আঞ্চলিক জনসংস্কৃতি


প্রসঙ্গ: বাংলা গান

রাজ্যেশ্বর মিত্র

৩৫০.০০ 

ইন্দিরা/ থীমা

 

বাংলা গানে আজ এই নতুন শতকে যেমন রূপায়ণ সম্বন্ধে সচেতনতা এসেছে, তেমনটা গত শতকের প্রথম দিকে ছিল না। যদি বাংলা গানের বিশিষ্ট রীতিনীতি সম্পর্কে আমরা অবহিত হতাম, তা হলে আমাদের সঙ্গীতের ক্লাসিকাল যুগটিকে অবহেলা করতাম না, আবার পুরাতন গানের সেকেলে ‘ভালগারিটি’কেও বর্জন করতাম। এর জন্য বাংলা গান নিয়ে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ রপ্ত করা জরুরি ছিল। রাজ্যেশ্বর মিত্র এমনই এক বিরল সঙ্গীতজ্ঞ যিনি তাঁর এই বইটিতে বাংলা গানের সেই শিল্প-ইতিহাস খুঁজে গিয়েছেন, যা আমাদের শুধু পরম্পরা চেনায় না, সৃষ্টিগত পরিবর্তনের বিভিন্ন বাঁকগুলিকেও চিনিয়ে দেয়। রামমোহন রায়, রামনিধি গুপ্ত, বৈষ্ণব পদকর্তাদের গান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে গিরিশচন্দ্রের নাট্যসঙ্গীত, পুরুলিয়ার ঝুমুর ও ঝাড়খণ্ডী কীর্তন, মুকুন্দদাসের জাতীয় জাগরণের গান উঠে এসেছে তাঁর আলোচনায়। আছেন সুরসুধাকর দিলীপকুমার, গীতিকার সাহিত্যিক হেমেন্দ্রকুমার রায়, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, পঙ্কজকুমার মল্লিক, ধীরেন্দ্রনাথ দাস। ইন্দিরা সংগীত-শিক্ষায়তনের সুভাষ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে প্রথম প্রকাশিত হয় এ-বই, নতুন সংস্করণে যুক্ত হয়েছে রাজ্যেশ্বর সংকলিত ও তাঁরই করা স্বরলিপি-সহ রামনিধি গুপ্ত, শ্রীধর কথক, দাশরথি রায়ের নির্বাচিত গানের সংগ্রহ। অতএব প্রবন্ধাদির পরিপূরক গান ও স্বরলিপি বইটিকে ‘বাংলা গানের এক প্রামাণ্য আখ্যান’ করে তুলেছে, মুখবন্ধে জানিয়েছেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

কুশদহ/ নির্বাচিত রচনা সংকলন

সম্পাদক: সুখেন্দু দাশ

৩৫০.০০ 

                 গোবরডাঙা গবেষণা পরিষৎ                      

‘এই কুশদহ যেন সমদর্শী ও সংযত বাক্‌ হইয়া সদা সত্য ও ন্যায়, প্রেম ও প্রীতির সহিত দেশের সেবা করিতে পারে।’ উন্মেষপর্বের এমন অভিপ্রায়, বিশ শতকের শুরুর দশকে ‘কুশদহ’ সম্পাদক দাস যোগীন্দ্রনাথ কুণ্ডুর আত্মনিয়োজনকে কালজয়ী করেছে। মাসিক পত্রিকাটিতে গোবরডাঙা খাঁটুরা প্রভৃতি জনপদের বিশেষ উল্লেখ থাকলেও তা মধ্য-বঙ্গবাসীর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল। ১৯০৮-১৮ পর্যন্ত প্রকাশিত সেই জনপদকথায় ছিল বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদিয়া এবং আজকের বাংলাদেশের যশোহর, খুলনা, সাতক্ষীরার বিস্তারি এলাকা। পত্রিকার সূত্রপাত ১৮৭৭ সালে ক্ষেত্রমোহন দত্তের হাতে। যোগীন্দ্রনাথ কুণ্ডু ও নবপর্যায়ে নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত (১৯২১-২২) পত্রিকা থেকে নির্বাচিত লেখা, সুখেন্দু দাশের সুচারু সম্পাদনায় হারিয়ে যাওয়া আঞ্চলিক জীবনসংস্কৃতিরই উজ্জীবন। এতে আছে শিক্ষা, বিজ্ঞান, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য, কুশদহ সমিতি, গ্রামের কথা-সহ সমাজ-সাংস্কৃতিক বহমানতা। আছে পুস্তক সমালোচনা ও কালানুক্রমিক রচনার প্রাপ্ত সূচি। ‘কুশদহ’র অবস্থান বহুর মধ্যে মিশে থাকলেও, পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায় তা নিয়ে ধারাবাহিক বৃত্তান্ত লিখেছেন এবং গোবরডাঙা জমিদার বংশের বংশতালিকা তৈরির অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। তেমনই ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন ও পল্লিসংস্কারে আছে ইতিহাসের উদ্‌ঘাটন। কথক ধরণীধর বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূতাত্ত্বিক প্রমথনাথ বসু, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রমুখের জীবনী আলোচনায় থেকে গিয়েছে আকর উপাদান। সুমুদ্রিত এমন সঙ্কলন বাংলার আঞ্চলিক জনসংস্কৃতির বহুবর্ণী ঐশ্বর্য ও ঐতিহ্যকেই উজ্জ্বলতর করে।

 

দাসের আত্মকথা/ দাস যোগীন্দ্রনাথ কুণ্ডু

সম্পাদক: কুমারেশ দাশ

২৫০.০০ 

ভাষালিপি      

প্রচলিত অধিকাংশ আত্মজৈবনিক গ্রন্থে দেখা যায় জীবনের কর্মচর্যার মহৎ দিকটিই সুকৌশলে পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হয়। বাস্তব জীবনের দুর্বলতম দিকগুলি ইচ্ছাকৃত ভাবে চাপা দেওয়ার প্রবণতা সেখানে লক্ষ করা যায়। এখানেই আলোচ্য বইটির বিশেষত্ব। ছেলেবেলা থেকে প্রত্যন্ত জীবন অবধি ‘কুশদহ’ পত্রিকার সম্পাদক দাস যোগীন্দ্রনাথ কুণ্ডু তাঁর জীবনের কমজোরি দিকগুলিও অকপটে পাঠকপাঠিকাকে জানিয়েছেন। গ্রন্থের ‘শেষকথা’য় তিনি লিখেছেন, ‘‘নিজ জীবনের পাপ-দুর্ব্বলতার কথা সত্যভাবে বলিতে চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু সুযোগসূত্রে অন্যের হীনতা প্রকাশ করিতে দাসের অধিকার নাই; সুতরাং তদ্রুপ অংশ পরিত্যক্ত হইয়াছে।’’ অতএব বলতে দ্বিধা নেই এ বইটি আসলে বিরল সত্য কথা। দাসের আত্মকথা দু’দফায় লেখকেরই সম্পাদিত ‘কুশদহ’ সাময়িকপত্রে বার হয়। পরে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে। বইটি একটি সময়ে একটি অঞ্চলের সমাজজীবন বা ইতিহাসের মূর্ত ছবি। তা সত্ত্বেও কেউ গা করেননি বইটি প্রকাশ করতে। ‘‘কারণ ‘মানুষ’টি একটি বিশেষ ধর্মাশ্রিত এবং শিক্ষায় প্রথাবদ্ধ ‘ছাট্টিফিট’ নেই। চলনে বলনে বিজ্ঞান শোয়ার খাটে মাথার উপরে বালক ব্রহ্মচারীর ছবি বা পাঁচ আঙুলে মন্ত্রসিদ্ধ সোনার আংটি...।’’ কুমারেশ দাশের নির্মেদ সম্পাদনায় ও প্রয়োজনীয় তথ্য-সংযোজনে অবশেষে প্রায় তিনশো পাতার ঝকঝকে বইটি প্রকাশ পেল।