্ডে ঘুরে আসতে পারেন এই জায়গাগুলি থেকে

১৮০৯ সালে মহারাজা তেজচন্দ্র বাহাদুরের অসাধারণ আটচালা মন্দির দেখে নিতে ভুলবেন না। দু’টি আলাদা বৃত্তে মন্দির বিভক্ত। বাইরের বৃত্তে ৭৪টি ও ভিতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির বাংলার এক বিস্ময়।

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে কালনার রেলপথে দূরত্ব প্রায় ৮২ কিমি। হাওড়া থেকে কাটোয়াগামী ট্রেনে কালনা চলে আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন: দেবীপুর-কালনা-আমাদপুর সার্কিটে থাকার জন্য আমাদপুরে থাকাই সবচেয়ে ভাল। (www.heritageamadpur.com) প্রতি ঘরের ভাড়া: ২৫০০-৫০০০ টাকা।

পূর্বস্থলী

কলকাতা থেকে মাত্র ১২০ কিমি। বর্ধমানের পূর্বস্থলীর আনন্দনগরের এই জলাশয়ের নাম ‘চুপির চর’। প্রায় ১১ কিমি দীর্ঘ এই লেকের বুকে ভেসে বেড়ায় নানা পরিযায়ীর দল। বিশাল চরের নাম চুপি। প্রচুর পাখি লেকের আনাচেকানাচে ভেসে বেড়ায়। হ্রদের বুকে শীতে নানা পরিযায়ী পাখি উড়ে আসে। ঘাটের পাড় জুড়ে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। টলটলে জলে নৌকায় ভেসে পড়ুন। এখানকার সমস্ত মাঝি পাখি চেনেন। তাঁরাই চিনিয়ে নিয়ে যান।

আরও পড়ুন, দ্বীপের নাম হেনরি

লেসার হুইসলিং ডাক, কমন  স্নাইম, লিটল গ্রিব,  ব্ল্যাক সোল্ডারড কাইট, বার্ন সোয়ালো, ব্ল্যাক হেডেড আইবিস-সহ প্রায় ১০০ প্রজাতির পরিযায়ীর দেখা মেলে। ঘণ্টা পিছু নৌকা ভাড়া নিন। শুধু পাখি দেখার ডেস্টিনেশন নয়, এখানকার কাঠের তৈরি পুতুলের গ্রাম আর জমিদারবাড়িও এক অনন্য সংযোজন। বাংলার অজানা এক অধ্যায়কে জেনে নিন।

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে চুপির চরের দূরত্ব ১২০ কিমি। হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে পূর্বস্থলী নেমে টোটোতে চলে আসা যায় চুপির চর। গাড়িতে এলে, ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ধরে নবদ্বীপ হয়ে পারলিয়া মোড় হয়ে পূর্বস্থলি চলে আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য রয়েছে অক্ষয় হোমস্টে (www.homesteysanyal.com) ৩টি ঘর। ২,২০০ টাকা। ৫০০ টাকা জনপ্রতি খাওয়া।

আঁটপুর

টেরাকোটার মন্দিরনগরী। বর্ধমান রেসিডেন্সির দেওয়ান আঁটর খাঁয়ের নাম অনুসারে এই জনপদের নাম হয় আঁটপুর। ১৭৮৬-’৮৭ সালে বর্ধমান রাজার দেওয়ান কৃষ্ণরাম মিত্র গঙ্গাজল, গঙ্গামাটি আর পোড়ামাটির ১০০ ফুট উচ্চতার রাধাগোবিন্দ মন্দির নির্মাণ করেন। বাংলার নিজস্ব চার চালার ছাদ, চার খিলানের স্তম্ভ, টেরাকোটার অসাধারণ কাজ সম্বলিত দু’পাশের দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য প্যানেলে, পৌরাণিক ও সামাজিক চিত্রকথার অপরূপ আখ্যান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। গম্বুজ আকৃতির লোকমঞ্চ, চণ্ডীমণ্ডপ, কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি অসাধারণ। কাছেই জলেশ্বর, রামেশ্বর, বানেশ্বর ও ফুলেশ্বর মন্দির বিখ্যাত।

এখানের বাবুরাম ঘোষের দুর্গাবাড়িতে শ্রী রামকৃষ্ণের কাছে দীক্ষা নেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। এই দিনকে স্মরণে রেখে এখানে পুতাগ্নি উৎসব পালন করা হয়।

আঁটপুর থেকে ৬ কিমি দূরে রাজবলহাটের মৃন্ময়ীদেবী রাজবল্লভীর সুন্দর মন্দিরটি দেখে নিতে পারেন।

এই আঁটপুরেই কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মভিটে। বাংলার অল্পচেনা আঁটপুর ঐতিহ্যের আর এক নাম।

কী ভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে তারকেশ্বর লোকালে হরিপাল নেমে বাসে আঁটপুর চলে আসতে পারেন।

আরও পড়ুন, আর এক তিব্বতের সন্ধানে বাইলাকুপায়

দশঘরা

কলকাতা থেকে মেরেকেটে ৭৫ কিমি দূরে। বাংলার আরও এক ঐতিহ্যময় মন্দিরনগরী। মিথ বলছে, মুঘল আক্রমণ থেকে নিজেদের মহামূল্যবান রত্নসামগ্রী বাঁচাতে দশটি ঘড়াতে ভরে, দিঘির জলে লুকিয়ে রাখা ছিল। আর সেই থেকেই এই জায়গার নাম হয়ে যায় দশঘরা। রয়েছে সুবিশাল সেই দিঘি, কিন্তু আজও সেই গুপ্তধনের খোঁজে মানুষ ডুব দেন দিঘিতে। না, গুপ্তধনের সন্ধানে নয়, আপনি দশঘরায় আসুন টেরাকোটার অসাধারণ কারুকাজ দেখতে।

তারকেশ্বর থেকে মাত্র ১২ কিমি উত্তরে ১৮ শতকের নির্মিত মন্দিরগুলি তাক লাগিয়ে দেবে। কালের অতলে হারিয়ে গিয়েছে এখানকার বেশ কিছু মন্দির। জমিদার সদানন্দ বিশ্বাসের তৈরি, গোপীনাথ মন্দিরটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কেয়ারি করা সুন্দর মরসুমি ফুলের বাগান ঘেরা মন্দিরের গায়ে প্যানেল করা টেরাকোটার কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। আটচালা মন্দিরের গায়ে  ফুটে উঠেছে রামায়ণ, নৃত্যরত নর্তকী, রাজসভা আর সেই সময়ের দৈনন্দিন জীবনের নানা চিত্রকলার অসাধারণ কিছু মুহূর্ত। এই চিত্রকলা বাংলার এক অনন্য নিদর্শন। মন্দির সংলগ্ন অষ্টকোণাকৃতি দোলমঞ্চ মনে করিয়ে দেবে ফেলে আসা ইতিহাসের পাতা।

মন্দির থেকে কিছু দূরে বিশ্বাসদের জমিদার বাড়ি। আজও এক স্বর্ণময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। জমিদার বাড়ির ঠাকুরদালানে আজও পূজিতা হন দেবী দুর্গা।

দশঘরার ব্যবসায়ী বিপিনকৃষ্ণ রায় নির্মাণ করেন এক সুন্দর প্রবেশ তোরণদ্বার আর ঘড়ি। সময়ের জাঁতাকলে সে ঘড়ি স্তব্ধ হয়ে গেছে। কিন্ত, বারে বারে মনে করিয়ে দেবে বাংলার এক ফেলে আসা ঐতিহ্য।

কোথায় থাকবেন: আঁটপুর-দশঘরায় থাকার জন্য রয়েছে ভিলা-দে–রিট্রিট (www.bookmyweekends.com)

বাংলার এই ফেলে আসা ইতিহাস আর নানা ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানে একটু অন্য রকম ভাবে যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন তাঁরা যোগাযোগ করতে পারেন: legaciesofbengal@gmail.com

সম্রাট চৌধুরী: ৯৮৩১৯৪৮৬৩৪/ ৯৮৩০২৫৮৮২৮

ছবি: লেগাসিজ অব বেঙ্গল ও লেখক