Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

পান্নারঙা পাহাড়ি পথে

ইকো পার্কের সিঁড়ি ভেঙে

একা, একাকিত্ব, একাত্ম।

কোন শব্দটা মন্দ আর কোনটা ভাল? দিল্লির উড়ানে নিঃসঙ্গ যাত্রীকে মনের আনন্দে বই পড়তে পড়তে স্যান্ডউইচ খেতে দেখে তর্কটা শুরু করেছিলেন একদল তরুণ পর্যটক। যাঁদের সঙ্গে ফের দেখা হবে এক সবুজ পাহাড়ের কোলে। সেখানে, যেখানে একলা পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিলিয়ে যেতে পারে একাকিত্ব।

ধনৌলটি! ঔপনিবেশিক শাসনের অনাবিল কিছু অবদানের অন্যতম, মুসৌরি শহরের থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেকের পথ। গাছের আড়ালে খাদ, খাদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করেই পাহাড়। তারই মধ্যে নিজের মতো চুপিসাড়ে জায়গা করে নিয়েছে এক চিলতে রাস্তা। মুসৌরি শহরের সাহেবি আহ্লাদ ছাড়িয়ে সে পথ ধরেই মাত্র মাইল পনেরো। যাত্রা শেষে অপেক্ষা করে নিরিবিলি সেই ঠিকানা, যার নাম ধনৌলটি।

সেই মসৃণ পাহাড়ি পথ ধরেই রওনা হয়েছে তরুণ দল। মুসৌরির ছোট্ট সাহেবি কাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে, কয়েক পাতা লেখা শেষ করে একই পথ ধরেছেন প্লেনের সেই একা যাত্রী। চোদ্দো সিটার গাড়ি ভাড়া নিয়ে হইহই করে পাহাড়ের ছবি তুলতে নেমে পড়েছেন বাঙালি পরিবারের ১২ জন।তবু দেখা হয়নি পথে কারও। গুণটা তাঁদের কারও নয় অবশ্য। গুণটা শুধু সে পথেরই। একাকিত্বকে সম্মান জানিয়েই যেন যথেষ্ট কম সংখ্যক গাড়ি চলে সে পথে আজও। পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে থাকে দুই গাড়ির মধ্যে মনোরম দূরত্ব। পাশে পাশে চলতে থাকে শুধুই পাহাড়। সেই সবুজ পাহাড়ই যেন বুঝিয়ে দেয়, একাকিত্বেরও মানে বদলে যায় পথের বাঁকে বাঁকে। বুঝিয়ে দেয়, সমতলের শহুরে ভিড়ের মধ্যে একা হওয়ার অস্বস্তির সঙ্গে আপস করে নেওয়াই যায় মাঝেমধ্যে সবুজ পাহাড়ের কোলে একা বসে থাকার সুযোগ পেলে। মনে করিয়ে দেয়, একাকিত্বেরও সঙ্গী হয়। সূর্যোদয়ের ক্ষণে পাহাড়ের ওপার থেকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাওয়া সেই হাল্কা কুসুম আভার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে চাইলে নিজেকে এ তল্লাটে একাই করে নিতে হয় পাহাড়ের গায়ে কিছু রডোডেনড্রনের ভিড়ে।

দূরের হাতছানি

গড়ওয়াল এলাকার এই চত্বরটির আশপাশে গ্রাম আছে কিছু। আর একা হতে চাওয়া শহুরে পর্যটকদের জন্য এখনও ধরে রাখা আছে শান্ত নিরিবিলি বাতাস। তাঁদের কথা ভেবেই তৈরি হয়েছে পার্ক। সেখানে দু’-তিন কিলোমিটারের হাঁটা, ভ্রমণ পিপাসুদের মুখে যা ইতিমধ্যে বেশি পরিচিতি পেয়েছে হাইকিং নামে— দেখিয়ে দেয় পাহাড়ের বিস্তার। দেখার বলতে সেটুকুই। আর দৌড়োদৌড়ি বলতে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস এবং পরদিনের ঝর্নাদর্শন। দৌড়ের চিন্তা নেই বলেই ইকো পার্কের অলিগলিতে আলাপ হয়ে যেতে পারে স্থানীয় কমলা, বাণী কিংবা সাহিলের সঙ্গে। কয়েক কিলোমিটার দূরে, জঙ্গলের ভিতরের গ্রামে যাঁদের সংসার। ঝাঁ চকচকে রিসর্টে এক রাতেই তাঁদের মাসের বেতন উড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ জমাতে বাধে না ওঁদের। ওটাও ওখানকার তরুণদের পেশা। পাহাড় চেনানোর বিনিময়ে রোজগার। চেনানোর চেষ্টা বলাই ভাল— বলছিলেন তাঁদেরই এক জন।

চেষ্টা কেন? 

চেনা যায় না। কবি বলেছিলেন না... সকলে প্রত্যেকে একা। বিশেষত তাঁর নিজের শহরে। কমলার ভাই, বোন, বন্ধুরা তেমনটাই বিশ্বাস করেন। শহুরে বিলাসিতার আড়ালে আসলে যে প্রত্যেকে একা। পাহাড়ি সংসারে থাকা ওঁদের মতো গাছ, পাখি, মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন না যে তাঁরা!

গাছ চেনার ফাঁকে পাহাড়ি সংস্কৃতির দর্শন শুনতে শুনতে পড়বে বেলা। কাঠ কুড়িয়ে দুপুরশেষে তখন হয়তো গ্রামের পথে সাহিলের মা বাসন্তী। পশ্চিমী ট্রাউজ়ার্সের জন্মদাত্রীর মাথায় কাঠের বোঝা ধাক্কা না দেওয়ার কারণও নেই তেমন। সাহিল মুচকি হাসবেন শুধু। তাঁর ঘরে কী রান্না হয় সেই কাঠে, পাশে পাশে বলতে থাকবেন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে।

রং বদলাবে তাঁদের ধনৌলটি।

ওক গাছের আড়াল থেকে যে তত ক্ষণে উঁকি দিয়েছে সুয্যি। পান্নারঙা পাহাড়ি বাগান হঠাৎ যেন ঝিকিমিকি। কথার ফাঁকেই সূর্য পৌঁছবে মুসৌরি পাহাড়ের কাছে। তার পিছন থেকেই ঘোষণা করবে দিন শেষের। আকাশের রং হলুদ থেকে কমলা, তার থেকে লাল, বেগুনি। ঝুপ করে হঠাৎ কালো। 

মুসৌরিতে ঝর্নাধারা

একাই বাড়ি ফিরবেন বাসন্তী? ছেলের তখনও রিসর্টে কাজ বাকি।

মা বলবেন, একা কেন? এই তো কত কী আছে। ঘরে যাবে তো পাখিরাও।

এ বার কি সত্যিই একা শহুরে পর্যটকরা? আঁধার নামা পাহাড়ের বুকে বন্ধু খুঁজে নেন তাঁরাও। আড্ডা জমান একই রিসর্টের অন্য ঘরে আস্তানা ভাড়া করা বাঙালি পরিবারের সঙ্গে। ছুটির মেজাজ
গান ধরে— আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ!

পুনশ্চ: শান্তি ভঙ্গ হয় কখনও সখনও। দিল্লি থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ হওয়ায় গড়ওয়ালে বেশ কিছু এলাকা নাম করে নিয়েছে ‘সপ্তাহান্তের ঠেক’ হিসেবে। ফলে একাকিত্বের সঙ্গে একাত্ম বোধ করে ছুটি কাটাতে ধনৌলটি যেতে হবে অবশ্যই কোনও না-ছুটির দিনে!

 

কী ভাবে যাবেন

বিমানে দিল্লি অথবা  দেহরাদূনের জলি গ্রান্ট বিমানবন্দরে যেতে পারেন। সেখান থেকে গাড়ি করে বেরিয়ে পড়তে পারেন ধনৌলটির উদ্দেশে


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper