Human Generations

আফ্রিকায় জন্মের পর আধুনিক মানুষ কত প্রজন্মে পৌঁছোল? তিন লক্ষ বছরের হিসাব কষে বার করলেন আমেরিকার বিজ্ঞানীরা

মানব প্রজন্মের মেয়াদ বা ব্যবধান নিয়ে এর আগে একাধিক গবেষণা হয়েছে। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন উত্তর বার করেছেন। ফলে এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ০৮:৫৯
Share:

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলে মানুষের জীবনধারা। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

নিজের বংশের শিকড় খুঁজতে কেউ পারিবারিক ইতিহাস ঘাঁটেন, কেউ অনলাইনে বংশবৃত্তান্তের ওয়েবসাইট খোঁজেন। নাছোরবান্দা কেউ কেউ আবার ডিএনএ পরীক্ষা করাতে ছোটেন! বংশ পরম্পরায় পিছোতে পিছোতে তাঁরা খুঁজতে চান নিজের অস্তিত্বের উৎস। রোমাঞ্চিত হতে চান সেই ইতিহাস জেনে।

Advertisement

এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে যত বংশলতিকা (ফ্যামিলি ট্রি) পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে দীর্ঘতমটি চিনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর মোট ৮০টি প্রজন্মের কথা জানা যায়। তাঁর উত্তরাধিকারেরা এখনও জীবিত এবং কনফুসিয়াসের বংশের পরিচয়ই বহন করেন। প্রায় তিন হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রাচীন বংশ। কিন্তু আধুনিক মানুষ তো তার চেয়েও পুরনো! তিন হাজার নয়, তিন লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে পথ চলা শুরু করেছিল হোমো স্যাপিয়েন্স। আফ্রিকায় সেই আবির্ভাবের পর থেকে এখনও পর্যন্ত মানুষ কত প্রজন্মে পৌঁছোল? সম্প্রতি তারই হিসাব কষেছেন আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী। অঙ্ক কষে তাঁরা বার করেছেন আধুনিক মানুষের মোট প্রজন্মের সংখ্যা। সভ্যতার ইতিহাসে এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে বলে বিজ্ঞানীদের মত।

আমাদের জানা প্রাচীনতম জীবাশ্মের বিজ্ঞানসম্মত সাল-তারিখ অনুযায়ী, আধুনিক মানুষ পৃথিবীতে টিকে আছে প্রায় তিন লক্ষ বছর ধরে। এই হোমো স্যাপিয়েন্সের মোট প্রজন্মের সংখ্যা জানতে গবেষণা শুরু করেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা প্রদেশের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় ব্লুমিংটনের জনসংখ্যা-জিনতত্ত্ববিদ ম্যাথিউ হান। তাঁর নেতৃত্বে গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালে, ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়। সেখানেই তিনি হিসাব করে মানব প্রজন্মের মোট সংখ্যা দেখিয়েছেন। কী ভাবে সেই সংখ্যা নির্ণয় করেছেন, জানিয়েছেন সেই পদ্ধতিও।

Advertisement

ম্যাথিউ জানিয়েছেন, পৃথিবীতে হোমো স্যাপিয়েন্স যত দিন ধরে রয়েছে, সেই সংখ্যাকে আধুনিক মানুষের এক-একটি প্রজন্মের গড় মেয়াদ দিয়ে ভাগ করলেই মোট প্রজন্মের সংখ্যা পাওয়া যাবে। তবে তার জন্য আগে মানব প্রজন্মের গড় মেয়াদ বা ‘প্রজন্মের ব্যবধান’ নির্ভুল ভাবে নির্ণয় করা দরকার। কী ভাবে প্রজন্মের মেয়াদের গড় নির্ণয় করা যায়? ম্যাথিউ তা-ও দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষ যে বয়সে সন্তানের জন্ম দেয়, তার একটি গড় হিসাব এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে। সেটা পুরুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি এবং মহিলার ক্ষেত্রে কম। কারণ, পুরুষদের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতার মেয়াদ তুলনামূলক বেশি থাকে।

মানব প্রজন্মের মেয়াদ বা ব্যবধান নিয়ে এর আগে একাধিক গবেষণা হয়েছে। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন উত্তর বার করেছেন। ফলে এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ২০০৩ সালে আইসল্যান্ডের মানুষদের নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল ‘আমেরিকান জার্নাল অফ হিউম্যান জেনেটিক্স’-এ। ওই দেশের প্রাচীন গির্জা এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছিলেন, গত ৩০০ বছরে আইসল্যান্ডে প্রজন্মের গড় ব্যবধান ৩০.৩ বছর। আবার, ২০০৫ সালের একটি গবেষণার কেন্দ্রে ছিলেন ইউরোপীয়েরা। ১৯৬০ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার বয়সের ভিত্তিতে পুরুষদের প্রজন্মের ব্যবধান নির্ণয় করা হয়েছিল। গড় প্রজন্ম ব্যবধান পাওয়া গিয়েছিল ২৯.১ বছর।

ম্যাথিউদের গবেষণার ব্যাপ্তি অবশ্য এর চেয়ে অনেক বেশি। তাঁরা গত আড়াই লক্ষ বছরেরও বেশি সময়ের প্রজন্ম-ব্যবধান নির্ণয় করেছেন। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, পিতামাতার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের দেহে সম্মিলিত মিউটেশনও (ডিএনএ-র স্থায়ী পরিবর্তন) বদলে যায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে ম্যাথিউরা নতুন মিউটেশনগুলির একটি মডেল তৈরি করেন, যা প্রজন্মের ব্যবধান অনুসারে একদল নতুন মানুষের মধ্যে দেখা যাওয়া সম্ভব। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ম্যাথিউ বলেন, ‘‘কোনও বাবা-মা বয়স অনুসারে সন্তানের মধ্যে কী মিউটেশন রেখে যাচ্ছেন, তা যদি আমরা জানতে পারি এবং নতুন মিউটেশনের একটি তালিকা যদি আমাদের কাছে থাকে, তবে ওই নতুন ব্যক্তিদের বয়সের হিসাব অনুমান করা সম্ভব। এ ভাবেই আমরা প্রজন্মের সংখ্যা হিসাব করেছি।’’

ম্যাথিউ এবং তাঁর সহকর্মীরা মিউটেশনগুলিকে উদ্ভবের সময় অনুসারে শ্রেণিবদ্ধ করেন এবং আবির্ভূত নতুন মিউটেশনগুলির মিশ্রণ নির্ধারণ করেন। তার মাধ্যমে প্রতিটি সময়কালের সাপেক্ষে প্রজন্মের ব্যবধান তাঁরা নির্ণয় করেন। দেখা যায়, আড়াই লক্ষ বছরের প্রজন্মের গড় ব্যবধান ২৬.৯ বছর। এই হিসাবে তিন লক্ষ বছরে মানুষ আনুমানিক ১১ হাজার ১৫২টি প্রজন্ম তৈরি করে ফেলেছে। স্পেনের জীববিজ্ঞানী তথা জিনতত্ত্ববিদ মোইসেস কল মাসিয়া জানিয়েছেন, ২৬.৯ বছরের প্রজন্ম-ব্যবধান একেবারে অকল্পনীয় নয়। তবে প্রজন্মগুলির সম্ভাব্য মেয়াদ উল্লেখ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ব্যবধানের সঙ্গে মিল থাকতে পারে মানুষের অন্যতম ‘নিকট আত্মীয়’ শিম্পাঞ্জিদের। ২০১২ সালের গবেষণায় শিম্পাঞ্জিদের আনুমানিক প্রজন্মকাল বলা হয়েছিল ২৪.৬ বছর। মোইসেসের মতে, সর্বনিম্ন এই ব্যবধান ধরলে মানুষের প্রজন্মের সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১২,১৯৫টি। এ ছাড়া, যদি সর্বোচ্চ ৩০ বছরের ব্যবধান ধরা যায়, তবে মানুষের প্রজন্মের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১০ হাজার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement