অর্থনীতিতে উলটপুরাণ! ডলারের বিপরীতে হু-হু করে বাড়ছে রুশ রুবলের দাম। অন্য দিকে খাদে গড়াগড়ি খাচ্ছে ভারতের রুপি! তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য গত চার বছর ধরে মস্কোর উপর বহাল রয়েছে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়ায় ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা। তার পরেও ‘ঝোড়ো ব্যাটিং’য়ে সকলের চোখ টেনেছে রুবল।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ব জুড়ে তীব্র আকার ধারণ করে জ্বালানি সঙ্কট। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে রুশ খনিজ তেল ‘উরাল ক্রুড’-এর চাহিদা। গত তিন মাসে সেই তরল সোনা বিক্রি করে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে মস্কো। ফলে ডলারের বিপরীতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে রুবল।
জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম ‘ব্লুমবার্গ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিলের গোড়া থেকে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে রুশ মুদ্রার মূল্য। ফলে ডলারের বিপরীতে ৭২.৬-তে পৌঁছে গিয়েছে সেটি, ফেব্রুয়ারির পর যা সর্বোচ্চ। রুবলের এ-হেন পারফরম্যান্সে যাবতীয় আশঙ্কা যে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
টানা দু’বছর ধরে রুশ মুদ্রার অবমূল্যায়নের (ডলারের নিরিখে মূল্য হ্রাস) পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ। যদিও বাস্তবে পুরোপুরি তার উল্টো ছবি ধরা পড়ায় হতবাক হয়েছেন তাঁরা। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান পরিস্থিতিকে রুবলের অতিমূল্যায়নের সঙ্গেও তুলনা করতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, ডলারের বিপরীতে রুশ মুদ্রা শক্তিশালী হওয়ায় পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা সামলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হচ্ছে মস্কো। এর ১৬ আনা কৃতিত্ব প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দিচ্ছেন তাঁরা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁর নির্দেশে কঠোর মুদ্রানীতি মেনে চলছে পূর্ব ইউরোপের এই দেশ।
‘ব্লুমবার্গ’ জানিয়েছে, পুতিনের এ-হেন সিদ্ধান্তে রাশিয়ার অভ্যন্তরে কমেছে মুদ্রাস্ফীতির চাপ। তাঁর আমলে রফতানি খাতে বৃদ্ধি পেয়েছে মস্কোর আয়। সঙ্কুচিত হয়েছে রাজস্ব বাজেট। ফলে যুদ্ধের বিপুল খরচ সামলেও দিব্যি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মস্কোর অর্থনীতি।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন রুশ অর্থমন্ত্রী ম্যাক্সিম রেশেতনিকভ। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের আর্থিক মডেল আগামী দিনে রুবলকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি শক্তিশালী করে তুলবে। কারণ, এটা পুঁজির বহির্গমনকে সীমিত রেখেছে।’’ মস্কোর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হতে চলেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
পুতিন প্রশাসনের দাবি, পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিয়েছে তারা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে আমদানি কমিয়েছে রাশিয়া। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা অনেকটাই কমাতে সক্ষম হয়েছে মস্কো। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশ রুবলে করছে পূর্ব ইউরোপের এই দেশ।
দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কমাতে স্থানীয় সুদের হার অনেকটাই বৃদ্ধি করেছেন পুতিন। এর জেরে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মস্কোর অর্থনীতির সূচক। অন্য দিকে, সংঘর্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিপক্ষকে মাত দিতে হরমুজ় প্রণালীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হিসাবে পরিচিত।
হরমুজ় বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির খনিজ তেল রফতানিতে পড়েছে ভাটা। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই রাশিয়ার তরল সোনা বিক্রির উপর থেকে সাময়িক ভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আমেরিকা। সঙ্গে সঙ্গে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ‘উরাল ক্রুড’ নিয়ে বিশ্ববাজারে হাজির হন পুতিন, যা মস্কোর অর্থনৈতিক সূচককে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলেছে।
রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ বছরের মার্চে বিশ্ববাজারে ‘উরাল ক্রুড’-এর গড় মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ৪৪.৬ ডলার। এপ্রিলে এক লাফে সেটা বেড়ে ৭৭ ডলারে পৌঁছে যায়। ফলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তিন গুণের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয় তারা, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৭৩০ কোটি ডলার।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে লাগাতার বৃদ্ধি পেয়েছে রুশ খনিজ তেলের দাম। ওই মাসের শেষের দিকে বাড়তে বাড়তে প্রতি ব্যারেলে সেটা ৯৪.৯ ডলারে পৌঁছে যায়। ফলে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে কোনও সমস্যা হচ্ছে না প্রেসিডেন্ট পুতিনের।
বৈদেশিক মুদ্রা কেনার জন্য মস্কোর একটি ‘জাতীয় কল্যাণ তহবিল’ রয়েছে, যেটা অপরিশোধিত খনিজ তেলের দামের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ব্যারেলপ্রতি ৫৯ ডলারের বেশি মূল্যে ‘উরাল ক্রুড’ বিক্রি হলে, আয় করা অতিরিক্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট তহবিলে পাঠিয়ে দেয় সেখানকার যাবতীয় জ্বালানি সংস্থা। আবার দাম পড়ে গেলে তাদের লোকসান সামলাতে ওই তহবিল থেকেই টাকা দিয়ে থাকেন পুতিন।
আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই ব্যবস্থার জোরেই ডলারের বিপরীতে রুবল-মূল্যের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে রুশ প্রশাসন। চলতি বছরের মে মাসে ‘জাতীয় কল্যাণ তহবিল’-এর অর্থে নতুন করে বৈদেশিক মুদ্রা এবং সোনা আমদানিতে মন দেয় মস্কো। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনের পর থেকে তা বন্ধ রাখতে একরকম বাধ্য হয়েছিলেন পুতিন।
সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা এবং সোনা কেনার জন্য ‘জাতীয় কল্যাণ তহবিল’-এর ১১,০০০ কোটি রুবল বরাদ্দ করেছে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। মার্কিন মু্দ্রায় এই অঙ্ক প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের অনুমান, ইরান সংঘাত অব্যাহত থাকলে আগামী জুনে সুদের হার হ্রাস করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করবে মস্কো। তাতে আরও শক্তিশালী হতে পারে রুবল।
রুশ মুদ্রা শক্তিশালী হওয়ায় ডলার-রুবল বিনিময়ের সম্ভাব্য হার সংশোধন করেছে মস্কো। আগে সেটা ৯২.২ ডলার ধার্য করা হয়েছিল। পুতিন প্রশাসনের অনুমান, সেই সূচক নেমে ৮১.৫ ডলারে ঘোরাফেরা করবে। আর তাই ‘উরাল ক্রুড’-এর চাহিদা বজায় থাকলে সব কিছু বজায় থাকবে বলেই মনে করছে পূর্ব ইউরোপের দেশটির অর্থ মন্ত্রক।
অন্য দিকে, জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রুপির অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। ডলারের বিপরীতে বর্তমানে ৯৭-এর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় মুদ্রা। বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের দাম ১০৪ ডলারে ঘোরাফেরা করছে। এই দর আরও বৃদ্ধি পেলে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ১০০ ছাপিয়ে যেতে পারে বলেও মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
রাশিয়ার থেকে ভারতের বিদেশি মুদ্রাভান্ডার অনেক বেশি শক্তিশালী। তা ছাড়া নয়াদিল্লির উপরে নেই কোনও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ। তার পরেও ডলারের নিরিখে রুপির দাম পড়ে যাওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ডলারের বিপরীতে রুপিকে শক্তিশালী করতে হলে ভারতকে কমাতে হবে আমদানি। পাশাপাশি, রফতানি বাণিজ্যেও যথেষ্ট সাফল্য প্রয়োজন। কিন্তু, বাস্তবে রাশিয়া, চিন এবং ইউরোপের অধিকাংশ উন্নত অর্থনৈতিক দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে নয়াদিল্লির, যা দেশের অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সূচককে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে হলে ভারতের চাই বিপুল জ্বালানি। সেই লক্ষ্যে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে বিপুল পরিমাণে খনিজ তেল আমদানি করতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে। তরল সোনার ৮৫ শতাংশই বিদেশ থেকে কিনে থাকে কেন্দ্র। এতে শক্তিশালী হচ্ছে ডলার। আর অন্য দিকে লাফিয়ে নামছে রুপির মূল্য।