Aam Tel As Bengal's Own Finishing Oil

অলিভ বা চিলি অয়েলকে কি টক্কর দিতে পারে আমতেল? বাঙালির ছাদ থেকে বিশ্বজনীন হতে দোষ কী!

সুপারমার্কেটের দামি বিদেশি শিশির সঙ্গে যদি লড়াই লাগে বাঙালির ছাদে-বারান্দার রোদে তৈরি হওয়া ঘরোয়া আমতেলের! পাস্তা, রামেন থেকে ডিমসামের ডিপ- এ কি বিশ্বমানের ‘ফিনিশিং টাচ’ দিতে পারবে আমতেল? খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৮:৫৩
Share:

এ বার গরমে আম তেল বানিয়েছেন তো? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

এই যে মাঝ মে মাসের ঝাঁইপোড়া গরম, এতেই আমে আর তেলে মজে ভাল।

Advertisement

বন্ধ কাচের বয়ামে ঝাঁঝালো সর্ষের তেলে গা ডুবিয়ে গ্রীষ্মের সুগন্ধি ফলের নির্যাস মিশতে থাকে একটু একটু করে। প্রথমে কাঁচা সবুজ খোসা তপতপে হয়, তার পরে তুলোর মত নরম হয়ে আসে কাঁচা আমের সাদাটে শাঁস। হলুদ নুনে মাখানো আমের টুকরো একে একে থিতিয়ে পড়তে থাকে তেলের বয়ামের নীচে। যেখানে তেলকে আরও ঝাঁঝালো করার শুকনো লঙ্কা, কালোজিরে আর সর্ষে ফোড়নের সঙ্গে মাখামাখি করে রয়েছে গোটা ধনে, সর্ষেবাটা, হিং, পাঁচ ফোড়ন, হলুদ, মেথি, রাঁধুনি, মৌরীর মতো নানা স্বাদবর্ধক মশলা। রোদ যত চড়বে, বয়ামের নীচে তপ্ত তেলে ততই রসায়ন বাড়তে থাকবে মশলা আর আমের। জারণ-বিজারণে তৈরি হবে বাঙালির প্রিয় আমতেল।

কিন্তু এত কাণ্ডের পর কী হবে? এক পক্ষকাল ছাদে বা বারান্দার রোদে দিয়ে দিয়ে তৈরি করা সেই আমতেলের শিশি পড়ে থাকবে রান্নাঘরের একটি কোণে। আর সপ্তাহান্তে সুপারমার্কেটে বাজার করতে গিয়ে গুচ্ছের টাকা খরচ করে খাদ্যরসিক বাঙালি কিনে আনবেন চিলি অয়েল, রোজ়মেরি অয়েল, ইটালির এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, কোরিয়ার টোস্টেড সেসেমি অয়েল, ফ্রান্সের ট্রাফল, মরক্কোর আরগন কিংবা রোমের হার্ব ইনফিউজ়ড অলিভ অয়েল।

Advertisement

বাহারি শিশিতে রান্না ঘরের র‍্যাকে সার দিয়ে সাজিয়ে রাখা হবে সেই সব তেল। বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এলে কন্টিনেন্টাল খাওয়ানোর অছিলায় দেখানো হবে বিদেশি ফিনিশিং অয়েলের বিপুল সম্ভার। আর বাড়িতে দেশি মশলা দিয়ে ‘ইনফিউজ়ড’ কাঁচা আমের নির্যাসে ভরপুর সুগন্ধি আমতেলের খোঁজ পড়বে কেবল মুড়ি মাখার সময়। বড়জোর আলুভাতে বা পান্তা ভাতের বাটিতে ছড়ানোর জন্য! কেন? আম তেল কি বিদেশি ফিনিশিং অয়েলের সঙ্গে স্বাদে এবং গন্ধে টক্কর দিতে পারে না?

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

ধরা যাক বাড়িতে পাস্তা বানালেন। শেষ পর্যায়ে যে রসুনে ভেজানো অলিভ অয়েল উপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তার বদলে যদি ছড়িয়ে দেন আমতেল! কিংবা পিৎজ়ার উপর যে নানা রকম ভেষজ দেওয়া অলিভ অয়েল ছড়ানো হয়, তার বদলেও ছড়িয়ে দেওয়া হল একটু আমতেল। তবে কি মন্দ লাগবে খেতে? কলকাতার রন্ধনশিল্পীরা কী বলছেন?

ফিনিশিং অয়েল অর্থাৎ খাবারের উপরে ছড়িয়ে সুগন্ধ বৃদ্ধির যে তেল, সেই ভূমিকায় আমতেলের বিপক্ষে নন এ শহরের ‘শেফ’-রা । বরং কেউ কেউ আগ্রহই দেখালেন নানা খাবারে আমতেল ব্যবহার করার ব্যাপারে।

সপ্তপদী রেস্তোরাঁর কর্ণধার এবং রন্ধনশিল্পী রঞ্জন বিশ্বাস যেমন মনে করেন, চিলি অয়েল, রোজ়মেরি অয়েল বা হার্ব ইনফিউজ়ড অলিভ অয়েলের পাশে ফিনিশিং অয়েল হিসাবে দিব্যি নিজের জায়গা বানাতে পারে বাঙালির আমতেল। শুধু ভারতীয় খাবারদাবারে নয়, রঞ্জন বলছেন, “আমি ওই তেল পাস্তাতেও ব্যবহার করব। বিশেষ করে যে সমস্ত রেড সস পাস্তা রয়েছে, যেখানে টম্যাটো পিউরি ব্যবহার হয়, বেসিলের মতো হার্ব ব্যবহার হয়, তাতে আমতেল ব্যবহার করলে দারুণ স্বাদ আসবে। কারণ, বেসিলের সঙ্গে আমের গন্ধ খুব ভাল যায়। এ ছাড়া নানা ধরনের মেক্সিকান খাবারেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ভাল লাগবে খেতে।” মেক্সিকান খাবারে কেন? রঞ্জন বলছেন, “ওদের খাবারে জিরে, ধনেপাতার ব্যবহার হয় যেহেতু, তার সঙ্গে আমতেলের গন্ধ আলাদা একটা মাত্রা আনবে।”

‘সিক্স বালিগঞ্জ প্লেস’- এর রন্ধনশিল্পী তথা ডিরেক্টর সুশান্ত সেনগুপ্ত আবার আমতেলকে চিকেন টিক্কা পিৎজ়ার উপরে ছড়ানোর পক্ষপাতী। সুশান্ত বলছেন, “কিছু ফিউশন খাবারে আমতেল ব্যবহার করলে খেতে ভালই লাগবে। আমরা চিকেন টিক্কা পিৎজ়ায় আমতেল ব্যবহার করতে পারি। কারণ, চিকেন টিক্কার একটা মূল উপকরণই হল আচারের তেল বা পিকল অয়েল। আমাদের আমতেলও তা-ই। এ ছাড়া আমি আমতেল ব্যবহার করতে পারি ম্যারিনেশন অয়েল হিসেবেও। ধরুন কিছু গ্রিল করছি, মাছ হোক বা মাংস, তার ম্যারিনেশনে আমতেল দিলে দারুণ একটা স্বাদ আসবে। বা আমরা যে ফ্লেভার বাস্টিং এর জন্য মশলা বা তেল দিই, তাতেও আমতেল ব্যবহার করা যেতে পারে।”

রঞ্জন কিংবা সুশান্ত একা নন, বাঙালি ও ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি কিছু বিদেশি খাবারেও আমতেল মেশানোর ব্যাপারে শর্তসাপেক্ষে রাজি অনেকে। তাঁরাও, যাঁরা পেশাগত ভাবে দিনরাত তথাকথিত বাঙালি খাবার বানানোর সঙ্গে যুক্ত নন। যেমন বিজ়ার এশিয়ার রন্ধনশিল্পী ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্যের কথাই ধরা যাক। তিনি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ— তাই, চাইনিজ়, জাপানিজ়, কোরিয়ান, মঙ্গোলিয়ান, সিঙ্গাপুরিয়ান, ভিয়েতনামিজ় খাবার বানানোয় দক্ষ। আর সেই সব খাবার খাঁটি ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াতেই বানানোয় বিশ্বাস করেন। তিনি কি ভারতের বাইরের কোনও দেশের রান্নায় আমতেল ব্যবহার করতে চাইবেন? প্রশ্ন শুনে ইন্দ্রনীলের জবাব, “আমি এখনও পর্যন্ত করার কথা ভাবিনি। তবে যদি কখনও করি, তাহলে ইতালিয়ান রান্না বা ইউরোপীয় রান্নার বদলে সেই সমস্ত দেশের খাবারে দেব, যারা আম খেতে অভ্যস্ত। বিশেষ করে ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় দেশগুলিতে। যেখানে আমের ফলন হয়, যেখানে রান্নাবান্নায় আমের ব্যবহার আছে, সেখানে। তাইল্যান্ডের খাবারে আমতেল ব্যবহার করা যেতেই পারে। তা ছাড়া বিভিন্ন স্যালাড ড্রেসিংয়েও আমতেল ব্যবহার করলে খেতে ভাল লাগবে বলে আমার ধারণা।”

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পার্ক স্ট্রিটের ফ্লুরিজ-এর রন্ধনশিল্পী বিকাশ কুমার উত্তর প্রদেশের মানুষ। তবে রান্না করেন সাহেবি খাবারদাবার। আমতেলের স্বাদ-গন্ধের সঙ্গে তাঁর পরিচয় কলকাতায় এসেই। আমতেল কি কন্টিনেন্টাল রান্নায় ব্যবহার করবেন? প্রশ্ন শুনে বিকাশের মত, “আমি এমন কোনও রান্নায় ব্যবহার করব না, যেখানে সর্ষের তেলের ঝাঁঝ বাকি স্বাদগুলোকে নষ্ট করে দিতে পারে। তবে হ্যাঁ, মেক্সিকান রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে আমতেল। বা কোনও রান্নায় যদি ভারতীয় ছোঁয়া আনতে হয়, তবে আমতেল ব্যবহার করা যেতেই পারে।”

অর্থাৎ আমতেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার ব্যাপারে আগ্রহী শেফ বা রন্ধনশিল্পীরাও। কিন্তু রোজ তো আর ‘শেফ’-এর বানানো খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় না। মাঝে মধ্যে মুখ বদলের জন্য বাড়িতে যে সব দেশি-বিদেশি খাবার বানিয়ে খাওয়া হয় কিংবা স্বাস্থ্যকর ভেবেও যে সব খাবার খান, সেই সব পদের স্বাদ বদলানো যেতে পারে আমতেল দিয়ে। ধরুন, কেউ তাই গ্রিন কারি, জাপানি রামেন, টম্যাটো বা মাশরুমের স্যুপ রান্না করেছেন। আঁচ থেকে নামানোর পরে তার উপর কয়েক ফোঁটা আমতেল ছড়িয়ে দিলে স্বাদ বদলে যেতে বাধ্য। আবার মোমো কিংবা ডিমসামের ডিপ হিসেবে চিলি অয়েলের সঙ্গে আমতেল মিশিয়েও ব্যবহার করা যেতে পারে। গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মেয়োনিজ় দিয়ে না খেয়ে যদি উপরে ছড়িয়ে দেন আমতেল, খারাপ লাগবে কি খেতে? রোজের স্বাস্থ্যসম্মত মিলেট কিংবা ডালিয়ার খিচুড়ির একঘেয়ে স্বাদও অনায়াসে বদলানো যাবে বাড়িতে তৈরি আমতেল দিয়ে।

শুধু কি স্বাদবদল? আমতেল বেছে নেওয়ার আরও অনেক কারণ দেওয়া যেতে পারে। এক, এ যুগে মানুষ স্বাদু জিনিসের চেয়ে ‘ক্লিন’ বা প্রিজ়ারভেটিভ মুক্ত জিনিস খুঁজছেন বেশি। এমন খাবার চাইছেন, যা কারখানায় প্রক্রিয়াজাত নয়। বাড়িতে বানানো আমতেল সেই দিক থেকে আদর্শ। স্বাস্থ্যকর ভাবে সূর্যের আলোয় জারণ প্রক্রিয়ায় তৈরি। সম্পূর্ণ রাসায়নিক রহিতও। তাই তা শরীরের জন্য ভাল। দুই, আমতেলে ব্যবহৃত মশলা এবং আমের নির্যাস পাচক রস নিঃসরণে সাহায্য করে। ফলে হজমের জন্য উপকারীও বটে। তিন, আমতেল শুধু কোনও সুগন্ধি ভোজ্য তেল নয়। আম তেল বাঙালির বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার অঙ্গ। এটি এক নিমেষে এ কাল আর সে কালের মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটায়। ভাসিয়ে দেয় নস্টালজিয়ায়। স্বাদের সঙ্গে এতে মেলে শিকড়ের টানও। যা মনে করিয়ে দেয় শৈশবের খোলা ছাদে মা-ঠাকুমার রোদে দেওয়া আমতেল পাহারা দেওয়ার স্মৃতিকে।

তাই আগামী দিনে সুপারমার্কেটে চিলি অয়েল, অলিভ অয়েল কিনতে যাওয়ার আগে এক বার রান্না ঘরের কোণটি দেখে নিন। গত বারের সাধ করে বানানো আমতেল শিশিতে বা বয়ামে ভরে অবহেলায় পড়ে নেই তো?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement