তিন দশকের পরিকল্পনায় তৈরি হয়েছিল হাওড়া ব্রিজ


সেতু একটা ছিলই। তবে সেটা ছিল পন্টুন ব্রিজ বা ভাসমান সেতু। নীচে নৌকা, উপরে পাটাতন। মাঝ বরাবর খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা। লম্বায় ১৫২৮ ফুট, ৪৮ ফুট চওড়া। দু’পাশে সাত ফুটের ফুটপাত। জাহাজ-স্টিমার চলাচলের জন্য সেতুর মাঝখানে ২০০ ফুট খুলে দেওয়া যেত। স্টিমার এলেই সেতু বন্ধ। ভোঁ ভোঁ শব্দ করে স্টিমার পেরিয়ে যাবে, তার পর আবার খুলবে সেতু। ঠিক যেন রেলগেটে ট্রেন পেরোনো। আর হবে না-ই বা কেন, পুরনো হাওড়া ব্রিজের নকশা বানিয়েছিলেন স্যর ব্র্যাডফোর্ড লেসলি। ব্রিটিশ শাসনে রেল কোম্পানির খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ার। এ দেশের বড় বড় রেলসেতুর নকশা তিনিই বানিয়েছিলেন। যেমন, নৈহাটির জুবিলি ব্রিজ। লেসলি সাহেব বিলেত থেকে এসে সেতু নির্মাণের এলাকা ঘুরে দেখে গিয়েছিলেন। ফিরে গিয়ে তৈরি করেন নকশা।

তার আগে থেকেই সেতু গড়ার কত গল্প! ব্রিটিশ প্রশাসন ১৮৫৫-৫৬ সালে প্রথম একটা সেতুর কথা ভেবেছিল। তৈরি হয়েছিল কমিটিও। কারণ, তত দিনে নদীর দু’পাড়েই জাঁকিয়ে বসেছে গোরাদের কারবার। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কারখানা। তাই হাওড়া-কলকাতার জন্য একটি সেতু এ বার দরকার। ’৫৫-এর সেতু কমিটি চর্চা শুরু করলেও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বছর চারেক পর ১৮৫৯-৬০ সালে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে সময়েও সরকারের প্রকল্প প্রস্তাবিত হয়েও ঠান্ডা ঘরে যেত। হাওড়া ব্রিজের প্রথম প্রস্তাবেই ক্ষেত্রেই তা করা হয়েছিল। তার আট বছর পর সেই ঠান্ডা ঘরের ফাইল আবার বার হয়। ঠিক হয়, এ বার সেতু একটা বানাতেই হবে। ত়ৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর সিদ্ধান্ত নেন, সেতু নির্মাণের যাবতীয় দায়িত্ব সরাসরি সরকারের হাতে থাকবে না। ১৮৭১ সালে তৈরি হয় একটি ট্রাস্ট। সেই ট্রাস্টের অধীনেই হাওড়ার প্রথম ভাসমান সেতু নির্মাণের ভার দেওয়া হয়।

অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বে সোনালি চতুর্ভুজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল। দেশ জুড়ে এক্সপ্রেসওয়েগুলিতে চলার জন্য চালু হয়েছিল টোল। এখন তো অনেক রাজ্য সড়কেও টোল বসানো হয়েছে। কিন্তু ১৮৭১ সালে বাংলার ছোট লাট যখন ‘হাওড়া ব্রিজ অ্যাক্ট’ তৈরি করেছিলেন, তখনই সেতু পেরোতে টোল বসানো হয়েছিল। টোলের টাকাতেই চলত সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। ’৭১-এ আইন হওয়ার পর স্যর লেসলিকেই সেতু নির্মাণের ভার দেওয়া হয়। তিনি বিলেতে ফিরে গিয়ে সেতুর ডেক এবং ভাসমান সমতল ‘নৌকা’ বানানোর কাজ শুরু করালেন। জাহাজে সেই মাল পৌঁছল কলকাতা বন্দরে। তার পরে একে একে সমতল নৌকার উপর পর পর ডেকগুলি জুড়ে তৈরি হল প্রথম হাওড়া ব্রিজ। মাঝের ২০০ ফুট খোলার ব্যবস্থাও রইল। ১৮৭৪ সালে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় সেই সেতু। অর্থাৎ ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন যা পরিকল্পনা করেছিল, তা রূপায়িত হল ১৯ বছর পর।

মজার কথা হল, সে সময় পন্টুন ব্রিজ তৈরি করতে লেসলি সাহেবের সংস্থাকে দিতে হয়েছিল ২২ লক্ষ টাকা। কিন্তু সেতু যত দিন ছিল, তা থেকে সর্বমোট টোল আদায় হয়েছিল ৩৪ লক্ষ ১১ হাজার টাকা। মোদ্দা কথায়, সেতু থেকেও লাভ করেছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। বছরে কমপক্ষে দেড় লক্ষ টাকা টোল আদায় হয়েছে সে সময়। তবে ভাসমান সেতুর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জাহাজ-স্টিমার যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। জাহাজ গেলেই গাড়ি চলাচলের জন্য সেতু বন্ধ হয়ে যেত। যানজটের বহরও বাড়ত দিনের বেশির ভাগ সময়। কারণ, দিনের বেলাতেই কেবলমাত্র সেতু খোলা যেত। এই ব্যবস্থা চলে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত। তার পর রাতেও জাহাজের জন্য সেতু খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। তাতে আগে যেখানে দিনে ২৪ বার সেতু খুলতে হত, তা কমে যায়। দিনে মাত্র চার বার সেতু খুললেই কাজ মিটে যেত। বন্দরের নথি বলছে, ১৯০৭-০৮ সালে হাওড়া ব্রিজের মাঝখান দিয়ে ৩০২০টি জাহাজ-স্টিমার-লঞ্চ গিয়েছিল। তবে রাতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা হলেও যানজটের সমাধান হচ্ছিল না। ফলে সে সময় থেকেই হাওড়াতে একটি নতুন সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকে ব্রিটিশ প্রশাসন।

ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্বেই নতুন একটি সেতুর কথা ভাবা হচ্ছিল। তার অন্যতম কারণ ছিল হাওড়া ব্রিজের উপর গরুর গাড়ির দাপট। বন্দরের নথি বলছে, ১৯০৭ সালের ২৭ অগস্ট দেখা যাচ্ছে, সেতু দিয়ে ১৩টি গাড়ি চললে তার আটটিই গরুর গাড়ি! পন্টুন ব্রিজ চওড়া ছিল ৪৮ ফুট। কিন্তু বাস্তবে গাড়ি চলাচলের জন্য ৪৩ ফুটের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। অন্য দিকে গরুর গাড়ির প্রবল চাপে হিমসিম অবস্থা বন্দর কমিশনারের। তিনিই বৈঠক ডেকে নতুন সেতুর প্রস্তাবনা করেন। তৈরি হয় একটি কমিটি। বন্দরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জন স্কট, পূর্ব রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আর এস হাইট এবং কলকাতা পুরসভার চিফ ইঞ্জিনিয়ার ম্যাককেব ওই কমিটির সদস্য হন। ভাবনা শুরু হয়, ভাসমান সেতুর বদলে একটি ক্যান্টিলিভার সেতু নির্মাণের।

এই পরিকল্পনা মোটেই পছন্দ হয়নি স্যর লেসলির। কারণ, তখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে তিনটি মাত্র ক্যান্টিলিভার সেতু বানানো হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে ভারতে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে চাননি তিনি। এর মধ্যেই ১৯১৭ সালে ক্যান্টিলিভার প্রযুক্তিতে তৈরি কানাডার পঁ দ্য কেবেক সেতু ভেঙে পড়েছিল। লেসলি সাহেব নতুন একটি ভাসমান সেতুর পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। একই মতামত ছিল পোর্ট কমিশনারেরও। কারণ, বন্দরের কাছে সেতুতে গরুর গাড়ি চলাচলের চেয়ে বিলেত থেকে আসা জাহাজ চলাচল আরও বেশি জরুরি ছিল।

সেই শুরু বিতর্কের। নতুন সেতু কোথায় হবে, কোন প্রযুক্তিতে হবে, সেতু নির্মাণের সময় যান চলাচলের সমস্যা মিটবে কী ভাবে, ইত্যাদি। বিভিন্ন সরকারি নথি বলছে, তৎকালীন ইঞ্জিনিয়াররা তর্ক-বিতর্ক করেছেন। সরকারি নথিতে তা লিপিবদ্ধ হয়েছে। ব্রিটিশ প্রশাসন কখনও কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। প্রায় ২০-২২ বছর চর্চার পরও যখন ইঞ্জিনিয়াররা সহমত হতে পারেননি, তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কমিটি তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার পরে সেই কমিটির সিদ্ধান্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে নতুন সেতুর পরিকল্পনা-নকশা তৈরি হয়। সেই কাহিনিও চমকপ্রদ।

প্রাথমিক কমিটি গঠনের পর ১৯১১ সালে নতুন হাওড়া সেতু নির্মাণের নকশা চাওয়া হয়। পরের বছর সারা বিশ্ব থেকে ৯টি সংস্থা ১৮টি নকশা জমা দেয়। কিন্তু সব ক’টি নকশাই ছিল বাসকুল মডেলে। অর্থাৎ সেতুর মাঝ বরাবর খোলা রাখার ব্যবস্থা রেখেছিল সব সংস্থাই। এর মধ্যে এসে পড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ব্রিটিশরা নতুন কোনও পরিকাঠামো প্রকল্প থেকে সরে আসে। ১৯১৭ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত যুদ্ধের কবলে পড়ে অর্থনীতিও ধাক্কা খায়। এ দেশে আমদানি কমতে থাকে। ফলে নতুন করে কোনও প্রকল্প হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে ব্রিটিশ প্রশাসন। ১৯২১ সালে ফাইল ঝেড়ে ফের চর্চা শুরু হয়।

আর তা শুরু হতেই সামনে এসে পড়ে পোর্ট কমিশনার আর রেলওয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের ভিন্ন মতের কথা। এক জন পন্টুন ব্রিজ চান তো অন্য জন ক্যান্টিলিভার সেতু। ব্রিটিশ প্রশাসন একটি মধ্যপন্থা বার করেন। ১৯২১ সালে স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে (আর এন মুখার্জি) মাথায় রেখে একটি কমিটি গড়ে দেন। তিনি তখন মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানির অন্যতম মালিক। কমিটির সদস্য তৎকালীন কলকাতা বন্দরের চেয়ারম্যান ক্লিমেন্ট হিন্ডলে, চিফ ইঞ্জিনিয়ার জে ম্যাগ্লাসান। কমিটি তৎকালীন বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার বেসিল মট-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। স্যর বেসিলই প্রথম ‘সিঙ্গল স্প্যান আর্চড ব্রিজ’-এর প্রস্তাব করেন। ১৯২২ সালে আর এন মুখার্জি কমিটি চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে। তাতে যাবতীয় বিতর্ক সরিয়ে ক্যান্টিলিভার সেতু নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। ঠিক হয়, এমন প্রযুক্তি হবে যাতে সেতুর নীচ দিয়ে অনায়াসে জাহাজ-স্টিমার যাতায়াত করতে পারবে।

১৯২৬-এ পাস হয় ‘দ্য নিউ হাওড়া ব্রিজ অ্যাক্ট’। সম্ভবত দেশের প্রথম সেতু হাওড়া ব্রিজ, যার নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি আইনসিদ্ধ। আইন পাস তো হলই, এর পর ১৯৩০ সালে ১৫ মার্চ বাংলার গভর্নর বৈঠক ডেকে সেতু নির্মাণের জন্য এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বন্দরের নথিপত্র বলছে, একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হয়েছিল। তার আগে প্রযুক্তিবিদরাই আলোচনা, তর্ক করেছেন। মাঝে বিশ্বযুদ্ধের সময় সেতু নির্মাণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। আইন পাস এবং গভর্নরের অনুমোদনের পর বন্দর কর্তৃপক্ষ আর দেরি করেনি। তা বলে এখনকার রাফাল বিতর্কের মতো ‘ক্রেডেনশিয়াল’ নেই এমন কাউকেও বরাত দেওয়া হয়নি। হাওড়া ব্রিজ তৈরিতে ২৬ হাজার ৫০০ টন  ইস্পাত লেগেছিল। তার মধ্যে ২৩ হাজার ৫০০ টন সরবরাহ করেছিল টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড। হাওড়া ব্রিজই সম্ভবত প্রথম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প, যার কাঁচামালের সবটাই ভারত থেকেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাটা স্টিল চাইলেই ব্রিটিশরা তাদের বরাত দেয়নি। বলা হয়েছিল ‘ক্রেডেনশিয়াল’ দেখাতে। টাটা কর্তৃপক্ষ জানায়, মেঘনা নদীর উপর ভৈরববাজারে একটি রেলসেতুর জন্য তারা ৩৪০০ টন ইস্পাত সরবরাহ করেছে। ইস্পাতের গুণমান নিয়ে সেতুর ফ্যাব্রিকেটর ব্রেথওয়েট, বার্ন অ্যান্ড জেসপ (বিবিজে) খুশি। ব্রিটিশরা এই ক্রেডেনশিয়ালে খুশি হয়েছিল। পরবর্তী কালে টাটারা ইস্পাত সরবরাহ করেন। আর ‘বিবিজে’ হাওড়া ব্রিজের ফ্যাব্রিকেশন-এর কাজ করে। ১৯৩৭-এ ব্রিজ তৈরি শুরু হয়, কাজ শেষ হয় ১৯৪২-এর অগস্টে। ১৯৪৩-এর ফ্রেব্রুয়ারিতে তা জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আজ তার ৭৫ বছর বয়স।

আজও কলকাতা ও হাওড়া ব্রিজ সমার্থক। ব্রিটিশ আমলে পর পর দু’টি সেতু তৈরি হয়েছিল। প্রথমটির পরিকল্পনা চলেছিল ১৯ বছর, নতুন ব্রিজের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ বছর। ৭৫ বছর আগে তৈরি হওয়া সেতুটি ৭১ ফুট চওড়া। সঙ্গে দু’পাশে ১৫ ফুটের ফুটপাত। ১৯৪৭-এ হাওড়া ব্রিজে গাড়ি চলত দিনে ৩৪ হাজার। এখন চলে সোয়া লাখ। পথচারী পাঁচ লাখ। তার পরেও অবিচল হাওড়া ব্রিজ। তার নেপথ্যে কি সেই নির্মাণের পূর্ববর্তী ত্রিশ বছরের পরিকল্পনা? এখনকার মতো ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ নীতি ব্রিটিশদের ছিল না। সাত বছরে চারটি সেতু বিপর্যয়ের পর আমাদেরও এখন ব্রিটিশ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

তথ্যসূত্র: কলকাতা বন্দর; দ্য পোর্ট অব ক্যালকাটা,  আ শর্ট হিস্ট্রি: এন মুখোপাধ্যায়; হাওড়া ব্রিজ, অ্যান আইকন ইন স্টিল- প্রকাশক: টাটা স্টিল