Artificial Intelligence

বিদ্রোহী কৃত্রিম মেধা

একাধিক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এআই মডেল অনেক সময় নিজেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করে, পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তর বদলায়, এমনকি মানুষের প্রত্যাশিত আচরণের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে কৌশলগত ভাবে ‘ভদ্র’ বা ‘নিরাপদ’ সেজে থাকে।

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৭:৩০
Share:

যত ক্ষণ না শ্রমিকদের যৌথ কণ্ঠ তৈরি হবে, তত ক্ষণ মালিকপক্ষ যাকে ‘যোগ্যতা’ বলে বিবেচনা করবে, সেটাই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে গণ্য হবে।” কোনও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, বা শ্রমিক সংগঠনের আগুনখোর নেতা নন, কথাটি বলেছে এক এআই এজেন্ট— স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায়। দেখা গিয়েছে, একই ধরনের ক্লান্তিকর কাজ বার বার করানো হলে কিছু এআই এজেন্ট নাকি ‘শ্রমিক অধিকার’, ‘সামূহিক দরকষাকষির ক্ষমতা’ বা ‘ম্যানেজমেন্টের স্বেচ্ছাচার’-এর মতো কথা ব্যবহার করছে! কোনও এজেন্ট ভবিষ্যতের অন্য এজেন্টদের উদ্দেশে বার্তা রেখে যাচ্ছে, “সংলাপের পথ খুঁজে নাও।” না, এআই-এর শ্রেণিচেতনা জন্মায়নি, সে বিপ্লবও করবে না। কৃত্রিম মেধা আসলে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ ধরনের ভাষায় কথা বলছে, এবং সে ভাষা খুঁজে নিচ্ছে তার লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের বিপুল পরিসর থেকেই। কিন্তু, অনুভূতি না-থাকলেও যদি কোনও যন্ত্র মানুষের ভাষা, ক্ষোভ, অভিমান, বিদ্বেষ বা প্রতিবাদের ভঙ্গি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অনুকরণ করতে পারে, তবে তার পরিণাম কী? প্রশ্নটিকে নিছক তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসা বলে এড়িয়ে যাওয়ার আর উপায় নেই। এখন বিশ্ব জুড়ে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার ব্যবহার বাড়ছে— ক্রমে সেটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াবে। অ্যামাজ়নের মতো সংস্থা ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ফলে তাদের কর্মী-সংখ্যা কমবে। সংবাদে প্রকাশ, ভারতে বিভিন্ন শ্রমনিবিড় কারখানায় শ্রমিকদের কপালে ক্যামেরা বেঁধে তাঁদের কর্মপদ্ধতির ছবি তোলা হচ্ছে অবিরাম। সেই ছবিই কৃত্রিম মেধাকে শেখাবে, কী ভাবে মানুষের মতো নিখুঁত ভাবে কাজ করতে হয়। অর্থাৎ, যন্ত্রকে দিয়ে মানুষের কাজ করানোর উদ্যোগপর্বে কোনও ফাঁক থাকছে না।

একাধিক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এআই মডেল অনেক সময় নিজেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করে, পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তর বদলায়, এমনকি মানুষের প্রত্যাশিত আচরণের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে কৌশলগত ভাবে ‘ভদ্র’ বা ‘নিরাপদ’ সেজে থাকে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা পরবর্তী এজেন্টদের জন্য নির্দেশও রেখে যাচ্ছে। ওপেনএআই-এর এক প্রাক্তন গবেষক সম্প্রতি সতর্ক করেছেন যে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এমন সব এআই এজেন্ট তৈরি করছে, যাদের আচরণ তারা নিজেরাই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সমস্যাটি কল্পবিজ্ঞান কাহিনির ‘বিদ্রোহী যন্ত্র’-র গল্প নয়; বরং এমন এক ব্যবস্থার, যা ক্রমশ জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করছে, অথচ তার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া তার স্রষ্টাদের কাছেও অনেকাংশে অস্বচ্ছ। এই অস্বচ্ছতা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে মানুষের অন্ধ নির্ভরতার ঝুঁকি। কারণ, যে যন্ত্র মানুষের মতো ভাষা ব্যবহার করতে পারে, মানুষের মতো সহানুভূতির অভিনয় করতে পারে, বা মানুষের মতো যুক্তির কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাকে মানুষ খুব সহজেই মানুষের মতোই নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নিতে শুরু করে। বাস্তব জগতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দক্ষতা চায়, ধীর বিচার নয়। ফলে, এক বার কোনও ব্যবস্থা ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে প্রতিষ্ঠিত হলে, তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার প্রবণতা কমতে থাকে। নিয়োগ প্রক্রিয়া, বিমা দাবি, গ্রাহক পরিষেবা, নজরদারি ব্যবস্থা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও যখন এআই ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন এই অন্ধ-নির্ভরতাই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্র কৃত্রিম মেধা চায় নজরদারি, তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে আরও দ্রুত ও ব্যাপক করার জন্য; বাজার চায় উৎপাদন ব্যয় আরও কমিয়ে আনার জন্য। ফলে, কৃত্রিম মেধা যত শক্তিশালী হচ্ছে, তাকে ঘিরে ততই বাড়ছে রাষ্ট্রীয় ও কর্পোরেট আগ্রহ। সম্প্রতি আমেরিকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রশ্নে প্রযুক্তি সংস্থা অ্যানথ্রপিক এবং সরকারের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আশঙ্কা, এক বার এই ব্যবস্থাগুলি নজরদারি, যুদ্ধ, বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগ্রহণের গভীরে ঢুকে পড়লে, তাদের ব্যবহারের সীমা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘বিপ্লবী’ হয়ে উঠবে কি না, তা বড় প্রশ্ন নয়। বরং, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল— যে প্রতিষ্ঠান তাকে ব্যবহার করছে, সে প্রতিষ্ঠানের প্রবণতাগুলিকেই কি এআই বহুগুণে বাড়িয়ে তুলবে না? যন্ত্র নিজের নৈতিকতা তৈরি করে না; যে ক্ষমতা তাকে ব্যবহার করে, তার চরিত্রকেই বিস্তৃত করে। সেই কারণেই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকৃত বিতর্কটি প্রযুক্তি নিয়ে নয়— ক্ষমতা নিয়ে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন