Anupam Ghatak

বাংলা গানের চেনাজানা সুরে এনেছিলেন ভিনদেশি বৈচিত্র

মুম্বইয়ের বিশিষ্ট সুরকার নৌশাদও কাজ করেছেন তাঁর সহকারী হিসেবে। বাংলার সনাতনী সুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য ঘরানার নানা চলন অনায়াসে মিশিয়ে দিয়েছেন বার বার। অনন্য স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সুরকার অনুপম ঘটক বাঙালি শ্রোতার হৃদয়কে নিয়ে গেছেন এক মায়াবী জগতে।

স্বপ্নসোপান দত্ত

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৯:১৯
Share:

সুরস্রষ্টা: অনুপম ঘটক। বিদেশি সঙ্গীতে তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ

গত শতকের আশির দশকে দূরদর্শনে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নৌশাদ বলেন, “আই ওয়াজ় অ্যান অ্যাসিস্ট্যান্ট অব আ মিউজ়িক্যাল জিনিয়াস নেমড অনুপম ঘটক অ্যাট লাহোর রেডিয়ো স্টেশন।”

ইনিই সেই অনুপম, যাঁর সুরে সন্ধ্যাকণ্ঠে গাওয়া ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ আজও আমাদের মনে ‘আবেশ ছড়াতে চায়’। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ‘ওগো মোর গীতিময়’ বইটিতে অনুপম ঘটকের খালি-গায়ে পৈতে-পরিহিত একটি ছবি দেখা যায়। ১৯১১ সালে ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া এই মানুষটিকে নিপাট বাঙালি পুরোহিতের মতো দেখতে। এই মানুষ যে গানের প্রথম লাইনেই পাশ্চাত্য ব্লুজ় ঘরানার প্রয়োগ করতে পারেন, অবিশ্বাস্য হলেও সেটা দেখা যায় স্বল্পশ্রুত ‘জাগো রে সাথী গো স্বপ্ন সহেলি মরমি রে’ গানটিতে। বেশভূষায় সপ্রতিভ না হয়েও তাঁর সুরের আধুনিকতা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তা এ গান শুনলে বোঝা যায়। একেবারে অপ্রত্যাশিত সব ‘রিফ্রেন’-এর মাধ্যমে একটি নতুন সুরের ভাষা নির্মাণ করলেন অনুপম। তিনি ভাল করেই জানতেন যে, শব্দকল্প বা সাউন্ডস্কেপ-এর সঙ্গে চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকের, এমনকি হয়তো এখনকার বাঙালি সমাজও পরিচিত, তাদের কানে এই সুর একটি বড় রকমের ধাক্কা দিতে বাধ্য। তাই বলা যায় উনি সচেতন ভাবেই আমাদের ঝাঁকিয়ে দিয়েছিলেন।

বাংলা গান সম্পর্কে লিখব আর রবীন্দ্রনাথের কথা বলব না, তা হয় না। কারণ বিষ্ণুপুর ঘরানার যদুভট্টের কাছে তালিম নিলেও তিনি ধ্রুপদিয়া হওয়ার চেষ্টা করেননি। উপমহাদেশের সুর, বাংলার লোকায়ত সুর এবং বিভিন্ন ভিনদেশি সুরের অভূতপূর্ব প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর হাতে বাংলা গান প্রথম শুধুই ‘গান’ হয়ে উঠল, বিশেষ কোনও রাগে বাঁধা বন্দিশ নয়। দুঃখের বিষয়, এ কথাটা আমরা আজও বুঝিনি। ‘সুখহীন নিশিদিন’ যে তারানা অঙ্গের, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিই তার সঙ্গে ‘দারা দিম দারা দিম’ প্রভৃতি জুড়ে দিয়ে। তবে আজ আমরা না বুঝলেও বাংলা গানের ‘স্বর্ণযুগের সুরকার’রা এই সারসত্যটি বুঝতেন। অনুপম ঘটক ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

চল্লিশের দশকের গানে এক অন্য সাঙ্গীতিক ভাষার উন্মেষ লক্ষ করা গেলেও কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া তার মধ্যে আধুনিক মনোভঙ্গির অভাব ছিল। অনুপমের সে সময়ের সুরগুলিও ছকেই বাঁধা ছিল মোটের উপর। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকেই এক অন্য ও অনন্য অনুপমকে আমরা পাই। ‘ইন্দ্রধনু’র ছটা ছাড়াও ওই ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিরই ‘কে তুমি আমারে ডাকো’ আমাদের এই ‘হঠাৎ পাওয়া’য় মুগ্ধ করে দেয়।

অভীক চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘অনুপম সুরে’ নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন অনুপমের সুরের এক আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যের কথা, চড়া বা মেজর পর্দা থেকে ক্রমে নিচু পর্দায় বা মাইনরে প্রবাহিত হওয়া, যাকে সাঙ্গীতিক ভাষায় ‘ডিমিনিশিং কর্ড’ বলে। অভীক লিখছেন, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ প্রসঙ্গে সলিল চৌধুরী বলেছিলেন, “অনুপমদা নিশ্চয় কোনও জন্মে পিয়ানো টিউনার ছিলেন, নইলে এমন কাণ্ড করেন
কী করে?”

এই পর্যায়ে ছবির বাইরে আর একটি গানের কথা উল্লেখ করি। ‘আমি শুনি ওগো, শুধু শুনি আমি’ গানটিতে আছে অনবদ্য একটি পঙ্‌ক্তি— ‘মাধবী মধুপে কানাকানি করে’। এখানে আশ্চর্য ভাবে সুরের পর্দা নেমে যাওয়াতে ‘কানাকানি’ কথাটি একটি বিশেষ মাত্রা পায়। সন্ধ্যার কণ্ঠে এই ভাবটি অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠে, মনে হয় যেন ফিসফিস করে কথা হচ্ছে। উচ্চ স্তরের, প্রতিভাবান সুরস্রষ্টা না হলে এ জিনিস অসম্ভব।

আর একটি অনন্য সৃষ্টি সন্ধ্যা-শ্যামলের দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া ‘বলে কুহু কুহু কোয়েলা’ গানটি। এই গান ‘দৃষ্টি’ ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। গানটি শুনলে বোঝা যায়, কী ভাবে প্রেমালাপকে মোৎজ়ার্টের অপেরার নরনারীদের মিলনমুহূর্তের সাঙ্গীতিক আদানপ্রদানে উন্নীত করা যায়। গানের গোড়ায় অনেকটা তান এবং কোয়েলের ডাকের মাঝামাঝি একটি স্তরে কণ্ঠস্বরকে খেলানো হয়, যা আমাদের ওই জার্মান সুরস্রষ্টার অপেরা ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-এর প্রেমিকযুগল ‘পাপাগিনা’ আর ‘পাপাগিনো’র সুরসংলাপের কথা মনে করায়।

সঙ্গীত কখন সার্থক হয়ে ওঠে, তা নিয়ে অনুপমের নিজের কথায়, “অন্তর জানতে পারে সঙ্গীত আন্তরিক হলো কিনা। আন্তরিক সঙ্গীতে আত্মসমর্পণের বীজ থাকে। এই বীজ থেকে সৃষ্টি হয় তিনটি বিশিষ্ট ধারা। প্রথম হৃদয় থেকে উঠে সে হয় ঊর্ধ্বমুখী— যায় সে আত্মার অন্বেষণে, দ্বিতীয় ধারা সুন্দর পৃথিবীকে সুন্দরতর করে, তৃতীয় ধারা— হৃদয় থেকে উঠে আবার হৃদয়ে ফিরে আসে।” সুরের জগতে যাঁর অবাধ বিচরণ, যিনি বাংলার সনাতনী সুরের সঙ্গে ভিনদেশি সুধাকে অনায়াসে মিশিয়ে দিতে পারতেন, তাঁর মুখেই এই কথা সাজে। তিনিই ওই তিনটি স্তরে বা পরতে বাঙালি শ্রোতার হৃদয়কে এক মায়াবী জগতে নিয়ে যেতে পারেন, মর্ত থেকে স্বপ্নলোকে আমাদের মনকে নিয়ে যেতে পারেন।

তাঁর সময়ের বঙ্গসমাজ যে প্রথমেই তাঁকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেনি, অভীকের লেখায় সেই সাক্ষ্য পাই। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন যে ‘অগ্রদূত’ গোষ্ঠী, তাঁদেরই এক জন, বিভূতি লাহা— ছবির সিচুয়েশন অনুযায়ী গানগুলি কেমন হবে তা নিয়ে সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার অনুপমের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেছিলেন। ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’র সুর নিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, এই সুর দর্শক নেবে না। সুরকার প্রথমে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ছবির এই দৃশ্যে কুয়াশাঘন পরিবেশ যে স্বপ্নময় মুহূর্ত তৈরি করছে, গানের সুরও সেই অনুযায়ী কমে বেড়ে ভেসে ভেসে যাচ্ছে, এটাই তো আদর্শ ওই পরিস্থিতিতে। তাও বিভূতি লাহা বললেন, অন্য কোনও সুর করার জন্য।

নিবন্ধকার লিখছেন, এর পরে অনুপম নাকি বলেন, “সিচুয়েশন অনুযায়ী এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। তাছাড়া বিভূতিবাবু আপনার হাতে আরও কয়েকটি ছবি আছে। ‘অগ্নিপরীক্ষা’র গান ফ্লপ হলে আমি কিন্তু বাংলা ছবি থেকেই সরে যেতে বাধ্য হব।” এই ‘বাঙাল’ জেদের কাছে ছবির পরিচালক হার মানেন, আর গানটি ছবিটির চেয়েও বেশি মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।

গানটিকে আমরা মনে রেখেছি, কিন্তু গানের সুরকারকে? তাঁর অবস্থা এমনই যে, তাঁর মৃত্যুর বছরটিকে নিয়েও অবিশ্বাস্য রকমের বিভ্রান্তি আছে। আরও অবিশ্বাস্য যে, এই ব্যাপারটি নিয়ে কেউ আলোচনা করেন না। আন্তর্জাল ঘাঁটলে তিনটি সালের উল্লেখ পাওয়া যায়, ১৯৪৭, ১৯৫২ আর ১৯৫৬। প্রথম দু’টির অসম্ভবতা এক ঝলকেই বোঝা যায়, ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিটিই যে ১৯৫৪ সালে নির্মিত হয়েছে! তবে কি আন্তর্জালের এই ঘোষণা, “…পাস্ড অ্যাওয়ে অন টুয়েল্ফথ ডিসেম্বর, ১৯৫৬ ইন ক্যালকাটা, ওয়েস্ট বেঙ্গল, অ্যাট দ্য এজ অব ফর্টি ফাইভ...” বিভ্রান্তি দূর করে? কিন্তু মারাত্মক সব খটকা রয়েই যায় যে!

১৯৭০ সালে মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘দুরন্ত তুমি বিদায়ের আগে’ গানটির কথাই ভাবা যাক। এই গানের স্বীকৃত গীতিকার শান্তি ভট্টাচার্য আর স্বীকৃত সুরকার অনুপম ঘটক। যদিও ‘ছাপার অক্ষরে’ লেখার আসলে কোনও প্রয়োজনই নেই, নিঃসন্দেহে সুরটি অনুপম ঘটকের, তাঁর অননুকরণীয় শৈলীর স্বাক্ষর এই গানের সর্বাঙ্গে, কর্ড প্রোগ্রেশন-এর সেই দোলনার মতো ওঠানামা, যা শ্রোতার সমস্ত মনকে দুলিয়ে দেয়।

এরকম গান সত্তরের দশক জুড়েই ছড়িয়ে আছে, যেমন শিপ্রা বসুর কণ্ঠে, হীরেন বসুর কথায় ‘দু’টি তারা হারা হয়ে আঁখিতারকায়’ (১৯৭২), অরুণ দত্তের গলায় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘কুহুর কবিতা পৃথিবী যে ওই শোনে’ (১৯৭৬) বা তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া, পবিত্র মিত্রের কথায় ‘আমার এ গান পড়বে তোমার মনে’ (১৯৭৯)। গানগুলির প্রত্যেকটি অনুপম ঘটকের সুর বলে স্বীকৃত এবং এদেরও প্রত্যেকটিতে আছে তাঁর জাদুস্পর্শ।

‘কুহুর কবিতা’ গানটির কথাই ধরা যাক। এর কথা যেমন গম্ভীর, সুরও তেমনই আশ্চর্য গভীর, কিন্তু তা সত্ত্বেও একে ‘হেভি লিসনিং’ বলে মনে হয় না। লয়, তাল আর ছন্দের ‘জাগলারি’ ছাড়াই কী ভাবে শহরজীবনের একাকী মুহূর্তের সঙ্গে সুরকে খাপ খাওয়াতে হয়, যাতে সত্যিই মনে হয় ‘কিমাকার ডায়নামো’র মতো পৃথিবী নিঃশব্দে যেন এক অদৃশ্য পায়েড পাইপার-এর ওয়াল্টজ় ছন্দের জাদুতে তালে তালে পাক খাচ্ছে। এরকম সুর দিয়ে কাহিনি নির্মাণ করা ওই মানুষটির পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু তথ্য যে বলছে, তিনি তো এই গান গীত হওয়ার কুড়ি বছর আগেই চলে গেছেন!

এখানে হয়তো বলা হবে, গায়ক অরুণ দত্ত ছিলেন একাধারে অনুপম ঘটকের শিষ্য ও জামাতা। হয়তো তাঁর কাছে অনুপমের কিছু স্বরলিপি ছিল। কিন্তু কথা ছাড়া স্বরলিপি আসে কোথা থেকে? যত দূর খুঁজে দেখা যায়, সত্তর দশকের ওই গানগুলি কোনও পুরনো গানের নতুন সংস্করণ নয়। তা ছাড়া মাধুরী, শিপ্রা বা তরুণের সঙ্গে তো তাঁর কোনও বিশেষ সম্পর্ক ছিল না। তা হলে ওই সব গানের রেকর্ডিংয়ের দিনে সুরকার বা অ্যারেঞ্জার হিসেবে কে উপস্থিত ছিলেন?

এই বিভ্রান্তি দূর করতে যদি কেউ যথাযথ আলোকপাত করেন, তা হলে এই মানুষটির স্মৃতির প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা দেখানো হবে বলে মনে হয়। সুরসন্ধানীরা তাঁর গানগুলির যথার্থ মূল্যায়ন করলেই একমাত্র তাঁকে বিস্মৃতি ও বিভ্রান্তির অন্ধকার থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন