FIFA World Cup 2026

বিশ্বকাপের আগে ব্রাজ়িলকে নিয়ে গান কলকাতার শিল্পী অভিষেকের, ফুটবলের সাম্বার ছন্দের সঙ্গে মিলল তবলার বোল

২০০০ সাল থেকে বিশ্ব জুড়ে পেশাদার শিল্পী হিসাবে পারফর্ম করছেন অভিষেক বসু। ব্রাজ়িলের ভক্ত অভিষেক এ বার চান, বিশ্বকাপ উঠুক নেমারদের হাতে।

Advertisement

দেবার্ক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ১২:৪৯
Share:

ব্রাজ়িল ফুটবল দল। (ইনসেটে) অভিষেক বসু। ছবি: সংগৃহীত।

৫ মিনিট ৭ সেকেন্ডের একটা গান। শুনলে প্রথমে মনে হবে লাতিন আমেরিকা বা স্প্যানিশ ভাষায় গাওয়া। কিন্তু ভাল করে শুনলে বোঝা যাবে, এই গানে কোনও ভাষাই নেই। কিছু কথা আছে শুধু। সঙ্গে ছন্দ। আসলে সঙ্গীতের তো কোনও ভাষা হয় না। ঠিক যেমনটা ফুটবলের কোনও ভাষা নেই। ফুটবলের আবেগ ও সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতের তবলা ও লাতিন আমেরিকার ছন্দ মিলিয়ে গান বানিয়েছেন অভিষেক বসু। ব্রাজ়িলকে নিয়ে তৈরি এই গান। নাম ‘সেলেকাও অন সং।’

Advertisement

৪৪ বছরের অভিষেক কলকাতার টালিগঞ্জের বাসিন্দা। ৬ বছর বয়স থেকে তবলার তালিম নিয়েছেন প্রয়াত পণ্ডিত শঙ্কর ঘোষ ও পণ্ডিত বিক্রম ঘোষের কাছে। ২০০০ সাল থেকে বিশ্ব জুড়ে পেশাদার শিল্পী হিসাবে পারফর্ম করছেন অভিষেক। পেয়েছেন বহু পুরস্কার। গানের পাশাপাশি ফুটবলেরও সমান ভক্ত অভিষেক।

পারিবারিক ভাবে ব্রাজ়িলের ভক্ত অভিষেক আনন্দবাজার ডট কম-কে বললেন, “আমি শুধু ব্রাজ়িলের ফুটবলের নয়, ব্রাজ়িল-সহ লাতিন আমেরিকার ছন্দ ও সঙ্গীতের ভক্ত। আসলে লাতিন আমেরিকার সঙ্গে ভারতীয় ছন্দ ও সঙ্গীতের অনেক মিল রয়েছে। সেই টান থেকেই এই ভাবনা। ব্রাজ়িলের ফুটবলও তো একটা শিল্প। সেখানেও ছন্দ আছে। এই দু’য়ের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এই গান।”

Advertisement

ভাবনা অভিষেকের হলেও এই গানের কথা প্রয়াত চন্দ্রচূড় মুখোপাধ্যায়ের। গেয়েছেন তিনিই। ১১ জুন অনলাইনে গানটি মুক্তি পাবে। এই গানের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হবে চন্দ্রচূড়কেও, এমনটাই মত অভিষেকের। তিনি বললেন, “আমার গানবাজনার যে দল আছে, সেখানে চন্দ্রচূড় গাইত। এই গানের কোনও ভাষা নেই। একে বলে স্ক্যাটিং। আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকায় গ্রাম্য এলাকায় এই স্ক্যাটিংয়ের ব্যবহার খুব বেশি হয়। শুনলে প্রথমে মনে হবে লাতিন আমেরিকা বা স্পেনের ভাষা। তা কিন্তু নয়।”

নির্দিষ্ট কোনও ভাষার ব্যবহার না করার নেপথ্যেও একটা কারণ সেই ফুটবল। অভিষেক বললেন, “ফুটবলারেরাও খেলার মাঝে সতীর্থের সঙ্গে কথা বলার জন্য কোড বা সাঙ্কেতিক ভাষা ব্যবহার করে। যাতে প্রতিপক্ষ বুঝতে না পারে কী বলছে। সেখান থেকেও এই ভাবনা। ফুটবলের যেমন কোনও ভাষা নেই। তেমনই সঙ্গীতেরও ভাষা নেই। একটা অন্য রকম ভাষা তৈরির চেষ্টা করেছি। আশা করি, গানটা শুনলে সকলে আনন্দ পাবেন।”

১৫ বছর আগে লেখা হয়েছিল এই গানের কথা। গানটি অবশ্য তৈরি হয়েছে ২০১৮ সালে। তা হলে এত বছর পরে কেন তা মুক্তি পাচ্ছে? ব্রাজ়িলের ফুটবল তার জন্য খানিকটা হলেও দায়ী। অভিষেক বললেন, “গত কয়েক বছর ব্রাজ়িলের দল গোছানো ছিল না। এ বার ছবিটা আলাদা। আনচেলোত্তির মতো কোচ আছেন। আমি রিয়াল মাদ্রিদের ভক্ত। দুর্দান্ত একটা দল বানিয়েছেন আনচেলোত্তি। ব্রাজ়িলে কোনও সময়ই শিল্পের অভাব ছিল না। কিন্তু রাজনীতির জন্য ভাল ফুটবলারদের নেওয়া হয়নি। এ বার সেই রাজনীতি হয়নি।” ব্রাজ়িল যে এ বার বিশ্বকাপ জিততে পারে, তা মনে করেন অভিষেক। তাঁর কথায়, “খাতায়-কলমে হয়তো বিশাল নাম নেই। কিন্তু যাঁরা আছেন তাঁরা খুব ভাল ফুটবলার। যদি প্রতিটা প্লেয়ার নিজের দক্ষতা অনুযায়ী খেলেন তা হলে ব্রাজ়িলকে হারানো মুশকিল। তবে হ্যাঁ, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।”

বিশ্ব ফুটবল নিয়মিত দেখলেও ভারতীয় ফুটবল এখন তেমন দেখা হয় না ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক অভিষেকের। তবে ২২ বছর পর লাল-হলুদ আইএসএল জেতায় খুব আনন্দ পেয়েছেন। এক প্রিয় দল ২২ বছর পর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর এক প্রিয় দল কি পারবে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপ জিততে? অভিষেক বললেন, “ব্রাজ়িলের একটা ব্যাপার আছে। ২০ বছরের তফাতে জেতে। ১৯৭৮ সালে কী দুর্দান্ত দল ছিল। জ়িকোদের সেই দলও তো জিততে পারেনি। এ বার জেতার সম্ভাবনা আছে। তবে তার জন্য নেমারকে এ বার ভাল খেলতেই হবে। এটাই ওর শেষ সুযোগ।” ব্রাজ়িলের সমর্থক হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই আর্জেন্টিনা তাঁর শত্রু। তবে লিয়োনেল মেসির খেলা দেখতে ভাল লাগে তাঁর। মেসিকে সর্বকালের সেরাদের একজন বলেই মনে হয় অভিষেকের।

ব্রাজ়িলকে নিয়ে আশা দেখলেও বাংলা তথা ভারতের ফুটবল নিয়ে খুব একটা আশা দেখছেন না অভিষেক। তার একমাত্র কারণ, রাজনীতি। তিনি বললেন, “কলকাতায় ফুটবল পাগল সমর্থকের অভাব নেই। কিন্তু শুধু সমর্থকদের মধ্যে উন্মাদনা থাকলেই তো হবে না, সিস্টেমের মধ্যেও থাকতে হবে। নইলে উন্নতি হবে না।” এই সমস্যা থেকে সমাধানের জন্য সেই বিদেশি ফুটবলের প্রসঙ্গ টেনেছেন অভিষেক। বললেন, “আমি মনে করি, মেসি, নেমারের মূর্তি না বসিয়ে ওঁদের কোচ হিসাবে আনুন। অ্যাকাডেমি তৈরি করুন। ব্রাজ়িলে প্রতিটা পাড়ায় অ্যাকাডেমি আছে। এখন বাঙালি ফুটবলার ক’জন। তার দায় কার? যাঁরা দায়িত্ব পেয়েছেন তাঁরা তৈরি করতে পারছেন না। আইএসএলের শুরুর দিকে জ়িকো বলেছিলেন, আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হোক, তৈরি করব। সেটা শোনাই হল না। বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। ওখানে গিয়ে শিখতে হবে। নইলে উন্নতি হবে না।”

তবে স্বপ্ন দেখেন অভিষেক। স্বপ্ন দেখেন, এক দিন ভারতের ফুটবলেও সোনালি দিন আসবে। আসলে সঙ্গীতের মতো ফুটবলেও তো কোনও বেড়াজাল নেই। তা এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তেমন দিন এলে হয়তো ভারতীয় ফুটবলের জন্যও গান বাঁধবেন ব্রাজ়িলের ভক্ত অভিষেক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement