• ২০ অক্টোবর ২০২০ শহর

গান শেষ আর জান শেষ তো একই কথা রাজামশাই

প্রমথেশ বড়ুয়ার আবিষ্কার। চল্লিশের দশকের ‘ম্যাটিনি আইডল’ রবীন মজুমদারকে নিয়ে লিখছেন পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায়

২৯, ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:০১

শেষ আপডেট: ২৮, ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৭:০৬


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

সালটা ১৯৩৮। স্কটিশ চার্চ কলেজের অ্যানুয়াল সোশ্যাল। প্রেসিডেন্ট হয়ে মঞ্চের সামনের সারিতে বসে প্রমথেশ বড়ুয়া। ইয়ং ব্রিগেডের স্বপ্নের নায়ক। মঞ্চে গান ধরল ফোর্থ ইয়ারের সেক্রেটারি ছেলেটি। নজরুলগীতি। ‘‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে/ বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে।’’ গাইতে গাইতে চোখভর্তি জল নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল সে। 

অনুষ্ঠান শেষ। ছেলেটির ডাক পড়ল প্রমথেশ বড়ুয়ার কাছে। বড়ুয়াসাহেব ভারী প্রশংসা করলেন ছেলেটির গানের। বললেন, পরের দিন যেন সে অবশ্যই দেখা করে। ছেলেটি আত্মহারা। বড়ুয়াসাহেবের গুণমুগ্ধ সে। বড়ুয়া-কাফ জামা পরে, সঙ্গে দেবদাসের মতো মালকোঁচা দিয়ে ধুতি। তাঁর সামনে গিয়েই দাঁড়াতে হবে তাকে? 

পরদিন সে গেল বড়ুয়াসাহেবের কাছে। এ কথা-সে কথা হল। আচমকাই বড়ুয়াসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিনেমায় নামতে চাও?’ ঘাবড়ে গেল ছেলেটি। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। তার উপরে ব্রিটিশ রাজত্বে রেলে বড় চাকরি করা তার বাবা অত্যন্ত রাশভারী আর রক্ষণশীল মানুষ। তাঁর স্বপ্ন, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে। ম্যাট্রিকুলেশনে তুখোড় ফল করা ছেলের কাছে বাবার এমন আশা করা তো অস্বাভাবিক নয়। বড়ুয়াসাহেব খানিক শুনলেন, খানিক বুঝে নিলেন। তার পরে ছেলেটির বাড়ির ঠিকানা চেয়ে রেখে দিলেন। পরীক্ষাশেষে ছেলেটির সেখানেই যাওয়ার কথা কিনা!

সেখানেই এল বড়ুয়াসাহেবের চিঠি। কলকাতায় ফিরে দেখা করার জরুরি তলব নিয়ে। পড়াশোনার অজুহাত দিয়ে বাবার আশীর্বাদ নিয়ে ছেলে এল কলকাতায়। যদিও ছোট বোন কবিতাপাঠিকা গৌরী ঘোষ জানালেন, ছেলের অভিনয়ে আসার কথা পরে জানতে পেরে বাবা অত্যন্ত রেগে যান এবং ছেলের মাসোহারাও বছরখানেকের জন্য বন্ধ করে দেন। এক সময়ে বড়ুয়াসাহেবের সঙ্গে দেখা করে বাবা এমনও বলেছিলেন, ‘‘আপনি আমার সবচেয়ে রত্ন ছেলেটিকে কেন কেড়ে নিলেন?’’ কিন্তু এটাও ঠিক, সে দিন বাবাকে মিথ্যেটুকু না বললে হয়তো কোনও দিনই আর নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়া হত না রবীন মজুমদারের। 

Advertising
Advertising

এক সাক্ষাৎকারে রবীনবাবু বলেছিলেন বড়ুয়াসাহেবের সঙ্গে স্টুডিয়োয় যাওয়ার দিনটির কথা— গোটা দিন জুড়ে ঘটে চলল কতশত আশ্চর্য ঘটনা। গান করতে হল অনুপম ঘটকের সামনে। তার পরে যাওয়া হল কালী ফিল্মস স্টুডিয়োয়। মেকআপ হল, রঙিন ধুতি-জামা পরা হল, তার পরে সোজা ক্যামেরার সামনে। স্ক্রিন টেস্ট, ভয়েস টেস্ট হওয়ার পরে বড়ুয়াসাহেব ছবির প্রযোজক কে এস দরিয়ানির কাছে গিয়ে বললেন, ‘‘এই যে আপনার নতুন হিরো।’’ সে ছবির নাম ‘শাপমুক্তি’। মুক্তির সাল ১৯৪০। এতে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল সুশীল মজুমদারের এবং গান করার কথা ছিল সত্য চৌধুরীর। কিন্তু তাঁদের বাদ দিয়ে প্রমথেশ নিয়ে এলেন রবীনবাবুকে। আর বাংলা ছবির দর্শক পেলেন তাঁদের আগামী বেশ কয়েক বছরের ম্যাটিনি আইডলকে। প্রমথেশ বড়ুয়া শুধু যে তাঁকে হাত ধরে সিনেমায় নিয়ে এসেছিলেন, তা নয়। বড়ুয়াসাহেব সম্পর্কে স্মৃতিচারণায় রবীনবাবু বলেছিলেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতেন মিস্টার বড়ুয়া। যিনি কখনও শাসন করতেন, কখনও প্রশ্রয় দিতেন, কখনও তিরস্কার করতেন, কখনও বা অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে থাকতেন। 

আরও লিখেছিলেন তিনি, ‘‘আমার চিত্রজীবনে যখন মধ্যাহ্ন-সূর্যের দীপ্তি, তখন একটা সময়ে আমি ভেসে গিয়েছিলাম ওই তরল পানীয়ের স্রোতে। তখনো এক-একটা মুহূর্তে আমার মনে পড়ত মিস্টার বড়ুয়ার কথা, মনে পড়ত তাঁর সতর্কবাণী, কিন্তু তখন তো আর তিনি বেঁচে নেই, পরলোকের সেই প্রান্ত থেকে তাঁর হাত তো আমার কাঁধ স্পর্শ করতে পারত না। তা যদি পারত তবে আমার জীবন অন্যভাবে নিয়ন্ত্রিত হত, আমার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত।’’

‘শাপমুক্তি’র পরে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর ঝুলিতে ‘গরমিল’, ‘নন্দিতা’, ‘সমাধান’, ‘কবি’, ‘ভাঙাগড়া’, ‘না’, ‘টাকা আনা পাই’-এর মতো ছবি রয়েছে। বিশেষত ‘কবি’ ছবিতে তাঁর অসাধারণ অভিনয় সাড়া ফেলে দেয় চলচ্চিত্র জগতে। হিন্দিতে ‘অ্যারাবিয়ান নাইটস’ ছবিতে কানন দেবীর বিপরীতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন, গানও গেয়েছেন। অভিনয়ের সঙ্গে সুললিত কণ্ঠস্বরটি দিয়েও মন জয় করে নিয়েছিলেন দর্শকের। ‘গরমিল’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘এই কি গো শেষ দান’ গানটি প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়। এ ছাড়াও ‘বালুকাবেলায় মিছে কী গড়িস খেলাঘর’, ‘এই যে এলাম শঙ্খনদীর তীরে’, ‘কালো যদি মন্দ তবে’, ‘দেখা হল কোন লগনে’র মতো অনেক গানই আজও নাড়া দিয়ে যায়। ‘কবি’ ছায়াছবিতে তাঁর গান শুনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, ‘‘দ্বিতীয় সায়গল কণ্ঠকে উপলব্ধি করলাম।’’ অথচ মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীর সারিতে রবীনই ঠাঁই পাননি!

একটা সময়ে তাঁকে দিয়ে গান গাওয়ানোর জন্য মুখিয়ে থাকতেন সঙ্গীত পরিচালকরা। তেমনই এক জন ছিলেন সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায়। তিনি আবার রবীন মজুমদারের বন্ধুও বটে। রবীন চট্টোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে গিয়েছেন একটি গান গাওয়াবেন বলে। গানটি ‘আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ’। অথচ রবীন গোঁ ধরে আছেন, কিছুতেই তিনি গানটি গাইবেন না। সুরকারও নাছোড়। শেষে জেদ ভাঙলেন শিল্পী। সেই গান আজ এত বছর পার করেও অমর হয়ে আছে। সেই আমলে মেগাফোন কোম্পানি থেকে প্রায় দেড় লাখের মতো এই গানের ডিস্ক বিক্রি হয়েছিল। তাঁর কণ্ঠ শুনে শচীনদেব বর্মণ এক বার বলেছিলেন, ‘‘অভিনয় ছাইড়া দাও রবীন, খালি গান গাইয়া যাও।’’ 

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে রবীনবাবু ছিলেন গায়ক-নায়ক। বারো-তেরো বছর বয়সেই দিনাজপুরে উত্তরবঙ্গ রাজশাহী ডিভিশন মিউজ়িক কম্পিটিশনে গান গেয়ে ফার্স্ট হয়েছিলেন। তাঁদের মতো রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে গানবাজনা করবে, এমনটা ভাবাই কিছুটা কষ্টকর ছিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, প্রধান আপত্তিটা যাঁর কাছ থেকে আসার কথা ছিল, সেই বাবাই গানের প্রতিযোগিতায় ছেলের প্রথম হওয়ায় ভারী খুশি হয়েছিলেন। হারমোনিয়ামও কিনে দিয়েছিলেন একখানা। বাবার উৎসাহেই তিনি নিয়মিত গানের চর্চা চালিয়ে যান। শচীনদেব বর্মণ এবং কৃষ্ণচন্দ্র দে-র গানের ভারী ভক্ত ছিলেন রবীন। রেকর্ডে তাঁদের গান শুনে অনায়াসে তুলে নিতেন হারমোনিয়ামে। তার পর বন্ধুদের কাছে সেই গান গেয়ে আসর মাত করতেন। 

পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে আসার পরে বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন রবীন, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে গান শেখার অনুমতি চেয়ে। অনুমতি মিলেছিল সঙ্গে সঙ্গেই। রবীন মজুমদারের প্রথাগত গান শেখার হাতেখড়িটি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছেই। যত্ন করে তাঁকে নজরুলগীতি শিখিয়েছিলেন ভীষ্মদেব। রবীন লিখেছিলেন, ‘কথার সঙ্গে সুরের মেলবন্ধনে সংগীত নামক যে অপরূপ বস্তুটি সৃষ্টি হয় তার হদিশ ওঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।’ 

প্রথম রেকর্ডের জন্য গোড়ায় তিনি এইচএমভিতে গিয়েছিলেন। শোনা যায়, সেখানে নাকি তাঁকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখা হয়েছিল। বিরক্ত তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। পরবর্তী কালে গিয়েছিলেন মেগাফোনে। তারাপদ চট্টোপাধ্যায় তখন সেখানকার দায়িত্বে। অডিশনে পাশ করেন রবীন। প্রথম তাঁর গানের রেকর্ড বেরোল সেই মেগাফোন থেকেই। এক পিঠে ‘আজি এ বিদায়ক্ষণে’ আর অন্য পিঠে ‘ওগো অনেক দিনের চেনা’। কথা মহম্মদ সুলতানের এবং সুর ভবানীচরণ দাসের। এর পরে তাঁর যতগুলি রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছিল, তার প্রায় সবই মেগাফোন থেকে।

ব্যক্তিগত জীবনে ভারী সাদাসিধে মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাংবাদিক রবি বসু একটা সুন্দর গল্প বলেছিলেন। এক বনেদি মানুষের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজনের নিমন্ত্রণ। মাটিতে আসন ছড়িয়ে খেতে বসলেন সবাই। পাতের পাশে বৃত্তাকারে সব কাঁসার বাটি সাজানো। হঠাৎ পাশের মধ্য চল্লিশের ভদ্রলোকটির পাতের দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলেন রবি বসু। বাকিরা সবাই উচ্ছিষ্ট ফেলছিলেন পাতের পাশের মেঝেয়। কিন্তু সেই ভদ্রলোক পাতেরই এক কোণে উচ্ছিষ্ট এমন সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলেন, যেন একখানা মন্দির। কালিয়ার দু’টি আলু পাতের এক কোণে রেখে তার উপরে কাঁটাগুলি এমন সুন্দর করে গেঁথে গেঁথে রেখেছিলেন, দেখে মনে হচ্ছিল ছোটখাটো দু’টি পিন কুশন পাতের উপরে রাখা। 

কিন্তু এমন পরিপাটি মানুষও একটা সময় জীবনটাকে বড় বেশি অগোছালো করে ফেলেছিলেন। সরল মনের ছিলেন বলে মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলতেন বড় সহজেই। তাঁর জীবনে আর্থিক অনটনের শুরু হয় ১৯৫২ সাল নাগাদ। সেই সময়ে তিনি আউটডোর শুটিংয়ে গিয়েছিলেন। এক বন্ধুস্থানীয় মানুষের কথা অনুযায়ী একটি ছবির চুক্তিপত্রে সই করেন। অতি বিশ্বাসে পড়ে দেখেননি শর্তগুলো কী। তাতে ছিল, সামান্য মাসিক টাকার বিনিময়ে তাঁরা তাঁকে ‘এক্সক্লুসিভ আর্টিস্ট’ হিসেবে গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদকালে তিনি অন্য কোনও ছবিতে সই করতে পারবেন না। 

কিন্তু বিষয়টি তাঁর জানা না থাকায় তিনি এর পরেই অন্য এক প্রযোজকের এক ছবির জন্য সই করেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আসে উকিলের চিঠি। শুরু হয় মামলা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলে তা। রবীন তত দিনে যে ক’টি ছবিতে সই করেছেন, সব কিছুর উপরেই বসে স্থগিতাদেশ। হাতে আর কোনও ছবিও নেই। প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টের সেই শুরু। অবস্থা এমন দাঁড়াল, দু’বেলা খাওয়া জোটাই দুষ্কর হয়ে ওঠে! 

সেই মামলা কিন্তু জিতেছিলেন রবীন মজুমদার। পাঁচ বছর পরে। কিন্তু ঘটনাচক্রে কোনও ক্ষতিপূরণই পেলেন না তিনি। এতেই সমস্যার শেষ নয়। ওই সময়ে আক্কেল দাঁতের ব্যথায় অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছিলেন শিল্পী। ব্যথা কমানোর জন্য তাঁকে মরফিন ইঞ্জেকশন নিতে উপদেশ দেন তাঁর এক শুভানুধ্যায়ী, চলচ্চিত্র জগতেরই আর এক খ্যাতনামা মানুষ। ধীরে ধীরে শুরু হল মরফিন-এর নেশা। দ্রুত নামতে শুরু করল কেরিয়ারগ্রাফ। কাগজে শিরোনাম বেরোল ‘রবি অস্তমিত’।

হয়তো একেবারেই চলচ্চিত্র জগৎ থেকে হারিয়ে যেতেন তিনি। কিন্তু তাঁকে ফের মূলস্রোতে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষ। অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। মেডিক্যাল বোর্ড বসান। বাবা ডাক্তার সনৎকুমার ঘোষের চিকিৎসায় এবং পুত্র নচিকেতা ঘোষের শুশ্রূষায় সেরে উঠলেন রবীন। বিশ্বশ্রী মনতোষ রায়ের কাছে ব্যায়ামচর্চা করে ফিরে পেলেন স্বাস্থ্য। প্রমথেশ বড়ুয়া যদি তাঁকে বাংলা ছবির জগতে প্রবেশের চাবিকাঠিটি দিয়ে থাকেন, তবে নতুন জীবনে প্রবেশের চাবিটি তুলে দেন নচিকেতা ঘোষই। তাঁর সেই উজাড় করা ভালবাসা বাকি জীবনে কখনও ভোলেননি রবীন। ঘনিষ্ঠদের কাছে বলেছিলেন, ‘নচি এক একটা রাত কী যত্নেই না আমার অসুস্থ শরীরটা কাছে টেনে আমার মাথা কোলে নিয়ে সারা রাত জেগে কাটিয়েছে।’ এর পরে তিনি অসিতবরণের সঙ্গে ‘জয়দেব’ ছবিতে অসামান্য অভিনয় করেন পরাশরের চরিত্রে এবং গানে। শুধু তা-ই নয়, সুস্থ হয়ে ফেরার পরে তাঁর হাতে তখন পরপর ছবি। কিন্তু তিনি তখন তদ্বির করছেন সুরকার নচিকেতা ঘোষের জন্য। শর্ত রাখছেন, তাঁকে ছবিতে নিলে নচিকেতা ঘোষকে মিউজ়িক ডিরেক্টর হিসেবে নিতে হবে। 

এক বার নচিকেতা ঘোষ একটি গানের সুর রবীন মজুমদারকে শুনিয়ে বলেন, এ বার পুজোয় তাঁর জন্যই এই গানটি করেছেন তিনি। সে সুর শুনেই তিনি অক্লেশে বলে ওঠেন, এ গান তো হেমন্তের গলায় মানাবে। ওঁকে দিয়েই যেন গাওয়ানো হয়। হেমন্তের কণ্ঠে সেই গান, ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’। এমন আত্মত্যাগই বা করতে পারেন আর ক’জন? 

দিলখোলা, মিষ্টভাষী এমন মানুষটির বড় ভক্ত ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, উত্তমদার আগে যাঁরা বড় পর্দা কাঁপাতেন, তাঁদের মধ্যে রবীন মজুমদার, অসিতবরণের মতো নায়কের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছিল। ‘কবি’ ছবিতে রবীন মজুমদারের গান আর অভিনয় এখনও যেন চোখে ভাসে সৌমিত্রের। দু’জনের মধ্যের সম্পর্কটিও ছিল ভারী সুন্দর। বহু কাল পরে এক ছবিতে অভিনয়ের সময়ে ফের নায়কের সঙ্গে গুণমুগ্ধের সাক্ষাৎ। মাদকাসক্তি কাটিয়ে রবীনও তখন ফিরেছেন অভিনয়ের জগতে। সুতরাং, আড্ডা জমল ভালই। আড্ডাশেষে সৌমিত্র গিয়েছেন মেকআপ করতে। স্টুডিয়োর একটি বিশেষ ঘর বরাদ্দ ছিল উত্তমকুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মেকআপ নেওয়ার জন্য। কিন্তু সৌমিত্রকে তখন গল্পে পেয়েছে। তিনি ফের খোঁজ করলেন ‘রবীনদা’র। জানলেন, ওই স্টুডিয়োরই অন্য একটা ঘরে মেকআপ নিচ্ছেন তিনি। সৌমিত্র তখন নিজের মেকআপ রুমে নিয়ে আসেন তাঁকে। 

সেই ঘর জুড়ে বড় বড় অভিনেতার ছবি। রবীন মজুমদারের ছবিও সেখানে টাঙানো। স্মৃতিমেদুর সৌমিত্র বলছেন, ঠিক সেই সময়ে তিনি এক আশ্চর্য জিনিস অনুভব করেন। ওই রকম বড় মাপের মানুষ, যাঁর অমন বড় ছবি টাঙানো আছে, অত চমৎকার অভিনয়ক্ষমতা এবং গানের গলা, তিনি আজ একটা ছোট ঘরে মেকআপ নিচ্ছেন! উদীয়মান অভিনেতাদের জগতে রবীন মজুমদার যেন আজ লাইমলাইট থেকে অনেকটাই দূরে। সেই পরিচিতিটাও অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ তাই নিয়ে মানুষটার কোনও অভিযোগ নেই, নিজের জন্য কোনও কিছুর দাবিও নেই। এতটাই আত্মসম্মানবোধ ছিল তাঁর!    

এই মানুষকেই বেছেছিলেন সত্যজিৎ রায়, তাঁর ‘হীরক রাজার দেশে’র জন্য। সত্যজিৎ জানতেন, পুরনো দিনের বাংলা ছবির প্রতি সৌমিত্রের গভীর টানের কথা। তাই সৌমিত্রের কাছ থেকেই সত্যজিৎ পুরনো আমলের বাংলা ছবির দরকারি খবরগুলো পেতেন। এক দিন সৌমিত্রের কাছেই রবীন মজুমদারের খোঁজ করলেন তিনি। টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে তখন সদ্য দেখেছেন রবীন মজুমদারকে। সৌমিত্র বলছেন, ‘‘মানিকদা জানতে চাইলেন, ‘ইনিই কি তোমাদের সেই রবীন মজুমদার’?’’ সত্যিই, তাঁকে তখন চেনা যায় না। অসুখে ভুগে শরীর ভেঙে পড়েছে একেবারেই। সৌমিত্রকে সত্যজিৎ জানালেন যে, তাঁর ইচ্ছে ‘হীরক রাজার দেশে’তে রবীন মজুমদারকেই কাস্ট করতে চান তিনি। 

কিন্তু তত দিনে হাঁপানির টানে গান বন্ধ হয়েছে রবীন মজুমদারের। অথচ রোলটি গায়ক কবি চরণদাসের। যে অত্যাচারী হীরকরাজের সামনে দাঁড়িয়ে অনায়াসে গাইতে পারে— ‘দেখো ভাল জনে রইল ভাঙা ঘরে, মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে’। কিন্তু সেই গান গাইবে কে? রোলটি ছোট করে ব্যাখ্যা করে সত্যজিৎ জানতে চেয়েছিলেন, এই চরিত্রে যে গান আছে, তা তিনি গাইতে পারবেন কি না। উত্তর এসেছিল, ‘না, আমি প্রফেশনালি গান গাওয়া বহু দিন ছেড়ে দিয়েছি।’ সত্যজিৎ তখন প্রস্তাব দেন, অমর পালের গানে লিপ দিতে তাঁর কোনও অসুবিধে আছে কি না। শিল্পী জানিয়ে দেন, তাঁর কোনও অসুবিধে নেই। রবীনকে আরও একটি অনুরোধ করেছিলেন সত্যজিৎ। তাঁর দাড়ি না কাটতে। ওটা তিনি মেকআপ দিয়ে করতে চাইছেন না। অমর পালের কণ্ঠে শীর্ণ, হতদরিদ্র চেহারা অথচ জ্বলজ্বলে চোখ দু’টি নিয়ে চরণদাসের সেই গান ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’ আজও কি ভোলা যায়?

হীরকরাজকে চরণদাস বলেছিল, ‘গান শেষ আর জান শেষ একই কথা।’ এক গায়ক-নায়কের জীবনে কথাগুলি বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। ‘হীরক রাজার দেশে’ মুক্তির তিন বছর পরে ১৯৮৩ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন মজুমদার। 

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: গৌরী ঘোষ

তথ্যসূত্র: ‘আঁধার ঘরের প্রদীপ’, অরুণকুমার সরকার       


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper
আরও পড়ুন
এবিপি এডুকেশন

National Board of Examination announces tentative dates for NEET PG and other exams

Pune student attempts JEE Main despite cracking MIT, secures rank 12

Survey conducted by NCERT to understand online learning amid COVID-19 situation: Education Minister

Supreme Court to give verdict on plea against NLAT 2020 on September 21

আরও খবর
  • খেলতে খেলতে খেয়ালে

  • রূপ নয়, সুরের জাদুতেই আসর মাতাতেন জানকী

  • শান্তিনিকেতনের আকবরী মোহর

  • একটা গান লিখো আমার জন্য

সবাই যা পড়ছেন
আরও পড়ুন