সমন্বয়: ইদের আলোকসজ্জায় নাখোদা মসজিদ, ডান দিকে, ব্রেবোর্ন রোডের মাঘেন ডেভিড সিনাগগ।
কোনও কোনও বার রমজানি খুশির ইদ বা কুরবানির ইদুজ্জোহার দিনটা যেমন দুর্গাপুজোর ছুটির মধ্যে মেশে, বা হয়তো মিলে যায় মহরম এবং রথযাত্রার ঋতু, এও অনেকটা তেমনই সন্ধিক্ষণ। ইহুদিদের একটি বিশেষ উৎসবের তারিখ আর বাঙালির দেবীপক্ষ, আকছার পরস্পরের গায়ে লেপ্টে পড়ে। কলকাতায় ইহুদির সংখ্যা কমতে কমতে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। ইহুদি সংস্কৃতির ছোঁয়াচ আর বোঝাই যায় না জনজীবনে। এ সব দিন-তারিখ নিয়ে তাই সচরাচর মাথা ঘামাই না আমরা। তবু মধ্য কলকাতার অপরূপ সিনাগগগুলি এক রঙীন অতীতের ছবি সজীব করে তোলে। ভাদ্র-আশ্বিনের সন্ধিক্ষণে ‘ইয়ম কিপ্পুর’ উপলক্ষে যখন উপাসকদের ঢল নামত সেখানে।
এ দেশের ইতিহাসের এক ত্রিকালদর্শী সাক্ষী ফ্লাওয়ার সিলিমানের মুখোমুখি বসে সেই দুপুরে এমন অনেক পুরনো কথা শোনা গিয়েছিল। ‘ইয়ম কিপ্পুর’-এর দিনটা ইহুদিদের কাছে পবিত্রতম। প্রায়শ্চিত্তের দিন, পাপ ধুয়ে প্রার্থনায়, উপাসনায় শুদ্ধ হওয়ার লগ্ন। কলকাতার জাতক, ৯২ বছরের ইহুদি-কন্যা ফ্লাওয়ার বলছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছেপিঠে এ শহরে ইউরোপ থেকে আসা হাজারো ইহুদির ভিড়ে গমগমে ব্রেবোর্ন রোডের মাঘেন ডেভিড সিনাগগের কথা। সেখানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনারত অবস্থায় কানে আসত দুর্গাপুজোর বিসর্জনের ঢাক। ঠিক তখনই পাশের রূপসী পর্তুগিজ গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠছে ঢং ঢং, বা হয়তো অদূরে জ়াকারিয়া স্ট্রিটের নবগঠিত বড় মসজিদে আজানের ডাক দিয়েছেন মুয়াজ্জিন। ফ্লাওয়ারের চোখে ফিচেল হাসি, “তখন আমি বড়জোর বছর দশেক, কিন্তু মনে মনে ঈশ্বরের জন্য আমার ভারী চিন্তা হত, এক সঙ্গে এত দিক থেকে এতগুলো ধর্ম, এত ভক্তের ডাক তিনি সামলাবেন কী ভাবে! কাকে ছেড়ে কাকে দেখবেন!”
নারকেলডাঙায় ইহুদিদের সমাধিক্ষেত্রে, এ শহরের মাটির নীচে ৯৪ বছর বয়সে ফ্লাওয়ার চিরঘুমে গিয়েছেন, তা প্রায় দু’বছর হতে চলল। কলকাতায় এখন টিকে আছেন প্রায়-অদৃশ্য বড়জোর ন’-দশ জন ইহুদি বুড়োবুড়ি। ইতিহাসের বিচিত্র পরিহাস, পাপমুক্ত হওয়ার পবিত্র দিনে এ শহরে দৈবাৎ আগত কোনও ইহুদি অতিথির কেউ সিনাগগে যাবেন বলে ঠিক করলে, ফটক খুলে তাঁদের স্বাগত জানাবেন উপাসনালয়টি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ক’জন উৎকলদেশীয় মুসলিম কর্মচারী। পুরী, কাকতপুর, কোনার্কের সিরাজ, আনোয়ার, মাসুদরা কয়েক প্রজন্ম ধরে মধ্য কলকাতার তিনটি চোখ-জুড়ানো সিনাগগ পরম যত্নে আগলে রেখেছেন।
আর ব্রেবোর্ন রোড ধরে হাওড়ার ব্রিজের দিকে একটু হেঁটে গেলে আপনার মনে হতে পারে, গোটা তল্লাট জুড়ে বুঝি বা আসর ফেলেছে কোনও সুবৃহৎ পার্লামেন্ট অব রিলিজিয়নই। প্রাচ্যের রাজকীয়তম সিনাগগ বলে খ্যাত মাঘেন ডেভিডকে বাঁ হাতে ফেলে এগোলে প্রথমে নজরে আসবে ক্যাথলিকদের অপরূপ গথিক স্থাপত্যশৈলীর ‘ক্যাথিড্রাল অব দ্য মোস্ট হোলি রোজ়ারি’ (পর্তুগিজ গির্জা), তার পরই শ্বেতাম্বর জৈনদের পুরনো স্কুলের পাশে শহরের বৃহত্তম ইমামবাড়া ‘হাজি কারবালাই ইমামবরগাহ’। মাঘেন ডেভিড ও পর্তুগিজ গির্জাকে দু’পাশে রেখে হাওড়া ব্রিজের অ্যাপ্রোচ রোডের দিকে আরও এগোলে বড়বাজারের সর্পিল গলির জটে তিন শতকের প্রাচীন আর্মানি গির্জার সঙ্গেও দেখা হবে। বড়বাজারের নন্দরাম মার্কেটের উল্টো দিকের গলি, কিন্তু ইলেকট্রিক তারের মাকড়সার জাল, বিচিত্র দোকানের ছাউনির ফাঁকে রহস্যময়ী ধবধবে আর্মেনিয়ান ‘হোলি চার্চ অব নাজ়ারেথ’-এর বসত। বার বার এলেও ভিড়ের গোলকধাঁধায় তা খুঁজে বার করা কোনও নাবিকের নতুন দ্বীপ আবিষ্কারের মতোই রোমাঞ্চকর সফর। এই গির্জা চত্বরেই সম্ভবত কলকাতার প্রাচীনতম খ্রিস্টান কবরটিরও স্মারক। চার্নক সাহেবেরও আসার কয়েক দশক আগে, সতেরো শতকের একটি স্মৃতিচিহ্ন।
উনিশ শতকের মাঝপর্বের হাজি কারবালাই ইমামবরগার একাংশে ঢালাও সংস্কার দরকার। দোতলার ভিতর ঘরে ইমাম হোসেনের সমাধির স্মারক সুদৃশ্য তাজিয়া, ফ্রেমে বাঁধানো তাঁর হাতের লেখার অনুকৃতি বা বেলজিয়ান কাচের প্রকাণ্ড আয়না, ঝাড়লণ্ঠন ছাপিয়ে তবু নজর টানে ইমামবাড়া চত্বরেই ভবানীপুরের গুজরাতি ভাড়াটের কারখানা। ইমামবাড়ার ভিতরে, বাইরে অজস্র ভাড়াটের মধ্যে উর্দুভাষী মুসলিমদের খেলনার দোকান, শিখ সর্দারজির অমৃতসরী ছোলে-কুলচার ঠেকের মতোই গুপ্তিপাড়ার বাঙালি শঙ্কর সাহার প্লাস্টিকের ফুলের দোকানটিও রয়েছে আজ বহু বছর।
*****
ব্রিটিশ আমলের কলকাতা খোপে খোপে তিন ভাগে ভেঙে ফেলা যেত অতি সহজেই। উত্তরে বাঙালিবাবুদের নেটিভ টাউন বা ব্ল্যাক টাউন এবং দক্ষিণে সাদা চামড়ার ইংরেজদের হোয়াইট টাউন— মাঝের ফাঁকে ধূসর অংশটিতেই গড়ে ওঠে পাঁচমিশেলি এক জটিল গ্রে টাউন। যার সার্বিক ‘আইডেন্টিটি’ বা জাতধর্মের পরিচিতি এক কথায় সাব্যস্ত করা মুশকিল। এও এক ঝালমুড়ি তত্ত্ব। ঝালমুড়ির এক ঠোঙায় মুড়ি, মশলা, লঙ্কা বা পেঁয়াজের কুচি, মটর, বাদাম, শসার টুকরোর মতোই নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের সহাবস্থান। পরস্পরের গা ঘেঁষে থাকলেও নিজস্বতার রংটুকু যাঁরা গা থেকে কিছুতেই খুলতে চান না। এক কলকাতার ভিতরে গলা-জড়াজড়িতেও তাই চাপা অভিমান, পা-টানাটানি আর অবিচ্ছেদ্য আকর্ষণের টানে মিশে থাকে অনেকগুলো কলকাতা।
বড়বাজার-ব্রেবোর্ন রোডের সীমানা থেকে জ়াকারিয়া স্ট্রিটের যে অংশটি এত ক্ষণ আলোচনায় উঠে এল, তার লাগোয়া কলুটোলা, ফিয়ার্স লেন ছুঁয়ে টেরিটিবাজার, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট নেমে এসেছে জীবনানন্দের কবিতায়। টেরিটিবাজারের চিনে গির্জা, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট লাগোয়া মেটক্যাফ স্ট্রিটের পার্সি মন্দির বা বৌবাজারের বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার কথা আপাতত ঊহ্য থাক! জীবনানন্দের কবিতার ‘রাত্রি’ ও কলকাতার দারিদ্র, নিঃসঙ্গতা, জীবনযুদ্ধের ফাঁকে এক ঐতিহাসিক বহুজাতিকতা মেলে ধরে। ছাতি-ফাটা তেষ্টায় কাতর কুষ্ঠরোগী, জানলায় একা গান গাওয়া ইহুদি রমণী, পথচলতি ফিরিঙ্গি যুবক থেকে গন্তব্যহীন ঈষৎ স্খলিত আফ্রিকান ‘লোল নিগ্রো’ও সে কলকাতার চরিত্র। বৌবাজার থেকে কলুটোলাকে জুড়ে ফেলা ফিয়ার্স লেনের মোক্ষমতম বর্ণনাটি অবশ্য পেয়েছি ১৯৪৬-এর গোষ্ঠী-সংঘর্ষের আবহে লেখা ‘ফিয়ার্স লেন’ নামের স্বল্পচেনা অণু উপন্যাসে। ‘ফিয়ার্স লেন’-এর লেখক নবেন্দু ঘোষ চিনে, দোসাদ, মুসলিম বসতের সর্পিল গলিকে আঁকাবাঁকা অজগরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বৌবাজারের দিকটায় এ গলিতে আর চিনা গণিকা, মদ্যপানের ঠেক বা বাইজি-বাড়ি দেখা যায় না সে দিনের মতো। তবে আজকের মুসলিমপ্রধান মহল্লায় রমজান মাসের ইফতারি খাদ্যমেলায় শতাব্দীপ্রাচীন আলাউদ্দিনের হালুয়া বা ফুটপাতের কাবাব-হালিমের টানে বেরোলেও কোনও কোনও বাড়ির ফলক চমৎকৃত করে। বৌবাজার দিয়ে ঢুকলে এ গলির মাঝামাঝি ডান হাতের ম্লান লালরঙা বাড়িটার গায়ে আবছা অক্ষর, ‘স্বর্গীয় শ্রী পূর্ণচন্দ্র ধরের বাটী। ভগবান শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণের পদধূলিধন্য।’
*****
চিৎপুরের ট্রামরাস্তা থেকে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউমুখী কলুটোলাকে আবার সাতসকালে নাখোদার সুরেলা আজান থেকে ট্রামের ঢং ঢং আওয়াজের সঙ্গে রিকশার টুংটুং ঘণ্টির জন্য মনে রেখেছেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত। রসিক কলকাতাদর্শী রাধাপ্রসাদ ওরফে শাঁটুলবাবুর আরও হা-হুতাশ ছিল, এ রাস্তায় বোগদাদি আমেজের নানা কিসিমের তামাক-জর্দা-আতরের খোশবাই হারানোর দুঃখে। আতরের দোকানের অবশ্য এখনও অভাব নেই চিৎপুর-কলুটোলায়। ট্রামরাস্তার মোড়ের কাছেই সাবেক কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ বিচারশালা হুগলি ফজদুরি বালাখানা (ফৌজদারি বালাখানা)। সেখানেই মায়ের জেঠামশাই কবিরাজ বিনোদলাল সেনের বাড়িতে বালকবয়সে অনেক থেকেছেন শাঁটুলবাবু। সে-বাড়ির নীচে আজও দুশো বছরের পুরনো খুদা বকশ-নবি বকশের সুপ্রাচীন আতর-বিপণি। এখান থেকেই পুজোর আগে শহরের বহু বনেদি ঘরের ঠাকুরদালানে ‘খাঁ সাহেব’ নামের আতর-সরবরাহকারীর দল ছড়িয়ে পড়েন ফি-বছর। পরম্পরা মেনে পুজোর উপচারে আতরটুকু পৌঁছে দিতেই হয় বাঁধাধরা সময়ে। এ দোকানে একদা সুগন্ধপ্রিয় দামাল যুবক কাজী নজরুল ইসলাম আসতেন বলে ফ্রেমে বাঁধানো বোর্ড লটকে দিয়েছে কলকাতার ছায়ানট সংস্থা।
আতরের দোকানের সপ্তম পুরুষ নিয়াজুদ্দিন আল্লাহবকশ আফসোস করেন, রজনীগন্ধা, জুঁইয়ের মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সেরা আতরের সন্ধানে আজও কনৌজ-লখনউয়ের ফুল-টুলের খোঁজ করতে হয়। রবিবারের সকালে কলুটোলা, চিৎপুরের রাস্তা একটু ফাঁকা পেয়ে বাড়ির পুজোর চন্দনগন্ধী আতর নিতে প্রায়ই আসেন আসবাব তৈরির স্টিলকো কোম্পানির কর্তা দীনেশ বজাজ। অনেক দিনের সুহৃদ নিয়াজুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে একটু আড্ডার লোভেও বটে।
সৈয়দ মুজতবা আলির লেখায় পঠিত জ়াকারিয়া স্ট্রিটের বিখ্যাত আমজাদিয়া হোটেলটি কোথায় ছিল, তা আজ বলা সহজ হবে না। তবে আলাউদ্দিন, তাশকিন বা লখনউ সুইটস-এর মতো বহু দোকানই হালে শহরের ফুড ব্লগারদের অবশ্যগন্তব্য হয়ে উঠেছে। রমজান মাসে হুজুগে বাঙালি শুধু নয়, ফোর্ট উইলিয়ামের নিরামিষাশী সেনা অফিসার পর্যন্ত নিয়ম করে ফালুদা, বাখরখানি বা অমৃতির টানে আসেন, দেখেছি। বড়দিনের মরসুমে বাঙালির এক তীর্থক্ষেত্র নিউ মার্কেটের নাহুমের সমবয়সি আলাউদ্দিনের মিষ্টি-বিপণি। অপরিচয়ের বেড়া ভেঙে জাতিধর্ম-নির্বিশেষে সব কলকাতাবাসীর কাছে সেও ক্রমশ আত্মীয় হয়ে উঠছে।
একদা এই চত্বরের সংস্কৃতির অহঙ্কার শিক্ষিত, সম্পন্ন, বাঙালি ব্যবসায়ী পরিবারের বাড়িগুলোই কারও কারও কাছে এ অঞ্চলের প্রধান পরিচয় ছিল। তারাচাঁদ দত্ত স্ট্রিটের তারাচাঁদ-পুত্র হরিহর দত্ত রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলনে ছিলেন। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে উর্দু, ফারসি পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। ১৮৭১-এ হরিসভা উপলক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন ধরেদের বাড়ি আসেন, কেশব সেন, মতিলাল শীল, সাগর দত্তদের বিচ্ছুরণে বাঙালির গরিমা জ্বলজ্বল করছে কলুটোলায়। ধরেদের ঠাকুরদালানে মা দুগ্গার অসুরবিহীন অভয়ামূর্তি, বদনচাঁদ রায়দের বাড়ির ঠাকুরদালানের দুগ্গা বা দোতলার জমকালো নাচঘরটি দেখতে এখনও বিদেশি পর্যটকেরা এ দিকে আসেন।
কলুটোলার আদি বাসিন্দা তেলি গোষ্ঠীভুক্ত সাধুখাঁদের এস্টেটেও পুরনো সময়ের দাগ স্পষ্ট। জাফরি-কাটা বারান্দা, কাঠের আসবাব, দরজা, জানলার নকশা থেকে মার্বেলের দেওয়ালে আঁকা ময়ূরের ছবি দেখে উদ্বেল হন এ শহরের ঐতিহ্যপ্রেমীরা। যেমন নাখোদা মসজিদের পাশে আজকের অজস্র ভাড়াটের অত্যাচারলাঞ্ছিত রংচটা কদাকার ‘সেলিম মঞ্জিল’ বহুতলটিও এক উপেক্ষা ও বিস্মরণের ইতিহাস মনে করায়। এ হল ঠুংরি-সম্রাজ্ঞী গওহরজানের স্মৃতি-জড়ানো গওহর বিল্ডিং। সম্প্রসারিত নাখোদা মসজিদ তৈরির সময়ে কচ্ছি মেমন গোষ্ঠীর নির্মাতারা গওহরের থেকে এ বাড়িটি কিনতে চাইলে বিক্রি না-করে দান করতে চেয়েছিলেন কোকিলকণ্ঠী। তবায়েফের সেই দান গৃহীত হয়নি। পারিবারিক জটে মামলা-মকদ্দমায় বাড়িটি খুইয়ে পরে কলকাতাকে চিরবিদায় জানিয়ে মাইসুরুতে চলে যান ক্লান্ত, রিক্ত, পরাজিত গওহর।
পাশের কলুটোলা স্ট্রিট-ঘেঁষা গলিতে আবার উস্তাদ বিসমিল্লা খানের ছোট মেয়ে, এ শহরের প্রখ্যাত সানাইশিল্পী উস্তাদ সাজ্জাদ হুসেনের বৌমা আজ়রা বেগমের সংসার। আজ়রার মুখে তাঁর বাবার মুখ বসানো। তাঁর দেখা পেতে চিলতে গলির অন্দরে প্রায় তিন-চারতলার উচ্চতা উঠে যাওয়া সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গায়ে কাঁটা দেয়! কলকাতায় বাজাতে এসে মধ্য-আশির বিসমিল্লা খান সাহেবও এই সিঁড়ি বেয়ে উঠতেন। নানাজির কথা ভেবেই সিঁড়ির ধারে লোহার হাতল বসানো হয়, বলছিলেন বিসমিল্লার দৌহিত্র, আজ়রার বড় ছেলে ফকির রেজ়া। ঠিক অখণ্ডতায় ততটা নয়, এমন নানারঙা খণ্ডচিত্রেই কলকাতার এই চৌহদ্দি আলাদা আলাদা ছবি আঁকে আমাদের মনে। অন্ধের হস্তিদর্শন? হোক না, বৈচিত্রের উদ্যাপনেও তা ভরপুর।
*****
গেল-রমজানে কলুটোলার উত্তরে জ়াকারিয়া-ঘেঁষা গলি রতু সরকার লেনের এক ছাদে অভিনব ইফতার আসরে দেখা হয়েছিল কচিকাঁচার দল তায়েবা চোহান, জ়োয়া চোহান, আইজ়া চোহান, মুনাফ চোহান বা ডাঁটো বয়সের মহম্মদ আসলাম সোলাঙ্কি, আতিক চোহানদের সঙ্গে। তায়েবা বি কম ছাত্রী। স্কুলের উঁচু ক্লাসের মুনাফ জুনিয়র ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলার। মুসলিম, কিন্তু নামের সঙ্গে যুক্ত পদবিতে তাদের রাজস্থানি পরিচয়ের স্বাক্ষর। মুসলমান যে মারোয়াড়িও হয়, তা এখনও আমরা বাঙালিরা অনেকেই ভাল করে জানি না। কলকাতার মারোয়াড়ি মুসলিমরা অনেকেই আবার রংরেজ় নামেও পরিচিত। বেশির ভাগই রঙে ছোপা কাপড়ের দড়ি তৈরির কাজ করেন। রঙিন নকশা আঁকেন দোপাট্টা বা শাড়িতে। রথের আগে তারে ঝুলিয়ে শুকোতে দেওয়া নানারঙা দড়িতে ভরে ওঠে এ রংরেজ় গলির ছাদগুলো। রথযাত্রায় ছোটদের রথ টানার দড়িও যথাসময়ে জ়াকারিয়ার এ গলি থেকেই বড়বাজারের খ্যাংরাপট্টির দোকানে পাড়ি দেয়।
ইফতারের ছাদের পাশেই শিবঠাকুর বালকনাথের ছোট্ট মন্দির। এলাকার মুসলিম ছেলেরাও হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে যার চাতালে শুয়ে-বসে মানুষ হয়েছে। পাশের গলিতে সরস্বতী পুজোয় শামিল বাঙালিনি জলি দুবে, মুদির দোকানি লবকুশ গুপ্তা, সাগর, নকুল, শুকদেবরাও ছিলেন সেই আনন্দ-আয়োজনের শরিক। এ গলির রংরেজ়দের বৃদ্ধ কুলপতি মহম্মদ সেলিমকে এলাকার সকলেই ‘ড্যাডি’ নামে চেনেন। সেলিম অবশ্য চোহান পদবিটি লেখেন না। ভোটের আগে ভয় ছিল, পরিবারের মধ্যে নানা জনের নাম-পদবির গরমিলে না ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’র আওতায় কারও নাম নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়। “আলহামদুলিল্লাহ, প্রায় সকলেই উতরে গিয়েছে!” সেলিমের এক ভাই আতিক চোহানের স্ত্রী আলিশা গৌরী শুধু বাদ পড়েছেন। সাম্প্রতিক এক শুক্রবারের দুপুরে কলকাতা বিষয়ক তথ্যচিত্রকর্মী দুই কলেজ-পড়ুয়া অনুষ্কা, শুভদীপদের সঙ্গী হয়ে ড্যাডির ঘরের আড্ডায় শরিক হওয়া গেল।
নোনা-ধরা দেওয়ালের স্যাঁতসেঁতে উঠোনের বাড়িটার জন্ম প্রাক্-স্বাধীন ভারতে। দোতলায় একটি ছোট ঘরে গোটা পরিবারের গাদাগাদি ঠাসাঠাসির সংসার। আর পাঁচটি মারোয়াড়ি ঘরের মতোই চায়ের সঙ্গে মাঠি আর নিমকির মুখরোচকে আপ্যায়ন করলেন সেলিম সাহেবের বৌমা শবনম বেগম।
ঐতিহ্য: বৌবাজারের ধরবাড়ির ঠাকুরদালানে শ্রীরামকৃষ্ণের পদচিহ্ন। ডান দিকে, রংরেজ় পল্লিতে তৈরি হচ্ছে রথের দড়ি
এ শহরের গড়পড়তা মারোয়াড়ি ঘরের মতো সেলিমের বাবাও রাজস্থানের ঝুঝনু জেলার। গ্রামের নাম চিরানা। মাছ, মাংস খেলেও তাঁরা ডাল-বাটি-চুরমার ভক্ত। আর উর্দু, আরবি নয়; হিন্দি, বাংলাতেই সড়গড়। গোটা পরিবার নিজেদের মধ্যে মারোয়াড়ি বুলির আলাপেই অভ্যস্ত। ড্যাডি দেখান, “এই দেখুন কোরান শরিফও আমরা বাড়িতে হিন্দিতে পড়ে থাকি।” ফুরসতের দুপুরে এ বাড়ির আড্ডা আকছার রামায়ণ, মহাভারতের কহানিতে এসে মেশে। ড্যাডির অল টাইম ফেভারিট হিরোও মহাভারতের কর্ণ। নাতি-নাতনিদের গল্প শোনান, “তার পর তো অর্জুনের এক তিরে কর্ণের রথ দশ হাত সরে গেল। জবাবে পাল্টা তির ছুড়লেন কর্ণও। অর্জুনের রথ তাতে তিন হাত পিছিয়ে গেল। তা হলে কে বেশি বাহাদুর, বলো দেখি?” নাতি-নাতনিদের প্রশ্ন ছুড়ে ঠোঁট টিপে দুষ্টু হাসেন ড্যাডি।
“কে, অর্জুন?”
“ধুর ধুর কিছুই তো বুঝলি না তোরা, ওরে বাবা অর্জুনের রথে তো মাথার উপর হনুমানজি আর নীচে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান রয়েছেন। কর্ণের বাণে সেই রথও তিন হাত পিছিয়ে গিয়েছিল। কত বড় বীর দেখলি!”
একটু দম নিয়ে ড্যাডি বলে চলেন, “কিন্তু উনি যে মা কুন্তীকে কথা দিয়েছিলেন, ভয় নেই মা, এ যুদ্ধে তোমার জ্যেষ্ঠপুত্রেরই পরাজয় হবে।”
*****
আশৈশব বিচ্ছিন্ন কর্ণ আর অর্জুনের মনটা বড় অমোঘ ভাবে ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ কুন্তীর সঙ্গে কর্ণের সংলাপেই।
তাই শিশুকাল হতে টানিছে দোঁহারে নিগূঢ় অদৃশ্য পাশ/ হিংসার আকারে/ দুর্নিবার আকর্ষণে…
এ অঞ্চলে এসে মনে হয়, দুই সহোদরের গল্পটাই কি নতুন করে লিখছে কলকাতা? দূরত্ব, আকর্ষণ কিন্তু দুরারোগ্য এক ভালবাসারও জন্ম দেয়। ১৯৪৬-এর বিভীষিকাময় অধ্যায় নিয়ে নবেন্দু ঘোষের ‘ফিয়ার্স লেন’ উপন্যাসে উঠে আসে স্থানীয় বাসিন্দা তৎকালীন যুক্তপ্রদেশের (ইউপি) ফৈজ়াবাদের আসলামের কথা। ফিরিওয়ালা থেকে মনোহারি সামগ্রীর দোকানি এক নিষ্ঠাবান মুসলিম, যিনি সব মানুষকেই ঈশ্বরের সন্তান বই আর কিছু ভাবতে পারেন না। চলতি শতকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন’-পরবর্তী দিনগুলি নিয়ে মীজানুর রহমানের শৈশবস্মৃতি ‘কৃষ্ণ ষোলোই’ বইটিও সন্তানদের আঁকড়ে আতঙ্কের প্রহর গোনা তাঁর নিজের মা এবং গড়পারের জনৈক বিষ্ণুচরণ ঘোষকে উৎসর্গীকৃত। বিষ্ণুবাবু আতঙ্কের দিনগুলোয় জান কবুল করে বিপন্নদের ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন। এ দেশের গোষ্ঠী-সংঘর্ষের ইতিহাস শুধুই নৃশংসতা আর সুবিধাবাদী লোভের কথা বলে না। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শতকরা ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে রক্ষা পাওয়া মানুষজনকে বাঁচিয়েছেন ভিনগোষ্ঠীর পড়শিরাই। ১৯৪৬ বা ১৯৬৪-র কলকাতা পুরসভার নথিতে এমন নমুনা ভূরি ভূরি। ফিয়ার্স লেনের আখ্যানের আসলামও ঠিক সেভাবেই পড়শি পরেশবাবু এবং আরও দু’তিনটি পরিবারকে বাঁচাতে স্বধর্মের ঘাতকের শাণ দেওয়া ছুরির সামনে বুক পেতে দেন। লেখক বার বার বলেছেন, তাঁর কাহিনি পুরোটাই সে-পাড়ার বাস্তবচিত্রের উপর ভিত্তি করে। এবং শহরের হিন্দুপ্রধান বা মুসলিমপ্রধান পাড়াগুলির গল্পের তখন বিশেষ হেরফের ছিল না।
আট দশক আগের লুঠপাট হিংসা কলুটোলার বাসিন্দাদের অনেকের জীবনেই গভীর অভিঘাত রেখে গেছে। তবে প্রবীণদের স্মৃতি নিছকই একতরফা হিংসা, বিদ্বেষের কথা বলে না। বদনচাঁদ রায়ের উত্তরপুরুষেরা ১৯৪৬-এ পুজো সরিয়ে প্রাণভয়ে জোড়াসাঁকোর আত্মীয়-বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরের বছর স্বাধীন দেশে খোদ পুলিশ কমিশনার নিজে আশ্বাস দিয়ে জোর করে তাঁদের পুজো স্বস্থানে ফেরান। পুজো বন্ধ হয় ধরেদের বাড়িতেও। তবে এখন মধ্য-আশির দিলীপকুমার রায় বা ধর-বাড়ির প্রবীণ দম্পতি অসীম, শর্মিষ্ঠারা বলেন, সেই এক বারই যা হওয়ার হয়েছিল। এর পরে যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে বরং স্থানীয় পড়শিরাই বুক পেতে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কলুটোলার রায়বাড়ির আয়তক্ষেত্রাকার প্রাসাদের একটা অংশ সেই চল্লিশের দশকেই কিনে নেন জনৈক মুসলিম প্রতিবেশী। দিলীপের শৈশবস্মৃতি, এক রাতে বহিরাগত সুযোগসন্ধানী লুটেরাদের হামলায় তাঁদের পড়শি সালাউদ্দিন সাহেবই সবাইকে ঘরে আলো জ্বেলে নির্ভয়ে থাকতে বলেছিলেন। বেপাড়ার হামলাবাজদের তেড়ে হুঙ্কার দিয়ে সেখান থেকে দূর দূর করে তিনি বিদেয় করেন। ফিয়ার্স লেনের ধর-বাড়ির বধূ শর্মিষ্ঠা আবার ওই পাড়ার সাগর দত্তদের বাড়ির কন্যাও। তিনি জোরগলায় বলেন, “এখানে যা আছি, শহরের অন্য কোনও বাঙালি পাড়াতেও এতটা নিরাপদ থাকতুম কি না, সন্দেহ আছে। রাত একটাতেও এ পাড়ায় গা-ভরা গয়না পরে হেঁটে গেলে কেউ ফিরে তাকাবে বলে মনে হয় না!”
স্বাধীনোত্তর দেশেও নানা দুষ্কৃতী, অপরাধীর দৌরাত্ম্য এ অঞ্চলেও ছায়া ফেলেছে। তবে সে-সব দূর অতীত। ১৯৯২-এ বাবরি-কাণ্ডের পরে বৌবাজারে বিক্ষিপ্ত অশান্তি ঘটলেও কলুটোলায় রায় বা ধরেদের বাড়ি বয়ে এসে আশ্বাস দেন পড়শিরা। “কোথাও যাবেন না, আমরা থাকতে পারলে, আপনারাও এখানে থাকবেন”— পাশে থাকার গ্যারান্টি দিয়েছিলেন স্থানীয় ভিনধর্মীরাই।
সেই ভরসাতেই এ সব সাবেক বাড়ির উঠোন দুপুর, রাতে আজও খোলা থাকে স্থানীয় ভ্যানওয়ালা বা মুটে আসলাম, সাহাবুদ্দিনদের জন্য। এ পাড়ার বাঙালি পরিবার ক্রমে ছোট হচ্ছে। অনেকেই পুরনো পাড়া, একান্নবর্তিতা ছেড়ে ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রাণের পুজো নিয়ে গরবিনি শর্মিষ্ঠা, অসীমেরা তবু এখনও পাড়ার পাঁচমিশেলি সংস্কৃতির সৌরভে পুলকিত হন। শর্মিষ্ঠা বলেন, “বড়দিনের কেক চাখার মতো রমজান মাসে আলাউদ্দিনের চিকেন, মাটনের সামোসা চাখাটাও আমাদের কাছে কলকাতার সংস্কৃতি। আবার মহালয়ার পর থেকে সাত্ত্বিক নিরামিষই এ বাড়ির রীতি।”
ধর বাড়ির উল্টো দিকে কয়েক পা দূরত্বে লখনউ সুইটস-এর বাড়ির আনোয়ার সিরাজ, অ্যাংলো সুইস কোম্পানির কারবারি। কাছেই বাড়িভর্তি ডাক্তার, প্রফেসর, উকিল, সিএ, ইঞ্জিনিয়ার-ভরপুর লোদি পরিবারের অবস্থান। ভাষা, ধর্মের দেওয়াল ভেঙে পড়শিদের পারস্পরিক সুভদ্র সামাজিক মেলামেশা লৌকিককতাও এ জলহাওয়ায় নিতান্ত স্বাভাবিক।
*****
মেছুয়াপট্টির চিলতে ডেরায় অসুস্থতায় কার্যত ঘরবন্দি, ৮৬ বছরের মহম্মদ খলিলও বনস্পতির মতো ছায়া দিয়ে চলেছেন। তাঁর ছাত্রীপ্রতিম পরম স্নেহের কাকলি ঘোষ কিছু দিন অন্তর ‘আব্বু’কে দেখতে এখানে আসেন। খলিল সাহেব অকৃতদার। কিন্তু তাঁর পাতানো ছেলেমেয়েরা ছড়িয়ে সারা দেশেই। আদতে আগ্রাওয়ালা খলিলের পিতৃকুল নাকি মোগল মনসবদারদের উত্তরপুরুষ। মাতৃকুলের শিরায় তাজমহলের স্থপতি-শিল্পীদের রক্ত বহমান। খলিল সাহেবের সম্বল বলতে ইসলামের সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ এবং গান্ধী, বিবেকানন্দের সমন্বয়ী আদর্শ। এটুকু আঁকড়ে জীবনটা এ কলকাতাতেই উজাড় করে দিলেন।
জ়াকারিয়া-কলুটোলার মাঝে কানাই শীল স্ট্রিটে মহম্মদ আলি গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান মহম্মদ খলিল এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। জীবনভর পিছিয়ে থাকা সংখ্যালঘু সমাজে শিক্ষার প্রসারে কাজ করার কথা ভেবেছেন। কিন্তু যে কোনও জাত-ধর্মের গরিব ছাত্রছাত্রীর পাশে দাঁড়াতে দু’বার ভাবেননি। বার বার জড়িয়ে পড়েছেন স্বার্থহীন বিনিসুতোর বাঁধনে। তিন দশক আগে খলিল সাহেবের কোচিং ক্লাসের ছাত্রী কাকলির সঙ্গে সম্পর্কটাও তাই পিতা-কন্যার হয়ে উঠেছে। জীবনের চরম দুর্বিপাকে পরিবারের থেকে আঘাত এলেও কাকলি সব সময়ে তাঁর আব্বুকে পাশে পেয়েছেন।
রংরেজ় গলির ড্যাডি, ওরফে সবার গার্জেন সেলিম সাহেবও এই ‘পাশে থাকা’র আদর্শই আবহমান বলে বিশ্বাস করেন। তাঁর উচ্চারণে অটুট প্রত্যয়, “মানুষ আসে, যায়, কিন্তু এই কালচারটা থেকে যায়।”
ভোটের আগে-পরে শহরের অন্য অনেক মহল্লার মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্পর্কে এখানে ছিটেফোঁটা চিড় ধরেনি। কলুটোলার নিয়াজুদ্দিন সাহেবের দোকানে আসা-যাওয়া সব শিবিরের লোকজনেরই। তিনি সবাইকেই হেসে বলেন, “আমাদের নবিজি সুগন্ধ ভালবাসতেন খুব! তাজা খুশবুতে মাইন্ড ফ্রেশ থাকে। মাথা গরমহয় না!”
লাইব্রেরিতে ইদানীং যেতে না পারলেও খলিল সাহেব দিনভর তাঁর বই-সম্ভারের হাল-হকিকত নিয়ে চিন্তায়! লোকের পড়ার অভ্যাস কমছে। গ্রন্থাগারের রামায়ণ, মহাভারত, গীতার উর্দু তর্জমা, আল-বিরুনির ভারতবীক্ষার ফারসি সন্দর্ভ ডিজিটাইজ় করার রেস্ত জোগাড় না হওয়া পর্যন্ত তাঁর শান্তি নেই।
ভালবেসে আঁকড়ে থাকার এই টান জাগিয়ে রাখে জ়াকারিয়ার জীবনযুদ্ধ, কলুটোলার অনির্বাণ কলকাকলি।
কাশীর বালাজি মন্দিরে রেওয়াজে বসার সময়ে এক ধরনের স্থানমাহাত্ম্যের কথা বলতেন বিসমিল্লা খান সাহেব। সে স্থান হয়তো আপাতসাধারণ। বাইরে থেকে কিছু বোঝার জো নেই। কিন্তু যে বোঝার বোঝে, ভিতর থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়।
আজ থেকে একশো বছরেরও আগে আজকের নাখোদা মসজিদের স্থলে পুরনো মসজিদের সামনে জনতা দেখেছিল বেপরোয়া প্রত্যয়ে অবিচল মধ্যযৌবনের এক সুঠাম দীর্ঘদেহী পুরুষকে। সহযোগীরা কেউ কেউ আঁতকে উঠলেও মানুষের জাতধর্মের তোয়াক্কা না করে যিনি জনে জনে রাখি পরাচ্ছিলেন। মসজিদে ঢুকে মৌলবি, নিষ্ঠাবান উপাসকদের দিকেও হাত বাড়িয়ে তাঁদের বুকে টেনে নিচ্ছিলেন। প্রথম বঙ্গভঙ্গের সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই রাখিবন্ধনের মাটি, এখানেই। যা আজও নিঃশব্দে বেঁধে বেঁধে থাকার অনিবার্য সুরটি বাঁশিতে ভরে নিয়েছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে