Chinese Brain Chip

বাজার কাঁপাতে আসছে ‘চিনা মাল’! মাস্ককে টেক্কা দিয়ে ‘ব্রেন চিপ’ তৈরি করে ফেলল চিন, শুরু বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রিও

চিনের তৈরি ওই মস্তিষ্ক-চিপটির নাম ‘নিয়ো’। বেজিঙের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংহাই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নিউরাকল টেকনোলজি’র গবেষকেরা যৌথ ভাবে তৈরি করেছেন এই চিপ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ১২:১৯
Share:
০১ ১৯

দীর্ঘ দিন ধরে ব্রেন-কম্পিউটার প্রযুক্তি বা ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’-এর ক্ষেত্রে মূল মনোযোগ ছিল আমেরিকার ধনকুবের ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক এবং তাঁর সংস্থা ‘নিউরালিঙ্ক’-এর। তবে ‘নিউরালিঙ্ক’ যখন সীমিত সংখ্যক রোগীর উপর তাদের যন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন চিন এমন একটি বড় পদক্ষেপ করেছে যা মাস্কের সংস্থা এখনও অর্জন করতে পারেনি।

০২ ১৯

অর্থাৎ, সোজা কথায় বলতে গেলে ব্রেন-কম্পিউটার প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইলন মাস্কের সংস্থাকে টেক্কা দিয়েছে চিন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিন বিশ্বের প্রথম ‘ব্রেন-কম্পিউটার চিপ’ হিসাবে এমন একটি যন্ত্রের অনুমোদন দিয়েছে, যা মানবদেহে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রির ছাড়পত্র পেয়েছে।

Advertisement
০৩ ১৯

চিনের তৈরি ওই চিপটির নাম ‘নিয়ো’। বেজিঙের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংহাই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নিউরাকল টেকনোলজি’র গবেষকেরা যৌথ ভাবে তৈরি করেছেন এই চিপ। মুদ্রার আকৃতির এই চিপটি মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের সহায়তার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

০৪ ১৯

সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য ব্যাপক হারে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে চিপটির। অর্থাৎ, মাস্কের নিউরালিঙ্কের আগেই চিন এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে। ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ বা মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের মধ্যে সংযোগকারী প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় চিনের এই পদক্ষেপ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

০৫ ১৯

নিউরালিঙ্ক ২০২৪ সালে মানুষের উপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করলেও, তাদের ‘এন১’ চিপ সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য এখনও ছাড়পত্র পায়নি। অন্য দিকে, চিনের ‘নিয়ো’ ইতিমধ্যেই মানবদেহে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্রও পেয়েছে।

০৬ ১৯

‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত ৩৬ জন রোগীর উপর ‘নিয়ো’ পরীক্ষা করা হয়েছিল। অন্য দিকে নিউরালিঙ্কের ‘এন১’ যন্ত্র বর্তমানে মাত্র ন’জন রোগীর উপর পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই অগ্রগতির ফলে এমন একটি ক্ষেত্রে চিন প্রথম স্থানে চলে এসেছে, যা আগামী দশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে অনেক গবেষক এবং বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন।

০৭ ১৯

‘নিয়ো’ ব্রেন চিপের কার্যকারিতা কী? এর প্রথম সংস্করণটি মূলত স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের, বিশেষ করে যাঁরা পক্ষাঘাত (প্যারালাইসিস) এবং মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের সাহায্য করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।

০৮ ১৯

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেন চিপ সমন্বিত ছোট্ট যন্ত্রটি খুলি এবং ঘিলুর মাঝখানে স্থাপন করা হয় এবং এর আটটি ‘সেন্সর’ মস্তিষ্কের বাইরের সুরক্ষাদায়ক আবরণ বা ‘ডুরা ম্যাটার’-এর সংস্পর্শে থাকে। সেন্সরগুলো নিকটবর্তী কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং একটি সেন্ট্রাল প্রসেসিং সিস্টেম মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে ডিজিটাল কমান্ড বা নির্দেশে রূপান্তরিত করে।

০৯ ১৯

জানা গিয়েছে, শরীরের গভীরে বা মস্তিষ্কের টিস্যু (কলা)-র ভিতরে সরাসরি প্রবেশ করাতে হয় এমন চিপ বা যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত কিছু ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই গবেষকেরা এই নকশাটি বেছে নিয়েছেন। কিন্তু চিনের নকশা কেন মাস্কের নিউরালিঙ্কের চেয়ে আলাদা? উভয় পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম প্রধান পার্থক্য হল মস্তিষ্কের সঙ্গে এদের সংযোগের ধরন। নিউরালিঙ্কের ‘এন১’ প্রোটোটাইপটির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সঙ্কেত সংগ্রহের জন্য ইলেকট্রোডগুলিকে মস্তিষ্কের বাইরের আবরণ বা ‘সেরিব্রাল কর্টেক্স’-এর ভিতরে প্রবেশ করাতে হয়।

১০ ১৯

অন্য দিকে, ‘নিয়ো’ চিপের ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি তুলনামূলক ভাবে কম জটিল। এতে সেন্সরগুলিকে মস্তিষ্কের গভীর কলাকোষে প্রবেশ না করিয়ে বরং মস্তিষ্কের বাইরের সুরক্ষামূলক স্তরের উপর স্থাপন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের চিপটি কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং মস্তিষ্কের বেশি গভীরে প্রবেশ না করানোর কারণেই হয়তো এটি দ্রুত অনুমোদন পেয়েছে।

১১ ১৯

মস্তিষ্কের চিপের সম্ভাবনা নিয়ে মাস্কের প্রচেষ্টা দীর্ঘ দিনের। আমেরিকার ধনকুবের প্রযুক্তি ব্যবসায়ী বার বার ব্রেন-কম্পিউটার প্রযুক্তির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। ইজ়রায়েলে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মাস্ক গুরুতর পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের চলাফেরার ক্ষমতা এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে উল্লেখ করেন। ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি এই প্রযুক্তিকে ‘যিশুর অলৌকিক ক্ষমতার সমতুল্য প্রযুক্তি’ বলে অভিহিত করেন।

১২ ১৯

নিউরালিঙ্ক জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ভবিষ্যতে কেবল চিন্তাশক্তির সাহায্যেই কোনও কিছু লেখা (টাইপ করা) বা কম্পিউটারের কার্সার নিয়ন্ত্রণ করার মতো কাজগুলি করতে পারবেন।

১৩ ১৯

নিউরালিঙ্কের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী অড্রে ক্রুজ় সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘‘গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম আমি আমার নাম লেখার চেষ্টা করেছি। আমি এ নিয়ে আরও কাজ করার চেষ্টা করছি। এটা ভেবে খুব ভাল লাগছে যে আমার এই অভিজ্ঞতা নিউরালিঙ্ককে প্রযুক্তিটি আরও উন্নত করতে সহায়তা করছে। হয়তো একদিন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ কেবল মনের জোরে বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।’’

১৪ ১৯

গবেষকদের মতে, ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষের উপকারে আসতে পারে। চলাফেরা এবং কথা বলার সমস্যা ছাড়াও বিষণ্ণতা, মৃগী, স্ট্রোক এবং পারকিনসন্সের চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

১৫ ১৯

বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সব রোগী শারীরিক অবস্থার কারণে নড়াচড়া বা হাঁটাচলা করতে পারেন না, এই চিপ সমন্বিত যন্ত্রগুলি তাদের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে পারে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় হলেও, বিশেষজ্ঞদের একাংশ এ-ও সতর্ক করেছেন, ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ গোপনীয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দেয়।

১৬ ১৯

গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডেভিড টাফলির দাবি, তাত্ত্বিক ভাবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চিন্তা এবং স্মৃতি-সহ অত্যন্ত সংবেদনশীল স্নায়বিক তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি এ-ও সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের প্রযুক্তি হ্যাক করা হলে তা মানুষের সাধারণ কার্যকারিতা, এমনকি হাঁটাচলার সঙ্গে সম্পর্কিত সঙ্কেতকেও ব্যাহত করতে পারে।

১৭ ১৯

যেহেতু ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস অত্যন্ত ব্যক্তিগত সব তথ্য নিয়ে কাজ করে, তাই প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের মালিকানা, নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

১৮ ১৯

তবে ব্রেন চিপ কার্যকর হলেও এখনও এর প্রয়োগে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে। গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, মানবদেহের ভিতরে যন্ত্র স্থাপন করা বা ‘ইমপ্লান্ট’ করার বিষয়টি এখনও একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। প্রতিবন্ধকতাগুলির মধ্যে রয়েছে বহিরাগত বস্তুর বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া দেখানো, ইমপ্লান্টের চারপাশে ক্ষতিগ্রস্ত কলা বা ‘স্কার টিস্যু’ তৈরি হওয়া এবং সংক্রমণ হলে আশপাশের টিস্যুতে ক্ষতির ঝুঁকি।

১৯ ১৯

নিউ ইয়র্ক পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ টাফলি উল্লেখ করেছেন যে, কোনও সমস্যা দেখা দিলে রক্তপাত, ফোলা ভাব কিংবা কথা বলা এবং হাঁটাচলার নেপথ্যে থাকা মস্তিষ্কের অংশে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পরিণতি গুরুতরও হতে পারে। যে কোনও সংস্থা বা দেশই এই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকুক না কেন, ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ প্রযুক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জগুলি সব সময়ই একটি মুখ্য বিষয় হিসাবে থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement