নিজামদের সোনার টিফিন বাক্সেই প্রতি দিন খাবার খেত চোর!

মুম্বইয়ের একটি পাঁচতারা হোটেলে বসে সোনার টিফিন বাক্সে খাবার খেত চোর। গ্রাফিক: তিয়াসা দাস।

সোনার টিফিন বাক্স থেকে হায়দরাবাদের নিজামরা কখনও খেয়েছেন কি না, জানা নেই। তবে ওই শহরের এক দাগী চোর প্রতি দিন তা থেকে আয়েশ করে খাবার খেত! নিজামদের মিউজিয়াম থেকে ওই টিফিন বাক্স-সহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে সে এবং তার সঙ্গী সটান গিয়ে ওঠে মুম্বইয়ের একটি পাঁচতারা হোটেলে। আর প্রতি দিনই ওই হিরে-রুবি-পান্নাখচিত সোনার টিফিন বাক্সে খাবার খেত সে। সেখানে বসেই নবাবি চালে দিন দুয়েক কাটিয়েও ছিল তারা। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন না থাকায় শেষমেশ পুলিশের জালে ধরা পড়ে গেল চোরেরা।

এ যেন ‘মিশন ইমপসিবল’ ফিল্মের দৃশ্য! তবে হায়দরাবাদের ওই দাগী চোর ও তার সঙ্গী কম্পিউটারের কোনও ডিস্ক গায়েব করতে নিজামদের মিউজিয়ামে যায়নি। তাদের নজর ছিল মিউজিয়ামের সোনার টিফিন বাক্স-সহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রের দিকে। নিজামদের মিউজিয়াম থেকে চুরি যাওয়া সোনার টিফিন বাক্স উদ্ধারের পর এমন তথ্য জানিয়েছে হায়দরাবাদ পুলিশ। চুরির সপ্তাহখানেকের মধ্যে পুলিশের জালে ধরা পড়েছে দু’জন।

গত ২ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ওই দু’জন ঢুকেছিল পুরানি হাভেলির নিজামদের মিউজজি়য়ামে। পুলিশ জানিয়েছে, মাস দুয়েক আগে চুরির ফন্দি আঁটার সময় ট্যুরিস্ট সেজে গোটা মিউজিয়াম ঘুরে এসেছিল তারা। পাঁচ-ছ’বার সেখানকার চক্কর লাগিয়েছিল। গত রবিবার রাতে পুরানি হাভেলিতে গিয়ে মিউজিয়ামের একটি ভেন্টিলেটরের ঢাকনা সরিয়ে প্রায় হলিউডি কায়দায় অনেকটা সংকীর্ণ পথ এগিয়ে যায় তারা। এর পর নেমে পড়ে মিউজিয়ামের ভিতরে। সেখান থেকে একটি আলমারি খুলে সোনার ঢাকনা দেওয়া কোরান হাতে তুলে নেয় তারা। হায়দরাবাদের পুলিশ কমিশনার অঞ্জনি কুমার জানিয়েছেন, ওই চোরদের জেরা করে জানা গিয়েছে, সে সময় আজানের শব্দ ভেসে আসে। অঞ্জনি কুমারের কথায়, “এটা ঈশ্বরিক হস্তক্ষেপ কি না জানি না, তবে সম্ভবত ভয় পেয়েই কোরানটি রেখে দেয় চোরেরা।”

আরও পড়ুন
মনমোহন না মোদী! দায় কার? পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জারি নজিরবিহীন তরজা

কোরান ছেড়ে রাখলেও আশপাশ থেকে হিরে-পান্না-রুবিখচিত চার কেজি ওজনের একটি সোনার টিফিন বাক্স তুলে নেয় তারা। সেই সঙ্গে নিয়ে নেয় রুবি-পান্নাখচিত সোনার কাপ-প্লেট, একটি চামচ এবং একটি ট্রে।

চুরি যাওয়া সামগ্রী রাখা ছিল নিজামদের এই মিউজিয়ামে। ছবি: পিটিআই।

অঞ্জনি কুমার জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, দুবাইয়ের বাজারে ওই তিন-কৌটোযুক্ত সোনার টিফিন বাক্স-সহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম ৩০-৪০ কোটি টাকা। তবে এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর করার পর তাঁরা নিশ্চিত, শুধুমাত্র ঐতিহাসিক মূল্যের কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে ওই সমস্ত জিনিসগুলির মূল্য ১০০-১২০ কোটি টাকা হবে।

চুরির খবর প্রকাশ্যে আসতে নড়েচড়ে বসে পুলিশ। এর পর এমন সমস্ত দাগী চোরদের তথ্যানুসন্ধান করতে শুরু করে পুলিশ, যারা ভেন্টিলেটর সংকীর্ণ পথ ধরে যাওয়ার মতো রোগা। তবে চোরেদের ধরা অত সহজ ছিল না। তদন্তে নেমে মিউজিয়ামের ভিতরে ৩২ সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে চোরেদের কোনও ছবি দেখতে পায়নি। সবক’টি ক্যামেরার মুখই অন্য দিকে ঘুরিয়ে রেখেছিল চোরেরা।

আরও পড়ুন
৪১ বছর পর ৩১২ টাকার মীমাংসা! মৃত্যুর পর মামলা জিতলেন গঙ্গা

চুরির পর একটি মোটরবাইকে চড়ে সেখান থেকে চম্পট দেয় তারা। মিউজিয়ামের গেটের বাইরে একটি ক্যামেরায় তা ধরা পড়ে যায়। তবে মাফলার জড়ানো থাকায় তাদের মুখ দেখা যায়নি। বেরোনোর সময় দেখা যায়, তারা মোবাইলে কথা বলছে। সেই সূত্র ধরে আশপাশের ৩০০টি মোবাইল টাওয়ারের তথ্য যাচাই করে পুলিশ। তবে তাতেও চোরেদের সন্ধান মেলেনি। তদন্তে জানা যায়, পুলিশকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যই একটি সিম-বিহীন মোবাইলে কথা বলছিল চোরেরা। এর পর চারমিনার এলাকায় ভিডিয়ো ফুটেজে দেখা যায়, একটি মোটরবাইকের রেডিয়েটরে পাথরে ধাক্কা লাগলে তা থামিয়ে দিচ্ছে দু’জন আরোহী। সেই সূত্র ধরেই এ বার এগোতে থাকে পুলিশ। জাহিরাবাদ জেলায় একটি পরিত্যক্ত বাইক উদ্ধার হয় যার রেডিয়েটরে সমস্যা রয়েছে।

উদ্ধারের পর সোনার টিফিন বাক্স হাতে হায়দরাবাদের পুলিশ কমিশনার অঞ্জনি কুমার (ডান দিকে)। ছবি: পিটিআই।

সেই সূত্র ধরে তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, হায়দরাবাদ থেকে সোজা মুম্বইয়ের একটি পাঁচতারা হোটেলে চলে যায় চোরেরা। সেখানেই পুলিশের জালে ধরা পড়ে তারা।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা ঝুলছে। তবে তার সঙ্গীই আসলে চুরির ফন্দি এঁটেছিল। ট্যুরিস্ট হিসাবে নিজামদের মিউজিয়ামে ঘোরার সময়ই চুরির আইডিয়াটা মাথায় এসেছিল তার!