টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ডের সদস্যদের প্রতিবাদী সমাবেশ। নিজস্ব চিত্র।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর মুখ্যমন্ত্রী নেই। মহিলা কমিশন এবং ফেডারেশন সভাপতির কুর্সি ছেড়েছেন যথাক্রমে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় এবং স্বরূপ বিশ্বাস। তা হলে ২৬টি গিল্ড-এর সভাপতি, সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক পদেই বা বদল ঘটবে না কেন?
সম্ভবত, এই ভাবনা থেকে বিজেপি সরকারের মন্ত্র, 'ভয় আউট ভরসা ইন' জপে শনিবার সকালে সহকারী পরিচালক গিল্ড, রাতে মেকআপ গিল্ড-এর বিজেপি সমর্থক কিছু সদস্য টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো চত্বরে প্রতিবাদী সমাবেশ করেন। তাঁদের নিশানায় প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ড-এর মহম্মদ হাসান, নিরুপম দেব, মেকআপ গিল্ড-এর বাপি মালাকার, স্বপন মজুমদার-সহ কয়েক জন। অভিযোগ, এঁরা আদতে প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সহযোগী। স্বরূপের সঙ্গে ‘অশুভ আঁতাঁত’ গড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে অরাজকতা চালিয়েছেন। ঘুষ নিয়ে কাজ দেওয়ার পাশাপাশি নারীঘটিত কেলেঙ্কারির সঙ্গেও এঁরা নাকি যুক্ত ছিলেন। যার জেরে এঁদের ঘনিষ্ঠরাই কাজ পেয়েছেন। বাকিরা কাজ পাননি, কার্ডও পাননি! অর্থের বিনিময়ে কার্ড বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। প্রসঙ্গত, বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর চোখে অরূপ এবং স্বরূপ বিশ্বাস ‘রাক্ষস খোক্কস’। এঁরা তাঁদেরই প্রতিনিধি!
শুধু তা-ই নয়, সংগঠনের সম্পাদক মহ. হাসানকে ‘জঙ্গি’ তকমাও দেওয়া হয়!
তারই প্রতিবাদ জানিয়ে রবিবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় পাল্টা সাংবাদিক বৈঠক ডাকে প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ড। সংগঠনের পক্ষ থেকে সহ-সম্পাদক কৌশিক মণ্ডল, সহকারী প্রোডাকশন ম্যানেজার অভিজিৎ সাহা আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। পাল্টা অভিযোগ জানিয়ে বলেন, “ওঁরা ‘তৎকাল বিজেপি’। ৪ঠা মে বেলা ১২টার পর জামার রং, পতাকা বদলে, কপালে গেরুয়া তিলক কেটে দল বদলেছেন। গত কাল তাঁরা ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিয়ে স্টুডিয়ো চত্বরে পা রেখেছেন। এঁরাই আসলে স্বরূপ বিশ্বাসের লোক, সমাজবিরোধী। নানা কারণে একাধিক বার পুলিশ আটক করেছে এঁদের। ইন্ডাস্ট্রিতে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন এঁরা। বিভেদ আনার চেষ্টা করছেন আমাদের মধ্যে।" জানিয়েছেন, গত রাতেই তাঁরা স্থানীয় রিজেন্ট পার্ক থানায় অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সবিস্তার জানিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক-অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষকে।
যাঁরা অভিযোগকারী, তাঁরা কারা? কৌশিক এবং অভিজিৎ জানান, তাঁরা তাপস খান, বাপি কাঞ্জিলাল, সঞ্জয় গুহ, বাপি সান্যাল, সঞ্জীব বণিক, সুব্রত বিশ্বাস, পিন্টু গোস্বামী এবং রাজা মুখোপাধ্যায়।
কেনই বা এত অভিযোগ এঁদের? জবাবে কৌশিক এবং অভিজিৎ বলেন, “নেপথ্যে একাধিক কারণ। ২০১৮-য় আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে শিক্ষিত কলাকুশলীদের দায়িত্ব দিতে চেয়েছি। কার্ড দিয়েছি, যাতে প্রয়োজনে চিঠি লেখা, কম্পিউটারের কাজ তাঁরা করতে পারেন। ওঁদের চাহিদা, সবাইকে কার্ড দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বরূপবাবুর ইশারায় ওঁরা কমিটির মাথা হয়ে বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ায় সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। এখন সরকার বদলাতেই ওঁরা চাইছেন, ‘ইলেকশন নয়, সিলেকশন ভোট’ হোক। ওঁরা গদি দখল করবেন।” প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ড-এর উভয় সদস্য জানান, ২০২২ থেকে দু’টি বিষয়ে তাঁরা ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপের বিরোধিতা করে আসছেন। এক, একনায়কতন্ত্র চলবে না। দুই, সদস্যদের উপার্জনের ৭. ৫ শতাংশ ফেডারেশনকে কেন দেওয়া হবে। কৌশিক ও অভিজিৎ আরও বলেন, “এরকম বহু আর্থিক তছরুপ করেছেন স্বরূপবাবু। আমরা দফায় দফায় মেল পাঠিয়ে ওঁকে প্রশ্ন করেছি। ফেডারেশন সভাপতি উত্তর দিতে পারেননি।”
ম্যানেজার গিল্ড-এর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তাঁরা দেবকে বিশেষ পদ দিয়েছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, দেব কি কোনও দিন ওই পদের দায়িত্ব সামলাবেন? তা হলে কেন ওঁকে ওই বিশেষ পদ দেওয়া হল? এর উত্তরে অভিজিৎ বলেন, “আগামী দিনে অন্য পেশার বিশিষ্টজনদের আমরা ওই বিশেষ সাম্মানিক পদে বসাব। তার মানে এই নয়, তাঁরা ওই পদের দায়িত্ব নেবেন। বরং, ওঁদের উপস্থিতি আমাদের সমৃদ্ধ করবে।” কৌশিক বলেন, “আমাদের সম্পাদক হাসানদাকে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে বিভেদ টানার চেষ্টা চলছে। আমরা সেটা হতে দেব না। যিনি এই তকমা দিয়েছেন, তাঁকে এক মাসের মধ্যে প্রমাণ দিতে হবে।”
এ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত সদস্যদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা একযোগে জানান, “গিল্ড আমাদের পাশে না থাকলে, আমরা জীবনধারণ করতে পারতাম না। আমাদের সন্তানেরা লেখাপড়া শিখতে পারত না।” সংগঠনের এক বিজেপি সদস্য সাংবাদিকদের বলেন, “গিল্ড রাজনৈতিক রং দেখে নয়, যোগ্যতা দেখে কার্ড দেয়। সংগঠন নয়, কলাকুশলীদের কাজ দেন প্রযোজকেরা। যিনি যোগ্য, তাঁকে ডেকে কাজ দেওয়া হয়।”
যিনি অভিযোগের কেন্দ্রে, সেই স্বরূপের বক্তব্য জানতে আনন্দবাজার ডট কম তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল। ফেডারেশন সভাপতির ফোন বেজে গিয়েছে। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “এখন কুর্সিতে নেই। এরকম অনেক অভিযোগ আসবে। নির্দিষ্ট সময়ে সব অভিযোগের জবাব দেব।”