সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাংলাই দিয়েছিল দেশের প্রথম মহিলা চৌকিদার’ (রবিবাসরীয়, ২৬-৪) শীর্ষক প্রবন্ধে হুগলি জেলার দক্ষ চৌকিদার বৈকুণ্ঠ সর্দারের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর অসামান্য সাহস ও কর্মদক্ষতার কাহিনি খুব সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে। অসুস্থ চৌকিদার স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানোর তাগিদে তিনি তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের কাছে চৌকিদারির কাজের জন্য আবেদন জানান। পুরুষশাসিত এই পেশায় তিনি শুধু চাকরি অর্জনই করেননি, দেশের প্রথম মহিলা চৌকিদার হিসাবে ইতিহাসের পাতায় নিজের স্থানও নিশ্চিত করেছেন। ইতিহাসের অন্তরাল থেকে এই বিস্মৃত কাহিনি পাঠকদের সামনে তুলে ধরে লেখক তাঁদের সমৃদ্ধ করেছেন।
এর তাৎপর্যটি অতি গভীর। এটি কেবল এক নারীর কর্মসংস্থানের গল্প নয়, বরং উনিশ শতকের বাংলা সমাজে পরিবর্তনের স্রোতের এক বাস্তব প্রকাশ। সেই সময়েই এক দিকে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলনের মতো সামাজিক সংস্কারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অন্য দিকে কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় চিকিৎসাশিক্ষায় প্রবেশ করে নারীর নতুন পরিচয় নির্মাণ করছেন। এই বৃহত্তর জাগরণের আবহেই দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর কর্মজীবনে প্রবেশ এক অন্য মাত্রা যোগ করে। তিনি কোনও বক্তৃতা বা তত্ত্বের আশ্রয় নেননি; কাজের মধ্য দিয়েই দেখিয়েছেন নারীর সক্ষমতা। গ্রামের নিরাপত্তা রক্ষা, রাতের পাহারা, বিপদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সুযোগ পেলে নারীও সমান দক্ষ। নারীস্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের বীজ বপন হয়েছিল ঠিক এই ভাবেই।
সেই সময়কার সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিবেশও এই প্রসঙ্গে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার পরিকাঠামো আজকের মতো সুদৃঢ় ছিল না; তস্কর, দস্যু ও নানা দুষ্কৃতীর আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা হয়ে উঠেছিল এক অপরিহার্য দক্ষতা। ফলে শুধু পুরুষরাই নয়, অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারে নারীরাও লাঠিচালনা, তরোয়াল চালনা প্রভৃতি কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠতেন। এটি কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না, বরং সময়ের দাবিতেই গড়ে ওঠা এক বাস্তব অভ্যাস। সেই প্রেক্ষাপটে দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর দক্ষতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি শুধু এই কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন তা-ই নয়, সেই দক্ষতাকে পেশাগত দায়িত্বে রূপান্তরিত করে সমাজের স্বীকৃতিও অর্জন করেছিলেন। তাঁর সাফল্য তাই ব্যক্তিগত সাহসের পাশাপাশি এক বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতারও প্রতিফলন চিহ্নিত করে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নারীস্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের কথা বলি, তখন দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর এই কাহিনি গভীর অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। নিজের কাজের মধ্য দিয়েই যে পরিবর্তন আনা যায়, তা তিনি বহু আগেই প্রমাণ করে গিয়েছেন। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার, ইতিহাসের আলোয় যাঁদের নাম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তাঁদের পিছনে থেকে যায় আরও বহু অজানা নারীর সংগ্রামের কাহিনি, যাঁরা হয়তো সে ভাবে নথিভুক্ত হননি, কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের ভিত গড়ে দিয়েছেন। দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর জীবন সেই সব ইতিহাসেরই এক শক্তিশালী প্রতীক, যা আমাদের শুধু অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের দিশাও দেখায়। তাই, দ্রবময়ী চণ্ডালিনীর হাতের ওই লাঠি শুধু অস্ত্রমাত্র নয়, তা ছিল ইতিহাস লেখার কলমও।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, উত্তর ২৪ পরগনা
বিজ্ঞানচিন্তা
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিজ্ঞানচিন্তা অসাধারণ গভীরতা সম্পন্ন। শৈশব থেকেই তিনি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। বালক পত্রিকায় ‘বৈজ্ঞানিক সংবাদ’ লিখে তিনি বিজ্ঞানচর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ করেছিলেন। ৭৬ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন বিশ্বপরিচয় যা উৎসর্গ করেছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। এই গ্রন্থে ‘পরমাণুলোক’, ‘নক্ষত্রলোক’, ‘সৌরজগৎ’ প্রভৃতি অধ্যায়ের মাধ্যমে তিনি জটিল বিজ্ঞানের বিষয়কে সহজ ও সাবলীল বাংলায় ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনেও বিজ্ঞানের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব, আইনস্টাইনের সঙ্গে দার্শনিক আলোচনা এবং শ্রীনিকেতনে কৃষি গবেষণার উদ্যোগ— সবই তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয়। বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে লিখেছিলেন, “শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে না হোক, বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক।”
অবৈজ্ঞানিকতা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আমাদের মনকে যুক্তিনিষ্ঠ ও মুক্তচিন্তার পথে এগিয়ে দেয়। এমন বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
প্রদীপ চক্রবর্তী, মনোরা পিক, নৈনীতাল
নির্বাচনের পরে
প্রকৃতির মতো গণতন্ত্রেরও নিজস্ব ঋতু আছে— তার নাম নির্বাচন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফিরে আসা এই নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি গণতন্ত্রের প্রাণ, শক্তি ও আত্মার প্রকাশ। জনগণের মতামত প্রকাশের এই অধিকারই গণতন্ত্রকে জীবন্ত ও গতিশীল রাখে।
নির্বাচনের সময় সর্বত্র চোখে পড়ে দেওয়াল লিখন, পোস্টার, ব্যানার, দলীয় পতাকা, ব্যঙ্গচিত্র ও মাইকিং-এর সমাহার। প্রচারের এই ধুমধাম কেবল রাজনৈতিক দলের প্রদর্শনীর মাধ্যম নয়, এটি গণতান্ত্রিক অধিকারেরও এক বহিঃপ্রকাশ। তবে এই উৎসবমুখর পরিবেশের পরেই সামনে আসে কিছু অস্বস্তি। অনেক পতাকা মাটিতে গড়িয়ে পড়ে, যা একটি দলের প্রতীক হিসাবে তার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। একটি পতাকা কেবল কাপড় নয়; এটি একটি আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রতীক। তাই নির্বাচন শেষে প্রতিটি দলের উচিত ব্যবহৃত পতাকা ও প্রচারসামগ্রী সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা। এতে যেমন অর্থের সাশ্রয় হবে, তেমনই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয়ও মিলবে।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তখন আর কোনও নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধি নন; তিনি সমগ্র রাজ্যের মানুষের প্রতিনিধি। একটি সরকার কখনওই কেবল একটি দলের সরকার নয়; এটি সমগ্র জনগণের সরকার। ভারতের সংবিধানে ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’-র যে নীতি স্বীকৃত, তার আলোকে সকল নাগরিকের প্রতি সমান আচরণ করাই একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য।
প্রকৃত পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। এটি মানসিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণের পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনের পর শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হল, অথচ এলাকার নর্দমা সংস্কার বা রাস্তার আলোর পরিস্থিতির উন্নতি হল না— তা হলে সেই পরিবর্তন মানুষের জীবনে বাস্তব কোনও প্রভাব ফেলে না; বরং হতাশাই বাড়ায়।
অতএব, আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। গণতন্ত্র কেবল ভোটদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন আচরণ, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। গণতন্ত্রের উৎসব কেবল নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী দায়িত্বশীল আচরণে। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, স্বচ্ছ প্রশাসন ও সমানাধিকারের চর্চার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ।
প্রশান্তকুমার ঘোষ, চন্দ্রকোনা, পশ্চিম মেদিনীপুর
পুরনো রীতি
‘ঠাকুর তুমি ভোটেশ্বরী’ (কলকাতার কড়চা, ২৫-৪) শীর্ষক লেখাটি ভাল লাগল। এক সময়ের সঙ্গে অন্য সময়ের তুলনা করা কঠিন। তবু, রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু ধারা আজও বহমান। যতীন্দ্রমোহন দত্ত বা যমদত্তের লেখা পড়লে জানা যায়, কী ভাবে তৎকালীন রাজনৈতিক পুরোধারা একে অপরের সভা পণ্ড করার চেষ্টা করতেন।
দীপঙ্কর সান্যাল, মধ্যমগ্রাম, উত্তর ২৪ পরগনা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে