গভীর মনটির খবর পাওয়া যায়

ভিনগ্রহী: টিভি সিরিজ ‘সত্যজিৎ রায় প্রেজেন্টস ২: বন্ধু’র (১৯৮৬) একটি দৃশ্যে নভোযানের সামনে অ্যাং। নিমাই ঘোষের তোলা ছবি, বই থেকে

ট্রাভেলস উইথ দি এলিয়েন (Travails With The Alien) /সত্যজিৎ রায়

সম্পাদক: সন্দীপ রায়

৬৯৯.০০ 

হার্পার কলিন্স ও সত্যজিৎ রায় সোসাইটি

 

বিশ শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি দুনিয়ার দিকপাল চলচ্চিত্রকারদের কারও কারও মধ্যে কোনও এক ব্যতিক্রম চোখে পড়ে সত্যজিতের। বিজ্ঞানভিত্তিক ছবি নিয়ে একটি নিবন্ধে লেখেন: ‘এতকাল পৃথিবীর মধ্যে যাঁরা সেরা পরিচালকের পর্যায়ভুক্ত তাঁদের কেউই এদিকে এগোননি। সম্প্রতি এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।’ উদাহরণ হিসাবে গোদারের ‘আলফাভিল’-এর কথা তুলেছিলেন তিনি। কৃত্রিম সেট তৈরি না করে সমকালীন প্যারিসের ছবি তুলে, তাতে শুধুমাত্র আলো ও ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ নির্বাচনের চাতুরির জোরে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানশাসিত এক প্যারিসের চেহারা ছবিতে এনে ফেলেছিলেন গোদার। ‘কলাকৌশলের দিক থেকে এ ছবি অবিস্মরণীয়’, সে কথা বলতে দ্বিধা করেননি সত্যজিৎ রায়।

১৯৬৬-তে লিখিত ‘কুব্রিক, ত্রুফো অ্যান্ড এস এফ’ শীর্ষক এই নিবন্ধটিতে উল্লেখিত দুই পরিচালকের আশ্চর্য প্রতিভার কথাও লিখেছেন সত্যজিৎ, ‘দু’জন নামকরা SF লেখকের কাহিনির ওপর ভিত্তি করে দুটি ছবি তুলেছেন।’ রে ব্র্যাডবেরির কাহিনি ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর ‘ফারেনহাইট ৪৫১’ ছবিটির অবলম্বন, আর স্ট্যানলি কুব্রিকের অবলম্বন আর্থার সি ক্লার্কের ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’। সে বছর লন্ডন গিয়েছিলেন সত্যজিৎ, আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে যোগাযোগের পর কুব্রিকের ‘আ স্পেস ওডিসি’ তৈরির স্টুডিয়োয় ঢুঁ মারেন, লিখছেন ‘ফ্লোরে গিয়ে মহাকাশ যানের অভ্যন্তরের সেট দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।’

‘থটস অন সায়েন্স ফিকশন’ অধ্যায়ে সত্যজিতের এ ধরনের নিবন্ধাদি রেখেছেন সম্পাদক। ‘আ লুক অ্যাট সায়েন্স ফিকশন ফিল্মস’, ১৯৬৬-তে লেখা সত্যজিতের আরও একটি প্রবন্ধ, তাতেও তিনি ফের উল্লেখ করছেন সেই চিন্তক মননশীল চলচ্চিত্রকারদের, যাঁরা চোখধাঁধানো ফাঁপা থ্রিলারে বিশ্বাস করেন না, যাঁরা বিজ্ঞানভিত্তিক ছবিতে নতুন বিষয় নতুন ধরন নিয়ে আসছেন প্রতিনিয়ত, মানবজীবনের প্রত্যন্ত প্রদেশ স্পর্শ করার জন্য। ‘দ্য প্রমিস অব বেটার অ্যান্ড মোর সিরিয়াস সায়েন্স ফিকশন ফিল্মস’-এর কথা বলে লেখাটি শেষ করেছেন সত্যজিৎ। যে ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্রকারদের কথা প্রথম থেকে বলে আসছেন, তিনি নিজেও তো তাঁদেরই গোত্রভুক্ত। ফলত সত্যজিৎও উদ্দীপিত হয়েছিলেন নিজের সায়েন্স ফিকশন ফিল্ম ‘দি এলিয়েন’ রচনায়।

রে ব্র্যাডবেরি ১৯৬৩-র ১২ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে প্রথমে সত্যজিৎকে ‘অপু ট্রিলজি’ নিয়ে নিজের মুগ্ধতার কথা জানান, তার পর লেখেন ‘ইট ইজ হার্টেনিং টু হিয়ার অব ইয়োর ইন্টারেস্ট ইন সায়েন্স-ফিকশন। আই এগ্রি, ইট ইজ লং পাস্ট টাইম ফর মাচ টু বি ডান ইন মোশন পিকচার্স ইন দিস ফিল্ড।’ ১৯৬৬-র ফেব্রুয়ারিতে সত্যজিৎ তাঁর জীবনীকার মারি সিটনকে এক চিঠিতে ছবিটির কাজ শুরু করার অভিপ্রায় জানানোর সঙ্গে এও জানান যে ছবির কাহিনি তাঁর নিজেরই বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প থেকে নেওয়া। ১৯৮২-তে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োয় এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্বপ্নপ্রকল্প ‘দি এলিয়েন’-এর দুর্ভাগ্যজনক ইতিবৃত্ত কবুল করেন সত্যজিৎ, সায়েন্স ফিকশন লেখক সঙ্কর্ষণ রায় ও মনস্তাত্ত্বিক অমিত চক্রবর্তীর কাছে, ‘‘ওটার পরিকল্পনা আজকের নয়।... চিত্রনাট্য লেখা হয় ১৯৬৭-তে, পনেরো বছর আগে। ওটা ইন ফ্যাক্ট আমি একবার লন্ডন গিয়েছিলাম, তখন স্ট্যানলি কুব্রিক ‘স্পেস ওডিসি’ তুলছেন। আর্থার ক্লার্কের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তার আগেই ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’র ওপর ভিত্তি করে... ওই বাইরে থেকে স্পেসশিপ আসার ব্যাপারটা রয়েছে, একটা আইডিয়া, একটা কল্পনা আমার মাথায় ছিল। তা আমি ক্লার্ককে বলাতে বললেন ‘বাঃ, এ তো বেশ লাগছে, তুমি গিয়ে লেখো।’ তারপর আমি কলকাতায় ফিরে এসে পুরো চিত্রনাট্য লিখেছিলাম... হলিউডে পাঠিয়েছিলাম... আমার হয়ে যিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন তাঁর কতকগুলো গোলমালের ফলে শেষ পর্যন্ত ছবিটা হয়নি।’’

হলে কী হত, বলা মুশকিল, যাঁর ‘পথের পাঁচালী’ ভারতকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়েছিল, তাঁরই ‘দ্য এলিয়েন’ যে সায়েন্স ফিকশন ফিল্মের দুনিয়ায় ভারতকে ফের অন্যতম সেরা-র শিরোপা এনে দিত কি না— কে বলতে পারে! সে সময়ে ছবিটিকে ঘিরে যাবতীয় চিঠিপত্র আর খবর এ-বইয়ের ‘দি এলিয়েন’ অধ্যায়ে ‘করেসপন্ডেন্সেস অ্যান্ড নিউজ রিপোর্টস’ বিভাগে জড়ো করা হয়েছে। তাতে হলিউডের বব টমাসের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘ফেমাস ডিরেক্টর অব ইন্ডিয়া টু অ্যাকসেপ্ট ফিল্ম চ্যালেঞ্জ’। চ্যালেঞ্জ নিতে সদাপ্রস্তুত ও দুঃসাহসী সত্যজিৎ বইটির এই অধ্যায়ে তাঁর হলিউড ও ইংল্যান্ড সফরের দীর্ঘ বেদনাময় অভিজ্ঞতা অত্যন্ত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে লিখে গিয়েছেন ‘অর্ডিলস অব দ্য এলিয়েন’-এ, লেখাটি বেরিয়েছিল ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়, অক্টোবর ১৯৮০-তে।

ব্যাপারটার অবশ্য এখানেই ইতি হল না। কলম্বিয়া কোম্পানি ছবিটি করবে বলে চিত্রনাট্যের বহু মিমিয়োগ্রাফ কপি তাঁদের অফিসে রেখে দিয়েছিল, সম্ভবত বিপত্তির শুরু সেখান থেকেই। ১৯৮২-তে স্পিলবার্গের ‘ই টি’-র সঙ্গে ‘দি এলিয়েন’-এর সাদৃশ্যের কথা প্রথম সত্যজিৎকে ফোন করে জানান আর্থার সি ক্লার্ক। ফলে সত্যজিৎ বলতে বাধ্য হন: ‘‘এখন এমন অবস্থা এসেছে যে আমার ‘এলিয়েন’ আর করা সম্ভব না। করলে বলবে যে আমি ওর থেকে নিয়েছি। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে উল্টো।’’ অসীম ছাবরার একটি চমকপ্রদ রচনায় আছে এ-সমস্ত তথ্য, তিনি ১৯৮৩-তে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জার্নালিজমের ছাত্র ছিলেন, সে সময় তাঁর লেখাটি রীতিমতো সাড়া ফেলে আমেরিকায়। স্পিলবার্গ অবশ্য কখনও খোলাখুলি মুখ খোলেননি এই বিষয়টি নিয়ে। তবে ১৯৯২-এ সত্যজিৎ রায়কে যখন সাম্মানিক অস্কার দেওয়া হচ্ছিল, তখন হলিউডের যে পরিচালককুল সবচেয়ে বেশি সরব হন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে মার্টিন স্করসেসির পাশে আগাগোড়া যিনি ছিলেন তিনি স্পিলবার্গ।

গোটা বইটি যেন সত্যজিতের কাঙ্ক্ষিত অথচ অপূরিত স্বপ্নের ইতিহাস। সন্দীপের ভাষায় তাঁর ‘মুভি-মেকিং হিস্ট্রি’র একটি অংশ। ‘দি এলিয়েন’ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য-নথি-স্থিরচিত্রের সঙ্গে আছে ছবিটির চিত্রনাট্য। আছে ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ, এবং সে গল্প থেকে ১৯৮৬-তে টিভি-র জন্যে যে হিন্দি ছবিটি করেছিলেন সন্দীপ, সেটির সত্যজিৎ-কৃত ইংরেজি চিত্রনাট্য।

পড়তে পড়তে, সন্দীপ সত্যজিতের যে সায়েন্স ফিকশনে আসক্ত মনটির কথা বলে নিজের মুখবন্ধ শুরু করেছেন, সেটির খোঁজ পাওয়া যায়। গোয়েন্দা গল্পলেখক হিসেবেই তাঁকে বড় বেশি খুঁজি আমরা, সিদ্ধার্থ ঘোষ বা বিশ্বজিৎ রায়ের মতো ব্যতিক্রমী গবেষক বাদ দিলে, তাঁর এই গভীর মনটির খবর রাখিই না। অথচ সত্যজিতের প্রথম মৌলিক গল্পই ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’— সায়েন্স ফিকশন!

বইটি সত্যজিতের সেই সৃষ্টিশীল মনটিকে আবিষ্কারের ব্যবস্থা করে দিল।