গল্পটাও ঠিক মতো বলা হল না

সম্পর্ক: ইন্দিরা গাঁধী ও পি এন হাকসার, জুলাই ১৯৭৫। ছবি বই থেকে

ইতিহাসের গবেষকের কাছে মস্ত ব়ড় চ্যালেঞ্জ হল অভিলেখাগারের গন্ধমাদন ঘেঁটে প্রয়োজনীয় তথ্যের বিশল্যকরণীটুকু তুলে আনতে পারা। জয়রাম রমেশের জন্য কাজটা সহজ করে গিয়েছেন স্বয়ং পরমেশ্বর নারায়ণ হাকসার— ষাট আর সত্তরের দশকের ইতিহাস যাঁকে পি এন হাকসার নামেই চিনেছে। রমেশ নিজেই জানিয়েছেন, হাকসারের ব্যক্তিগত নথি সংগ্রহটি বিস্ময়কর। সমস্ত কাগজ, সব চিঠিপত্র গুছিয়ে রাখা আছে পর পর, ভবিষ্যতের কোনও গবেষকের জন্য। ‘ইন্টারটোয়াইন্ড লাইভস’ পড়়তে পড়তে পাঠকের সন্দেহ হবে, কাজটা কি প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই সহজ করে দিয়েছিলেন হাকসার? এতটাই সহজ, যে ভবিষ্যতের লেখকের মধ্যে আলস্য তৈরি হবে অন্য কোনও নথির সন্ধান করায়? রমেশের কাজে সে আলস্যের ছাপ স্পষ্ট। হাকসারের আর্কাইভস-এর বাইরে খুব বেশি প্রাথমিক তথ্যের সন্ধান করেননি বলে সন্দেহ হয়।

তার ফল ভাল হয়নি। অনেকগুলো দিক থেকে। শুধু কোনও এক ব্যক্তিবিশেষের আর্কাইভস-এর ওপর নির্ভর করে যদি তাঁর জীবনী লেখা হয়, তবে তাতে সেই মানুষটির প্রভাব বড় বেশি পরিমাণে পড়ে। আর, তাতে হারিয়ে যায় জীবনীর নৈর্ব্যক্তিকতা। আরও মুশকিল, হাকসারের প্রতি রমেশের মুগ্ধতাও নৈর্ব্যক্তিক জীবনীর পথে বাধা। শুধু হাকসারের আর্কাইভস-এর ওপর নির্ভর না করলে হয়তো মুগ্ধতার রেশও কম থাকত লেখায়, নৈর্ব্যক্তিকতার দাবিও পূরণ হত। রমেশের আখ্যানের আরও এক খামতি হল, তাঁর মূল দুই চরিত্র— হাকসার আর ইন্দিরা গাঁধী— খানিক হাওয়ায় ভেসে আছেন। যে হেতু তথ্যসূত্র সীমিত, এবং অন্য সূত্র থেকে ন্যারেটিভের ফাঁক পূরণ করার চেষ্টা করেননি রমেশ, ফলে বহু ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে, ভারতে তখন বুঝি শুধু দু’জন মানুষেরই অস্তিত্ব ছিল— প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। ইন্দিরা গাঁধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম পর্বের হাকসারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু, হাকসার বলছেন আর ইন্দিরা গাঁধী করছেন, ভারতের যাবতীয় সিদ্ধান্ত শুধু এই দু’জনের ফ্রেমে আটকে রয়েছে, রমেশের বই হাকসারকে প্রায় এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছে। তাতে পাঠকের চোখে হাকসারের গুরুত্বের ইতরবিশেষ হয়নি, কিন্তু বইটির গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে খানিক হলেও।

অথচ, তাঁর হাতে জিনিস ছিল অনেক। ১৯৬৯ সালে ১৪টি ব্যাঙ্ককে রাষ্ট্রায়ত্ত করার সিদ্ধান্ত যেমন। কী অসম্ভব দ্রুততায় এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে সিদ্ধান্তটি হয়েছিল, রমেশ লিখেছেন। ৯ জুলাইয়ের চিঠিতে দেখা যাচ্ছে, হাকসার তখনও ব্যাঙ্ক অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত নন। আর, ১৯ জুলাই ইন্দিরা গাঁধী সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করলেন। এই দশ দিনে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে তুমুল টানাপড়েন চলছিল, ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্তকরণের সিদ্ধান্তে তার প্রভাব পড়েছিল স্পষ্ট। ডি এন ঘোষের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, কী ভাবে এক রাতের বৈঠকে স্থির হয়েছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত করা হবে ব্যাঙ্কগুলিকে। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হাতে গোনা কয়েক জন। আর, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আগে সেই সিদ্ধান্তের কথা জানতেনও ঠিক সেই ক’জনই। ২০১৬-র নভেম্বরের কথা মনে পড়তে পারে। ভবিষ্যতের কোনও গবেষক হয়তো জানাবেন, নোট বাতিলের সিদ্ধান্তটিও নেওয়া হয়েছিল হয়তো ঠিক এই ভঙ্গিতেই।

ইন্দিরা গাঁধীর প্রধানমন্ত্রিত্বে হাকসারের গুরুত্ব ঠিক কতখানি, তার বহু নমুনা রয়েছে বইটিতে। ১৯৭১ সালের একটা উদাহরণ দিই। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তৈরি হওয়া চাপ সামলাতে হচ্ছে ইন্দিরাকে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত ‘ট্রিটি অব পিস, ফ্রেন্ডশিপ অ্যান্ড কোঅপারেশন’ শেষ অবধি স্বাক্ষরিত হল। তার দিন তিনেক বাদে ইন্দিরা গাঁধী হাকসারের কাছে জানতে চাইলেন, চিনকে কি এই বার্তা দেওয়া উচিত নয় যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের চুক্তি হলেও চিনের সঙ্গে এই রকম আর একটা চুক্তির রাস্তা খোলাই রয়েছে? প্রশ্নটা জরুরি, কারণ চিনের সঙ্গে তখন ভারতের সম্পর্কের শৈত্য যেমন চরম, তেমনই তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে।

ইন্টারটোয়াইন্ড লাইভস/ পি এন হাকসার অ্যান্ড ইন্দিরা গাঁধী

জয়রাম রমেশ

৭৯৯.০০ 

সাইমন অ্যান্ড শুস্টার

হাকসার দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন। তার মূল কথা, ভারত যদি চিনকে এই বার্তাটি দেয়, তার একটাই মানে হওয়া সম্ভব— সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির ভারতের কাছে আদৌ কোনও মূল্য নেই, তাই যে কোনও দেশের সঙ্গেই সেই চুক্তি করার কথা ভাবতে পারে। তাতে চিনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হবে না, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তিটা মাঠে মারা যাবে। এটাই হাকসার। তাঁর কূটনৈতিক যুক্তি ঠিক না ভুল, সেই তর্ক এখানে নয়। কিন্তু, যে ইন্দিরা গাঁধীর হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়ে চলাই দস্তুর ছিল, তাঁকেও স্পষ্ট ভাবে নিজের মত জানানোই ছিল হাকসারের অভিজ্ঞান।

সেই ইন্দিরার সঙ্গেই সম্পর্কে অসেতুসম্ভব চিড় ধরেছিল। সেই গল্প বলতে গেলে জরুরি অবস্থার কথায় যেতেই হবে। কেন জরুরি অবস্থা জারি করতেই হল, তার কোনও যথাযথ ব্যাখ্যায় ঢোকেননি রমেশ। শুধু ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়? ইন্দিরা আর হাকসারের সম্পর্কের দীর্ঘ আলোচনার পর জরুরি অবস্থার কারণ হিসেবে শুধু সেটুকু বললে অনেকখানি ফাঁক থেকে যায়। রমেশ দেখিয়েছেন, কী ভাবে শুধু সরকারি, প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও হাকসারের ছায়া দীর্ঘতর হয়েছিল। ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ইন্দিরার বক্তৃতা থেকে মন্ত্রিসভায় রদবদল, সবেতেই হাকসারের মতের গুরুত্ব ছিল বিপুল। ইন্দিরার প্রতি হাকসারের বিশ্বস্ততার কথা বারে বারেই বলেছেন রমেশ। পাঠকের মনে হতেই পারে, সেই বিশ্বস্ততার উল্টো পিঠে ছিল বিচ্ছিন্নতাও। হাকসার যেমন এক দিকে ইন্দিরাকে চালনা করেছেন, আবার অন্য দিকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেছেন দুটো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে— মন্ত্রিসভা আর দল। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পুঞ্জীভূত হয়েছে সব ক্ষমতা। জরুরি অবস্থা কি এই ক্ষমতারই চরম বহিঃপ্রকাশ নয়?

গণতান্ত্রিক পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় পৌঁছলে পরিণতি কী হতে পারে, জরুরি অবস্থা দেখেছে। রমেশের সুযোগ ছিল এই বিশ্লেষণটিকে যত্ন করে তৈরি করার। এবং, সঞ্জয় গাঁধী নামক চরিত্রটিকে এই বিশ্লেষণের কাঠামোয় নিয়ে আসার। পরমেশ্বর নারায়ণ হাকসারকে বিচ্যুত করে ইন্দিরা গাঁধীর ক্ষমতার কেন্দ্রটিতে ঢুকে প়ড়লেন সঞ্জয় গাঁধী, এবং তাঁকে চালনা করলেন নিজের পথে, ঠিক যেমন হাকসার করতেন। রমেশ হাকসারকে যে ভাবে দেখেছেন, তার সঙ্গেও কিন্তু এই ব্যাখ্যা বেমানান হত না। এবং, আরও একটি কথা বলা যেত— একনায়ক যতই ভাল হোন না কেন, তিনি বিপজ্জনক। কারণ, ভাল থেকে মন্দ হয়ে উঠতে সময় লাগে না মোটেও।

বইটির মস্ত খামতি, এতে বড় বড় উদ্ধৃতি রয়েছে হাকসারের কাগজপত্র থেকে, কিন্তু বিশ্লেষণ নেই। অবশ্য রমেশ নিজেই জানিয়েছেন, তিনি একটা গল্প বলতে চেয়েছেন। ইন্দিরা আর হাকসারের গল্প। কিন্তু, শেষ অবধি সেই গল্পটাও কি বলা হল? গল্পের দুই মূল চরিত্র শূন্যে ভেসে থাকলেন। হাকসারের ওপর ইন্দিরা গাঁধীর নির্ভরতা জানলাম আমরা, কিন্তু কেন তৈরি হল এমন নির্ভরতা, জানা হল না। ইন্দিরা গাঁধীকে ভিতর থেকে দেখার চেষ্টা না করা এই বইয়ের একটা মস্ত খামতি। হাকসার প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারির পদ থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পর ইন্দিরা তাঁকে যে চিঠিটি লিখেছিলেন, বইয়ের ব্যাক কভারে সেই চিঠি আছে। কিন্তু, ইন্দিরা কেন তাঁকে নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টানোর কথা বললেন না এক বারও, রমেশ সেই কারণটি খুঁজতে পারতেন।