গাড়ি দুলছে, কর্তা নিশ্চিন্ত

দুর্দশা: খন্দে চূর্ণী সেতু। ছবি: প্রণব দেবনাথ

গাড়িটা যাচ্ছিল কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতার দিকে। সামনেই চূর্ণী নদীর উপরে সেতু।

গাড়ি সেতুতে ওঠার পরেই শুরু হল ঝাঁকুনি। সওয়ারিরা আতঙ্কিত— এই না হুড়মুড়িয়ে সেতু ভেঙে পড়ে। কলকাতায় যা ঘটল!

শুধু কি তাঁরাই? রানাঘাটের চূর্ণী সেতু পেরনোর সময়ে কিছুটা হলেও রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল লরিচালক সাহিদ মণ্ডলে। সেতু পেরিয়ে হাঁফ ছাড়েন তিনি। বলেন, “দেখছেন, কী অবস্থা? যাতায়াত করতেই ভয় লাগে। খালি মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল। তা হলে আর রক্ষা থাকবে না!”

একই আশঙ্কার ছায়া আর এক চালক সনাতন দাসের কথাতেও। তাঁর অভিযোগ, “সেতুর মাঝে বড়-বড় ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। আসল কাজ কিছু না করে তার উপরে পাথর আর পিচ দিয়ে লেপে দেওয়া হয়েছে। রেলিং ভেঙে গিয়েছিল। তার পাশ দিয়ে গার্ডওয়াল দেওয়া হয়েছে। এতে সেতুর উপরে ভার বেড়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয় নি।”    

ষাটের দশকে তৈরি হয়েছিল এই সেতু। দৈর্ঘ্যে ৯৮ মিটার, প্রস্থে ৯ মিটার। সেতু সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ-আন্দোলন হয়েছে। আরএসপি-র রানাঘাট লোকাল কমিটির সম্পাদক সুবীর ভৌমিকের আক্ষেপ, “মতীশ রায় পূর্তমন্ত্রী থাকার সময়ে সেতুতে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখনও সেই বাতিস্তম্ভ থাকলেও আলো জ্বলে না। রাতে যে কোনও সময়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’’ সেতুটির আমূল সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।

নির্মাণ: ১৯৬৪

নির্মাণকারী সংস্থা: পূর্ত দফতর।

রক্ষণাবেক্ষণ: জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ।

দৈর্ঘ্য: ৯৮ মিটার।

এক দিকে রানাঘাট শহর। অন্য দিকে রানাঘাট ১ ব্লকের রামনগর ১ পঞ্চায়েতের আঁইশতলা গ্রাম। মাঝ দিয়ে বয়ে গিয়েছে চূর্ণী নদী। তার উপরে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে এই সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতি দিন দক্ষিণ থেকে উত্তরবঙ্গ বা উল্টো পথে অজস্র দূরপাল্লার বাস, লরি, গাড়ি এই সেতু পেরোয়। রানাঘাট হয়ে বা ছুঁয়ে যাওয়া ৫০টি রুটের বাসও চলে। মোটরবাইক, সাইকেল তো আছেই। চব্বিশটা ঘণ্টাই ব্যস্ত থাকে চূর্ণী সেতু। যানজট হলে গাড়ির সার জমে যায় কয়েকটি সেতুর উপরে। সেই সময়ে আরও বেশি চাপ পড়ে। কিছু দিন হল, যানজট সামলাতে সেতুতে দু’জন সিভিক ভল্যান্টিয়ার মোতায়ন করেছে পুলিশ। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

বছর দুয়েক আগে দুর্বল রেলিং ভেঙে চূর্ণীতে পড়ে গিয়েছিল একটি লরি। কারও মৃত্যু না হলেও চালক ও খালাসি আহত হন। রেলিঙের ওই ভাঙা জায়গায় বাঁশের চটা বেঁধে দেওয়া হয়। সেই ভাবেই চলতে থাকে মাসের পর মাস। পরে অন্য দিকের রেলিংও ভাঙে। এই নিয়ে হইচই শুরু হলে রেলিং মেরামত করা হয়। কিছু দিন হল, সেতুর দু’দিকে কংক্রিটের গার্ডওয়াল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার জেরে ফুটপাথ বলে কার্যত কিছু আর অবশিষ্ট নেই।

পূর্ত দফতরের (রাষ্ট্রীয় সড়ক) এগজ়িকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার রঞ্জন কুমার বলেন, “সেতুটির রেলিঙের অবস্থা ভাল ছিল না। তাই সেখানে গার্ডওয়াল তৈরি করা হয়েছে।” আর, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের কৃষ্ণনগর প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিটের প্রকল্প অধিকর্তা সুগত সাহা দাবি করেন, সম্প্রতি কেন্দ্রের একটি প্রতিনিধি দল জাতীয় সড়কের উপরে সেতুগুলি পরিদর্শন করে জানিয়েছে, এখানকার কোনও সেতুই বিপজ্জনক অবস্থায় নেই। চূর্ণী সেতুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর কথায়, ‘‘ছোটখাটো কিছু সমস্যা আছে, সে দিকে ইতিমধ্যে নজর দিয়েছি।” 

পথকর্তাদের দাবি সত্যি হলে তো ভালই। তবে সাম্প্রতিক কালে কোনও সেতু ভেঙে পড়ার আগেই তা নিয়ে কারও সতর্কবাণী ছিল না, এই যা!