Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

নেহরুর ব্যর্থতারও যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন


এক কালখণ্ডের ভিতর আছি আমরা। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় রঙ্গমঞ্চে কত পটপরিবর্তন দেখেছি এই শাহি দিল্লিতে। এখন দেখছি নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক অধ্যায়। মুখ ও মুখোশে ভেদ আছে এই কালখন্ডের রঙ্গমঞ্চে। ব্যবহার আর বচনে মিল নেই। সত্য আর অসত্যের ভেদ মুছে যাচ্ছে। কাপট্যের ভাষা, ছলচাতুরির ভাষায় মোহগ্রস্ত আমাদের মন। এমন পরিস্থতি একদিনে আকস্মিক অকারণে হয়নি। এই সঙ্কটের শিকড় খুঁজতে হবে ইতিহাস থেকেই, কী ঘটেছিল অতীতে, তার অর্থ কী?

এই সম্বন্ধ বিচারেই ইতিহাসের আখ্যান। ইতিহাস তাই সময় চেতনার গদ্য। পূর্বকথন থেকে অনাগত ভবিষ্যতের রূপরেখা খুঁজে পাওয়া। আর তাই আজ ‘শাহি সমাচার’-এ ভারতের ইতিহাস রচনায় নেহরুর ভূমিকা ফিরে দেখতে চেয়েছি। জওহরলাল নেহরু অসৎ দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন এমন অভিযোগ কখনওই তাঁর বিরোধী নেতারাও তোলেননি। উল্টে এত বছর পর তাঁর সততা নিয়ে নানা তথ্য উজ্জ্বল আলোয় চোখ মেলেছে। নেহরুর ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন এম ও মাথাই। মাথাই তাঁর ‘রেমিনিসেন্স অফ দ্য নেহরু এজ’ গ্রন্থের এক জায়গায় লিখছেন, তিনি নেহরুকে পরামর্শ দেন, ‘হি কুড ডিডাক্ট এক্সপেনসেস ফর ট্রাইং অ্যান্ড আদার সাচ ইনসিডেন্টালস ফ্রম হিজ ইনকাম ফ্রম সেল অফ হিজ বুকস হোয়েন ফাইলিং ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নস টু গেট ডিডাকসন দ্যাট ওয়াজ লিগ্যালি পারমিসিবল। নেহরু আনসারড ইন দ্য নেগেটিভ সেইং দ্যাট হোয়েন হি হ্যাড নট ইনকারড দ্য এক্সপেনসেস হাউ কুড হি সিন ডিডাকসন, ইভন ইফ লিগালি অ্যালাওয়েড।’ ভাবা যায়? এত ছোট বিষয়েও নেহরু কতখানি সচেতন!

আর একটি ঘটনা। পঞ্জাবের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভীম সেন সাচার নেহরুকে বলেন, বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিত সিমলা সাকির্ট হাউসে ছিলেন, কিন্তু ২৫০০ টাকার একটি বিল সরকারকে মেটাননি। পঞ্জাবের তৎকালীন রাজ্যপাল সি ত্রিবেদী পরামর্শ দেন, ওই খরচটা রাজ্য সরকার কোনও বিবিধ অ্যাকাউন্টে দেখিয়ে দিক। মুখ্যমন্ত্রী নেহরুকে সে কথা জানান। নেহরু রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘‘এই টাকা আমি চেকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভাবে রাজ্য সরকারকে শোধ করে দিচ্ছি। তবে একেবারে পারব না।’’

নেহরু নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কী ভাবে নানা ব্যথর্তার নজির রেখেছেন তা নিয়েও কম লেখালিখি হয়নি। আমারও মনে হয় সে সব ব্যথর্তারও যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। কয়েক দিন আগে একটা বই হাতে এল। নাম ‘নেহরু’স ৯৭ মেজর ব্লান্ডারস।’ লেখক এক জন পদার্থবিদ। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা করছেন। এই ৯৭টি ভ্রান্তির প্রত্যেকটির সঙ্গে আমি একমত না হলেও বেশ কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে একমত। ভারতীয় সেনা কমান্ডাররা জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের এক্তিয়ারে ষখন ধীরে ধীরে নিয়ে আসছিলেন, যাকে বলা হয়েছিল ক্লিয়ারিং জে অ্যন্ড কে ফ্রম দ্য রডারর্স অ্যান্ড পাক আর্মি। মাশার্ল কারিয়াপ্পা ওয়েস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল অফিসার ছিলেন। তাঁর জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি নেহরুর কাছ থেকে আরও কিছু সময় চেয়েছিলেন। তিনি এবং আর এক কমান্ডার মেজর জেনারেল থিমায়া বলেছিলেন আর একটু সময় দিলেই আমরা কাশ্মীরকে পাক সেনা মুক্ত করে দেব। দু’সপ্তাহ সময় চান তাঁরা। কিন্তু নেহরু রেগে যান। সে সময় তিনি দিতে রাজি হননি। হয়তো আন্তর্জাতিক চাপ ছিল, হতে পারে রাষ্ট্রপুঞ্জের চাপ ছিল, কিন্তু থিমাইয়া তিনমূর্তি ভবনে নেহরুর সঙ্গে দেখা করে হতাশ হয়ে বেরিয়ে যান। নেহরু সময় দিলে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের রাজধানী মুজফ্ফরাবাদ আজ হয়তো ভারতেরই দখলে থাকত। লেখকের বক্তব্য, নেহরু সংঘর্ষ বিরতির আদেশ না দিলে হয়তো আজ গোটা কাশ্মীর ভারতের অধীনেই থাকত।

এটা অবশ্য সেনা অপারেশনের সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রশ্ন। নেহরু সময় দিলেই যে ভারতীয় সেনাবাহিনী সফল হত কি না তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে তাই আমার মনে হয়, নেহরুর ও কংগ্রেসের সঙ্গে জিন্না ও মুসলিম লিগের বোঝাপড়ায় অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। নেহরু যদি এটি এড়াতে পারতেন তা হলে তাঁর সাফল্যের মুকুটে এটি অনেক বড় পালক হতে পারত।

১৯৩৬-’৩৭ সালে প্রাদেশিক নিবার্চনে ১১টি এলাকায় ভোট হয়। কংগ্রেস পাঁচটি প্রদেশ— উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ, সেন্ট্রাল প্রভিন্স ও ওড়িশা-বিহারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। মুম্বই, বাংলা, অসম এবং নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স— এই চার প্রদেশে প্রধান দল হয়। জিন্নার মুসলিম লিগ তুলনামূলক ভাবে যথেষ্ঠ খারাপ করে। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে তখনই জিন্না জোট চেয়েছিলেন কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের। কংগ্রেস সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। বম্বে মন্ত্রিসভায় মুসলিম লিগের দুজন মন্ত্রীর নিয়োগ চান জিন্না। কংগ্রেস বলে, সে ক্ষেত্রে মুসলিম লিগ বিধায়কদের কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। জিন্না সে প্রস্তাবে রাজি হননি। উত্তরপ্রদেশেও একই ভাবে কংগ্রেস-লিগ সমঝোতা প্রবেশ। ভেঙে যায় নেহরু এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদের কংগ্রেসের সঙ্গে লিগের মিশে যাওয়ার প্রস্তাব। মানসিকতার জন্যই জিন্না আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে  মুসলিম লিগের আন্দোলনের চেষ্টায় সক্রিয় হন তিনি।

কাশ্মীরে রাষ্ট্রপুঞ্জের অধীনে গণভোট করানোর প্রস্তাব নিয়ে নেহরুর ভূমিকার সমালোচনা তো বহু আলোচিত বিষয়। সর্দার পটেল নিজে শেষ মুহূর্তেও এই প্রচেষ্টা কী ভাবে আটকাতে চান তা তো পটেলের ছায়াসঙ্গী সচিব ভি শঙ্করের স্মৃতিকথা থেকেই জানা যায়। জুনাগড়েও গণভোট হয় ’৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু সেটি সর্দার পটেল করান। রাষ্ট্রপুঞ্জের উপস্থিতি ছিল না সেখানে। এক ভারতীয় আইসিএস অফিসার সি বি নাগরকর এই ভোট পরিচালনা করেন। নেহরু নিজে কাশ্মীরের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক নাক গলানিতে বিরক্ত হন এবং তার দুঃখের কথাও তিনি জানান।

আজ এত বছর পর মনে হচ্ছে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনে কাশ্মীর সমস্যা থেকে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন এবং জাতপাতের সমস্যা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেহরুর ব্যর্থতা নজিরবিহীন।

নেহরুর দর্শন নিঃসন্দেহে আকর্ষণ করে কিন্তু তিনি সফল প্রশাসক ছিলেন বলে মনে হয় না। ’৬২ সালে চিনের আগ্রাসনের পর তিনি কার্যত ভেঙে পড়েন। ’৬৪ সালে তিনি মারা যান।

আজ সুষ্ঠু ভারত নির্মাণের জন্য প্রয়োজন নেহরুর ভ্রান্তিগুলির সংশোধন।


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper