ছোট্ট খাঁড়িটা থেকে নৌকা বের করছিল সুবল দাস। আলোয় ভেসে যাচ্ছে দুকূল গঙ্গা। লাল কুসুমের মতো তরল গলে গিয়ে রং ধরছে সারারাত চুপটি করে শুয়ে থাকা নদীর বুকে। দিনের শুরু। আজ খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছে সুবলের। এরই মধ্যে পাশের নৌকার গলুইয়ে উঠে পড়েছে স্তূপীকৃত মাছ। নরম রোদে চকচক করছে পাঁশুটে রূপোলী আঁশ। সুবলের অবশ্য এখন অন্য দিকে মন দেওয়ার সময় নেই। খাঁড়ি থেকে নৌকা বেয়ে মাঝ নদীতে এসে দেখছে সারারাত ছাঁদি জালে কত মাছ পড়ল। নৌকায় বউ বসে আছে। দুজনে মিলে এখনই ছুটবে বাজারে। কাকভোরের মৃদু আদর গায়ে মেখে অসংখ্য নৌকা ভাসছে জলে। দুলছে মৃদু হাওয়ায়। ঘুম ভাঙা চোখ মেলে নতুন দিনের কলরব শুনছে গঙ্গা পারের শহর ফলতা।

কাল অনেক রাতে ফলতা এসে পৌঁছেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের জানলা খোলা মাত্র গঙ্গার দামাল হাওয়া ঘরে ঢুকে এলোমেলো করে দিল সব। নদী অনেকটাই প্রশস্ত এখানে। জানলা থেকে একটু ঝুঁকেই দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি। মাটি লাল হয়ে রয়েছে আগুন রং ফুলে। চলতে চলতে হঠাৎই পাড় ভেঙে ছোট্ট একটা বাঁকের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে নদীর জল। ছোট ডিঙি নৌকা নোঙর করা রয়েছে সেখানে। খেপলার জাল শুকোচ্ছে পাড়ে। পাশেই উল্টে পড়ে রয়েছে বহুকালের পুরনো একটা ভাঙা নৌকা। সেখানে সাতসকালে অস্থায়ী সংসার পেতে বসেছে জেলে গিন্নি। কাঠকুটো বয়ে নিয়ে এসেছে একগাদা। রান্নার উদ্যোগ সম্ভবত। পার বরাবর চোখ পাতলে দেখা যায় অনেকগুলি ঘাট পরপর নেমে এসেছে জলে। ছলাৎ ছলাৎ জল আছড়ে পড়ছে ঘাটের গায়ে।

নদীর পার বরাবর হাঁটলে উথালপাথাল একটা হাওয়া এসে লাগে গায়ে।

মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই শুধু নয়। ফলতার রয়েছে এক বর্ণময় অতীতও। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিরাজদৌল্লা যখন কলকাতা দখল করেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা কলকাতা থেকে ফলতায় পালিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, হুগলি নদী ধরে ওলন্দাজদের ব্যবসা বাণিজ্য চলত ফলতায়। বিরাট এক কারখানা তৈরি করেছিলেন তাঁরা এখানে। ফলতার দক্ষিণ দিকে ১০ কিমি দূরে নদীর ওপারে গড়চুমুকের কাছে দামোদর আর হুগলি নদীর সঙ্গমস্থল। আবার ১৬ কিমি দূরে নুরপুরের অপর পাড়ে গাদিয়াড়ায় দামোদর হুগলি আর রূপনারায়ণের সঙ্গমস্থল। এখানে গঙ্গার পারে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ভারি সুন্দর একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। বাণিজ্যনগরী হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ ফলতা। কেন্দ্রীয় সরকার স্পেশাল ইকনমিক জোন তৈরি করেছে এখানে।

আরও পড়ুন: আরামবোল-ভাগাতোর-আঞ্জুনা-বাগা-কালাঙ্গুট

নদীর পার বরাবর হাঁটলে উথালপাথাল একটা হাওয়া এসে লাগে গায়ে। কেমন যেন একটা নোনা গন্ধ মাখা। মনে হয় সমুদ্রের গা শুষে ছুটে আসছে মাতাল হাওয়ার দল। বন্দর থেকে বন্দরে যায় অতিকায় মালবাহী জাহাজ। বিষণ্ণ ফাটা ফাটা গলায় ‘ভোঁ’ দেয় একটা। ঢেউয়ের ধাক্কায় দূরে সরে যায় জেলে নৌকাগুলি। জলে হুড়োহুড়ি করতে নামা ছেলের দলও সভয়ে সরে যায় একটু। সূর্যের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে ভরা দুপুরের নদী। মাছ ধরা বন্ধ রেখে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে জেলে। ঘাটে নৌকো বেঁধে স্নান করতে নেমেছে। অশ্বত্থ গাছের ঝিরঝিরে আলো-ছায়ায় উঁচু ঘাটের সিড়িতে বসে নদীর দিকে উৎসুক দৃষ্টি পেতে রেখেছে মেয়েটা। বাবা এখনও নৌকা নিয়ে মাঝগঙ্গায়। বাবার জন্য ভাত এনেছে সে।

জলের বুক চিরে মাঝে মাঝে উঁকি মারে জাহাজ।

দিন কেটে গেল নদীপ্রান্তে। বিকেলের দিকে আকাশজুড়ে মেঘ করল। তারই কালো ছায়া পড়ল জলে। দেখতে দেখতে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। পানাপুকুরের শাপলা ফুলগুলি নুয়ে গেল জলের তোড়ে। খেলা ভুলে ছুট লাগাল ছেলের দল। পারের কাছে যারা ছিল ফিরতে লাগল দ্রুত। ঝাপসা হয়ে যাওয়া মাঝ নদীতে জড়োসড়ো হয়ে ছইয়ের তলায় গিয়ে বসল মাঝিবউ। অনেকটা পথ যেতে হবে, দিনটাকে সুগন্ধী রুমালে মুড়ে কলকাতার পথ ধরলাম।

গঙ্গার পারে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ভারী সুন্দর একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। 

কোথায় থাকবেন: হোটেল রিৎজ রিভেরিয়া। ফোন-৯৭৩৫১০৭৯৭৭। ভাড়া: ১৮০০-২৮০০ টাকা। হোটেল সি বার্ড ইন্টারন্যাশনাল। ফোন: ২৪৬৩-২২৮৯। ভাড়া ১৯০০-২৯০০ টাকা। এ ছাড়াও একটু সকালের দিকে কলকাতা থেকে বেরিয়ে ফলতা ঘুরে রাতের মধ্যে আবার কলকাতা ফিরেও আসা যায়। এখানে গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট আছে। পিকনিক করার পক্ষেও ফলতা আদর্শ জায়গা।

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ফলতা (৫১ কিমি) বাস যাচ্ছে নিয়মিত। এ ছাড়াও ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় ফলতায়। ঘণ্টা দু’য়েক সময় লাগে।