অসমের অর্থনীতি ধুঁকছে। এই অভিযোগ বিরোধীদের নয়, স্বয়ং কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের। গত ২৫ মে প্রকাশিত রিপোর্টে সিএজি জানিয়েছে, বিপুল ঋণ, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং পর্যাপ্ত লগ্নির অভাবে রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য উদ্বেগজনক। পাশের রাজ্য মণিপুর গত তিন বছর ধরে অগ্নিগর্ভ। রাজনৈতিক অস্থিরতা সেখানে শুধু সামাজিক ক্ষতই তৈরি করেনি, অর্থনীতিকেও গভীর ভাবে আঘাত করেছে। ত্রিপুরার অবস্থা তুলনামূলক ভাবে কিছুটা ভাল। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে রাজ্যটির সাফল্যের কথা উঠে এসেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাও অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সেখানে এখনও অন্ধকার কাটেনি। যুবসমাজের মধ্যে পরিযাণ প্রবল।
এই তিনটি রাজ্যের একটি মিল রয়েছে। প্রত্যেকটিতেই তথাকথিত ‘ডাবল এঞ্জিন’ সরকার চলছে। অর্থাৎ কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের শাসন। অসমে বিজেপি এক দশক ধরে ক্ষমতায়, মণিপুরে প্রায় নয় বছর, ত্রিপুরায় আট বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট— কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকলেই অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
পশ্চিমবঙ্গের ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশে ‘ডাবল এঞ্জিন’ শব্দবন্ধটি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলার মানুষকে বলা হয়েছে, কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সাযুজ্য তৈরি হলেই উন্নয়নের গতি বহু গুণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে এ কথাও সত্য, গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গে সম্পদ পুনর্বণ্টনভিত্তিক যে অর্থনৈতিক মডেল গড়ে উঠেছিল, তার উপরে মানুষের আস্থা ক্রমশ কমেছে। অসংখ্য ভাতা, নগদ সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প রাজনৈতিক ভাবে কার্যকর হলেও, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রশ্নে সেগুলি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। দুর্নীতির প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ সরিয়ে রাখলেও এই বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন। এই কারণেই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি। অবশ্যই চাইব সরকার সেই চ্যালেঞ্জ সফল ভাবে মোকাবিলা করুক। কিন্তু সেই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ‘ডাবল এঞ্জিন’ হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সাযুজ্যের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন চলছে। কিন্তু তার পরেও রাজ্যের বহু পঞ্চায়েত ও পুরসভা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় পরিকাঠামো নির্মাণ, নিকাশি, পানীয় জল বা নগর পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া কোনও সরকারই ঠিকঠাক কাজ করতে পারে না। অর্থাৎ বাস্তবে ‘ডাবল এঞ্জিন’-এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ত্রিস্তরীয় গণতন্ত্রের কাঠামো। বন্দর, রেল বা জাতীয় সড়কের মতো ক্ষেত্রে কেন্দ্র প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু স্থানীয় রাস্তা, জমি, পুর-পরিষেবা বা গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূল স্তরের সহযোগিতা অপরিহার্য।
তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিজেপি পঞ্চায়েত এবং পুরসভাগুলিতেও প্রভাব বিস্তার করল। অসমের মতো পরিস্থিতি তৈরি হল। তা হলেও কি অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত? উত্তর সম্ভবত না। কারণ অসমের অভিজ্ঞতাই দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ অর্থনৈতিক সমস্যার স্বয়ংক্রিয় সমাধান নয়। ডাবল নয়, ট্রিপল এঞ্জিন সরকার থাকলেও উন্নয়নের মৌলিক বাধাগুলি থেকে যেতে পারে।
আসলে কেন্দ্র এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সাযুজ্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান শর্ত নয়। আজকের তামিলনাড়ু বা কেরলের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। নরেন্দ্র মোদীর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ের গুজরাতও একই উদাহরণ। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি রাজনৈতিক সমরূপতার কারণে হয়নি। হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, দক্ষ প্রশাসন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে।
একটি অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে গেলে শ্রমের জোগান এবং চাহিদা— দুই দিকেই নজর দিতে হয়। অপুষ্ট, স্বল্পদক্ষ এবং অপর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত শ্রমশক্তি নিয়ে কোনও সরকারই অর্থনৈতিক অলৌকিকতা ঘটাতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে। আর এই ধরনের বিনিয়োগের ফল এক বা দুই বছরের মধ্যে আসে না। অনেক সময় এক দশক বা তারও বেশি সময় লাগে।
এখানেই আবার যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের গুরুত্ব সামনে আসে। আগামী দশ বা পনেরো বছরে কেন্দ্র বা রাজ্যে কারা ক্ষমতায় থাকবে, তা আজ নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি এমন হওয়া উচিত, যাতে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নষ্ট না হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বলতে শেষ পর্যন্ত সেটাই বোঝায়। সেই কারণেই ‘ডাবল এঞ্জিন’-এর প্রচার আকর্ষণীয় শোনালেও অর্থনীতির ভাষায় তার গুরুত্ব সীমিত।
শ্রমের চাহিদার প্রশ্নে ছবিটা আরও স্পষ্ট। বিনিয়োগকারীরা কোনও রাজ্যে রাজনৈতিক স্লোগান শুনে আসেন না। তাঁরা আসেন লাভের সম্ভাবনা দেখে। সরকার করছাড় দিতে পারে, জমি দিতে পারে, বিদ্যুতে ভর্তুকি দিতে পারে। কিন্তু বাজার না থাকলে, দক্ষ শ্রমিক না থাকলে, পরিকাঠামো না থাকলে, শিল্প-পরিবেশ না থাকলে, সেই সুবিধার বিশেষ মূল্য থাকে না।
আজ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে বিনিয়োগ টানার প্রতিযোগিতা তীব্র। গুজরাত, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ— প্রত্যেকেই শিল্প ও পরিষেবা খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সক্রিয়। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে হবে। শুধু কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা সেই কাজ করতে পারবে না।
তার উপরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও খুব অনুকূল নয়। বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ আগের মতো নেই। দেশীয় পুঁজির জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ আনতে হলে রাজ্যকে নিজের শক্তির জায়গাগুলি নতুন করে চিহ্নিত করতে হবে।
এখানেই পশ্চিমবঙ্গের অতীতসমস্যা সামনে আসে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের একাংশ রাজ্য সম্পর্কে সতর্ক থেকেছেন। রাজনৈতিক সংঘাত, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্থিরতা তার বড় কারণ। নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে এই ধারণা বদলানো, প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে তা সম্পূর্ণ সফল হয়নি। তৃণমূল সরকারও সেই বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি।
নতুন সরকার যদি কেন্দ্রের সহযোগিতায় প্রাথমিক ভাবে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতেও পারে, তা হলেও একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক মডেলের ভিত্তি কী হবে? অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, না সম্পদ পুনর্বণ্টন? বাস্তবে অবশ্য এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যদি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য এক সঙ্গে অনুসরণ করা হয়, তা হলে দীর্ঘ মেয়াদে নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক দিক থেকে গুজরাত, মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর সমকক্ষ নয়। কিন্তু সে অসম, ত্রিপুরা বা মণিপুরও নয়। এই রাজ্যের মানবসম্পদ, শিক্ষাগত পরিকাঠামো এবং ঐতিহাসিক নগর অর্থনীতির একটি স্বতন্ত্র ভিত্তি রয়েছে। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সম্ভবত পরিষেবা ক্ষেত্রে।
তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, আর্থিক পরিষেবা, সৃজনশীল শিল্প— এই ক্ষেত্রগুলিতে পশ্চিমবঙ্গ এখনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। রাজ্যের যে মানবসম্পদ রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে বিপুল পুঁজি ও কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। দুর্নীতি ও অপশাসনের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে।
আশা করা যায়, নতুন সরকার অন্তত এই ক্ষেত্রগুলিতে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি করবে না। কারণ অর্থনীতির এক সহজ সত্য রয়েছে: জ্বালানি না থাকলে একটি ইঞ্জিনও চলে না, ‘ডাবল এঞ্জিন’ দূরের কথা। রাজনৈতিক স্লোগান নির্বাচন জয়ে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক সাফল্যের কোনও শর্টকাট নেই। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ ও নীতিগত স্থিরতার বিকল্প এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসই আমাদের তা বার বার মনে করিয়ে দেয়।
ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স বিভাগ, কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি, ইংল্যান্ড
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে