গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বেলা গড়ালেই গনগনে চারপাশ। বাইরে কাঠফাটা রোদ্দুর আর ঘরের ভিতরে ভ্যাপসা গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে দুপুর থেকেই সন্ধ্যা-নাম জপতে থাকেন মানুষ। ভাবেন রোদ পড়লেই বুঝি জ্বালা জুড়োবে, ঠান্ডা হবে চারপাশ। তা ছাড়া গ্রীষ্মের সকালে ঠাঠা রোদে বাইরে বেরোনো মানে ত্বকের ক্ষতি, চুলের ক্ষতি, হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন মিলিয়ে শরীরের ক্ষতির সম্ভাবনা। রাতে অন্তত ততটা কষ্ট হয় না। কিন্তু বিজ্ঞান এবং পরিবেশবিষয়ক এক সাম্প্রতিক গবেষণা অন্য কথা বলছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মাঝ দুপুরের চড়া রোদ আর তীব্র গরমের চেয়েও তপ্ত রাত শরীরের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর হতে পারে।
কেন তপ্ত দিনের থেকেও বেশি বিপজ্জনক তপ্ত রাত?
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দিনের বেলায় তাপমাত্রা যেমনই থাকুক না কেন, সূর্য ডোবার পর পারদ নামতে শুরু করে। শরীরও ওই নিয়মের ছন্দেই চলে। রাতের তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশে শরীরের তাপমাত্রা কমে আসে, হৃদস্পন্দন ধীর হয়, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে শরীর নিজেকে মেরামত করার সুযোগ পায়। কিন্তু গ্রীষ্মকালে রাতের তাপমাত্রা যতটা কমার ততটা যখন কমে না, তখনই বাড়তে শুরু করে সমস্যা। শরীর কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পায় না। ঘুমোনোর সময়ে অনবরত ঘাম হতে থাকে এবং ভিতর থেকে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। ঘুমও ভাল হয় না। এতে মূলত দু’টি সমস্যা হয়। এক, শরীর মেরামতির সুযোগ পায় না। ফলে সারা দিন ধরে নানা অত্যাচারের প্রভাব জিইয়ে থাকে শরীরে। দুই, ঘুম ভাল না হওয়ায় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তার প্রভাব পড়ে। দুর্বল হতে শুরু করে হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক। বিগড়ে যায় হজম করার ক্ষমতাও।
গবেষণা কী বলছে?
গরম কালের তপ্ত রাত ঘুম এবং শরীরের ক্ষতি করছে কী ভাবে, তা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে একটি বড় সমীক্ষা চালানো হয়েছিল সম্প্রতি। তাতে যে তথ্য মিলেছে, তা বেশ অবাক হওয়ার মতো।
১) ৬৮টি দেশের প্রায় ৪৭,০০০ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে গেলেই মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের পরিমাণ কমতে থাকে। রাতের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁলে গড়ে অন্তত ১৪ মিনিট করে ঘুম কমে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এক দিনের ঘুমের নিরিখে একে সামান্য বলে মনে হলেও, বছর শেষে ওই হিসাব প্রায় ৪৪ ঘণ্টা ঘুমের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল পরিবেশ বিষয়ক প্রথম সারির জার্নাল ‘ওয়ান আর্থ’-এ।
২) ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর জলবায়ু বিষয়ক রিপোর্ট (২০২৪ সালের) বলছে, উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর প্রায় ২৪০ কোটি মানুষ বছরে স্বাভাবিকের থেকে অন্তত অতিরিক্ত দুই সপ্তাহ এমন গরম রাতের মুখোমুখি হচ্ছেন।
কী কী ক্ষতি হতে পারে?
১) হৃদ্যন্ত্রের উপর চাপ: অতিরিক্ত গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সারা রাত অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় হার্টকে। ফলে রক্তচাপের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।
২) মস্তিষ্কের ক্ষমতা হ্রাস: অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় না। তার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। চিন্তাভাবনা এলোমেলো হয়ে পড়ে। এতে দ্রুত ধৈর্য হারিয়ে ফেলা, ভুল কাজ করা এবং অল্পেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
৩) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ঘুম কম হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও ভেঙে পড়ে, খুব সহজেই শরীর নানা রোগে আক্রান্ত হয়।
৪) স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি: রাতের পর রাত টানা গরমের ধকল সহ্য করতে করতে হিটস্ট্রোক, স্ট্রোক, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের সমস্যা মারণও হতে পারে।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
বয়স্ক মানুষ, যাঁদের হৃদ্যন্ত্রের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে এসেছে তাঁদের ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া শিশু, যারা দ্রুত ডিহাইড্রেটেড হয়ে যায়, তাদের ঝুঁকি আছে। অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। কারণ তাঁদের মেটাবলিক রেট বেশি থাকে। ফলে রক্ত সঞ্চালনে বাড়তি চাপ পড়তে পারে। এ ছাড়া যাঁদের হার্ট, ফুসফুস, কিডনির রোগ আছে এবং যাঁরা সারা দিন বাইরে কাজ করেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই রাতে ঘুম ভাল না হলে সমস্যা হতে পারে।
কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
১। সারা দিন এবং রাতে ঘুমোনোর আগেও পর্যাপ্ত জল পান করুন, যাতে শরীর শুকিয়ে না যায়।
২। রাতে যাতে ঘরে পর্যাপ্ত হাওয়াবাতাস চলাচল করতে পারে, তার ব্যবস্থা রাখুন। ফ্যান বা কুলার সঠিকভাবে ব্যবহার করুন।
৩। রাতে ঘুমোনোর সময়ে হালকা, ঢিলেঢালা এবং সুতির আরামদায়ক পোশাক পরুন।
৪। ঘুমোনোর আগে ভারী বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলুন। সন্ধ্যার পর বা রাতে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম বা ভারী ব্যায়াম না করাই ভাল।
৫। সম্ভব হলে রাতে ঘুমোনোর আগে একবার ঠান্ডা জলে স্নান করে নিতে পারেন। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং ঘুম ভাল হয়।