নদী, খাঁড়ি, বাদাবন, কুমির আর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার— সব মিলিয়েই সুন্দরবন। কিন্তু এই রোমাঞ্চকর সৌন্দর্যের ভূমি থেকে প্রায়ই বাঘের আক্রমণে মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর পাওয়া যায়।
কুলতলি ব্লকের বাসিন্দা রেখা দেবীর অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে তেমনই এক ঘটনা। সুন্দরবনের হাজার হাজার মানুষ আজও রেখা দেবীর পরিবারের মতো দৈনন্দিন জীবিকার জন্য জঙ্গল এবং নদীর উপরে নির্ভরশীল। বৈধ এবং অবৈধ, দু’ভাবেই। কেউ মাছ বা কাঁকড়া ধরেন, কেউ মধু সংগ্রহ করেন, কেউ বা জ্বালানি-কাঠ কুড়োতে বনে ঢোকেন। মহিলারা ভাটার সময় খাঁড়িতে কোমরজলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মীন সংগ্রহ করেন সামান্য রোজগারের আশায়। আর সেই সব পরিস্থিতিতেই অনেক সময় বাঘের মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। আবার কখনও গ্রামে বাঘ ঢুকে পড়লে বাড়ে আতঙ্ক, ক্ষোভ আর উত্তেজনা। সুন্দরবনে মানুষ আর বাঘের সম্পর্কের ইতিহাস প্রধানত সংঘাতের। এই জটিল সমস্যার সমাধান খুবই বিরল। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা অন্য রকম পথ দেখাচ্ছে।
‘ক্যান সেফার লাইভলিহুড প্র্যাকটিসেস স্ট্রেনদেন হিউম্যান-টাইগার কো-এক্সিসটেন্স ইন সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজ়ার্ভ, ইন্ডিয়া?’ শীর্ষক গবেষণাটি যৌথ ভাবে পরিচালনা করেছে ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া, লোকমাতা রানি রাসমণি মিশন এবং টেরি স্কুল অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ়। কুলতলি ব্লকের তিনটি গ্রামে সম্পূর্ণরূপে বন-নির্ভর পরিবারগুলিকে ছাগল আর পোলট্রি বা মুরগি পালনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে উন্নত জ্বালানি-সাশ্রয়ী রান্নার চুলা। পশুপালন এবং চুলার সঠিক নির্মাণ ও ব্যবহারের জন্য দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।
উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে মানুষের কাঠ সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে যাওয়ার হার প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। কাঠ সংগ্রহ কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। “আমাদের আগে সপ্তাহে পাঁচ-সাত বার কাঠ কুড়োতে জঙ্গলে যেতে হত। এখন দু’-তিন বারেই কাজ হয়ে যায়”— জানালেন রেখা দেবী। চুলা ব্যবহারের ফলে শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়েছে। রেখা দেবী বলছেন, তাঁর ও তাঁর ছেলেমেয়ের কাশি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগে সর্বদা কাশাটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। উন্নত চুলা কম কাঠ ব্যবহারের সঙ্গে কম ধোঁয়াও সৃষ্টি করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েক জন মহিলা নিজেরাই উন্নত চুলা তৈরি করতে শুরু করেছেন গ্রামের চাহিদা মেটাতে। তা ছাড়া, পশুপালনের ফলে পরিবারের মাসিক আয় বেড়েছে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত। মহিলাদের হাতে থাকছে সেই অর্থ। তাঁরা আর্থিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতায়নের একটি উপায় দেখতে পাচ্ছেন।
জীবিকার এই রূপান্তরের ফলে প্রকল্পভুক্ত গ্রামগুলিতে বছরে বাঘে-মানুষে সংঘাতের হার প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ, কমেছে মৃত্যু, কমেছে আতঙ্ক, শোক। বাঘের প্রতি মানুষের মনোভাব ও সম্পর্কেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। কুলতলি ব্লকে ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গ্রামে বাঘ ঢোকাকে কেন্দ্র করে জনরোষের অন্তত চারটি ঘটনা ঘটে। সেখানে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জনরোষের ঘটনা কমে দাঁড়ায় মাত্র একটিতে। “এখন গ্রামে বাঘ ঢুকলে স্থানীয় মানুষ বনবিভাগ আর আমাদের দলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঘের উদ্ধারকাজে সাহায্য করছে”— জানালেন প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দলের ‘বাঘ বন্ধু’ অশোক হালদার।
সুন্দরবনে বহু পরিবার বিপজ্জনক আর অনিশ্চিত জীবিকার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে। পেটের টানে মানুষ ঝুঁকি নিয়েও বনে যান। তাই ‘জঙ্গলে যাওয়া নিষিদ্ধ’ বা ‘বাঘ বাঁচাও’ দর্শনের সাহায্যে এমন সমস্যার সমাধান প্রায় অসম্ভব। প্রয়োজন একটি বিকল্প দর্শন ও পন্থার। একই কথা বলছেন অশোক হালদারও— যদি মানুষ ঘরেই নিরাপদ এবং স্থায়ী জীবিকার সুযোগ পান, তা হলে তাঁরা নিজেরাই বন-নির্ভরতা কমাতে আগ্রহী হবেন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন রেখা দেবীর মতো গ্রামের মহিলারা। তাঁরাই উদ্যোগ করেছেন, শিখেছেন, অন্যদের শিখিয়েছেন এবং সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের দর্শন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। বাঘের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বাসস্থান। একই সঙ্গে বায়োস্ফিয়ার রিজ়ার্ভ, জাতীয় উদ্যান এবং ব্যাঘ্র প্রকল্পের অন্তর্গত সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কাজেই সুন্দরবন কেবল ভারতের বা পশ্চিমবঙ্গের সম্পদ নয়, গোটা বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য আমাদের রক্ষা করে। আয়লা বা আমপানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের মারাত্মক প্রভাব কম করে। অসংখ্য বিরল প্রাণীর আশ্রয় এই বাদাবন। কিন্তু সুন্দরবনকে সুসংরক্ষিত রাখতে চাইলে কেবল বাঘ সংরক্ষণের কথা ভাবলে বোধ হয় চলবে না। বন-নির্ভর মানুষদের জীবিকার নিরাপত্তার কথাও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন। আজ যখন প্রায় সর্বত্র মানুষ আর বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর প্রতি মানুষের বিদ্বেষ বাড়ছে, তখন সুন্দরবনের এই অভিজ্ঞতা নতুন আশা দেখাচ্ছে।
বাঘের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ইতিহাস প্রধানত সংঘাতের হলেও, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক হতে পারে সহাবস্থানের।
ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে