সম্প্রতি ইলাহাবাদ হাই কোর্টের কিছু ‘বেসুরো’ কথা দেশনাগরিকের কানে এসেছে। উত্তরপ্রদেশের পুলিশ আধিকারিকদের ভর্ৎসনা করে ইলাহাবাদ হাই কোর্ট বলেছে, সে রাজ্যের পুলিশ যদি সংবিধানকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখায়, তাতে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা কোনও রাজনৈতিক প্রয়োজনের কাছে বন্দি থাকতে পারে না, শাসনের দায়বদ্ধতা প্রথমত ও শেষত আইন ও সংবিধানের কাছে। কথাটি নতুন নয়, বহু পুরনো। তবু কিনা, কথাটি এই ভারতে অত্যন্ত ‘বেসুরো’। কেননা এত দিনে ভারতবাসী মাত্রেই জেনে নিয়েছেন, এবং মেনেও নিয়েছেন যে, সংবিধান, আইনকানুন, ইত্যাকার সবই কার্যক্ষেত্রে ক্ষমতার কাছে বাঁধা। যিনি থাকেন ক্ষমতায়, তিনিই সর্বগ্রাসী, এবং সেই করালগ্রাসের সামনে আইনবিধি সবই তুচ্ছ। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ প্রশাসনের একের পর এক আইনবহির্ভূত ক্ষমতার অপব্যবহার, এনকাউন্টার হত্যা, বলপূর্বক উচ্ছেদ, অকারণ গ্রেফতার, সরকারের অপছন্দের লোকদের বিরুদ্ধে গুন্ডাদমন আইনের লাগাতার ব্যবহার— সমগ্র ভারতের প্রেক্ষিতেই একটি নতুন ‘মডেল’ তৈরি করেছে। এ দিকে মাননীয় বিচারপতিরা বললেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কারও বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এফআইআর দায়ের করা, খেয়ালখুশি মতো প্রতিরোধমূলক আটক আইন প্রয়োগ করা— এ সব অন্যায়, অসাংবিধানিক। আদালতের এই মতামত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা অধুনা অন্যান্য রাজ্যেও এখন ‘উত্তরপ্রদেশ মডেল’ কথায়-কথায় উঠে আসে। কখনও বিজেপি নেতৃত্বের মুখে, অনুকরণার্থে। কখনও বিজেপি-বিরোধী সমালোচকদের মুখে, সমালোচনার্থে।
ঠিক এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও আজ ইলাহাবাদ হাই কোর্টের সতর্কবাণীটির বিশেষ গুরুত্ব। সদ্যপ্রাক্তন তৃণমূল সরকারের দুর্নীতিনিমজ্জিত ও সামন্ততান্ত্রিক যথেচ্ছাচার ও বলপ্রয়োগ থেকে সবে মুক্তি পেয়ে এই রাজ্য পুনরায় আশঙ্কিত হয়ে পড়েছে, দেখছে নতুন সরকারের নতুন ধারার শক্তিপ্রদর্শনের নমুনা। সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিস্মৃত হয়ে শাসক কী ভাবে নিজেদের ধারার শাসন সবলে সমাজের উপর প্রতিষ্ঠা করেন, তার নমুনা। এ রাজ্যে এখন পুলিশ ও তার সর্বাধিক দমনকারী বাহিনী র্যাফ-এর সহায়তায় বুলডোজ়ার তন্ত্র যে ভাবে কাজ করছে, তাতে বলা যেতেই পারে যে ‘উত্তরপ্রদেশ মডেল’ এখন শাসক দলের পরিচালনায় পশ্চিমবঙ্গেও মহাসমারোহে সক্রিয়।
সদ্যঘটিত হকার উচ্ছেদ কাজটির কথাই ধরা যাক। রাজ্যব্যাপী হকার সমস্যা একটি গুরুতর বিষয়, তাকে সামান্য বা সহজ বলা চলে না। হকারের জায়গা দখল বেআইনি, আবার আইনের পথে তা সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক বাধা। গত কয়েক দশক ধরে বাম ফ্রন্ট ও তৃণমূল আমলে হকার সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকার উপর্যুপরি ব্যর্থ। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, রাস্তার হকারদের অধিকার বিষয়ে একটি আইন তৈরি হয় ২০১৪ সালে— যা কিন্তু ছিল কেন্দ্রীয় আইন। পশ্চিমবঙ্গে সেই অনুসারে বিধি তৈরি হয় ২০১৮ সালে। হকারদের নথিভুক্তি, তাঁদের জায়গা নির্ধারণ, উচ্ছেদের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন ও নিয়ন্ত্রণ— এ সবের বিধিব্যবস্থাও বিবেচিত হয়। তা সত্ত্বেও গত কয়েক দশক প্রশাসন ও পুরসভার নাকের ডগা দিয়েই লাগাতার নিয়ম লঙ্ঘন চলেছে। সেই সুদীর্ঘকালীন সরকারি ব্যর্থতার নিরাময় নিশ্চয় অতি জরুরি। নতুন সরকার সে বিষয়ে ভাবছে, তা সুসংবাদ। কিন্তু অসুখ নিরাময়ের জন্য এ ভাবে পুলিশবাহিনীর আক্রমণ-সহ বুলডোজ়ার চালানোই কি একমাত্র ‘ওষুধ’? পুনর্বাসনের ভাবনা ছাড়া এত মানুষের জীবনজীবিকায় এমন আকস্মিক আঘাত কি অমানবিক নয়? প্রশাসনের ক্ষমতাদর্প থেকে বেরিয়ে হকার সঙ্কট সমাধানের জন্য দরকার ছিল ধৈর্যসহকারে শৃঙ্খলাপূর্ণ নীতি প্রণয়ন। হয়তো ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গিয়েছে। বুলডোজ়ার মডেল এসে শৃঙ্খলা ও মানবিক সমাধানের দায়কে ভাসিয়ে দিয়েছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে