Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

‘ফুটপাতে জন্মেছিলাম, ফুটপাতেই মরতে হবে আমাদের’

আশ্রয়: গড়িয়াহাট উড়ালপুলের তলার সংসার। ছবি: সুদীপ ঘোষ

হন্তদন্ত হয়ে পা চালিয়েছিলেন। পিছন থেকে তখন সকলে বলছেন, ‘ওই, ওই তো মা! ওর মেয়েই তো খুন হয়েছে।’ কিন্তু তিনি তখন ত্রস্ত হয়ে শ্যামবাজার মোড়ের দিকে দৌড়চ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘‘কিছু হয়নি। জানি না আর।’’

কারণ, শ্যামবাজারের ম্যানহোল থেকে এক শিশুকন্যার দেহ উদ্ধারের পর থেকেই ওই এলাকার ফুটপাতবাসীদের দফায়-দফায় জেরা করেছিল পুলিশ। তার মধ্যে মৃতা কন্যার মা মণি দাসও ছিলেন। পরে অবশ্য জানা যায়, শিশুকন্যা-খুনের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত মণিই! আর তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট এলাকার ফুটপাতবাসীরা। কারণ, পুলিশ বলে দিয়েছে, ওখানে কারও থাকা হবে না। মা মেয়েকে খুন করেছে কি করেনি, এ আলোচনা-বিতর্কের থেকেও তাঁদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে ফুটপাতের ঠিকানা হারানোর বর্তমান বিপন্নতা! যা নিয়ে মণির উপরে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ সকলেই! ফুটপাতবাসীদেরই এক জন বললেন, ‘‘নিজের বাচ্চা নিজে কী করেছে কে জানে! এখন তো শুনছি ও-ই খুন করেছে। সত্যি-মিথ্যা তো আমরা জানি না। কিন্তু পুলিশ সকলকে নিয়ে সমানে টানাটানি করছে। বলছে এখানে থাকতে দেবে না! সংসার নিয়ে কোথায় যাব বলুন তো! আমাদের এ রকমই জীবন! ফালতু ঝামেলা যত্ত সব!’’ 

আসলে তাঁরা জানেন হয়তো, ফুটপাতে থাকতে গেলে ‘একটু-আধটু’ এ রকম হবেই! কিন্তু টিকে থাকাটাই মূল কথা! ফুটপাত জুড়ে থাকা এ জীবনকে শহর চেনে না। পাশ কাটিয়ে চলে যায় প্রতিদিন। এ জীবনও যে খুব একটা শহরকে নিয়ে মাথা ঘামায়, তেমনটা নয়। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই এ শহরের সঙ্গে লেনদেন এ জীবনের। কখনও-সখনও কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তখন তা নিয়ে শোরগোল হয় কিছু দিন। ফুটপাতের জীবনে নাড়া পড়ে।

যেমনটা পড়েছিল ২০১৬ সালের ৩১ অগস্ট ব্রেবোর্ন রোডের ঘটনার পরে। যখন বারো বছরের এক ঘুমন্ত কিশোরীকে ব্রেবোর্ন রোডের ফুটপাত থেকে চলন্ত ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে গিয়ে একাধিক বার ধর্ষণের পরে গলা টিপে খুন করে তপসিয়া খালে ফেলে দেওয়া হয়েছিল তার দেহ! ঘটনার বীভৎসতায় চমকে উঠেছিল শহর। অভিযুক্ত দু’জনের বিচার চলছে বর্তমানে। কিন্তু ব্রেবোর্ন রোডের ফুটপাত সে স্মৃতি মনে রাখেনি। হয়তো মনে রাখতে চায়নি ইচ্ছা করেই। দু’বছর আগের ঘটনা জিজ্ঞাসা করায় ফুটপাতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শুয়ে থাকা কয়েক জন জানালেন, তাঁরা কিছু জানেন না! ওই মেয়েটির মায়ের খোঁজ করায় এক জন রীতিমতো মারমুখী হয়ে বললেন, ‘‘কার কথা বলছেন, কিছু জানি না! যান তো এখান থেকে!’’

তবে ফুটপাতবাসীদের মধ্যেও শ্রেণিবিচার রয়েছে। রয়েছে উঁচু-নিচু ভেদ। বেশির ভাগই কাগজ কুড়োন। তবে ভ্যান চালান, গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করেন, রাস্তায় ফুল বিক্রি করেন, এমনও অনেকে রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের কিছুটা ‘আলাদা’ বলে মনে করেন। আর রয়েছেন ‘বহিরাগতেরা’। এই নয় যে ফুটপাত দেখলেই যে-কেউ শুয়ে পড়তে পারবেন বা আস্তানা গাড়তে পারবেন। বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অনেকগুলি পরিবার বাস করছে, সেখানে এ রকম অস্থায়ী আস্তানা বানানো রীতিমতো মুশকিল। এক-দু’দিন ঠিক আছে। কিন্তু তার বেশি নয়! জায়গা ছেড়ে বহিরাগতদের চলে যেতে হবে ভালয়-ভালয়।

যেমন হেদুয়ায়। দীর্ঘদিন ধরে অনেকগুলি পরিবার বাস করছে ফুটপাতে। তাদের মধ্যেই একটি পরিবার হল বিশ্বনাথ মাঝির। স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে আশির দশক থেকেই সেখানে থাকেন তিনি। বিশ্বনাথবাবু জানালেন, ‘‘যে-কেউ এল আর থেকে গেল, তা হতে দিই না। দেবই বা কেন? এই জায়গাটা তো আমাদের!’’ ওখানকারই আর এক ফুটপাতবাসী পঁয়ষট্টি বছরের ছায়া মাঝি বললেন, ‘‘আমরাই এখানে থাকি। বাবা-মা সকলেই এখানে গত হয়েছেন। আমিও ফুটপাতেই মারা যাব।’’

অনিশ্চয়তা রয়েছে, নেশাড়ুদের উপদ্রব রয়েছে, মাঝেমধ্যে ‘পুলিশি হুজ্জুতি’ও রয়েছে, কিন্তু তার মধ্যেই ফুটপাতের জীবন সম্পর্কে এই এক অদ্ভুত নির্ভরতায় যেন শহরের সব প্রান্ত সমান। সে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের কোনও ফুটপাতবাসী হোন বা গড়িয়াহাট উড়ালপুলের তলার ফুটপাতবাসীরা। সকলেরই এক কথা, ‘‘ফুটপাতে জন্মেছিলাম। ফুটপাতেই মরতে হবে আমাদের!’’

তবে গড়িয়াহাটের ফুটপাতবাসীরা জানালেন, তাঁদের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড সবই রয়েছে। আর রয়েছে হাতে-হাতে স্মার্টফোন। সেখানকার এক জন ফুটপাতবাসীর কথায়, ‘‘পুরসভা, পুলিশ অনেক বার মালপত্র তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের সরাতে পারেনি। আমরা সব নিয়ম জেনে গিয়েছি। এত সহজ নয় সরানো।’’ তবে মাঝেরহাট সেতু ভাঙার পরে ওখানে তাঁরা কতদিন থাকবেন, তা নিয়ে অবশ্য একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গৃহহীনদের জন্য পুরসভা ও রাজ্য সরকারের নৈশাবাস রয়েছে। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয় মোটেই! তবে যাঁদের জন্য নৈশাবাস, তাঁরা সেখানে যেতে রাজি নন। হাতিবাগানের এক ফুটপাতবাসী বললেন, ‘‘শুনেছি এমন আছে। তবে ওখানে কি বৌ-বাচ্চা নিয়ে থাকতে দেবে? আলাদা থাকতে পারব না বাবু!’’

এ এক বৈপরীত্যের জীবন! যেখানে পারস্পরিক সম্পর্কের ধোঁয়াশা, মেয়েকে মা খুন করেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা ছাপিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে ঠিকানা হারানোর বিপন্নতা। আবার পরিবারের থেকে আলাদা হতে হবে, এই আশঙ্কায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও প্রত্যাখান করেন অনেকে।

কলকাতা পুরসভা জানাচ্ছে, এ শহরে রোজ ৭০ হাজার মানুষ রাতে ফুটপাতে শুতে যান! যাঁদের জীবনের সামান্যতম নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু নির্ভরতার ফুটপাত রয়েছে!


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper