কলকাতার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন

সৃষ্টি: মৃতজনে প্রাণ। ‘ফ্রাঙ্কেনস্টা‌ইন’ (১৯৩১) ছবির দৃশ্য।

দিন ছিল শুক্রবার। ১৮১৯ সালের ৭ মে। বিলেতে কেমব্রিজশায়ারের গ্রামের এক হতদরিদ্র কুলি, টম উইমস সে দিন সন্ধের দিকে খেতের মধ্যে তার স্ত্রী মেরিকে গলা টিপে হত্যা করে। বছরখানেক আগে তাদের বিয়ের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুজনের ঝগড়া শুরু হয়। টম গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণের মিলগুলিতে কাজ খুঁজতে চলে গিয়েছিল। কিন্তু কোনও কারণে গ্রামে ফিরেই তার আবার দেখা হয়েছিল স্ত্রীর সঙ্গে। তার পরেই ঝগড়া এবং খুন।

খুনটা ঝোঁকের মাথাতেই করে ফেলেছিল টম। তাই গা বাঁচানোর তেমন সুযোগও সে করে নেয়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রামবাসীরা পুলিশে খবর দেয়। গ্রেফতার হয় টম। তার মতো হতদরিদ্র কুলির না ছিল ভাল উকিল নেওয়ার ক্ষমতা, না ছিল সমাজের মান্যগণ্য মানুষের চোখে তার জীবনের বিশেষ দাম। সে কালে যাদের ট্যাঁকের জোর বা কৌলীন্য ছিল, তারা খুনের মতো কাজ করলে তাদের বেশির ভাগ সময়েই অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু অজ্ঞাতকুলশীল গরিব লোকের জন্য ও সব ঝামেলা কে পোয়াবে? তাই কোর্টে হাজির হতেই জজসাহেব টমকে ফাঁসির সাজা শুনিয়ে দিলেন। আর কয়েক দিনের মধ্যেই টম উইমস ফাঁসির দড়িতে ঝুলে চিরকালের মতো দারিদ্রমুক্ত হল। পড়ে রইল কেবল তার প্রাণহীন লাশখানা।

সেই লাশ নিয়েই এ বার শুরু হল এক নতুন গবেষণা। আদালতের মতে, কেবল প্রাণ দিয়ে টমের পাপমুক্তি সম্ভব নয়। সমাজের প্রতি নাকি তার দায় তখনও বাকি। এবং সেই দায় শোধ হবে, যদি হত্যাকারী টমের দেহ সমাজের কোনও কাজে লাগে। কী কাজে লাগানো যেতে পারে একটি মৃতদেহকে, সে নিয়ে অবশ্য আদালতকে তার মহামূল্য সময়ের খুব একটা বেশি ব্যয় করতে হয়নি। জজসাহেবের পরিচিতদের মধ্যেই ছিলেন তখনকার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির অধ্যাপক, জেমস কামিংস। কামিংস তখন মনুষ্যশরীরের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণারত। তিনিই চেয়ে নিলেন দেহখানা।

উইমসের মৃতদেহ ফাঁসিকাঠ থেকে নামিয়ে সোজা পাঠিয়ে দেওয়া হল কেমব্রিজের বটানিক গার্ডেনের লেকচার হল-এ। দেহটি যখন সেখানে পৌঁছল, সেখানে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। থাকার অবশ্য কথাও নয়। কেমব্রিজের আশেপাশে বিলেতের যত সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা ছিলেন, তাঁদের প্রায় সকলেই সে দিন ওই হল-এ হাজির হতে আগ্রহী ছিলেন। হল-এ ঢোকার জন্য সে দিন টিকিট বিক্রি হয়েছিল বেশ চড়া দামে।

‘মেরি শেলিজ় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ (১৯৯৪) ছবিতে রবার্ট ডি নিরো

তাদের সকলের চোখের সামনে একটা মস্ত ব্যাটারি থেকে অধ্যাপক কামিংস বিদ্যুতের তার লাগান টমের মৃতদেহে। তার পরেই চালু করে দেন ব্যাটারিটা। যেই বিদ্যুৎ মৃতদেহটিকে স্পর্শ করে, অমনি ঠান্ডা প্রাণহীন দেহখানির এক-একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লাফিয়ে উঠতে শুরু করে। পায়ে তার ছোঁয়ালে পা-টা নেচে ওঠে, হাতে লাগলে হাতদুটো। যেন যন্ত্রচালিত খেলার পুতুল। হল-এর অনেকেই সেই দৃশ্য দেখে চমৎকৃত। তবে সত্যিকারের সমঝদার যাঁরা, তাঁরা এ রকম দৃশ্য আগেও দু-এক বার দেখে থাকবেন। বিশেষ করে রাজধানী লন্ডনের বিভিন্ন হল-এ। আসলে তখনকার বিজ্ঞান চর্চা আর বিনোদনের মধ্যে খুব বেশি ফারাক ছিল না। নামী গবেষকরা পয়সা করতেন লেকচার দিয়ে, আর সেই লেকচারে লোক টানতে তাঁরা করতেন নানান নজরকাড়া অভিক্রিয়া। সমাজের উঁচুতলার লোকেরা আসতেন সেই সব লেকচার শুনতে আর দেখতে। জ্ঞান অর্জন আর মনোরঞ্জন, দুটোই মিলত একটি টিকিটের বিনিময়ে। রথ দেখা আর কলা বেচা।

তবে বিনোদনমিশ্রিত বলেই যে এ সব পরীক্ষা নেহাতই লঘু মনোভাবাপন্ন ছিল, তা অবশ্যই নয়। এ সব অপরোক্ষ অভিক্রিয়া অনেক গবেষকের জন্যই ছিল গূঢ় দার্শনিক কোনও তত্ত্ব বা মতবাদকে লোকসমক্ষে প্রমাণ করার এক মস্ত সুযোগ। অধ্যাপক কামিংসের মতো তখন যাঁরা বিদ্যুৎ এবং শরীরের সম্পর্ক নিয়ে ভাবিত হয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই চেয়েছিলেন প্রমাণ করতে যে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, চৈতন্য ইত্যাদি, মানে আক্ষরিক অর্থে আমরা যাকে ‘প্রাণ’ বলি, তা আসলে এক ধরনের বৈদ্যুতিক শক্তি মাত্র। অবিনশ্বর আত্মা বলে কিছু নেই। আর তাই চার্চের পাদ্রিদের উপরে নয়, বরং বিজ্ঞানীদের উপরেই লোকের আস্থা রাখা উচিত। টম উইমসের মতো দরিদ্র কুলির দেহ তাই হয়ে উঠেছিল বিজ্ঞান আর ধর্মের প্রত্যক্ষ রণক্ষেত্র।

এত ক্ষণে সুবিজ্ঞ পাঠক নিশ্চয়ই টম উইমসের অদৃষ্টের সঙ্গে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর গল্পের একটা প্রচ্ছন্ন সম্পর্ক লক্ষ করেছেন। যে দিন কামিংস টমের দেহে বিদ্যুৎ সঞ্চারণ করে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিলেন, তার ঠিক বছরখানেক আগে এক দিকে যেমন কেমব্রিজের ছোট্ট গ্রাম্য চার্চে টমের বিয়ে হয়েছিল, তেমনই অন্য দিকে মেরি শেলির লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-ও প্রকাশিত হয়েছিল। সেই উপন্যাসেও রয়েছে মৃত ব্যক্তিকে পুনর্জীবিত করার বৈজ্ঞানিক আশা। সেই আশা পূর্ণ করতে যে বিদ্যুৎ জরুরি হতে পারে, তারও রয়েছে
সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

কিন্তু এ সব বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কোথায় জানলেন মেরি শেলি? এই দার্শনিক আলোচনা, জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা দ্রষ্টব্য অভিক্রিয়ার সঙ্গে তিনি পরিচিত হলেন কী করে? সে সব প্রশ্নের জবাব পেতে গেলে ফিরতে হবে আমাদের এই কলকাতাতেই। কেমব্রিজে তার উত্তর মিলবে না। অতীতের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে হবে আরও কয়েক ধাপ। ১৮১৮-১৯ থেকে পিছিয়ে যেতে হবে আরও প্রায় অর্ধশতাব্দী।

বন্ধু: উপরে বাঁ দিকে, জেমস লিন্ড-এর একমাত্র ছবি। অন্য একটি তৈলচিত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তার পাশে পার্সি শেলি ও মেরি শেলি

সালটা ১৭৬২। পলাশির যুদ্ধের মাত্র পাঁচ বছর পর। বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরকে সরিয়ে মিরকাশিম তখন বাংলার মসনদে। ইংরেজরা তখনও ঠিক দেশের রাজা হয়ে ওঠেনি। তবে বাণিজ্যের নামে বেশ জাঁকিয়েই বসেছে। সেই বাণিজ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ইংরেজদের দূরপাল্লার বাণিজ্যিক জাহাজগুলির। ইংরেজরা এই জাহাজগুলিকে বলত ‘ইস্ট ইন্ডিয়াম্যান’। ‘ড্রেক’ নামক এমনই এক ইস্ট ইন্ডিয়াম্যান ১৭৬২ সালে নোঙর ফেলে কলকাতা থেকে আশি মাইল দূরে, হুগলি নদীর তীরে কাজরী গ্রামে। সে কালে এখানেই প্রথম থামত দূরদূরান্ত থেকে আসা জাহাজগুলি। জাহাজ থেকে নামলেন নবীন এক ডাক্তার— জেমস লিন্ড। এত দিনে তাঁর স্বপ্ন সফল হল।

আঠাশ বছর বয়সি এই ছোকরা ডাক্তারের কিন্তু ডাক্তারি করার তেমন ইচ্ছে ছিল না আদৌ। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র লিন্ডের প্রবল উৎসাহ ছিল সংস্কৃত আর বিজ্ঞানের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি তখনও বিজ্ঞান আর সাহিত্যকে ‘বি এসসি’ বা ‘বি এ’ নামে ভাগ করতে শেখেনি। তাই অনেক কৃতী ছাত্রই সাহিত্য ও বিজ্ঞান, দুটোই পড়ত আগ্রহ সহকারে। তা ছাড়া যদিও স্যর উইলিয়াম জোন্স তখনও এশিয়াটিক সোসাইটির সূচনা করেননি, তবুও ইউরোপে প্রাচীন প্রাচ্যবিদ্যা নিয়ে তখন অনেকেই খুব উৎসাহী। কেউ ভাবছেন সংস্কৃত কাব্যের ভান্ডারে তাঁরা খুঁজে পাবেন জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যামিতির কোনও লুপ্ত সূত্র। লিন্ডের তাই বাই চাপল, তিনি কলকাতা আসবেন। এখানে ভাল করে সংস্কৃত আর ফার্সি শিখবেন। সেই সঙ্গে বিষুবরেখার কাছাকাছি থেকে জ্যোতির্মণ্ডল সংক্রান্ত নতুন কিছু গবেষণাও করে ফেলতে পারবেন। দিবারাত্র বঙ্গদর্শনের স্বপ্ন লিন্ডকে ছাত্রাবস্থায় তাই ধাওয়া করে চলল।

কিন্তু এডিনবরা থেকে কলকাতা আসতে তখন খরচ প্রচুর। মধ্যবিত্ত পরিবারের কৃতী সন্তান লিন্ডের সে সামর্থ্য নেই। অনেক ভেবেচিন্তে তাই ঠিক করলেন, তিনি জাহাজের ডাক্তার হবেন। ডাক্তার হতে তখন বিশেষ কোনও ডিগ্রির দরকার ছিল না। অভিজ্ঞ কোনও ডাক্তারের কাছে কিছু দিন হাতে-কলমে কাজ শিখলেই হত। কিন্তু জাহাজের ডাক্তারদের অনেক সময় তাও লাগত না। প্রতিটি ইস্ট ইন্ডিয়াম্যানে এক জন করে অভিজ্ঞ ডাক্তার থাকতেন আর তার সহকারী হিসাবে অনেক সময়ই একেবারে আনকোরা আনাড়ি কোনও ছেলে সফর করত। তেমন উৎসাহী বা মেধাবী হলে দু-একটি সফরের পরেই এই সহকর্মীরা নিজেই ডাক্তারি করার মতো জ্ঞানার্জন করে ফেলত। তবে যেহেতু তখন ডাক্তারদের সামাজিক মর্যাদা তেমন ছিল না, তাই শিক্ষিত সচ্ছল পরিবারের ছেলেরা এই পেশায় তেমন আসত না। ফলস্বরূপ লিন্ডের মতো উচ্চশিক্ষিত, ডিগ্রিধারী ছাত্রের জাহাজে সহকারী ডাক্তারের পদ পেতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। সহজেই তিনি পেয়ে গেলেন ‘ড্রেক’ জাহাজে সহকারী চিকিৎসকের পদটি।

কাজরীর বন্দরে পৌঁছতে লেগে গেল প্রায় ছ’মাস। তত দিনে অনুসন্ধিৎসু যুবক হয়ে উঠেছেন পাকা ডাক্তার। কলকাতা পৌঁছেই তিনি মুখোমুখি হলেন নতুন এক জ্বরের। বাকি সব ভুলে সেই মারণ জ্বরের গবেষণাতেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন নবীন ডাক্তার লিন্ড। লিখে ফেললেন ল্যাটিন ভাষায় বাংলার জ্বর নিয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক বই। পরে ১৭৭৬ সালে এডিনবরা থেকে এই বইটির একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। বাংলার জ্বরজারি নিয়ে এটিই প্রথম বই।

ঠিক কত দিন জেমস লিন্ড কলকাতায় ছিলেন তা অবশ্য আজ কুয়াশাচ্ছন্ন। তবে সম্ভবত ১৭৬৮ নাগাদ তিনি বিলেতে ফিরে যান। মাঝে কলকাতায় বসবাসকালে তিনি এক বার চিনও ঘুরে আসেন। বিলেতে ফিরে লিন্ড যান অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে। পরিভ্রমণ, পর্যবেক্ষণ ও পঠনের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের নানান জ্ঞান সংগ্রহ করেন তিনি। তবে মানুষটা ছিলেন খানিক খ্যাপাটে। চাকরিবাকরি করা তাঁর ধাতে সয়নি কোনও কালেই। নিজের বাড়িতেই নানান গবেষণা করে আর বই পড়ে কেটেছে তাঁর বেশির ভাগ সময়। সে যুগে হতদরিদ্র ইংরেজ সন্তান কলকাতায় ছ’মাস থেকেই বড়লোক হয়ে দেশে ফিরে এস্টেট কিনে বসত। লিন্ড কিন্তু এত দেশ ঘুরেও বেশ গরিবই রয়ে গেলেন সারা জীবন। এমনকি তখন বিলিতি বিজ্ঞানী সমাজের মধ্যমণি স্যর জোসেফ ব্যাঙ্কস লিন্ডের সম্বন্ধে পরিচিত এক জনকে চিঠি লিখতে গিয়ে লেখেন, ‘লোকটি খুব বুদ্ধিমান আর একেবারে উদ্ধত নয়— সমাজে ও ওর নিজের জায়গা জানে এবং সুখের বিষয় যে তার থেকে উপরে উঠতে চেষ্টা করে না।’ ব্যাঙ্কসের চিঠির ভাষার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে তাঁরা সহজেই বুঝতে পারবেন যে তিনি লিন্ডকে মূলত নিচু শ্রেণির কেজো মানুষ হিসেবেই ভাবতেন।

গবেষণা: লুইজি গ্যালভানির ভাগ্নে জিয়োভানি আলদিনি, বিদ্যুৎ নিয়ে তাঁর মামার নানান চমকপ্রদ পরীক্ষা তখনকার দিনের দস্তুর অনুযায়ী জনসাধারণের সামনে দেখিয়ে বেড়াতেন, দু’পয়সা উপার্জনের আশায়। এ ভাবেই বিজ্ঞানের এই বিষয়গুলি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে

১৭৮৩ সাল নাগাদ লিন্ড লন্ডনের কাছেই উইনসর শহরে বাস করতে শুরু করেন। কাছেই রাজপ্রাসাদে একটি ছোট চাকরি করে তাঁর সংসার চলত। তবে বাড়িতে তিনি নানান বিজ্ঞানের পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন সারা ক্ষণ। উইনসরের বিখ্যাত ইটন স্কুলে তখন পড়েন ভবিষ্যতের বিখ্যাত রোম্যান্টিক কবি পার্সি বিসে শেলি। মা-মরা ভাবুক প্রকৃতির ছেলে ছিলেন পার্সি শেলি। ঘোর বিষয়ী জমিদার পিতার সঙ্গে মোটেই বনত না ছেলেটির। এমনকি এক সময় তাঁর বাবা চেয়েছিলেন নিজের ছেলেকে পাগলা গারদে ভর্তি করে দিতে। ভেবেছিলেন, তাতে যদি কবিতার ভূত মাথা থেকে নামে। স্কুলজীবনে অবসাদে ডুবে থাকতেন পার্সি। এমনই সময় হঠাৎ এক দিন তার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল প্রৌঢ় জেমস লিন্ডের। স্কুলপড়ুয়া শেলির সঙ্গে প্রৌঢ় পণ্ডিতের বন্ধুত্বটা ছিল অপ্রত্যাশিত। কিন্তু টিকে গেল সেটা।

ধীরে ধীরে গাঢ়ও হল সেই বন্ধুতা। জেমস লিন্ড অনুপ্রাণিত করলেন পার্সি শেলিকে। গল্প শোনালেন ভারতের, চিনের, আফ্রিকার— আরও নানান দেশের। তাঁর গবেষণাগারে ডেকে নিয়ে দেখালেন তাঁর যন্ত্রপাতি। লিন্ড নিজে বাড়ি বয়ে গিয়ে পার্সির বাবাকেও বোঝালেন যাতে ছেলেকে স্কুল ছাড়িয়ে পাগলা গারদে না দেন। পার্সি অভিভূত হলেন। তাঁর কবিতার মুখ ঘুরে গেল। প্রতিভা প্রস্ফুটিত হল। পার্সি শেলির স্ত্রী মেরি শেলি তাঁর স্বামীর জীবনীতে লিখেছেন যে পার্সি জেমস লিন্ড সম্পর্কে প্রায়ই বলতেন, ‘‘আমার জীবনে আমার পিতার কাছে আমার যত ঋণ, তার থেকে ঢের বেশি ঋণ ওই ভদ্রলোকের কাছে।’’ পার্সি শেলির একাধিক কবিতাতেও তিনি জেমস লিন্ডের প্রতি তাঁর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

গবেষক ক্রিস্টোফার গুল্ডিং সম্প্রতি জেমস লিন্ডের কাগজপত্র ঘেঁটে আবিষ্কার করেছেন যে ১৭৮২ সাল থেকে ১৮০৯ সাল অবধি প্রাণিদেহের উপরে বিদ্যুতের প্রভাব নিয়ে নানান চিন্তাভাবনা করছিলেন লিন্ড। তাঁর পরিচিত অনেক মনীষীকেই তিনি তখন এ বিষয়ে চিঠি লিখেছিলেন। বিশেষ করে তিনি মৃত ব্যাঙের দেহে বিদ্যুৎ সঞ্চারণ করে সেই মৃতদেহের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছিলেন। পার্সি শেলিও তাঁর বন্ধুর এই গবেষণার বিষয়ে বিশেষ অবগত ছিলেন। এমনকি তিনি নিজেও এ বিষয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পার্সি শেলির কলেজের বন্ধু, টমাস জেফারসন হগ জানিয়েছেন যে অক্সফোর্ডে শেলির হস্টেলের ঘর ভর্তি থাকত নানান বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামে। তার মধ্যে ছিল বড় একখানা বৈদ্যুতিক ব্যাটারিও! টমাস হগ আরও লিখেছেন, শেলির এই উৎসাহ সরাসরি জেমস লিন্ডের দ্বারা প্রভাবিত।

তাই ১৮১৬ সালের গ্রীষ্মে যখন কবি বায়রন শেলি-দম্পতিকে জেনিভাতে তাঁর বাগানবাড়িতে বেড়াতে আসার নিমন্ত্রণ করেন, তখন শেলি লিন্ডের অনুপ্রেরণায় বিদ্যুৎ এবং প্রাণের সম্বন্ধ নিয়ে বেশ ওয়াকিবহাল। তাঁর মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী মেরিও সেই বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তত দিনে। বায়রনের বাড়িতেই সে বার লেখা হয় মেরি শেলির উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’।
মেরি নিজে লিখেছেন যে বইটি লেখার সম্মুখপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন এক রাতে বায়রন ও তাঁর স্বামী পার্সির এক দীর্ঘ আলোচনা থেকে। কোনও মৃত জীবকে বিদ্যুৎ দ্বারা পুনর্জীবিত করা সম্ভব কি না, ওঁরা সেই রাতে এটাই আলোচনা করছিলেন।

‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাসেও মেরি শেলি জেমস লিন্ডের প্রতি বেশ স্পষ্ট কিছু ইঙ্গিত করেছেন। সেই সব ইঙ্গিতের মধ্যে অন্যতম হল হেনরি ক্লারভাল-এর চরিত্রটি। উপন্যাসে ক্লারভাল গবেষক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বাল্যবন্ধু। দুজনে প্রায় অভিন্নহৃদয়, এমনকি ক্লারভাল তাঁর বন্ধু ভিক্টরের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে রাজি। শেষে তাঁকে প্রাণ দিতেও হয় বন্ধুর জন্য। কিন্তু ভিক্টর যখন বিদ্যুতের শক্তি আবিষ্কার করতে ও মৃত্যুকে জয় করতে ধাবিত, ক্লারভাল কিন্তু তখন মন দিয়ে সংস্কৃত পড়ছে। তাঁর ইচ্ছে, সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে ভারতে যাবে।

ভিক্টরের তৈরি দানবটির হাতে মৃত্যু হওয়ার দরুন ক্লারভালের ভারত-দর্শনের স্বপ্নটি আর সার্থক হয়নি। সত্যিই যদি তা হত, তা হলে ক্লারভালও এসে নামত কাজরীর সেই বন্দরে।
আর তার কয়েক দিন বাদেই হয়তো কুলপি হয়ে পৌঁছত কলকাতা। কিন্তু তা আর হল না। ক্লারভাল মারা পড়ল ভয়ঙ্কর সেই দানবের হাতে। আর পার্সি শেলি মারা গেলেন নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে, জলে ডুবে। তারই সঙ্গে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেল ডাক্তার জেমস লিন্ডের স্মৃতি আর তাঁর কলকাতায় আসার ইতিহাস।