পথ চলাতেই আনন্দ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘খুলিলে মনের দ্বার না লাগে কপাট’— পয়লা উপন্যাস যদি অমরত্ব লাভ করে, তবে পাঠকমহলে জনপ্রিয়তা অর্জনের কাজটি বেশ খানিকটা সহজ হয়ে যায় সৃষ্টিকর্তার পক্ষে। সেটা সাহিত্য হোক কিংবা চলচ্চিত্র। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাস। এ ভাবেই বাজিমাত করেছিল ‘পথের পাঁচালী’ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পর দুই প্রজন্ম ধরে বাঙালি পাঠক কেবলই পড়েছে তাঁকে আর তাঁর সৃষ্টিকে।

 

(১)

বিভূতিভূষণের বাবা মহানন্দ বন্দ্যাপাধ্যায় ছিলেন যাকে বলে ভবঘুরে। একেবারে গোড়ায় ছেলের লেখাপড়া শুরু হয়েছিল তাঁরই হাতে। তবে বছরের বেশির ভাগ সময়টাই বাইরে বাইরে কাটত তাঁর। কাজ এবং ভ্রমণ, দুই উদ্দেশ্যেই। সেই স্বভাব পেয়েছিলেন বিভূতিভূষণও। চিরকালই হেঁটে স্কুলে যেতেন। অবশ্য সেটা দারিদ্র্যের কারণেও। তবে এই সময়ে পল্লীপ্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতেন দু’চোখ ভরে। পথের সৌন্দর্যই তাঁর মনে প্রকৃতির প্রতি প্রেম জাগিয়ে তোলে। পরে এই ছাপ ফুটে ওঠে তাঁর লেখায়।

এই পড়া নিয়ে একটা মজার গল্প রয়েছে। বিভূতিভূষণের লেখাপড়ার গোড়ার দিনগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ‘বর্ণপরিচয়’-এর। মাসের প্রথমেই সাড়ে সাত আনা পয়সা দিয়ে এক মাসের ‘বর্ণপরিচয়’ কিনে রাখতেন মহানন্দ। তাঁর কাছেই লেখাপড়া শুরু হয়েছিল বড় ছেলের। রোজ সকালে এক পয়সা দামের একটা ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়েই পড়া শুরু হত। সন্ধের পরে সেই বইয়ের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না।

বাবার জিম্মা থেকে হরি রায়ের পাঠশালা, তার পরে হুগলি জেলার সাগঞ্জ-কেওটা, অবশেষে মহানন্দের কলকাতা বাসের কালে বৌবাজারের আরপুলি লেনের পাঠশালা— এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সম্পন্ন হয় বিভূতিভূষণের প্রাথমিক শিক্ষা। এর সঙ্গে পাঁচ বছর বয়স থেকেই বাবার কাছে সংস্কৃত এবং মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ পাঠ। বিভূতিভূষণের স্কুলের নাম বনগ্রাম উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়। তাঁর সেখানে ভর্তি হওয়াটাও একটা গল্প। মহানন্দ বাড়িতে থাকতেন না। প্রবল অভাবের সংসারে ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার আশা পোষণ করতেন না মৃণালিনী। এ দিকে বিভূতিভূষণ দেখতেন, প্রতিবেশীর ছেলেরা বনগ্রামে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়। তাঁরও খুব ইচ্ছে হল। দ্বিধা কাটিয়ে কোনও এক ইংরেজি বছরের মাঝামাঝি গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন সেখানে। ‘লক্ষ্মীর ঝাঁপি’ থেকে সিঁদুর মাখানো টাকা দিলেন মৃণালিনী।

কড়া নজর ছিল প্রধান শিক্ষক চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। প্রথম দু’দিন ভয়ে স্কুল কম্পাউন্ড অবধি গিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন বিভূতিভূষণ। তৃতীয় দিন তাঁকে ডেকে পাঠান প্রধান শিক্ষক। সিঁদুর মাখানো টাকা দেখে আসল ঘটনা জানতে চান এবং জানার পরে, ছাত্রের বেতন মাফ করে দেন। পড়াশোনা চলতে থাকে। তিনি যখন ক্লাস এইট, প্রয়াত হন মহানন্দ। সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন বিভূতিভূষণ।

 

(২)

১৯১৮ সালে রিপন কলেজ থেকে ডিসটিংশন নিয়ে বিএ পরীক্ষায় পাশ করেন বিভূতিভূষণ। তার পরে কিছু দিন এমএ এবং ল ক্লাসে পড়েছিলেন। তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে বসিরহাটের মেয়ে গৌরীদেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই বিসূচিকা রোগে মারা যান গৌরীদেবী। বিভূতিভূষণেরও পড়াশোনায় ইতি ঘটে। হুগলির জাঙ্গিপাড়ার মাইনর স্কুলে শিক্ষকের চাকরি নেন। পরে জাঙ্গিপাড়া থেকে সোনারপুরের হরিনাভি।

এর পরে এগিয়ে যেতে হয় প্রায় দু’দশক। এক দিন হঠাৎ হইচই পড়ে যায় ছোট্ট বনগ্রামে। অঞ্চলে খবর ছড়িয়ে পড়ে, ইছামতী নদীতে স্নান করতে নেমে ডুবে গিয়েছেন বিভূতিভূষণের বোন জাহ্নবীদেবী। সেই খবরের সূত্রেই প্রখ্যাত লেখকের ঠিকানা এসে পৌঁছয় ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কন্যা রমাদেবীর কাছে। বাবার দেওয়া আকাশি-নীল রঙের সোনালি ঢেউ খেলানো শাড়ি পরে বিভূতিভূষণের সঙ্গে দেখা করতে যান রমাদেবী। লেখক তখন বড়ই বিষণ্ণ। অটোগ্রাফ খাতায় সই করে লিখে দিলেন: ‘‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু।’’ অতঃপর ২৯ বছর ব্যবধানের দুই মানব-মানবীর বন্ধুত্ব এবং চিঠি চালাচালি।

রমাদেবী বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। সময় চাইলেন বিভূতিভূষণ। মনে করিয়ে দিলেন গৌরীদেবীর কথা। বোঝালেন নানা ভাবে। বললেন, ‘‘আমার সাথে তোমার বয়সের অসম্ভব তফাত। তুমি না হয় ছেলেমানুষ, বুঝতে পারছ না, কিন্তু আমি একজন বয়স্ক লোক হয়ে কি করে তোমাকে ডোবাই?’’ এমনকি এ-ও বললেন, ‘‘দেখ আমার গায়ের রোমে, মাথার চুলে পাক ধরেছে।’’ কিন্তু রমাদেবী নাছোড়, ‘‘আপনাকে মাত্র দশদিনের জন্য স্বামী হিসেবে পেলে আমি ধন্য।’’ ৩ ডিসেম্বর, ১৯৪০ সম্পন্ন হল সেই শুভকাজ। সাত বছর পরে জন্ম হল পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বাবলু)।

বিভূতিভূষণের কলেজ জীবনের কথা হচ্ছিল। এমএ এবং ল ক্লাসে পড়ার সময়ে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল নীরদচন্দ্র চৌধুরীর। তিন বছরের ছোট-বড় এই দুই সহপাঠীর ঘনিষ্ঠতার কথা সুবিদিত। নীরদচন্দ্রের ‘দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক’ বইয়ে তার কিছু পরিচয় মেলে। মূলত সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই দু’জনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। নীরদচন্দ্রের বিয়ে হয়নি তখনও। অন্য দিকে গৌরীদেবীর মৃত্যুতে বিভূতিভূষণ সদা-বিচলিত। সেখানেই একই মেসের বাসিন্দা নীরদচন্দ্র ‘পথের পাঁচালী’ শেষ করার জন্য তাগাদা দিলেন বন্ধুকে। প্রায় তিন বছর ধরে। তাঁর লেখায় পাওয়া যায়— ‘‘১৯২৮-এ প্রকাশিত তাঁহার প্রথম উপন্যাস তাঁহার আসন প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিল এবং এখন ওই গ্রন্থটির সত্যজিৎ রায়-কৃত চলচ্চিত্র রূপ সারা বিশ্বে সমাদৃত হইয়াছে। ১৯২৪-এ প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা লিখিয়াই তিনি আমাকে পড়িয়া শুনাইয়াছিলেন... ১৯২৮-এ উহা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হইবার পর আমি এক প্রকাশক খুঁজিয়া পাই যিনি উহা গ্রন্থাকারে ছাপিতে সম্মত হন।’’

বিভূতিভূষণের একাকিত্বের কথাও বলেন নীরদচন্দ্র। প্রায় সন্ধেতেই তাঁর সঙ্গে সময় কাটাতে আসতেন বিভূতিভূষণ। বন্ধুর কাছে স্ত্রী বিয়োগের যন্ত্রণার কথা বলতেন। তবে বিভূতিভূষণের আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা চালানোর ব্যাপারটা জানতেন না নীরদচন্দ্র। পরে সে সব কথা জেনেছেন ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের ভিতর দিয়ে। তাঁর কাছে তাই বিভূতিভূষণই স্বয়ং ‘অপরাজিত’। তিনি জানান, বন্ধু ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী ও স্থিতধী। প্রবল জীবনসংগ্রাম তাঁকে তেতো করে তুলতে পারেনি। জীবন সম্পর্কে কোনও হতাশাও জাগিয়ে তোলেনি। বরং সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল করেছিল। গড়ে তুলেছিল তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। সে কারণেই প্রকৃতি এবং মানুষের মন নিয়ে এত জটিল কাটাছেঁড়া করতে পেরেছেন বিভূতিভূষণ।

দু’জনে প্রবল বন্ধুত্ব হলেও জীবনযাপনে তফাত ছিল। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বিভূতিভূষণ চিরকালই খুব সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। এমনকি কিছুটা আয়েশ করার সঙ্গতি হওয়ার পরেও। নীরদচন্দ্রের কলমে, ‘‘বহু বৎসর পর, আমার বিবাহ পরবর্তীকালে, তিনি আমার স্ত্রীর সঙ্গে ভারী বন্ধুত্ব করিয়াছিলেন, তাঁহার সহিত আসিয়া পছন্দ-অপছন্দের গল্প করিতেন। কিন্তু বৈঠকখানায় না বসিয়া তিনি নির্বিকার, শান্তভাবে বিড়ি টানিতে টানিতে সোজা তাঁহার শয়ন কক্ষে চলিয়া যাইতেন এবং সূচী-শিল্প করা চাদরের উপর বসিয়া, দুর্গন্ধময় নিম্ন মধ্যবিত্ত গন্ধ ছড়াইতেন। আমার স্ত্রী তাঁহাকে বিড়ি ফেলিতে বাধ্য করিয়া, ভৃত্যকে দিয়া একপ্যাকেট খ্যাতনামা সিগারেট আনাইয়া দিতেন।’’ নীরদচন্দ্রের উচ্চ মধ্যবিত্ত আভিজাত্যের গরিমা ছিল। তবু বন্ধুত্ব ছিল অটুট।

বনগ্রামে বিভূতিভূষণের বাড়ি

(৩)

বিভূতিভূষণের প্রিয় ফল ছিল আম আর কাঁঠাল। ভালবাসতেন চাঁপা, বকুল, শেফালি ফুল। বন্য ফুলের মধ্যে পছন্দ ছিল ঘেঁটু আর ছোট এড়াঞ্চি। ঋজু বনস্পতিতেও আকর্ষণ ছিল তাঁর। গাছ আর মেঘমুক্ত রোদের দিনে দিগন্ত— এ সব নিয়েই চলত তাঁর পড়াশোনার নেশা। সাহিত্য পড়তেন। সঙ্গে পড়তেন জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান আর উদ্ভিদবিদ্যা। শেষ জীবনে নাকি পরলোকতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। পড়াশোনা নিয়েই থাকতেন। তাই সারা বাড়িতে বইপত্র ছড়ানো থাকত। আলমারিতে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন না।

দৈনন্দিন রুটিনটাও ছিল ভারী মজার। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। প্রবল গরম হোক বা প্রবল শীত, স্নান করতে যেতেন ইছামতীতে। ফিরে লিখতে বসতেন। প্রথমে দিনলিপি। তার পর চিঠিপত্রের উত্তর। ৭টা নাগাদ প্রাতরাশ। ৯টা নাগাদ স্কুলের পথে যাত্রা। শোনা যায়, গোপালনগর উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে যাওয়ার সময় সদ্য-ভাঙা গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি জাতীয় কিছু একটা নিয়ে যেতেন বিভূতিভূষণ। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে জলযোগ। ইছামতী অথবা বাওড়ের ধারে শক্তপোক্ত গাছের ডালের উপরে গিয়ে বসতেন। খানিক বাদে আবার পড়ানো। প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়েরা ভিড় করে আসত তাঁর কাছে। পড়াতেন, গল্প বলতেন। রাতের খাওয়ার পরে কোনও কোনও দিন আড্ডা দিতে বাইরে যেতেন। বাড়ি ফিরতে হয়তো একটা বেজে যেত। আর এই পুরো সময়টাই প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করতেন। বিশেষত, বিকেল আর বেশি রাতে। গাছের ডালে বসে আকাশের বদলাতে থাকা রং দেখতেন। গভীর রাতে দেখতেন গভীর কালো আকাশ।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘‘বিভূতিভূষণ আর সমস্ত সার্থক-কর্মা দিব্যদৃষ্টি লেখকের মত এই দুইটি প্রধান বিষয় বা বস্তু নিয়েই যা কিছু বলবার তা ব’লে গিয়েছেন।’’ সেই দু’টি প্রধান বিষয় হল প্রকৃতি আর মানুষ। প্রকৃতির কথা কিছু হল। মানুষ নিয়ে আরও ভয়ের কিছু বাস্তব এঁকেছিলেন বিভূতিভূষণ।

‘তালনবমী’র আগের রাত জুড়ে গোপাল স্বপ্ন দেখেছিল— ‘‘খোকা, কাঁকুড়ের ডাল্‌না আর নিবি? মুগের ডাল বেশি করে মেখে নে... খোকা যাই তাল কুড়িয়ে দিয়েছিলি, তাই পায়েস হল! ...
খা, খা,—খুব খা—আজ যে তালনবমী রে...’’ বিভূতিভূষণের অনেক চরিত্রই এমন অভুক্ত।

‘পথের পাঁচালী’তে ছিল অপু-দুর্গার আশ-শ্যাওড়ার ফল খাওয়ার গল্প। বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন, জন্মে থেকে তারা কোনও ভাল জিনিস খেতে পায়নি। অথচ তারা তো পৃথিবীতে নতুন। তাই মিষ্টি রসের স্বাদ পেতে চায় তারা। কিন্তু মিষ্টি কিনে খাওয়ার অবস্থা তাদের নেই। তবে বিশ্বের সম্পদ অনন্ত। সেখান থেকেই সামান্য বনের গাছ থেকে, তারা নিজেদের ভাল লাগার জিনিস সংগ্রহ করে। লেখকের কলমে: ‘‘...লুব্ধ দরিদ্র ঘরের বালকবালিকাদের জন্য তাই করুণাময়ী বনদেবীরা বনের তুচ্ছ ফুলফল মিষ্টি মধুতে ভরাইয়া রাখেন।’’ তার পরে এক দিন নিশ্চিন্দিপুরের পাশের গ্রামে আদ্যশ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণে গিয়ে ব্রাহ্মণদের দেখাদেখি ছাঁদা বাঁধে অপু। সেই ছাঁদা দেখে বড় খুশি হয় তার মা সর্বজয়া।

‘দৃষ্টিপ্রদীপ’ উপন্যাসের একেবারে গোড়ায় জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে জিতুর দাদা বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সমান ভাগে খাবার না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিল— ‘‘মাছ তো কম কেনা হয়নি, তার ওপর আবার মাঠের পুকুর থেকে মাছ এসেছিল—এত মাছ সব হারু আর ভুন্টিরা খেয়ে ফেলেচে! বাবারে, রাক্কোস্ সব এক-একটি! একখানা মাছও খেতে পেলাম না।’’

‘সই’, ‘পুঁইমাচা’ বা ‘অনুবর্তন’-এ বারবার খিদে উঠে এসেছে বিভূতিভূষণের কলমে। বড় বেশি দারিদ্র্য দেখেছেন লেখক। সাহিত্যে তার ছাপ থাকবে না, তা-ও কি হয়? লেখালেখির প্রাণ পায় সেখান থেকেই। ‘পথের পাঁচালী’ প্রসঙ্গে দিলীপকুমার রায়কে এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘‘দৈনন্দিন ছোটখাটো সুখ-দুঃখের মধ্যে দিয়ে যে জীবনধারা ক্ষুদ্র গ্রাম্য নদীর মত মন্থর বেগে অথচ পরিপূর্ণ বিশ্বাসের ও আনন্দের সঙ্গে চলেছে—আসল জিনিসটা সেখানে... নভেল কেন কৃত্রিম হবে?’’

বিভূতিভূষণের ভালবাসাও ছিল অকৃত্রিম। দিনলিপিতে লিখেছিলেন, ‘‘ভালবাসা Pity নয়, করুণা নয়, Charity নয়, সহানুভূতি নয়, এমন কি বন্ধুত্বও নয়— ভালবাসা ভালবাসা। এখন সেই জিনিসের সূক্ষ্ম মহিমা ও রসটুকু না বুঝে যে নষ্ট করে ফ্যালে অযাচিতভাবে দিয়ে, অপাত্রে দিয়ে— তার চেয়ে বড় মূর্খ আর কে?’’ প্রকৃতি আর মানুষ পছন্দ করতেন বলেই মন দিয়ে দেখতেন জগতের সৃষ্টি। ভালবাসা দিয়েও। নিজে সৃষ্টি করতেন তার থেকে রস আহরণ করে। ভালবাসা সেখানেও ছিল কানায় কানায়।

 

(৪)

পুজোর ঠিক কয়েক দিন আগে ঘাটশিলা চলে যেতেন বিভূতিভূষণ। ফিরতেন মাঘের শেষে অথবা ফাল্গুনের গোড়ায়। আসলে তিরিশের দশকের শুরু থেকেই ঘাটশিলা আর গালুডির সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। পরে ঘাটশিলায় একটি বাড়ি কেনেন, গৌরীদেবীর নামে নাম দেন ‘গৌরীকুঞ্জ’। ১৯৪২ সালে ব্যারাকপুরে পুরোদস্তুর সংসারি হওয়ার পরেও ঘাটশিলায় গিয়ে মাসকয়েকের অবসর যাপন চলত। বছরের এই সময়ে সেখানে যেতেন তাঁর সাহিত্যিক বন্ধুরা। প্রমথনাথ বিশী, বিশ্বপতি চৌধুরী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, প্রবোধকুমার সান্যাল, বাণী রায়, সুমথনাথ ঘোষ, নীরদরঞ্জন দাশগুপ্তদেরও ছুটিটা ঘাটশিলাতেই কাটত। ফলে আড্ডা জমত। আর চলত প্রকৃতি দেখা। নির্জন এলাকায় একা একা বেড়াতেন বিভূতিভূষণ। এঁদেলবেড়ের জঙ্গল, সুবর্ণরেখা নদী, পাণ্ডবশীলা, কাছিমদহ রাত-মোহনা ছিল তাঁর প্রিয় ভ্রমণের জায়গা। শোনা যায়, ফুলডুংরি পাহাড়ের পিছনে একটি পাথরের উপরে বসে উপাসনা করতেন তিনি। বাড়ির সামনেও তেমন একটা পাথরখণ্ড ছিল। কূর্মাকৃতি বলে বিভূতিভূষণ নাম দিয়েছিলেন, ‘কূর্মকূট’। ঘাটশিলা তাঁর এতই পছন্দ হয়েছিল যে গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ এবং বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে সেখানে বাড়ি কিনিয়েছিলেন।

তত দিনে বেরিয়ে গিয়েছে ‘আরণ্যক’। সময়টা ১৯৪৩ সালের শেষ দিকে। শীত কাল। বন আধিকারিক যোগেন্দ্রনাথ সিংহের আমন্ত্রণে সারান্ডার জঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ। সেই জঙ্গলে ভ্রমণ করার সময়ে লিখলেন ‘দেবযান’। মুগ্ধ হয়েছিলেন এতটাই যে, এক দিন রাত দেড়টা অবধি জেগে ছিলেন। মাথার উপরে দ্বিতীয়ার চাঁদ, পাশে কোয়না নদী— তার মধ্যে বসে বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন, ‘‘অরণ্যই ভারতের আসল রূপ, সভ্যতার জন্ম হয়েচে এই অরণ্য-শান্তির মধ্যে, বেদ, আরণ্যক, উপনিষদ জন্ম নিয়েচে এখানে— এই সমাহিত স্তব্ধতায়— নগরীর কোলাহলের মধ্যে নয়।’’

ঠিক এত দূরই দেখার ক্ষমতা ছিল বিভূতিভূষণের। তাই এইচএইচ জনস্টন, রোসিটা ফোর্বস-এর মতো কয়েক জন বিখ্যাত পর্যটকের বই পড়ে আফ্রিকার ভূপ্রকৃতি নিখুঁত বর্ণনায় সাজিয়েছিলেন ‘চাঁদের পাহাড়’-এ। আসলে প্রায় সাধকের মতোই লিখতেন বিভূতিভূষণ। জীবনের প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত। শেষ দশ বছর, ব্যারাকপুরে থাকাকালীন লিখেছেন ‘অশনি সংকেত’ বা ‘ইছামতী’র মতো কালজয়ী উপন্যাস। মৃত্যুর ঠিক পাঁচ-সাত দিন আগে পুজোর ছুটিতে শেষ করেছিলেন জীবনের শেষ গল্প ‘শেষ লেখা’। পরে বিভূতিভূষণের লেখার বাক্স থেকে উদ্ধার হয়েছিল সেই গল্প।

 

(৫)

বিভূতিভূষণ তখন হরিনাভিতে। বন্ধু ‘বালক-কবি’ পাঁচুগোপাল ওরফে যতীন্দ্রমোহন রায় এক দিন তাঁকে বললেন, ‘‘আপনার সঙ্গে ঘুরতে হলে, পা-দু’খানি লোহার করতে হবে।’’ স্কুল থেকে ফিরে খানিক বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়তেন বিভূতিভূষণ। কখনও বসতেন ছ’আনি চৌধুরীদের ভাঙাবাড়ির দোলমাচার সামনে, কখনও ময়রা পাড়ার খোঁড়া গুরুর পাঠশালে। সেখানে ছাত্ররা সুর করে ধারাপাত পড়ত। শুনতে ভালবাসতেন বিভূতিভূষণ। এক এক দিন যতীন্দ্রনাথের আসতে দেরি হলে একাই বেরিয়ে পড়তেন। তখন সন্ধে হলে বোসপুকুর কিংবা নিশ্চিন্দিপুরের ফাঁকা, মেঠো রাস্তায় তাঁকে খুঁজতে বেরোতে হত। প্রায়ই খগেন বোসের বাড়ির সামনে কাঁঠালিচাঁপা বনের ধারে খুঁজে পাওয়া যেত বিভূতিভূষণকে। এ রকমই এক দিন হাঁটতে হাঁটতে বোড়াল পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন তিনি। রাজনারায়ণ বসুর বাড়ি দেখতে। আবার এক দিন বোড়াল থেকে ফেরার পথে রাজপুর বাজারে গঙ্গার ধারে এসে বিভূতিভূষণ বললেন, “এত দূর ঘুরে দেখে এলাম মন্দিরটার কাছে না বসলে, কর মশাই রাগ করবেন।” যতীন্দ্রনাথ প্রবল অবাক হলেন। কারণ সেই ব্যক্তি তখন প্রয়াত হয়েছেন। তবু বিভূতিভূষণ বললেন, “তাঁর দেহ নেই কিন্তু আত্মা আছে তাঁর কীর্তিগুলি ঘিরে, তুমি টের পাও না, আমি কিন্তু টের পাই।” যতীন্দ্রমোহনের লেখা থেকে পাওয়া যায়— “ভবিষ্যতে ‘দেবযান’ নির্মাতার তখনকার এই কথাগুলি মনে পড়্‌লে আজও দেহ রোমাঞ্চিত হ’য়ে ওঠে।”
ঠিক যেমন, ছ’আনি চৌধুরীদের ভাঙা বাড়ি থেকেই গড়ে উঠেছিল ‘কেদার-রাজা’র পটভূমিকা।

এখানেই শুরু বিভূতিভূষণের লেখালেখিও। ১৯২০ সালের জুন মাসে হরিনাভির দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অ্যাংলো সংস্কৃত বিদ্যালয়ে পড়ানোর কাজে যোগ দিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ। সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যতীন্দ্রমোহনের। সে সময়ে কলকাতার এক প্রকাশক ‘ছয় আনা গ্রন্থাবলী’ নামে এক সিরিজ বার করত। তাদের গ্রন্থাবলি প্রকাশ শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দিয়ে। স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে তেমনই একটি বই বিভূতিভূষণকে দিয়ে যতীন্দ্রমোহন প্রস্তাব করেছিলেন— ‘‘আসুন আপনাতে আমাতে এইরকম একটা উপন্যাস সিরিজ বের করা যাক।’’ তার পরে বিভূতিভূষণের নামে স্কুলের নোটিস বোর্ড, দেওয়াল, নারকেল গাছের গায়ে পোস্টার পড়ল। বাধ্য হয়ে গল্প লিখলেন বিভূতিভূষণ— ‘পূজনীয়া’। সে নামে অবশ্য বেরোয়নি। প্রকাশিত হয়েছিল ‘উপেক্ষিতা’ নামে।

সে-ই হল লেখার শুরু। তার পর আর কলম থামেনি। দু’চোখ ভরে জগৎকে দেখেছেন। দুনিয়ার পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছেন। এবং লিখেছেন।

 

ঋণ: বিভূতি-রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা (দিবারাত্রির কাব্য): আফিফ ফুয়াদ (সম্পা), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সন্ধানে: রুশতী সেন (সম্পা), আমাদের বিভূতিভূষণ: রমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মৌসুমী পালিত, বিভূতিভূষণের অপ্রকাশিত দিনলিপি: সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায় (সম্পা)