সম্প্রতি ‘পিদ্দী’ ছবিতে জাহ্নবী কপূরের চরিত্র নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দর্শকের একাংশের মত, অভিনেত্রীর চরিত্রকে নামমাত্র গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আসলে তাঁকে ছবিতে যৌনতার প্রতীক হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রামের মহিলার চরিত্রে জাহ্নবী। অথচ তাঁর পোশাক ও তাঁকে যে ভাবে ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে তা ভীষণই ‘শরীরসর্বস্ব’ বলে অভিযোগ।
এই বিতর্কে সরাসরি মুখ খোলেননি জাহ্নবী। তবে এক অনুরাগীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের ‘স্ক্রিনশট’ প্রকাশ্যে আসার পরে স্পষ্ট হয়েছে, অসন্তুষ্ট জাহ্নবী নিজেও। এক জায়গায় জাহ্নবী আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, তাঁর অজান্তেই বক্ষবিভাজিকার শট নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ওরা বলবে, মুখের ‘ক্লোজ়আপ’ শট নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওরা নেবে বক্ষবিভাজিকার শট। কিছু বিশ্বাস করা যায় না।”
জাহ্নবী আগামী দিনে আর দক্ষিণের ছবিতে অভিনয় করবেন কি না, তা নিয়েও এ বার প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, এক জায়গায় তিনি বলেছেন, দক্ষিণের ছবিতে এ ভাবেই মহিলাদের তুলে ধরা হয়। তবে জাহ্নবী প্রথম নয়। এর আগেও দক্ষিণের চলচ্চিত্রজগৎ নিয়ে এমন অভিযোগ এনেছেন অন্য অভিনেত্রীরাও। মহিলাদের শরীরসর্বস্ব করে তোলার গতানুগতিক স্রোতের শিকারও হয়েছেন অনেকে। ক্যামেরার যৌন-উদ্দেশ্যমূলক দৃষ্টিকোণ এবং নারীদের সীমিত অভিনয়ের জায়গা— এই বিষয়গুলি নিয়ে মুখ খুলেছেন আরও অনেকে।
এই প্রসঙ্গে অনিবার্য ভাবে উঠে আসে ‘বেসিক ইনস্টিংক্ট’ ছবিতে শ্যারন স্টোনের কথা। ছবির মুক্তির পরে হলিউড অভিনেত্রী বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, ছবিতে তাঁকে পণ্যের মতো করে তুলে ধরা হয়েছে। দর্শক তাঁর অভিনয়ের চেয়ে তাঁর শরীর ও যৌন আবেদন নিয়েই বেশি আলোচনা করেছিল সেই সময়ে। তিনি জানিয়েছিলেন, ছবিতে বিখ্যাত জেরার দৃশ্যটি যে ভাবে দেখানো হয়েছিল, তাতে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর মতে, ছবির প্রচারের সময়েও তাঁকে এক জন দক্ষ অভিনেত্রী হিসাবে নয়, বরং একটি যৌনতার প্রতীক হিসাবে বেশি তুলে ধরা হয়েছিল।
তাপসী পন্নু: এই বিষয় নিয়ে স্পষ্ট ভাবে কথা বলেছিলেন তাপসী পন্নু। তেলুগু ও তামিল ছবিতে দীর্ঘ দিন কাজ করার পর তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের শরীরকে ভিন্ন ভাবে দেখানো হয়। দক্ষিণী ছবিতে প্রায়ই নাকি ‘নাভিদেশের শট’ বেশি করে দেখানো হয়, এই দাবি করেছিলেন তিনি। নাভির দৃশ্যের মাধ্যমে সেই নারী চরিত্রটিকে ‘অবজেক্টিফাই’ বা পণ্যায়িত করা হয়।
সাই পল্লবী: অভিনেত্রী বহু বার এই বিষয়ে কথা বলেছেন। শুধুমাত্র চাকচিক্যে ভরা চরিত্র, আইটেম নাচ বা নারীদের অপ্রয়োজনীয় ভাবে যৌনতার মোড়কে দেখানো হয়— এমন দৃশ্য এড়িয়ে চলেন। তাঁর মতে, নারী চরিত্রের নিজস্ব গুরুত্ব ও গভীরতা থাকা উচিত, শুধু নায়কের পাশে সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয়।
সমান্থা রুথ প্রভু: অভিনেত্রী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বাণিজ্যিক ছবিতে অনেক সময়ে পুরুষ দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি বার বার জোর দিয়েছেন শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রয়োজনীয়তার উপর। তাই নিজেও এমন চরিত্রই নির্বাচন করেন, যেখানে সেই মহিলার উপস্থিতি যথেষ্ট গুরুত্ব দাবি করে।
নয়নতারা: দক্ষিণী চলচ্চিত্রে ‘লেডি সুপারস্টার’ নামে পরিচিত নয়নতারা। যেখানে অভিনেত্রীদের শুধু ছবির সৌন্দর্যায়নের জন্যই ব্যবহার করা হয়, সেই সব ছবি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছেন। তাই ছবি নির্বাচনের সময়ে সতর্ক থাকেন তিনি। নারীকেন্দ্রিক ছবিই বেছে নেন অভিনেত্রী।
পার্বতী তিরুভোতু: গত কয়েক বছরে বেশ কিছু ছবির বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষী তকমা লেগেছে। সেই ধরনের ছবির সমালোচনা করেছেন পার্বতী। পর্বতী এ-ও প্রকাশ্যে বলেছিলেন, অভিনেত্রীদের শুধুমাত্র দর্শকের আকর্ষণের বস্তু হিসেবে দেখানো উচিত নয়। তাঁর স্পষ্ট দাবি, নারীদের আরও বাস্তব ও সম্মানজনক ভাবে উপস্থাপন করা দরকার।
রাধিকা আপটে: তামিল ও তেলুগু ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে রাধিকারও। অনেক সময় অভিনেত্রীদের উপর অপ্রয়োজনীয় ‘সৌন্দর্য’ দেখানোর চাপ থাকে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। বেশ কিছু অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি। কখনও তাঁকে ওজন বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। কখনও আবার স্তন ও নিতম্বের মাপ বড় করে দেখাতে ‘প্যাডেড’ অন্তর্বাস পরতে বলা হয়েছিল।
অনুষ্কা শেট্টী: ‘বাহুবলী’-খ্যাত অভিনেত্রী অনুষ্কাও এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তিনিও জানিয়েছিলেন যে, তিনি এমন চরিত্র পছন্দ করেন, যাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং ছবিতে গুরুত্ব থাকে। শুধু মাত্র ছবির ‘গ্ল্যামার’ বৃদ্ধির জন্য কোনও ছবি করতে চান না, এ-ও জানিয়েছিলেন তিনি।
রাশি খন্না: তিনি দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতের লিঙ্গবৈষম্য ও ‘অবজেক্টিফিকেশন’ নিয়ে কথা বলেছেন একাধিক বার। তাঁর মতে, অনেক সময়ে অভিনেত্রীদের প্রতিভার বদলে তাঁদের চেহারা বা গ্ল্যামারের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। এই ধরনের মানসিকতার বিরুদ্ধে নারীদের নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হয়। বড় বাজেটের থেকেও তাই ছবিতে চরিত্রের গুরুত্ব বুঝে কাজ করেন, জানিয়েছিলেন রাশি।
নিত্যা মেনেন: জাহ্নবীর বিষয়টি নিয়েও সম্প্রতি কথা বলেছেন নিত্যা। তাঁর মতে, এই সমস্যা শুধু দক্ষিণী চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়, তবে এটি বাস্তব একটি সমস্যা। তিনি মনে করেন, অভিনেত্রীদের নিজেদের সীমারেখা নির্ধারণ করা উচিত। প্রয়োজনে দৃঢ় ভাবে আপত্তি জানানোর পরামর্শও দিয়েছেন নিত্যা।
সপ্তমী গৌড়া: ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন সপ্তমী। কন্নড় অভিনেত্রীর মতে, অভিনেত্রীদের কাজ বা উপস্থিতির বদলে শরীরের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয় দক্ষিণী চলচ্চিত্রে। তাঁর এই মন্তব্য কন্নড় চলচ্চিত্র জগতে এই বড় আলোচনা তৈরি করে।
রুক্মিণী বসন্ত: দক্ষিণী ছবিতে মহিলাদের যৌনতার মোড়কে তুলে ধরার প্রবণতাকে সমালোচনা করেছিলেন রুক্মিণীও। অভিনেত্রীদের শরীরের নির্দিষ্ট অংশ ক্যামেরার মাধ্যমে তুলে ধরা হয় বলে দাবি করেছিলেন তিনি। শুধু ছবিতেই নয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও ছবিশিকারিরা এই কাজ করেন বলে দাবি করেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, এটি অসম্মানজনক এবং একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রম্যা: অভিনেত্রীদের যে ভাবে যৌনতার মোড়কে তুলে ধরা হয়, তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন দক্ষিণী অভিনেত্রী। পর্দায় নারীদের আরও সম্মানজনক ভাবে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।