Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

চিনের কোলে বসল নেপাল! সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা

গ্রাফিক: তিয়াসা দাস।

‘দাদাগিরি’র মাশুল গুনতে হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে!

দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যে দু’টি দেশ (নেপাল, ভূটান)-কে ভারতের ‘অ্যাডভান্সড গার্ড’ (অগ্রণী প্রহরী) বলেছিলেন, তাদের অন্যতম নেপাল ঝুপ করে চিনের কোলে বসে পড়ায় অনেকটাই উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই ঘটনা আগামী দিনে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে চিনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়তে পারে ভূটানও।

কাঠমান্ডু সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, পুণেতে ভারত-সহ ‘বিমস্টেক’ জোটের দেশগুলির সঙ্গে এই সেপ্টেম্বরে ৭ দিনের যৌথ সেনা মহড়ায় তারা যোগ দেবে না। তবে তার এক দিন পর থেকে চেংদুতে যে ১২ দিনের সেনা মহড়া হবে চিনের সঙ্গে, তাতে অংশ নেবে নেপাল।

বিশেষজ্ঞরা কাঠমান্ডুর এই ঘোষণায় অশনি সংকেত দেখছেন। তাঁরা বলছেন, তিব্বতের লাসা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ পুরোদস্তুর চালু হয়ে গেলে ভারতের সীমান্ত-লাগোয়া এলাকাটিকে আর দুর্গম রাখবে না। ফলে, ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তা রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সহায়ক হয়ে উঠতে পারে চোরাকারবার ও পাচার-বাণিজ্যের।

দায় এড়াতে পারে না ভারত

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দুই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পুরুষোত্তম ভট্টাচার্য ও সংযুক্তা ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘এর জন্য কিছুটা দায়ী ভারতই। গত কয়েক দশক ধরে ভারতই বার বার যেচে নেপালের রাজনীতিতে নাক গলানোর চেষ্টা করেছে। তার রাজতন্ত্রকে এক সময় টিঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। আবার পরে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের সময় নেপালকে সংবিধান প্রণয়নের জন্য আগ বাড়িয়ে পরামর্শ দিতে গিয়েছে দিল্লি। যা কাঠমাণ্ডুর পছন্দ হয়নি। তাই ২০১৫-য় নেপালের ভয়াবহ ভূকম্পের পর দিল্লির অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল কাঠমান্ডু। তার পরেও নেপালের তরাই অঞ্চলে থাকা হিন্দিভাষী (মদেশি)-দের সমর্থনে কেন্দ্রীয় সরকার কলকাতা বন্দর দিয়ে নেপালি পণ্য পরিবহণে যে ভাবে বাধার সৃষ্টি করেছিল, তা ভারত সম্পর্কে নেপালকে অন্য ভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিকল্প হিসেবে চিনের দিকে ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করেছে।’’

আরও পড়ুন- ভারতকে ‘না’, নেপাল জানাল, চিনের সঙ্গেই যাবে যৌথ মহড়ায়

অতীতের ছবি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান শিবাজীপ্রতীম বসু বলছেন, চিনের সামরিক শক্তির কথা মাথায় রেখে ছয়ের দশক থেকেই নেহরু চেয়েছিলেন, নেপাল ও ভূটানের মতো রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে। ভৌগোলিক ভাবে এই দু’টি রাষ্ট্র যে ভারতের ‘বর্ম’ হতে পারে, দূরদর্শী নেহরু তা বুঝেছিলেন সেই সময়েই। তাই, নেপাল ও ভূটানের সঙ্গে আলাদা ভাবে ‘ট্রেড ও ট্রানজিট’ চুক্তি করেছিল ভারত। ’৪৯-এ ভূটানের সঙ্গে আর ’৫০ সালে নেপালের সঙ্গে। নেপালের রাজতন্ত্রকেও এক সময় কার্যত মদতই দিয়ে গিয়েছে দিল্লি। যদিও পরে ’৬২-র যুদ্ধে চিনের কাছে ভারতের পরাজয়ের পর রাজা মহেন্দ্রর সময় থেকেই চিন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যের রাজনীতি শুরু হয় নেপালের।

বিরোধের সূত্রপাত রাজীব গাঁধীর সময় থেকেই

তবে ভারতের সঙ্গে নেপালের মতবিরোধ যে মোদী সরকারের আমলেই প্রথম দেখা দিয়েছে, তা কিন্তু নয়। এর সূত্রপাত হয় রাজীব গাঁধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই।

পুরুষোত্তম ও শিবাজীপ্রতিমের কথায়, ‘‘১৯৮৮ সালে রাজীব গাঁধীর সময় থেকে ওই ট্রেড ও ট্রানজিট চুক্তির পুনর্নবীকরণ নিয়ে দিল্লির সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় কাঠমান্ডুর। আপত্তি ওঠে সেই চুক্তির কয়েকটি শর্ত নিয়ে। নেপাল মনে করতে শুরু করে ভারত ‘দাদাগিরি’ চালাচ্ছে।’’

বলা যায়, সেই শুরু। ‘‘তার পর নেপালি কংগ্রেসের পরিবর্তে কে পি ওলির মতো মধ্যপন্থী বামপন্থীদের হাতে নেপালের ক্ষমতা চলে যেতে শুরু করায় ভারতের ‘দাদাগিরি’কে নেপালের অস্বীকার করার উৎসাহ বেড়ে যায়। ওলি প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পরেই তার সূত্রপাত। কিন্তু সে বার তাঁর ততটা ক্ষমতা ছিল না। এ বার তাঁর সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংশয় নেই। তাই ভারতকে অস্বীকার করার নেপালি উৎসাহে এই জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে’’, বলছেন শিবাশিস।

নেপালের কী স্বার্থ, চিনেরই বা কী?

শিবাজীপ্রতিমের বক্তব্য, চিন চাইছে, দক্ষিণ এশিয়া ও এই উপমহাদেশে ভারতকে এ দিকে, পাকিস্তান, অন্য দিকে, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, নেপাল, ভূটানের মতো তার পছন্দের, তার ওপর নির্ভরশীলদের নিয়ে সাজানো ‘স্ট্রিং অফ পার্ল’-এর মতো দেশগুলি দিয়ে ঘিরে ফেলতে। তার জন্য ওই দেশগুলিকে বেশি বাণিজ্য-সুবিধা দেবে বেজিং। দেবে অর্থসাহায্য। প্রযুক্তি সাহায্য। বিভিন্ন পণ্যের ওপর চাপানো শুল্কে দেবে ছাড়। তা নেপাল, ভূটানের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির খুব প্রয়োজন। নেপাল কার্যত ‘ল্যান্ড-লক্‌ড স্টেট’। তার এক দিকের কিছুটা তিব্বত। অন্য দিকে নেপালের সীমান্তের বেশির ভাগটাই ভারতের সঙ্গে। তার ফলে, ভারতের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল নেপাল। কলকাতা আর বিশাখাপত্তনম বন্দর ছাড়া নেপালের সামনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আর কোনও ‘রুট’ এত দিন খোলা ছিল না। চিন, তিব্বত বা অন্য দেশের মাধ্যমে নেপালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ হয়, সেখানকার বন্দরগুলি অনেক দূরে বলে। চিন এ বার তার দু’টি বন্দর নেপালকে ব্যবহার করতে দেবে বলেছে। যদিও দূরত্বে তা কলকাতা বা বিশাখাপত্তনম বন্দরের চেয়ে অনেক বেশি। তবে তার চেয়েও বড় কথা, লাসা থেকে কাঠামান্ডুর অত্যন্ত দুর্গম পথে চিন উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নেপালকে। এতে সত্যিই অনেকটা উপকার হবে নেপালের। ভারতের ওপরেও তার নির্ভরতা কমবে।

বড় কাথাকাছি। চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিংয়ের সঙ্গে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি।

তবে শিবাজীপ্রতিম এও মনে করেন, চিনের দিকে বড় বেশি করে ঝুঁকে পড়ার খেসারত অবশ্য দূর ভবিষ্যতে ভালই দিতে হবে কাঠমান্ডুকে। নেপালের রাজনীতিতে নাক গলাবে চিন। সেটা বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলে নেপালের পক্ষে মেনে নেওয়া যতটা সম্ভব হবে, জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতাসীন হলে তা ততটা হবে না।

তবে ভৌগোলিক কারণেই নেপালের কাছে ভারতের গুরুত্ব কমে যাবে না বলে মনে করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার। তাঁর কথায়, ‘‘কাঠমান্ডু থেকে কলকাতা আর বিশাখাপত্তনম বন্দরের দূরত্ব অনেকট কম। নেপালকে যে দু’টি বন্দর দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে চিন, কাঠমান্ডু থেকে তাদের দূরত্ব ৩ হাজার কিলোমিটারের আশপাশে। ফলে, পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে খরচ পোষাতে ভারতকে ভুলে গেলে আখেরে ক্ষতিই হবে নেপালের।’’

আরও পড়ুন- চিনের ইন্ধনে যৌথ মহড়ায় যোগ দিল না নেপাল? ক্ষুব্ধ ভারত​

ভারতের সীমান্তের নিরাপত্তায় বিঘ্নের আশঙ্কা

পক্ষান্তরে সংযুক্তা মনে করছেন, ‘‘লাসা থেকে কাঠমান্ডু সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা পুরোদস্তুর গড়ে উঠলে সীমান্তে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার যথেষ্টই আশঙ্কা রয়েছে।’’

সংযুক্তার ধারণা, আগামী দিনে ভূটানও কিছুটা ঝুঁকে পড়তে পারে চিনের দিকে।

পুরুষোত্তমও বলছেন সে কথাই। তাঁর বক্তব্য, এখনও পর্যন্ত ভূটান নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েই চলার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে ভারত ও চিনের মধ্যে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলার। তাই ডোকলাম তার নিজের ভূখণ্ডে হলেও ভারত ওই ইস্যুতে যতটা মুখ খুলেছে, ভূটান ততটাই থেকেছে মুখে কুলুপ এঁটে। এতেই ইঙ্গিত, ভবিষ্যতে চিনের দিকে ঝুঁকে পড়ার জোরালো সম্ভাবনাটা জিইয়ে রাখতে চাইছে ভূটানও।

তার কারণটাও অর্থনৈতিক। পণ্যের প্রাচুর্য, বিভিন্নতা, দাম- এই সব কিছু নিয়ে অর্থনীতিতে অনেকটাই শক্তিশালী চিনের অর্থ সাহায্যের ক্ষমতাও বেশি।

তাই সংযুক্তার কথায়, ‘‘যে কারণে আফ্রিকার বেশির ভাগই দেশই এখন তাইওয়ান (চিন মানতে চায় না বলে)-কে স্বীকৃতি দিতে চায় না, সেই একই কারণে, চিনা অর্থ সাহায্যের মোহে ভারতের আরও একটি ‘অ্যাডভান্সড গার্ড’ দেশ ভূটানও বেজিংয়ের দিকেই কিছুটা ঝুঁকে পড়তে পারে, নেপালের মতো।’’


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper