Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

জনতা ঈশ্বরকেও গণপ্রহার দিতে ছাড়ে না

ছবি: রৌদ্র মিত্র

গ্রান্ট কাউন্টি, ইন্ডিয়ানা, ১৯৩০। জেলখানার বাইরে জনতার পৈশাচিক চিৎকার। ভিতরে তখন কুঁকড়ে রয়েছে তিনটি প্রাণ। খুন ও ধর্ষণে অভিযুক্ত ওই তিন জনকে জনতা জেলের দরজা ভেঙে উচিত শাস্তি দিতে এসেছে। দরজা ভেঙেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল জনা পঞ্চাশেক লোক। সামনে পেয়ে প্রথমে পিটিয়ে অজ্ঞান করল থমাস শিপকে। প্রায় নিষ্প্রাণ কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটিকে টেনে-হিঁচড়ে নামানো হল রাস্তায়। দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত শরীরটা টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হল আর এক অভিযুক্ত আব্রাম স্মিথ-এর কাছে।

পরের কুড়ি মিনিট স্মিথের উপরে চলল একই রকম অত্যাচার। যারা কাছ থেকে পেটানোর সুযোগ পাচ্ছিল না, দূর থেকেই ইট-পাথর ছুড়ে শোধ তুলছিল। যখন দুই কালো চামড়ার ‘পশু’কে কাছের একটি গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হল, তত ক্ষণে কারও দেহেই আর প্রাণ নেই। ওই অবস্থাতেই পোজ দিয়ে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেল জনতার মধ্যে। তার পর জনতার নজর পড়ল তৃতীয় অভিযুক্ত, কিশোর জেমস ক্যামেরন-এর দিকে।  চড়-থাপ্পড়-লাথি মারতে মারতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সেই গাছটির দিকে। সেখানে তখন তাকে ঝোলানোর জন্য তিন নম্বর দড়ি প্রস্তুত করা হয়ে গিয়েছে। ভাগ্য ভাল, সে দিন তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়নি। এক সহৃদয় মহিলা ভিড়কে শান্ত করে তার প্রাণরক্ষা করেন।

২০১৫। নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর জেল। দু’দিন আগেই এক তরুণীকে ধর্ষণের সন্দেহে পুলিশ গ্রেফতার করে বন্দি করে রেখেছে সৈয়দ ফরিদ খান নামে এক যুবককে। এলাকাবাসীর ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছিল। অভিযুক্তকে তাঁদের হাতে তুলে দিতে হবে। জেলের চারপাশে ভিড় জমা হতে দেখেও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। মূল ফটক ভেঙে ফরিদের সেল-এ পৌঁছতে বেগ পেতে হয়নি উন্মত্ত জনতার। প্রথমে গণপিটুনি দিয়ে নগ্ন করে ঘোরানো হয় ওই যুবককে। পরে মোটরবাইকের সঙ্গে কোমরে চেন বেঁধে ৭ কিলোমিটার দূরে ক্লক টাওয়ারে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদকে। লোকের মোবাইলে বন্দি হয় গোটা পর্বটি। গোড়া থেকে শেষ অবধি এই হত্যাকাণ্ডকে নেতৃত্ব দেয় এলাকারই স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা।

ইন্ডিয়ানা থেকে ডিমাপুর, আখলাক থেকে জুনেইদ— কোনও ব্যতিক্রমী বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ‘মব জাস্টিস’-এর নামে এই ‘পাবলিক লিঞ্চিং’-এর মতো অপরাধের ইতিহাস বহু পুরনো। দেখতে গেলে সম্ভবত যিশুই সব থেকে বিখ্যাত ব্যক্তি, যিনি ‘লিঞ্চিং’-এর শিকার। অবশ্য ওই ভাবে শাস্তি দেওয়াটা সে কালের দস্তুরই ছিল। উন্মত্ত জনতার হাতে ‘ঈশ্বর’-এরও ছাড় নেই! ‘লিঞ্চিং’ বরাবরই শাসক ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে পুষ্ট নিয়ন্ত্রণের একটি বড় হাতিয়ার। প্রাচীন ইতিহাসে যার সফল প্রয়োগ দেখা গিয়েছে পারস্য, গ্রিস, রোমে। বিদ্রোহ আর বিরুদ্ধ-মতকে ঠান্ডা করতে প্রথমে লিঞ্চিং, তার পরে ক্রুশে চড়ানো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেহগুলি ক্রুশবিদ্ধ অবস্থাতেই রাখা হত। জন্তু-জানোয়ারেরা যাতে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে। গোটা প্রক্রিয়াটিই করা হতো জনবহুল এলাকায়, সকলের সামনে। বিরুদ্ধাচরণের ভয়াবহ ফল বুঝিয়ে দেওয়াটা সে দিনের শাসকের পক্ষে খুবই জরুরি ছিল যে!

‘ভিজিলান্টিজম’ বা ‘সামারি জাস্টিস’-এর রোগের ইতিহাস দীর্ঘ। তবে, ‘লিঞ্চ’ শব্দটি মার্কিনিদের দান। কারণ, ‘হিস্ট্রি অফ লিঞ্চিং’ আদতে একটি মার্কিন ট্র্যাজেডি। সমাজতাত্ত্বিক জেমস কাটলার আরও জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘লিঞ্চিং’ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অপরাধ। আজকের দিনে ভারতে প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উপর বেড়ে চলা ‘লিঞ্চিং-এর ঘটনাকে বুঝতে চাইতে হলে আমাদের এক বার মার্কিন দেশের ওই কালো অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকাতে হবেই। কারণ, শ্বেতাঙ্গ মার্কিনিরা যখন ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ সভ্যতার গৌরব পালনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সে দেশের জনতার একাংশ চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণের মতো নানা অভিযোগ তুলে গণপিটুনি দিয়ে, প্রকাশ্যে পুড়িয়ে, গাছে ঝুলিয়ে বিনা বিচারে আফ্রিকান-আমেরিকানদের গণহত্যাও করছিল। ঠিক যেমন, এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ও ঐতিহ্য ‘রক্ষা’র নামে, গো-‘রক্ষা’র নামে লিঞ্চিং-এর এক নয়া অধ্যায় শুরু হয়েছে। এমন নয় যে, এ দেশে গণপিটুনিতে এর আগে কখনও কারও মৃত্যু হয়নি। কিন্তু তার চরিত্রটা এমন চড়া দাগের এবং প্রকাশ্য বর্ণ, জাতি ও সংস্কৃতি বিদ্বেষী ছিল না।

মার্কিন রেভোলিউশনের সময় ‘লিঞ্চ ল’ (বিচার ছাড়াই শাস্তি) থেকেই ‘লিঞ্চিং’-এর উৎপত্তি। অষ্টাদশ শতকে ভার্জিনিয়ার দুই মার্কিনির নাম যার সঙ্গে জড়িয়ে। পিটসিলভানিয়া কাউন্টির ক্যাপ্টেন উইলিয়াম লিঞ্চ এবং বেডফোর্ড কাউন্টির চার্লস লিঞ্চ। পড়শিদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে উইলিয়াম প্রথম শব্দটি ব্যবহার করেন বলে অনেকে দাবি করেন। ১৮৩৬ সালে এডগার অ্যালান পো একটি লেখায় দাবি করেন, তিনি সেই নথি পেয়েছেন। যদিও সে দাবি ছিল একেবারেই ভিত্তিহীন। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, ‘লিঞ্চ ল’ তৈরির নেপথ্যে রয়েছেন চার্লসই। ভার্জিনিয়ার ‘দেশভক্ত’ চার্লস স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ে কর্নেল হন। যুদ্ধের পরে বিচারক হয়ে তৈরি করেন ‘লিঞ্চ ল’। যা যুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষ নেওয়া ভার্জিনিয়ার বাসিন্দাদের উপর অত্যাচার চালাতে ব্যবহৃত হত।

১৭৮২ সালে লেখা একটি চিঠিতে চার্লস প্রথম এই প্রথার উল্লেখ করেন। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তায় এমন বিচারহীন শাস্তির পক্ষে মার্কিন কংগ্রেসে তিনি পরিচিতদের কাছে লবিও করেন। চার্লস এবং তাঁর সঙ্গীরা ভার্জিনিয়ায় এ ভাবেই অপরাধীদের শাস্তি বিধান করতেন বলে অভিযোগ। যা ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের দাক্ষিণাত্যে সাধারণ শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সমাজ নিয়ন্ত্রণের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রাক-গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন মুলুকে দক্ষিণ ও প্রাচীন পশ্চিম প্রান্তে দাসপ্রথা বিরোধীরা, গবাদি পশু ও ঘোড়া চোর, জুয়াড়ি এবং দুর্বৃত্তরাই ছিল ‘লিঞ্চ মব’-এর মূল টার্গেট। ১৮৮০-র পর থেকে ‘বিপন্নতা’র ধারণা ক্রমশ বাড়তে থাকায় শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে নানা ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘মব ভায়োলেন্স’-এর ঘটনা দ্রুত হারে বাড়তে থাকে। আফ্রিকান-আমেরিকান, নেটিভ আমেরিকান, ল্যাটিনো, ইহুদি ও এশীয় অভিবাসীরাই ছিল জনতার ক্ষোভের মূলে।

তখন বর্ণবিদ্বেষী নানা তত্ত্ব সাদা চামড়ার মার্কিনিদের মাথায় খেলছে। কালো চামড়ার লোকেরা সরকারি ভাবে ‘স্বাধীন’ হলেও জনতা (বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যে) তা মানতে নারাজ। ‘ট্রু আমেরিকান’-দের আধিপত্য কায়েম রাখতে এই সব ‘অপর’ জাতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখাটা জরুরি হয়ে পড়ছিল। আর তা করতে লিঞ্চিং-এর মতো মোক্ষম অস্ত্রের জুড়ি ছিল না। লিঞ্চিং অর্থনৈতিক ফায়দার রাস্তাও খুলে দিচ্ছিল। সফল কোনও কালো চাষি বা অভিবাসীর ‘লিঞ্চিং’-এর পরে স্থানীয় সাদা মার্কিনিদের সমাজের উঁচু অবস্থানে টিকে থাকাটাকে আরও নিশ্চিত করে দিত।

আসলে ‘অপর’ এবং ‘অপর’-এর সংস্কৃতি বরাবরই একটি স্থিতিশীল সমাজে বসবাসকারীদের মধ্যে নানা ধোঁয়াশা তৈরি করে। তা দূর করার একটা সহজ পদ্ধতিই হল এই ‘অপর’কে মনুষ্যেতর বা পশু বলে দেগে দেওয়া। সেই ‘পশু’ আফ্রিকান-আমেরিকানদের না ছিল ভোটাধিকার, না ছিল বিচারব্যবস্থা ও সরকারি অফিসে যোগদানের অধিকার। সাদা চামড়ার জনতা লিঞ্চ শুরুই করেছিল কালোদের হাত থেকে তাঁদের ঘরের মেয়েদের ‘রক্ষা’ করতে। আবার নিজেদের অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য তাঁরা সদ্য দাসত্ব থেকে মুক্ত কালো মানুষগুলোকেই দায়ী করতেন। তাঁদের ধারণা ছিল, গৃহযুদ্ধের পরে মুক্ত নিগ্রোগুলো একটু যেন বেশিই স্বাধীন হয়ে উঠছে। চাষ করে, দোকানপাট, ব্যবসা করে তাঁদের টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকী, তাঁদের ঘরের মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কও গড়ছে। নিগ্রোদের ‘স্বাধীনতা’র এই চৌহদ্দিটাকে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার বলে মনে হতে লাগল শ্বেতাঙ্গদের। লিঞ্চিং ছিল সেই নিয়ন্ত্রণের সেরা পথ।

১৮৮২ (এ বছর থেকেই লিঞ্চিং-এর তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়) থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে আমেরিকায় ৪,৭৪৩ জন (শুধু ‘রেকর্ডেড’) ‘লিঞ্চিং’-এর শিকার হন। যাঁদের মধ্যে ৩,৪৪৬ জনই আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর। তালিকায় রয়েছে বহু মহিলা ও শিশু। বাকি নিহত শ্বেতাঙ্গদের একটা বড় অংশকেই লিঞ্চ করা হয়েছিল নিগ্রোদের সাহায্য করার অভিযোগে।

কাউকে লিঞ্চ করে মারাটা একটা উৎসবের চেহারা নিত সে সময়। পিটিয়ে, খুঁচিয়ে, পুড়িয়ে, শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে, শহর জুড়ে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে, গাছে ঝুলিয়ে চলত নানা রকম অত্যাচার। ঘটনার সাক্ষী থাকত কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার শ্বেতাঙ্গ। কখনও সখনও লিঞ্চিং-এর আগাম নোটিস ছাপা হতো। রেলের এজেন্টেরা ঘোষিত লিঞ্চিং সাইটের জন্য বিশেষ টিকিট বিক্রির বন্দোবস্ত করতেন। খবর পেলেই ছুটে যেতেন ফোটোগ্রাফাররাও। লিঞ্চিং-এর ছবির কয়েকশো প্রিন্ট বের করে চড়া দামে বিক্রি করতেন তাঁরা। সেই সব ছবি দিয়ে কার্ড ছাপা হত। তা কিনে আত্মীয়দের উপহারও পাঠাতেন অনেকে।

এ ভাবেই সে দেশে ‘লিঞ্চিং’ নিছক শাস্তি বিধানের থেকে সংখ্যালঘুর উপরে সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত রাখার কৌশলেই পরিণত হয়েছিল।

ইন্ডিয়ানার ওই কুখ্যাত লিঞ্চিং-এর ছবি তুলেছিলেন ফোটোগ্রাফার লরেন্স বেইটলার। সেই ছবি মার্কিন শিক্ষক এবং গীতিকার অ্যাবেল মিরপুলকে প্রবল ভাবে বিচলিত করেছিল। প্রতিবাদে কলম ধরেছিলেন অ্যাবেল। ১৯৩৭ সালে বের হয় তাঁর কবিতা ‘স্ট্রেঞ্জ ফ্রুট’ (প্রথমে নাম ছিল ‘বিটার ফ্রুট’)। যা পরবর্তী কালে গান আকারেও ‘অ্যান্টি-লিঞ্চিং’ ক্যাম্পেনের থিম সং-এ পরিণত হয়। সেই গান আজও বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে মার্কিন মুলুকে সেরা প্রতিবাদের ভাষা। ইন্ডিয়ানার আগে ও পরেও মার্কিন মুলুকে গাছে গাছে অজস্র নিরপরাধের বিকৃত, গলে যাওয়া মৃতদেহ ঝুলেছে।

১৯১৬ সালের ওয়েকো টেক্সাস যেমন। এক শ্বেতাঙ্গ চাষির স্ত্রীকে খুনের অভিযোগে সতেরো বছরের জেসি ওয়াশিংটনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। সে দিনই দু’ঘণ্টার বিচারে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দেয়। প্রায় ১৬ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে গাছে চেন দিয়ে ঝুলিয়ে এক এক করে দু’হাতের সব ক’টি আঙুল কেটে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় জেসিকে। এর দু’বছর পরে আরও একটি কুখ্যাত লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছিল টেনেসির এস্টিল স্প্রিং লোকালয়ে। কালো চামড়ার তুলনায় একটু বেশিই ‘বড়লোক’ ছিলেন জিম মেকলহেরন। সঙ্গে রাখতেন অটোমেটিক রিভলভার। ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তিন যুবকের কাছে হেনস্থার শিকার হন জিম। শুরু হয় বচসা, গড়ায় হাতাহাতিতে। ক্রুদ্ধ জিম হঠাৎই রিভলবার বের করে গুলি চালিয়ে দেন। দুই যুবকের মৃত্যু হয়, অপর জন আহত।

উত্তেজিত জনতা জিমের লিঞ্চিং-এর প্রস্তুতি শুরু করে। দিন কয়েক পরে পলাতক জিমকে গুলিতে জখম করে পুলিশ। তাঁকে আনা হয় এস্টিল স্প্রিং-এ। প্রথমে জিমকে চেন দিয়ে একটি গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়। লোহা গরম করে চলে পর পর আঘাত। শেষে তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সহজে দমবার পাত্র ছিলেন না জিম। আধ ঘণ্টা ধরে পুড়েও এক বারের জন্যও জনতার কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি।

ওই বছরই সাদা চামড়ার মব-এর হাতে নৃশংস ভাবে খুন হন এক আফ্রিকান-আমেরিকান তরুণীও। জর্জিয়ায় এক অত্যাচারী বাগানমালিককে গুলি করে খুন করে তারই এক নিগ্রো কর্মী। তার বদলা নিতে পরের গোটা সপ্তাহ জুড়ে স্রেফ সন্দেহের বশে তেরো জনেরও বেশি নিগ্রোকে পিটিয়ে খুন করে শ্বেতাঙ্গ জনতা। নিহতদের অন্যতম ছিলেন মেরি টার্নার নামে বছর কুড়ির ওই তরুণীর স্বামীও। তারই প্রতিবাদ করে খুনিদের জেলে পাঠানোর হুমকি দেন মেরি। সেটিই ছিল আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ওই তরুণীর অপরাধ।

 মেরির হাঁটুতে দড়ি বেঁধে একটি গাছ থেকে উলটো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। একটু বাতাসের জন্যে প্রাণটা আইঢাই করতে লাগল মেয়েটার। তার পরে গ্যাসোলিন আর পেট্রোল ঢেলে গায়ে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হল। এই অবস্থায় জনতাদের মধ্যে থেকেই এক জন ছুরি দিয়ে মেয়েটির পেট চিরে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে আছড়ে পড়ল তরুণীর অজাত শিশু। নিমেষে তাকেও পিষে মারা হল। সব শেষে মেয়েটির নিথর শরীরে কয়েকশো বুলেট ছুড়ে নিজেদের ঝাল মেটাল জনতা।

এই সব পাশবিক প্রকাশ্য হত্যালীলার বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠতে দেরি হয়েছিল। অন্তত বিশ শতকের গোড়ার দুই দশক পর্যন্ত। সব থেকে বড় প্রতিবাদ উঠে এসেছিল আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠী থেকেই। যাঁদের মধ্যে সব থেকে বড় নাম ছিল স্কুলশিক্ষক, সাংবাদিক, ফেমিনিস্ট আইডা বি ওয়েলস-এর। আইডা ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘অ্যান্টি লিঞ্চিং ক্রুসেডার’। পঁচিশ বছর বয়সে যে মেয়েকে টিকিট থাকা সত্ত্বেও স্রেফ কালো চামড়ার হওয়ার কারণে ট্রেনের কামরা থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। ১৮৯২ সালে যিনি সাক্ষী হন, তাঁর তিন তরুণ বন্ধুর লিঞ্চিং-এর। এলাকায় যাঁদের মুদিখানার জনপ্রিয়তা হজম হয়নি শ্বেতাঙ্গ দোকানিদের।

ওই ঘটনাটি আইডার জীবনের গতিপথ পালটে দেয়। প্রতিবাদে কলম তুলে নেন তিনি। আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে লিঞ্চিং-বিরোধী জনমত গড়ে তোলেন। দেখান, কেমন করে ভুয়ো অভিযোগ তুলে দেশে আফ্রিকান-আমেরিকান নিধন যজ্ঞ চলছে। এরই মাঝে ১৮৯২ সালে তাঁর কলম থেকে এল বিখ্যাত অ্যান্টি-লিঞ্চিং প্যামফ্লেট ‘সাদার্ন হরর্স: লিঞ্চ ল ইন অল ইটস ফেজেস’। ১৯০৯ সালে গড়ে উঠল ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল’। আইডা তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তত দিনে লিঞ্চিং-এর বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে পথে নামছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান সাধারণ মানুষও। মিছিল, পথসভা, লেখালেখি, কংগ্রেসের কাছে তদবির— সবই চলল।

লিঞ্চিং বিরোধী সচেতনতা গড়তে থাকে শ্বেতাঙ্গ মার্কিনিদের একাংশের মধ্যেও। মার্কিন কংগ্রেসের সামনে প্রথম অ্যান্টি-লিঞ্চিং বিল নিয়ে আসেন রিপাবলিকান সদস্য এল সি ডায়ার। ১৮৮২-১৯৬৮ পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসে ২০০টিরও বেশি অ্যান্টি লিঞ্চিং বিল জমা পড়েছিল। ১৮৯০-১৯৫২, সাত জন প্রেসিডেন্ট মার্কিন কংগ্রেসকে এ নিয়ে ফেডেরাল আইন তৈরি করার কথা বললেন। তবু দক্ষিণের ভোট রাজনীতির কারণে একটিও বিল সেনেটে পাশ হয়নি। বিল পাশের ব্যর্থতার দায় নিয়ে এই সে দিন, ২০০৫ সালে মার্কিন সেনেট সরকারি ভাবে ক্ষমা চেয়েছে। ইতিহাসের ক্ষত মেটানোর কাজ শুরু করতেই তাদের লেগে গিয়েছে দীর্ঘ দুই শতাব্দী।

‘মব জাস্টিস’-এর নামে এই অমানবিক ঐতিহ্যে সব থেকে বড় নাম আমেরিকাই। কম দুর্নাম কুড়োয়নি লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকার দেশগুলিও। সাম্প্রতিক কালে লিঞ্চিং ট্রাডিশনে আরও বেশি করে নাম জড়িয়েছে এশিয়া, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি। আইসিস-এর নৃশংস হত্যা থেকে বাংলাদেশে পর পর ব্লগার ও মুক্তমনাদের হত্যা। ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার মিথ্যা অভিযোগ তুলে আফগানিস্তানের তরুণী ফারখন্দেহ থেকে পাকিস্তানের মাশাল খানের লিঞ্চিং। হরিয়ানার জাজ্জরে পাঁচ দলিতের হত্যা থেকে আখলাক-আলিমুদ্দিন— ভারতও মার্কিন মুলুকের লিঞ্চিং ট্রাডিশনের সেই দীর্ঘ আর লজ্জাজনক ইতিহাসকেই উসকে দেয়। কোথাও বর্ণের নামে, কোথাও ধর্মের বা সংস্কারের— প্রান্তিক জনকে নিয়ন্ত্রণ আর সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য কায়েম রাখাটাই আসল লক্ষ্য। রাজনীতি আর অর্থনীতির অঙ্কটা এক।

মার্কিন দেশে শুরুটা মেয়েদের রক্ষার নামে, এ দেশে গরু। সময়ে সময়ে ‘সুপ্রিমেসি’ প্রতিষ্ঠার গল্পটাই যা পালটে পালটে যায়। অস্ত্রটা একই থাকে।


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper