সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালিদের অভিমান রয়েই গেল


বৈদ্যুতিন মাধ্যম, তারপর সোশ্যাল মিডিয়া। সারা পৃথিবী এসে হাজির শয়নকক্ষে। বিশ্ব যেন এক গন্ডগ্রাম। আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে জাতীয় স্বাতন্ত্রকে কি গ্রাস করে নেবে? এ কি এক ‘নয়া-নয়া’ সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ? আবার শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্র গঠনের ধুম পড়েছে, অতএব প্রান্তিক জাতিসত্তা কি ধুলোয় লুন্ঠিত হবে?

বাঙালি জাতি আবার আজ দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত। দুই বঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গির কৌণিকতার ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু দুই বাংলায় বহু বাঙালি আছেন যাঁরা অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিতে আস্থাশীল। দুই বঙ্গের প্রতিই তাঁদের সমান মমতা।

আবার এর পাশাপাশি আর একটা ‘ক্যাটেগরি’ হল প্রবাসী বাঙালি। আবার দিল্লিও প্রবাস, আমেরিকা, লন্ডন, ইউরোপ থেকে আফ্রিকাও প্রবাস। চাচাকাহিনির জার্মানিতে বাঙালি আড্ডা মনে পড়ে। আবার মরিশাসে গিয়ে দেখা হয়েছে বহু বছরের প্রবাসী বাঙালি পরিবারের সঙ্গে। শিকড় বঙ্গদেশ না হয়েও পরবর্তী প্রজন্ম চাইলে যাতে বাঙালি থাকতে পারে তাতে বঙ্গসমাজেরও দায়িত্ব অনেক। সম্প্রতি ‘বাঙালি’ নামে কিছু বন্ধু একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু করেছেন। এই গ্রুপে প্রিয়দর্শী দত্ত সম্প্রতি লিখেছেন, ‘আজ দুপুরে হঠাৎ মনে পড়ে গেল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দু’টি ছোট গল্প— অরন্ধনের নিমন্ত্রণ এবং তালনবমী...অরন্ধন বা তালনবমী কী জিনিস অনেক বাঙালিই খেয়াল রাখেন না। এই প্রজন্ম হয়তো জানেই না। তার একটা কারণ পারিবারিক স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। এক প্রজন্ম নিজের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য ও যৌবনের দেখা সময়ের ও আচার ব্যবহারের কথা অন্য প্রজন্মকে জানিয়ে যায় না। আমাদের মধ্যে কত জন তাদের বাবা-মার থেকে বা দাদু-ঠাকুমার থেকে তাদের সময়ের ও দেশের কথা জানতে চায়। রাষ্ট্রবাদীরাও চায় শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করতে। কিন্তু পরিবারের ও সমাজের দায়িত্বকে তারা এড়িয়ে যেতে চায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধে বলেছেন যে আমরা দেশের উপর অধিকার হারিয়েছি এই কারণে নয় যে ইংরেজ আমাদের উপর শাসন করছে। আমরা দেশের উপর অধিকার হারিয়েছি যে সমাজ তার নিজের দায়িত্ব রাজ্যের হাতে তুলে দিয়েছে।

দিল্লিতে আমি আজ এক নন রেসিডেন্ট বাঙালি। ৮৭ সালে দিল্লি এসেছিলাম। ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত তবু অনাবাসী। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের বাংলা বিভাগের সম্পাদক ছিলেন অরুণ চক্রবর্তী। একদা আমাকে বলতেন, ‘তোমরা হলে ডালের পাখি। ফুড়ুৎ করে একটা সময়ের পর কলকাতা উড়ে যাবে। জানি না, অবসরের পর আজকাল কলকাতা ফিরতে ইচ্ছে হয় বটে কিন্তু প্রবাসী বাঙালির একটা দুঃখ আমি ত্রিশ বছরে অনুভব করেছি, বিশেষত সাংস্কৃতিক জগতে, সেটা বলতে চাই।

দিল্লিতে এসে বহু দশক ধরে রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চা করেছেন সকলের পরিচিত মাস্টারমশাই সুধীর চন্দ। কত ছাত্রছাত্রী যে তিনি নিজের হাতে তৈরি করেছেন তার হিসেব তাঁর কাছেও নেই। আর এক শিল্পী সম্প্রতি প্রয়াত হলেন, সুনন্দা ঘোষ। তাঁর স্মৃতিচারণায় চিত্তরঞ্জন পার্কে বিপিনচন্দ্র পাল মেমোরিয়াল হলে মনোজ্ঞ এক অনুষ্ঠানও করলেন তাঁর প্রিয়জন ও ছাত্রছাত্রীরা। তাঁর কন্যা-জামাতা, এমনকী, নাতনিও সঙ্গীতচর্চা চালাচ্ছেন। এই শিল্পীরা কিন্তু সর্বদাই মনে করেন যে কলকাতা বঙ্গীয় শিল্প-সংস্কৃতির স্নায়ুকেন্দ্র। তাই কলকাতার ছাড়পত্র না পেলে বাঙালির শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া অসম্ভব। আভেরি চৌরে একদা কলকাতায় অভিনেত্রী হিসাবে পাদপ্রদীপের আলোয় ছিলেন, দিল্লিতে না এসে কলকাতায় থাকলে হয়তো তিনি আরও বড় ‘ব্র্যান্ড শিল্পী’ হতে পারতেন। দিল্লিতে বহু বছর ধরে রবীন্দ্রনাথের গান শুনিয়ে আসর মাত করেন জয়তী ঘোষ। পেশায় তিনি দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। কলকাতায় যে কোনও গানের সিডির দোকানে গেলেই ব্যাঙের ছাতার মতো শ’য়ে শ’য়ে নানা শিল্পীর নিত্যনতুন সিডি দেখি। কিন্তু প্রবাসী বাঙালির অভিযোগ, কলকাতা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। শর্মিলা রায় পোমো প্যারিসে না থেকে কলকাতায় থাকলে এবং বাংলা চ্যানেলে যেতে থাকলে হয়তো আরও বেশি খ্যাতি পেতেন!

দিল্লির বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের কাণ্ডারী তপন সেনগুপ্ত আমাকে এ ব্যাপারে বার বার বলেন যে কলকাতা-দিল্লি এই দেওয়াল ভাঙতে হবে। দেখা হলেই তপনবাবু বলেন, আমরা দুর্গাপুজোর সময় নানা উৎসবে কলকাতা, মুম্বইয়ের শিল্পীদের নিয়ে আসি। কিন্তু দিল্লির ক’জন শিল্পীকে কলকাতা ডাকে? দিল্লির নানা বাঙালি সংগঠন, শুধু চিত্তরঞ্জন পার্ক নয়, নয়ডা, গুরগাঁও তো বটেই, এমনকী পটপরগঞ্জ থেকে করোলবাগ, ময়ুরবিহার থেকে পশ্চিমবিহার— বঙ্গীয় সংগঠন অশেষ।

দিল্লির আয়তন বিশাল। একটা পাড়া থেকে আর একটা পাড়ার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া মানে যেন মার্কোপোলোর অভিযান। তবু তপনবাবু সব সংগঠনকে একটা ছাতার তলায় আনার চেষ্টা করেন। সমস্যা হচ্ছে বঙ্গসন্তানদের নানা ধরণের ছোট ছোট ‘ইগো’। দাদাগিরির বাসনা এবং অর্থগৃধ্নুতা। একটা প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ আছে না, দুজন বাঙালি বসবাস শুরু করলে দুটো কালীবাড়ি হয়। তবু আমার মনে হয় সময় এসেছে সবাই মিলে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনকে শক্তিশালী করা, সেটা সম্ভব হলে তবেই দিল্লি-কলকাতার প্রাচীর ভাঙা সম্ভব হবে।

বাঙালির অতীত ইতিহাসেও ঝগড়া কিছু কম ছিল না। সুভাষ বসুর সঙ্গে কলকাতা পুরসভার প্রার্থী বাছাই নিয়েও বিধান রায়ের মতবিরোধ হয়েছে। চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গেও সুভাষবাবুর মতান্তর প্রবল হয়। আর ব্রিটিশ জমানার ‘বসন্তক’ পত্রিকা পড়ুন। কলকাতার এক পুরপিতা কী ভাবে অন্য বাঙালি পুরপিতার কেচ্ছার বিবরণ ছাপছেন তা দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। তাই মনে হয়, মতান্তর থাকবে, মনান্তরও হতে পারে, কিন্তু শত পুষ্প বিকশিত হোক না কেন! অঞ্জন কাঞ্জিলাল লড়াই করে কলকাতায় গিয়ে নাটক করছেন, তাঁর অতিসক্রিয়তা দেখে অন্য বহু নাট্যগোষ্ঠী ক্ষুব্ধ। আবার সাহিত্য আকাদেমির বিশ্বজিৎও নিজের মতো করে চেষ্টা করছেন, রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরের মতো কঠিন নাটক উপস্থাপিত করে ভিন রাজ্যে ডাক পাচ্ছেন। ওঁদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সে নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। চিত্তরঞ্জন পার্কে চিত্তরঞ্জন ভবনে এক নতুন কফি লাউঞ্জ করে তাতে আলাপ-আলোচনা আড্ডা শুরু করেছেন ভবনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত রায়চৌধুরী। এক এবং দশের হিমাদ্রি দত্তও সেখানে একের পর এক আলোচনা সভার আয়োজন করছেন। বঙ্গীয় সমাজও নানা অনুষ্ঠানে ব্যস্ত। আবার সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী দীপক ভট্টাচার্য বইমেলা থেকে নাট্যোৎসব, নানা কাজে ব্যস্ত। দুই সঙ্গীতশিল্পী মিহির রায়চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী দিল্লিতে গানের রেকর্ডিং স্টুডিও তৈরি করে ফেলেছেন নিজেদের অক্লান্ত পরিশ্রমে। বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন তাদের পত্রিকা দিগঙ্গনকে জনপ্রিয় করার জন্য কলকাতা বইমেলায় স্টল দিচ্ছে, অন্য রাজ্যের বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করছে। নবীন কবিদের আসর হচ্ছে। প্রবাসী বাঙালিদের ডিরেক্টর তৈরি হচ্ছে, বাংলা আকাদেমি গঠনের চেষ্টা হচ্ছে।

তপনবাবু বলেন, আপনারা আনন্দবাজার পত্রিকা সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হয়ে দিল্লির বাঙালিদের কথা লিখছেন না। আমি ওঁকে বলেছি, আমরা আনন্দবাজার পত্রিকার নেট এডিশনের মাধ্যমে প্রবাসী বাঙালির আরও বেশি বেশি করে সংবাদ পরিবেশন করতে চাই। ছোটখাটো ইগোর ঊর্ধ্বে উঠে ভাবুন, প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রত্যেক গোষ্ঠীর প্রচার সবসময় সম্ভব হয় না, মূল্যায়নে পক্ষপাত নেই কিন্তু ‘সাবজেক্টিভিটি’ তো থাকবেই।

পুনশ্চঃ দেখেছেন কাণ্ড! বিজনদার কথা বলতেই ভুলে গেছি। বিজন মুখোপাধ্যায়। নেহরু জমানা থেকে আইসিসিআর-এর অফিসার ছিলেন। অবসরগ্রহণের পর ইমপ্রেসেরিও নামে এক সংস্থা শুরু করেন। আজ দিল্লি শুধু নয়, কলকাতা-মুম্বই-বেঙ্গালুরু— সব শহরের সংশ্লিষ্ট জনসমাজ তাঁকে জানে। প্রবীণ বিজনদা মাঝে মাঝেই বলেন, ‘আমার তো অনেক বয়স হল, এখন নবীন প্রজন্মের কাজ এই কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।’

 

অলঙ্করণ: অর্ঘ্য মান্না