Anti India Racism in Taiwan

তাইওয়ানে মলদ্বীপের ছায়া, ভারত-বিরোধী প্রচারে ক্ষমতা দখলের ছক! পর্দার আড়াল থেকে উস্কানি দিচ্ছে কোনও দেশ?

ভারত বিরোধিতাকে ইস্যু করে প্রচারে ঝড় তুলেছেন তাইওয়ানের এক প্রার্থী। কয়েক বছর আগে একই ছবি দেখা গিয়েছিল মলদ্বীপে। গোটা বিষয়টার নেপথ্যে চিনের হাত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ০৭:৫৮
Share:
০১ ২০

কখনও ভারত-বিরোধী স্লোগান। কখনও আবার অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে পোস্টার। সেই সঙ্গে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য। এক রাজনৈতিক নেতার প্রচারকৌশলে বিতর্কের মুখে সাবেক ফরমোজা তথা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না)। এর সঙ্গে মলদ্বীপের ঘটনাপ্রবাহের মিল খুঁজে পাচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। আর তাই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইতিমধ্যেই উষ্মা প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি।

০২ ২০

সম্প্রতি, তাইওয়ানের কাওশিউং পুরভোটের (সিটি কাউন্সিল) প্রার্থী লি হং-য়ির প্রচারকে কেন্দ্র করে তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক। দ্বীপরাষ্ট্রটির সিয়াওগ্যাং এলাকার বিলবোর্ডে একটি পোস্টার সেঁটে দেন তিনি। তাতে পাগড়ি পরিহিত এক ব্যক্তি এবং ভারতের উল্টো পতাকার ছবি ছিল। পাশাপাশি, ওই পোস্টারে এ দেশের অভিবাসীদের নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন লি। ফলে প্রবাসীদের মনে বাড়তে থাকে ক্ষোভ।

Advertisement
০৩ ২০

চলতি বছরের মে মাসে ওই পোস্টারের ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জটিল হয় পরিস্থিতি। তাইওয়ানকে নিয়ে নেটদুনিয়ায় ওঠে নিন্দার ঝড়। বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে কর্মরত রয়েছেন ৩,৫০০-৪,০০০ ভারতীয়। শ্রমিক সঙ্কটের জেরে অচিরেই এই সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সাবেক ফরমোজার। সেটা বন্ধ করার দাবিতে সেখানকার ৪০,০০০-এর বেশি নাগরিক একটি অনলাইন পিটিশনে সই করেছেন।

০৪ ২০

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিক-সঙ্কট মেটাতে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি করে তাইওয়ান। সেই সমঝোতা মেনে উৎপাদন এবং নির্মাণখাতে সীমিত সংখ্যক এ দেশের শ্রমিক নিয়োগের অনুমতি দেয় সাবেক ফরমোজা। শুধু তা-ই নয়, মাত্র ১,০০০ জনকে নিয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে একটি প্রকল্পও শুরু করে তারা। পরবর্তী দু’বছরে সেই সংখ্যা ধীরে ধীরে আরও বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজারে পৌঁছেছে।

০৫ ২০

চুক্তি অনুযায়ী, শিল্পোৎপাদন, কৃষি এবং নির্মাণক্ষেত্রে ভারতীয় শ্রমিকদের কাজে লাগাচ্ছে তাইওয়ান। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গিয়ে কাজ করতে যাতে সমস্যা না হয়, সে দিকেও নজর রয়েছে তাদের। আর তাই অসম, মিজ়োরাম এবং নাগাল্যান্ড-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের শ্রমিক হিসাবে পাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে তারা। তবে অন্য রাজ্যের কাউকে নিয়োগ করা হবে না, এ কথা অবশ্য বলা হয়নি।

০৬ ২০

তাইওয়ানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত লক্ষ। এঁদের সিংহভাগই ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স এবং তাইল্যান্ড থেকে কাজ করতে এসেছেন। গত কয়েক বছর ধরেই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। উল্টো দিকে কমছে জন্মহার। এই দুইয়ের জেরে দক্ষ শ্রমিকের অভাবে ভুগছে তারা। ফলে বাধ্য হয়ে এই প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরের একটি দেশের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।

০৭ ২০

এ-হেন পরিস্থিতিতে পুরনির্বাচনের প্রার্থী হয়ে কেন ভারতীয় শ্রমিকদের নিষিদ্ধ করার কথা বললেন লি? স্থানীয় ‘সেন্ট্রাল নিউজ় এজেন্সি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ওই ব্যক্তি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি সামগ্রিক ভাবে অভিবাসী শ্রমিকনীতির বিরোধী নই। কিন্তু, ভারতীয়দের এখানে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। এতে আগামী দিনে আমাদেরই সমস্যা হবে। তাই জাতীয় স্বার্থে পোস্টার দিয়েছি।’’

০৮ ২০

এ ব্যাপারে সমাজমাধ্যমে মুখ খুলেছেন তাইওয়ান বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিচিত সানা হাশমি। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন চিনের প্রভাবমুক্ত নয়। আর তাই ভারতীয় শ্রমিকদের কাজে লাগানোর বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে। এটা আগামী দিনে গণ আন্দোলনেরও রূপ নিতে পারে। তাই দিল্লিকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’’

০৯ ২০

ওই পোস্টে আরও একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সানা। তাঁর কথায়, ‘‘অধিকাংশ তাইওয়ানবাসীর ভারত সম্পর্কে ধারণা খুব একটা স্বচ্ছ নয়। এই উপমহাদেশ সম্পর্কে তারা প্রায় কিছুই জানেন না বলা যেতে পারে। সেই চিন্তাভাবনা থেকেও হয়তো এখানকার শ্রমিকদের ঢোকা আটকাতে চাইছেন দ্বীপরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী। তবে তাঁদের পুরনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’’

১০ ২০

‘ফার্স্টপোস্ট’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাশমি বলেন, ‘‘ভারত-তাইওয়ান শ্রমচুক্তি অবশ্যই দ্বীপরাষ্ট্রের ভোটের অঙ্ক পাল্টে দিতে পারে। লি-র রাস্তায় হেঁটে এই সমঝোতার প্রবল বিরোধিতা করছে কুওমিনটাং বা কেটিএম নামে সেখানকার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। ফলে আগামী দিনে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির ‘সুনজরে’ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের।’’

১১ ২০

বর্তমানে তাইওয়ান শাসন করছে ‘ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ (ডিপিপি)। দ্বীপরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে তারা। অন্য দিকে কুওমিনটাঙের অবস্থান ঠিক এর বিপরীতে। বেশ কয়েক বার চিনের সঙ্গে মিশে যাওয়া দাবি তুলেছে তারা। কারণ, সাবেক ফরমোজাকে বরাবরই নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে এসেছে বেজিং।

১২ ২০

তার পরেও অভিবাসী শ্রমিক ইস্যুতে দু’টি ব্যাপারে স্বস্তি পেয়েছে ভারত। প্রথমত, স্থানীয় পুরনির্বাচনে নির্দল হিসাবে লড়ছেন লি। দ্বিতীয়ত, তাঁর ওই পোস্টারের কড়া সমালোচনা করেছে তাইওয়ানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। তাদের সাফ কথা, ভারতীয় শ্রমিকদের দেশে ঢুকতে দিচ্ছে সরকার। স্বেচ্ছায় বা জোর করে তাঁরা আসেননি। ফলে সমস্যা সমাধানে সেই নীতি পাল্টাতে হবে। সেটা না করে বহিরাগতদের দোষ দেওয়া অনুচিত।

১৩ ২০

লি-র দেওয়া পোস্টারকে কেন্দ্র করে ‘সেন্ট্রাল নিউজ় এজেন্সি’কে তাইওয়ানের নিউ পাওয়ার পার্টির কাওশিউং শাখার প্রধান ওয়াং ই-হেং বলেন, ‘‘আমরা এই ঘটনার নিন্দা করছি। চরম অজ্ঞতা থেকে এই কাজ করা হয়েছে।’’ পাশাপাশি, বিবৃতি দিয়েছেন, সাবেক ফরমোজার ইকোনমিক অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার। সেখানে বলা হয়, ‘‘আমরা ভারতীয় অভিবাসী শ্রমিকদের আনার পরিকল্পনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ বৈষম্যমূলক মন্তব্য করলেও আমাদের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হবে না।’’

১৪ ২০

২০২৩ সালে মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট হন মহম্মদ মুইজ্জু। নির্বাচনী প্রচারে ভারত বিরোধিতাকেই সবচেয়ে বড় ইস্যু করেন তিনি। ক্ষমতা হাতে আসার পর নয়াদিল্লিকে সেনা সরানোর আর্জি জানাতে দেখা যায় তাঁকে। এ ব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার জন্য একটি কমিটিও গঠন করে তাঁর সরকার। ফলে দু’তরফে বাড়তে থাকে রাজনৈতিক উত্তাপ।

১৫ ২০

কুর্সিতে বসার পর বেশ কয়েক বার চিনসফর করেন প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁর সচিবালয়ের শীর্ষ আধিকারিক আবদুল্লা নাজ়িম ইব্রাহিম বলেন, ‘‘আমরা ভারতীয় সেনাকে মলদ্বীপে থাকতে দিতে পারি না। প্রশাসনিক ভাবে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে।’’ ওই সময় জানা যায়, দ্বীপরাষ্ট্রটিতে মাত্র ৮৮ জন সৈনিককে মোতায়েন রেখেছে নয়াদিল্লি।

১৬ ২০

২০১০ সালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অংশ হিসাবে মলদ্বীপে ফৌজ পাঠায় ভারত। উদ্দেশ্য, সেখানকার সেনাকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি, মলদ্বীপের প্রত্যন্ত দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য মানবিক সহায়তা এবং চিকিৎসা উপাদান পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করত তারা। এর জন্য ব্যবহার হচ্ছিল এ দেশের ‘ধ্রুব’ নামের সামরিক কপ্টার।

১৭ ২০

২০২৪ সালেই মলদ্বীপ থেকে সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করে নয়াদিল্লি। গোটা ঘটনার নেপথ্যে চিনের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, ভারতের বাহিনী কোথাও দ্বীপরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করেনি। তার পরেও মিথ্যা প্রচার চালিয়ে কুর্সি পান মুইজ্জু।

১৮ ২০

সেনা প্রত্যাহার করলেও মলদ্বীপে ভারতের রাশ আলগা হয়েছে, এ কথা ভাবলে ভুল হবে। গত বছর (২০২৫) দ্বীপরাষ্ট্রটিতে সফরকালে সেখানকার প্রতিরক্ষা ভবন ‘তোশিমা বিল্ডিং’-এর উদ্বোধন করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ১১তলা ওই বহুতলটি তৈরিও করেছে নয়াদিল্লি। ভারত বিরোধিতার তীব্রতা অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে সেখানে।

১৯ ২০

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখতে পাওয়া যেতে পারে। কারণ, ‘এক চিন’ নীতি মেনে সাবেক ফরমোজ়ার সঙ্গে আলাদা করে কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি ভারত। তবে দু’তরফে বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান রয়েছে। সেটা বেজিঙের জন্য যে অস্বস্তিকর, তা বলাই বাহুল্য।

২০ ২০

তা ছাড়া গত কয়েক বছর ধরেই চিনের প্রতিবেশী দেশগুলিকে অত্যাধুনিক হাতিয়ার বিক্রি করছে ভারত। উদাহরণ হিসাবে ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের কথা বলা যেতে পারে। এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের চুক্তি সেরেছে নয়াদিল্লি। আগামী দিনে তালিকায় তাইওয়ান যুক্ত হলে উদ্বেগ বাড়বে চিনের। আর তাই পর্দার আড়ালে থেকে ভারত বিরোধিতাকে হাওয়া দিচ্ছে তারা, মত প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের।

ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement