Bengali Literature

বিন্দুবাসিনী হল্ট

“বাবা অনেক দিন পোস্টেড ছিলেন বিন্দুবাসিনী হল্ট স্টেশনে। সেখান থেকেই কেউ লিখেছেন বোধহয়। দেখি চিঠিটা এক বার!”  

দেবপ্রিয়া সরকার

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৯:৩৬
Share:

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

শ্রদ্ধাভাজনেষু,

আপনার কন্যা রোগশয্যায়। তার ইচ্ছে এক বার আপনার পায়ের ধুলো নেওয়া। দেরি না করে তাড়াতাড়ি চলে আসার অনুরোধ করছি।

ইতি-

নরোত্তম দাস

পরলোকগত দাদামশাইয়ের নামে আসা তিন লাইনের চিঠিখানা পড়ে হকচকিয়ে গেল শুভায়ু। শুভায়ুকে চিঠি হাতে ঘরে ঢুকতে দেখে তার মা অনামিকা বললেন, “কার চিঠি রে?”

শুভায়ু উদাসীন গলায় বলল, “নরোত্তম দাসের।”

“নরোত্তম দাস! সে আবার কে? কোথা থেকে লিখেছেন?”

অনামিকার গলার স্বর বিস্মিত শোনাল। খামের বাঁদিকে লেখা প্রেরকের ঠিকানায় চোখ বুলিয়ে শুভায়ু বলল, “বিন্দুবাসিনী থেকে।”

“বাবা অনেক দিন পোস্টেড ছিলেন বিন্দুবাসিনী হল্ট স্টেশনে। সেখান থেকেই কেউ লিখেছেন বোধহয়। দেখি চিঠিটা এক বার!”

শুভায়ু একটু ইতস্তত করে মায়ের হাতে দিয়ে দিল চিঠিটা। অনামিকা এক ঝলক দেখেই বিস্ফারিত চোখে বললেন, “এ আবার কী ধরনের রসিকতা? বাবার তো একটিই সন্তান এবং সেটা আমি। বিন্দুবাসিনীতে আবার এত বছর পরে কোন মেয়ে জন্মাল? যত্তসব পাগলের প্রলাপ! ফেলে দে এ-সব ভুলভাল চিঠি।”

চিঠিটাকে মুঠোয় পাকিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিয়ে অনামিকা চলে গেলেন। শুভায়ু ধীরপায়ে এগিয়ে এসে দলা-পাকানো কাগজটা তুলে নিল। নিজের ঘরে এসে আরও এক বার চিঠির লেখাটায় চোখ বোলাল। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল খামের উপরে লেখা ঠিকানাটাও।

শুভায়ুর বাবা অরুণাভ বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার কয়েক মাস পরেই দাদামশাই অলোক ঘোষালের হাত ধরে শুভায়ু আর তার মা তাদের পৈতৃক ভিটে ছেড়ে চলে এসেছিল পাকাপাকি ভাবে। শুভায়ু তখন ক্লাস ফাইভে। সেই থেকে দাদুর বাড়িটাই তার নিজের বাড়ি। রেলে চাকরির সুবাদে সারা জীবন দাদুর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কেটেছে। রিটায়ার করার পর বিপত্নীক দাদুর শুভায়ুদের নিয়েই হেসেখেলে দিন কাটছিল। কিন্তু আচমকাই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক কেড়ে নিল প্রাণ।

শুভায়ু বিষয়টা নিয়ে তলিয়ে ভাবতে চেষ্টা করল। তার মা অনামিকাই প্রয়াত অলোককুমার ঘোষালের একমাত্র মেয়ে। দ্বিতীয় কোনও সন্তান তাঁর নেই। রক্তের সম্পর্ক না থাকলে কেউ কেন খামোখা তাঁকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করবে? তবে কি সকলের অজ্ঞাতে কোনও গোপন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন অলোক ঘোষাল? এই সন্তান কি সেই অবৈধ সম্পর্কের ফসল? কে জানে, দাদু আবার গোপনে কোনও উইল-টুইল করে গিয়েছেন কি না! তা হলে তো সে এসে দাবি করবে অলোক ঘোষালের সম্পত্তির অংশ। ভাগাভাগি হয়ে যাবে বসতবাড়িটাও!

চিন্তিত মনে দু’দিন কাটিয়ে অবশেষে শুভায়ু অনামিকাকে বলল, “অনেক হয়েছে মা, এই সাসপেন্স আর নিতে পারছি না। আগামী কালই আমি বিন্দুবাসিনী যাচ্ছি। নিজের চোখে দেখে আাসি পুরো ঘটনাটা।”

অনামিকা বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। কে না কে, কী একখানা রসিকতা করল তাই নিয়ে...”

অনামিকাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে শুভায়ু বলল, “এটা রসিকতা না সত্যি ঘটনা, সে আমি জানি না। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি, এই একটা চিঠি আমাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করেছে। আমাকে জানতেই হবে কে এই নরোত্তম দাস? দাদুর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? দাদুর কোন কন্যার কথাই বা সে বোঝাতে চাইছে?”

“একটা অজানা-অচেনা জায়গায় গিয়ে তুই একা কী করবি?”

“আমি গুগল ম্যাপে দেখে নিয়েছি মা, ছোট্ট একটা স্টেশন এই বিন্দুবাসিনী। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক খোঁজাখুঁজি করে বার করে নেব নরোত্তম দাসের হদিস।”

মাকে আশ্বস্ত করে পরদিন ভোর-ভোর রওনা দিয়ে বিন্দুবাসিনী হল্টে শুভায়ু যখন পৌঁছল, তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমেছে। প্রথমে উঁকি দিল স্টেশন মাস্টারের একটেরে ঘরটায়। এক জন মাঝবয়সি ভদ্রলোক বসে লেখালিখি করছিলেন। দরজার কাছে শুভায়ুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, “কী চাই?”

“আমি শুভায়ু সরখেল। আমার দাদু স্টেশন মাস্টার হিসেবে কয়েক বছর এখানে পোস্টেড ছিলেন।”

“কী নাম দাদুর?”

শুভায়ু উৎসাহিত হয়ে উত্তর দিল, “অলোককুমার ঘোষাল।”

ভদ্রলোক আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “অলোক ঘোষাল! আপনি ওঁর নাতি?”

“হ্যাঁ। আপনি চিনতেন দাদুকে?”

“আলাপ-পরিচয় কিছু নেই। কিন্তু এখানে আসা ইস্তক এত বার নামটা শুনেছি যে, মনে হয় উনি আমার অনেক দিনের পরিচিত। আপনি একটু বসুন ভাই, আমি একটা টেলিফোন করে নিই।”

শুভায়ু ভদ্রলোকের ব্যবহার দেখে বেশ অবাক হল। দাদুর নাম শুনেই যেভাবে লাফিয়ে উঠলেন, তাতে মনে হল যেন লটারি পেয়েছেন। বাইরে গিয়ে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বললেন ভদ্রলোক। তার পর ফিরে এসে হাসিমুখে বললেন, “আপনার জন্য চা-জল আনতে বলি?”

“না না, তার দরকার নেই। আমি খেয়ে এসেছি।”

“সে কী বলছেন ভাই? আপনি অলোকবাবুর নাতি। একটু যত্ন-আত্তি করব না?”

লোকটার ব্যবহার হেঁয়ালির মতো লাগছিল। শুভায়ু ভাবছিল, ওর দাদু এমন কী কাজ করেছিলেন, যার জন্যে তাঁর নাতিকে পেয়ে ভদ্রলোক এমন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আচরণ করছেন? শুভায়ু একটু ইতস্তত করে বলল, “নরোত্তম দাস নামে কাউকে চেনেন আপনি? উনি চিঠি লিখেছিলেন দাদুর ঠিকানায়...”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের বাইরে থেকে ভেসে এল মোটরবাইকের শব্দ। স্টেশনমাস্টার ভদ্রলোক বললেন, “ওই তো করিমুল আপনাকে নিতে এসেছে। ওর সঙ্গে যান, যাঁদের খুঁজছেন পেয়ে যাবেন।”

কয়েক মিনিটের মধ্যে করিমুল বিনা বাক্যব্যয়ে তাকে পৌঁছে দিল গন্তব্যে। ধুলো উড়িয়ে করিমুলের বাইক বিদায় নিতেই শুভায়ুর নজর পড়ল পুরনো দিনের চুন-সুরকির বাড়িটার দিকে। শুভায়ু দরজায় কড়া নাড়তেই ভিতর থেকে শব্দ এল, “আসছি বাপু, আসছি।”

এক জন বয়স্কা মহিলা দরজার পাল্লা সামান্য খুলে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে চাই?”

“নরোত্তম দাস বাড়িতে আছেন?”

ভদ্রমহিলা উপর থেকে নীচ অবধি শুভায়ুকে জরিপ করে বললেন, “কে? দাদা? একটু দাঁড়ান, ডেকে দিচ্ছি।”

ভদ্রমহিলা দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। আবার ফিরেও এলেন মিনিট দুয়েক পরে। হাসিমুখে দরজাটা হাট করে খুলে বললেন, “দেখুন দেখি কাণ্ড! আপনি অলোকবাবুর নাতি আগে বলবেন তো! শুধু শুধু দোরের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলুম। আসুন আসুন, ভিতরে আসুন। আমি শরবত নিয়ে আসি।”

শুভায়ুকে একটা কাঠের চেয়ারে বসতে দিয়ে ভদ্রমহিলা ভিতরে চলে গেলেন। মিনিট দশেক পর একটা পাথরের গ্লাসে আমপোড়ার সরবত এনে রাখলেন শুভায়ুর সামনে। তার পর প্রসন্নমুখে পাখার বাতাস করতে করতে বললেন, “তুমি বয়সে অনেক ছোট, তাই তুমি করেই বলছি। তোমার নাম শুভায়ু, তাই তো? তোমার মা অনামিকার শরীর কেমন আছে? সেই যে বার তোমার পরীক্ষার আগে মা শীতলা দয়া করলেন, তখন আমিই তো গিয়ে সত্যপীরের থানে বাতাসা মানত করে এলুম। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠার পর অলোকবাবু খুশি হয়ে আমাকে একখানা তাঁতের কাপড় কিনে দিয়েছিলেন। বড্ড ভাল মনের মানুষ বটেন অলোকবাবু।”

“কী রে জানকী, কী এত ছাইপাঁশ বকছিস শুভায়ুর সঙ্গে? ওকে এট্টু জিরোতে দে। বেচারা এতটা রাস্তা কষ্ট করে এসেছে।”

ভিতরবাড়ির দরজার কাছে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক জন বয়স্ক পুরুষমানুষকে দেখতে পেল শুভায়ু। ইনিই সম্ভবত ওই চিঠির লেখক, নরোত্তম দাস। ক্লাস টেনের টেস্ট পরীক্ষার আগে হওয়া চিকেন পক্সের কথা শুভায়ু কোন কালে ভুলে গিয়েছে, কিন্তু এই অচেনা, অজানা ভদ্রমহিলা সে কথা এখনও মনে রেখেছেন! দাদুর সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠতা কোন পর্যায়ে ছিল, সেটা ভালই অনুমান করতে পারছে শুভায়ু। দরজার কাছ থেকে লাঠি ঠুকে ঠুকে নরোত্তম ঘরের ভিতর চলে এলেন। একটা খালি তক্তপোশের উপর বসে বললেন, “যা জানকী, রাইকে ডেকে নিয়ে আয়।”

শুভায়ুর দিকে চেয়ে বললেন, “তোমার দাদু আমাদের অত্যন্ত আপনজন। এখান থেকে উনি চলে যাওয়ার পরও প্রায়ই আমাদের টেলিফোনে কথা হত। কিন্তু অনেক দিন হল ওঁর কোনও সংবাদ পাইনি। ফোনের নম্বরটা লাগে না আর। এক বার ভেবেছিলাম নিজেই চলে যাব ওঁর খবরাখবর নিতে। কিন্তু শরীর আজকাল সঙ্গ দেয় না। ওদিকে মেয়ে তো নাছোড়বান্দা। ‘বাবা, বাবা’ করে একেবারে অস্থির!”

জানকীর সঙ্গে এক জন রুগ্ণ যুবতী ঘরে ঢুকল। নরোত্তম বললেন, “এসো এসো রাইকিশোরী। এই দেখো, অলোকবাবু তাঁর নাতিকে পাঠিয়েছেন তোমার খবর নিতে। তুমি খামোখা চিন্তা করছিলে।”

মহিলার বয়স সাতাশ-আটাশের বেশি হবে না। করুণদৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা আসেনি?”

শুভায়ু এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, “দাদু আর বেঁচে নেই। হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছেন ছ’মাস আগে। দাদুর মোবাইল ফোন পছন্দ ছিল না। তাই বাড়ির ল্যান্ডফোনটা উনি ব্যবহার করতেন। দাদু মারা যাওয়ার পর ওটা আমরা আর রাখিনি। তাই ফোনের লাইনটা পাননি আপনি।”

শুভায়ুর মুখে ওর দাদুর মৃত্যুসংবাদ শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন সকলে। ডুকরে কেঁদে উঠলেন জানকী। রাইকিশোরীও শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ফোঁপাতে লাগল। নরোত্তম চুপচাপ বসে রইলেন মাথা নিচু করে। রাইকিশোরী কান্নাভেজা গলায় বলল, “আমি এবারে সত্যিকারের অনাথ হলাম গো পিসিমা।”

শোক সামলে নরোত্তম বললেন, “কাঁদিস না রাইমা, মানুষ চিরকাল বাঁচে না। ওকে ঘরে নিয়ে যা জানকী।”

শুভায়ুর মন উসখুস করছিল। রাইকিশোরী ও জানকী বিদায় নিতেই সে অসহিষ্ণু ভাবে বলে উঠল, “যদি কিছু মনে না করেন তা হলে জিজ্ঞেস করি, ওই ভদ্রমহিলা কেন দাদুকে বাবা বলে ডাকছেন? দাদুর সঙ্গে ওঁর কী সম্পর্ক? আমার মা ছাড়া দাদুর আর কোনও সন্তান আছে বলে তো আমাদের জানা নেই। দাদুও কখনও কিছু বলেননি আমাদের।”

নরোত্তম শুভায়ুর মনের দ্বিধাটা পড়তে পেরেছেন। একটু দম নিয়ে তিনি বললেন, “অলোকবাবু এখান থেকে চলে যাওয়ার মাসখানেক আগের ঘটনা। সেদিন ছিল ঝড়জলের রাত। কিছু গুন্ডা-মস্তান স্টেশন লাগোয়া জঙ্গলে একটি মেয়েকে তুলে এনেছিল। মেয়েটির চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসেছিলেন মাস্টারবাবু। ইজ্জত বাঁচাতে না পারলেও নিজের জীবন বাজি রেখে অলোকবাবু মেয়েটির প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে ভেবে ওর বাড়ির লোকেরা ওকে আর ফিরিয়ে নিতে চায়নি। অলোকবাবু ওকে নিজের মেয়ের মতো ভালবেসেছিলেন। রাইকিশোরী নামটাও অলোকবাবুরই দেওয়া। দুষ্কৃতীদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অনেক চেষ্টা করে মেয়েটির সরকারি হোমে থাকার ব্যবস্থাও উনি করে ফেলেছিলেন প্রায়। কিন্তু আমাদের সকলেরই মায়া পড়ে গিয়েছিল রাইকিশোরীর উপর। তাই যেতে দিইনি। আমি অকৃতদার। আমার বিধবা বোন জানকীরও ছেলেপুলে নেই। রাইকিশোরী আমাদের সন্তানের মতো। অলোকবাবুর হাতে ওর পুনর্জন্ম হয়েছিল বলে রাই ওঁকে বাবা বলে ডাকে।”

একটু থামলেন নরোত্তম। তার পর একটু ইতস্তত করে বললেন, “কয়েক মাস হল ফুসফুসের কঠিন রোগ বাঁধিয়ে বসেছে মেয়েটা। ডাক্তারবদ্যি অনেক দেখানো হল। কিন্তু কিছুতেই অসুখ সারছিল না। সম্প্রতি রক্তপরীক্ষায় রাইকিশোরীর এইচআইভি রিপোর্ট পজ়িটিভ ধরা পড়েছে। হয়তো আর বেশি দিন বাঁচবে না। গ্রামেগঞ্জে এখনও মানুষের এই অসুখ নিয়ে তেমন সচেতনতা নেই। ভেবেছিলাম লোক জানাজানি হওয়ার আগে অলোকবাবুকে বলে শহরে ভাল ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করব। ওদিকে রাইকিশোরীও ওঁকে এক বার দেখার জন্যে বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাই ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে চিঠি লিখেছিলাম। রক্ত-টক্ত নয় বাবা, এটা শুধু মানুষের সঙ্গে মানুষের মনের সম্পর্ক। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় একটা সর্বস্ব হারানো মেয়েকে বাঁচার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন অলোকবাবু। উনি আমাদের কাছে দেবতুল্য।”

শুভায়ুর সঙ্গে কথা শেষ করে নরোত্তম বললেন, “জানকী, শুভায়ুর খাবারের ব্যবস্থা করো। দেখো, ওর কোনও রকম অযত্ন যেন না হয়।”

জানকী কাছে এসে সস্নেহে বললেন, “গরিবের ঘরে আজ দুটো ভাত খেয়ে যেয়ো বাবা। ফেরার ট্রেন সন্ধের আগে পাবে না। আমি চটপট রান্নাটা সেরে নিই।”

জানালার বাইরে একটা ঝাঁকড়া ছাতিম গাছ। পাশেই টলটলে জলের পুকুরে কতগুলো পাতিহাঁস ভাসছে। এত পরিষ্কার জলের পুকুর আগে কখনও দেখেনি শুভায়ু। আর এত স্বচ্ছ মনের মানুষও তার এই প্রথম দেখা। শহুরে জীবনের অজস্র পঙ্কিলতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে শুভায়ুদের। ইচ্ছে থাকলেও স্বচ্ছ ভাবনা ভাবতে পারে না ওরা। অলোক ঘোষালের মেয়ের কথা জেনে এক বারের জন্যেও ভাল কিছু মাথায় আসেনি। শুধু খারাপ ভাবনাই ভেবে এসেছে সে। অথচ এই মানুষগুলো... একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুভায়ু।

এক্সপ্রেস বা মেল ট্রেনে সওয়ার হয়ে সকলেই ছুটে চলে বড়সড় জংশনের দিকে, কিন্তু কখনও কখনও ভাগ্যের রেলগাড়ি আচমকা এনে দাঁড় করিয়ে দেয় বিন্দুবাসিনীর মতো কোনও ছোটখাটো হল্ট স্টেশনে। দুরন্ত গতির জীবন তখন একটা ঝাঁকুনি খায়। মনের ভিতর থিতিয়ে পড়া সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো নড়েচড়ে ওঠে আর এক বার।

পাশের ঘর থেকে ফোড়নের ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসছে। পোড়া শুকনো লঙ্কার ঝাঁঝে শুভায়ুর চোখদুটো জ্বালা করছে অসম্ভব!


আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন