বহুস্বরের ব্যাপ্তি ও বৈভব


সৌরীন ভট্টাচার্য / রচনাসংগ্রহ ৪

সম্পাদক: অম্লান দত্ত

১০০০.০০ 

অভিযান পাবলিশার্স

কত ওঠাপড়া সামলে কবিকে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠস্বরে পৌঁছোতে হয়, কবির সেই স্বরে পৌঁছতে তাঁর পাঠককেও এক লড়াইয়ে প্রলুব্ধ হতে হয়। ‘প্রলোভনের কথাটা উঠছে এই জন্য যে গা-ছাড়া ভাবে এগোলে ওই লড়াইটা বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। আর প্রলোভনের মধ্যে কবি আর তাঁর পাঠকের সেই সহমর্মিতার কথাটা রয়েছে যা বাদ দিয়ে কিছুই কিছু না।’ প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কবিতার সূত্রে কথাগুলি খেয়াল করিয়ে দিয়েছেন সৌরীন ভট্টাচার্য। তাঁর রচনাসংগ্রহ-এর নতুন যে খণ্ডটি প্রকাশ পেল, তাতে তিনটি বইয়ের সমাহার— পাঠকের গরজ, বিষণ্ণ নাবিকের সংলাপ, আঁতের কথা। উল্লেখিত রচনাটি শেষোক্ত বইয়ের অন্তর্গত। গোটা সংগ্রহটির শুরুতেই সম্পাদক জানিয়েছেন ‘এই খণ্ডের অন্তর্গত বইগুলির মধ্যে বিষয়গত, কালগত এবং বিশ্লেষণী কোনো ঐক্য নেই।’ হয়তো ঐক্যের সে অভাবই বহুস্বরের ব্যাপ্তি ও বৈভব এনে দিয়েছে গ্রন্থটিকে। যেমন... রাজনীতির নতুন ভাষায় সমাজের পূর্ণাঙ্গ জীবনচর্যাকে ধরার চেষ্টা করতে হবে, রবীন্দ্রনাথের গদ্যে রসসঞ্চারী স্বাদ গ্রহণ করতে পারলে তবেই তাতে নিহিত যুক্তিক্রমটিকে চিনে ওঠা যাবে, কার্ল মার্কসের সমগ্র প্রকল্প আদতে ইতিহাসেরই পর্বসন্ধান, জীবন ও শিল্পের প্রতি গাঢ় আসক্তিই প্রয়াত সুবীর রায়চৌধুরী অশোক সেন বা প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যকে তাঁদের তত্ত্ব তৈরির শক্তি জোগাতো... পড়তে-পড়তে মুক্তমতি, প্রথাসিদ্ধ পথের বাইরে পা-ফেলা মনস্বী সৌরীনবাবুকে চেনা যায়।

শ্রীযুত রামাই পণ্ডিত বিরচিত শূন্যপুরাণ

সম্পাদক: আনন্দ ভট্টাচার্য

৫২০.০০

কে পি বাগচী

‘‘বর্তমান প্রজন্মের কাছে শূন্যপুরাণ-এর এক নতুন সংস্করণ উপহার দেওয়া জরুরি, তা না হলে, পুরানো প্রজন্মের প্রচেষ্টা অবলুপ্তির পথে চলে যাবে।’’— এই পথ ধরেই সম্পাদক আনন্দ ভট্টাচার্য নগেন্দ্রনাথ বসু (প্রথম সং, ১৩১৪ বঙ্গাব্দ)থেকে শুরু করে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মহম্মদ শহীদুল্লাহ ও বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের (দ্বিতীয় সং, ১৯৩৬) চারটি ভূমিকা সঙ্কলন করেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সর্বপ্রথম পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম লৌকিক দেবতা ধর্মঠাকুর ও তাঁর পূজার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৩০৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধটি, এবং ১৩১৬-য় প্রকাশিত যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির শূন্যপুরাণ সংক্রান্ত আলোচনাও এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। আছে দ্বিতীয় সংস্করণ অবলম্বনে শূন্যপুরাণ-এর পাঠ।

চারুচন্দ্রের কথায়, ‘‘বঙ্গে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রভাব ক্ষীণ হইয়া পড়িলে রামাই পণ্ডিত বৌদ্ধধর্ম্মের মহিমা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি ধর্ম্মপূজার পদ্ধতিস্বরূপ এই শূন্যপুরাণ রচনা করেন।’’ শূন্যপুরাণ তিনটি বা তারও বেশি খণ্ডিত পুথির সমষ্টি। গ্রন্থের উদ্দেশ্য শূন্যমূর্তি নিরঞ্জন ধর্মঠাকুরের মহিমা প্রকাশ। পুথির নামকরণ, পাঠ, রচনাকাল, রামাই পণ্ডিতের ঐতিহাসিকতা ইত্যাদি নিয়ে সব সংশয় আজও কাটেনি। আধুনিক গবেষকদের মধ্যে জহর সরকার প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্মঠাকুর ও ধর্মপূজাকে কেন্দ্র করে কোনও সংস্কৃতায়নের বৃত্ত তৈরি হয়েছিল কি না। বিভিন্ন আলোচনা ও মূলপাঠ-সহ এই সঙ্কলন এ বিষয়ে নতুন ভাবনার পথ সুগম করে দিল।

পাঁচ প্রজন্মের নকশালবাড়ি

সম্পাদক: নীলাঞ্জন দত্ত

৪২৫.০০ 

পূর্বালোক পাবলিকেশন

‘নকশালবাড়ি তো আমাদের পাড়ার একটা বাড়ির নাম। সে বাড়ির মা নকশাল, বড় মেয়ে নকশাল, তার ভাই নকশাল, ছোট বোনটাও বড় হতে হতে কীভাবে জানি নকশাল হয়ে গেল। লোকে বলত, ‘নকশাল বাড়ি’। এরকম অনেক নকশাল বাড়ি ছিল এক সময়।’ ভারী চমৎকার বর্ণনা করেছেন নীলাঞ্জন দত্ত, তাঁর সম্পাদকের ভাবনায়। আলোচ্য গ্রন্থটি আসলে এই আন্দোলনের সঙ্গে নানা ভাবে জড়িত নানা প্রজন্মের মানুষজনের ব্যক্তিগত যাত্রার আখ্যান। এই গ্রন্থের ১৯টি নিবন্ধই নতুন। লেখকসূচিতে সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই নাম রয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের পার্থ সারথি, প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে আসা লক্ষ্মী থেকে হালের প্রজন্মের অভিজ্ঞান সরকার, দেবলীনা ঘোষেরও।

কল্পনা সেনের মতো প্রায় সকলেরই লেখা আসলে অকপট বর্ণন, সেই নকশালবাড়ি আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী নানা সময়ের হুবহু ছবি উঠে এসেছে এই সব নিবন্ধে। অসাধারণ বর্ণনা রয়েছে সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। চম্বল থেকে ভোপালে ফেরার জন্য বাসের অপেক্ষায় তিনি ও তাঁর বন্ধু কল্যাণ মুখোপাধ্যায়। দু’জনের কথায় চলে আসছে ‘মাওবাদ’ শব্দটি। খাটিয়ায় বসে হুঁকো টানতে টানতে এক বৃদ্ধের প্রশ্ন: ‘‘বাবারা, এই ‘মাওবাদ’ স্টেশনটা কোথায় বল তো? আহমেদাবাদ, এলাহাবাদ, এসব স্টেশনের নাম শুনেছি। কিন্তু ‘মাওবাদ’ বলে কোনও স্টেশনের নাম তো শুনিনি!’’ ৩৮৪ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থ অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য।